রেযার মাকাম হাসিলের জন্য প্রয়োজন জাতি মহব্বত

হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘তাজাল্লীয়াতে জাত, তাজাল্লীয়াতে সিফাত ও তাজাল্লীয়াতে আফয়াল’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ রেযার পরিচয়ঃ
বিজ্ঞাপন
রেযার আভিধানিক অর্থ সন্তষ্টি বা প্রসন্নতা। ইসলামী পরিভাষায় খোদাতায়ালা যখন যে অবস্থায় রাখেন, তাহাতেই সন্তুষ্ট বা প্রসন্ন থাকাকে "রেযা" বলে। এক কথায় আল্লাহতায়ালার ফায়সালা (ব্যবস্থা) ও বিধানের উপর সন্তুষ্ট ও প্রসন্ন থাকাই "রেযা”।
আল্লাহপাক ঈমানদারগণকে পরীক্ষা করেন। কখনও বান্দাকে সুখে রাখেন; আবার কখনওবা দুঃখে রাখেন। সুখ বা দুঃখ যাহাই আসুক না কেন-উভয় অবস্থাতেই খোদাতায়ালার উপর সন্তুষ্ট থাকা ঈমানদারের ঈমানী কর্তব্য। প্রত্যেক অবস্থাতে ঈমানদার বান্দা যদি খোদার উপর সন্তুষ্ট বা প্রসন্ন থাকার যোগ্যতা অর্জন করিতে পারে, তবে বুঝিতে হইবে যে তাহার মধ্যে রেযার গুণ আসিয়াছে। এমতাবস্থায় আল্লাহপাক রেযার গুণধারী ঐ বান্দার উপর সন্তুষ্ট হন; ফলে রেযার গুণের সাথে রেয়ার মাকামও ছালেকের সিদ্ধ হয়।
রেযার মাকাম হাছিলের জন্য রেযার গুণ অর্জন করা পূর্ব শর্ত। অর্থাৎ খোদার সন্তুষ্টি বা প্রসন্নতা অর্জন করিতে হইলে তাঁহার (খোদার) বিধানের উপর সর্ব অবস্থায় সন্তুষ্ট বা প্রসন্ন থাকিতে হইবে-ইহার কোন বিকল্প নাই। যে সাধক সর্ব অবস্থায় খোদাতায়ালার উপর সন্তুষ্ট থাকে; খোদাতায়ালাও তাঁহার উপর প্রসন্ন থাকেন। কুরআন মজীদের এক আয়াতে এরশাদ হয়ঃ
বিজ্ঞাপন
رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ
অর্থাৎ-"আল্লাহ তাহাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তাঁহারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট।" (সূরা মায়েদাহঃ ১১৯)
রেযার তাৎপর্য সম্পর্কে বহু হাদীস বর্ণিত আছে। রাসূলে পাক (সাঃ) বলিয়াছেনঃ আল্লাহ বলেন, আমি তব্দীর অর্থাৎ অদৃষ্ট লিপি নির্ধারণ করিয়া দিয়াছি। তদ্দ্বীর অর্থাৎ উপায় অবলম্বনের ক্ষমতাও দিয়াছি। আমার সৃষ্টি এবং কার্যকলাপের পরিমানও মজবুত করিয়া দিয়াছি। যাহা কিছু হইবে বা ঘটিবে তাহা পূর্বেই নির্দিষ্ট করিয়া দিয়াছি। যে ব্যক্তি আমার এই বিধানের প্রতি সন্তুষ্ট থাকিবে, আমিও তাঁহার প্রতি প্রসন্ন থাকিব। যে ব্যক্তি আমার বিধানের প্রতি অসন্তুষ্ট থাকিবে আমিও তাহার প্রতি অসন্তুষ্ট থাকিব, আমার সহিত তাহার সাক্ষাত হওয়ার দিন পর্যন্ত।
বিজ্ঞাপন
খোদাতায়ালার বিধানে সন্তুষ্ট বান্দার প্রতি আল্লাহতায়ালা প্রসন্ন থাকেন। কিন্তু ইহার বিপরীত অর্থাৎ আল্লাহর বিধানে অসন্তোষ প্রকাশকারী বান্দার উপর আল্লাহ গোস্বা হন।
ইমাম গাজ্জালী (রঃ) রচিত "কিমিয়া সাদাত" নামক গ্রন্থে দেখা যায়ঃ কোন একজন পয়গম্বর (আঃ) দরিদ্রতা ও নিঃস্বতা বশতঃ বিশ বছর যাবৎ ক্ষুধার্ত ও বিবস্ত্র অবস্থায় এবং বড় পরিশ্রম ও কষ্টের সহিত দিনাতিপাত করিয়াছেন। তিনি দুঃখ ও দারিদ্র বিমোচনের জন্য আল্লাহতায়ালার দরবারে প্রার্থনা করিতেন, কিন্তু তাঁহার দু'আ কবুল হইত না। অবশেষে একদিন ওহী আসিলঃ "হে নবী! জমীন ও আসমান সৃষ্টি করিবার পূর্বেই তোমার অদৃষ্টে এই রূপ অবস্থা নির্ধারণ করিয়া রাখিয়াছি। তুমি কি চাও যে, আমি তোমার জন্য আসমান জমিনের সৃষ্টি প্রকৃতি এবং পরিচালনা ও শাসন ব্যবস্থা আবার নূতনভাবে গঠন করি এবং যাহা কিছু বিধান করিয়া রাখিয়াছি, তাহা উলট-পালট করিয়া দেই? যাহাতে তোমার যাহা ইচ্ছা তাহা পূর্ণ হউক, আর আমার যাহা ইচ্ছা তাহা কার্যকরী না হউক? এই কি তোমার আশা? তোমার ইচ্ছানুযায়ী সমস্ত কার্য হউক, আর আমার মরজী অনুযায়ী কিছু না হউক, ইহাই কি তোমার কামনা? আমার ইজ্জতের শপথ করিয়া বলিতেছিঃ তোমার হৃদয়ে যদি পুনরায় ইত্যাকার চিন্তার উদয় হয়, তবে তোমার নাম পয়গম্বরগণের দফতর হইতে কাটিয়া ফেলিব।"
আল্লাহর বিধানে অসন্তুষ্ট ব্যক্তির প্রতি আল্লাহর অসন্তুষ্টির প্রমাণ হাদীসেও দেখা যায়। রাসূলে পাক (সাঃ) বলিয়াছেন যে, আল্লাহ বলেনঃ "আমি এমন ক্ষমতা ও প্রতাপশালী আল্লাহ যে, আমি ভিন্ন আর কোন আল্লাহ নাই। যে কেহ আমার প্রদত্ত বিপদে ছবর এবং নেয়ামতে শোকর না করিবে এবং আমার বিধানে সন্তুষ্ট না থাকিবে তাহাকে বলিয়া দাও, সে আমার রাজ্য ছাড়িয়া অপর আল্লাহ অনুসন্ধান করুক।"
বিজ্ঞাপন
'রেযা'-ই শ্রেষ্ঠতম মাকামঃ
পূর্ববর্তী নসিহত সমূহে যে সমস্ত মাকাম বা গুণ (যেমন, তওবা, যোহদ, ফকর, খওফ, তাকওয়া, ছবর, শোকর, এখলাস ইত্যাদি) সম্পর্কে আলোচনা হইয়াছে, সে সমস্ত পাঠে নিশ্চয়ই তোমরা উপলব্ধি করিতে পারিয়াছ যে, উল্লিখিত গুণ বা মাকামগুলোর মধ্যে এখলাসের শ্রেষ্ঠত্ব সর্বাধিক। কিন্তু 'রেযা'র মাকাম এখলাসেরও উর্ধ্বে।
মূলতঃ ছুলুক ও ছায়ের শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য পনেরটি মাকাম বা গুণ অর্জন করা-যাহা তাজাল্লাত্রয়ের অধ্যায়ে আলোচনা করা হইয়াছে। পনেরটি মাকামের প্রথমটি হইল তওবা এবং সর্বশেষ হইল রেযা। এই সমস্ত মাকামের সাথে তাজাল্লীয়াতে জাত, তাজাল্লীয়াতে সিফাত ও তাজাল্লীয়াতে আয়াল (ক্রিয়া কলাপ)-এর সম্পর্ক আছে। একমাত্র "রেখা' ব্যতীত সকল মাকাম বা গুণ তাজাল্লীয়াতে আফ্যাল ও তাজাল্লীয়াতে সিফাতের নূরে সিদ্ধ হয়-যদিও ইহাদের পূর্ণতা আসে তাজাল্লীয়াতে জাতি নূরে। কিন্তু 'রেযা'র মাকাম তাজাল্লীয়াতে জাত ভিন্ন অর্জন করা যায় না।
বিজ্ঞাপন
কোন সাধক যখন তাজাল্লীয়াতে আফ্যালের নূর প্রাপ্ত হয়-তখন সে আল্লাহতায়ালার কুদরত সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করিতে পারে। সে তখন বুঝিতে পারে যে, আল্লাহর ক্ষমতার কোন পারাপার নাই। এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ডে যাহা কিছু হইতেছে তাহা সব কিছুই একক খোদাতায়ালার ইচ্ছাতেই সংঘটিত হইতেছে। খোদার ইচ্ছাতে গ্রহ-নক্ষত্রগুলো লাটিমের মত ঘুরিতেছে। খোদার ইচ্ছাতেই গাছে ফল হইতেছে, জমিনে শস্য হইতেছে, পানিতে মাছ হইতেছে। খোদার ইচ্ছাতেই সময়মত ঋতুর পরিবর্তন হইতেছে।
খোদাতায়ালার সীমাহীন ক্ষমতাকে প্রত্যক্ষ করিয়া ছালেক তওবার প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং তওবার মাকাম হাছিল করে। খোদাতায়ালার অপার কুদরত দৃষ্টে এবং আলমে মেছালের আয়নায় দোযখবাসীদের শাস্তির নমুনা দৃষ্টে ছালেক ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া খওফ ও তাকওয়ার মাকাম বা গুণ হাছিলে তৎপর হয়। তাজাল্লীয়াতে আয়াল ও তাজাল্লীয়াতে সিফাতের নূরে ছালেক মহা আধ্যাত্মিক জগত দৃষ্টে দুনিয়ার তুচ্ছতা উপলব্ধি করিয়া যোহদ ও ফকরের মাকাম হাছিল করে। আল্লাহতায়ালার শাকের ও রহমান নামে ছায়ের করিয়া ছালেক বুঝিতে পারে যে, খোদাতায়ালাই একমাত্র নেয়ামতদাতা; কিছু দেওয়া বা না দেওয়া-তাহার ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। যাহা কিছু দেন-তাহা তদীয় দয়া ও করুণার কিঞ্চিত বিকাশ মাত্র। ইত্যাকার জ্ঞান অর্জন করিয়া সে শোকর ও ছবর-এর মাকাম হাছিল করে; তাওয়াক্কুল বা খোদা-ভরসার ক্ষেত্রে দৃঢ় চিত্তের অধিকারী হয়।
এখলাসের মাকাম বা গুণের ক্ষেত্রে বলা হইয়াছেঃ যতক্ষণ ছালেক গুপ্ত শিরকের উভয় শাখা থেকে মুক্ত না হয়, ততক্ষণ এখলাসের গুণ আসে না। ছালেক বেলায়েতে ছোগরাকে অতিক্রম করিয়া যখন আকরাবিয়াতে যায়-তখনই তাহার এখলাসের গুণ সিদ্ধ হয়। কারণ গুপ্ত শিরকের কোন অবস্থাই তখন আর থাকে না। কাজেই বুঝা গেল, আফয়ালের নূরে এখলাসের গুণ আসে না; ইহা আসে সিফাতে হাকীকীর নূরে-বেলায়েতে কোবরার অধ্যায়ে।
বিজ্ঞাপন
কিন্তু রেযার মাকাম বা গুণ আফয়াল বা সিফাত-কোন নূরের সাহায্যের অর্জন করা যায় না। রেযার মাকাম তয় করিবার জন্য প্রয়োজন হয় তাজাল্লীয়াতে জাতি নূরের কারেন্ট-যাহা কামালাতে নবুয়তের দায়েরা হইতে ঊর্ধ্বের সবগুলো দায়েরাতেই বিরামহীন ভাবে পাওয়া যায়। উল্লিখিত আলোচনায় বুঝা যায় যে, রেযার মাকাম সকল মাকামের ঊর্ধ্বে।
রেযার মাকাম শ্রেষ্ঠতম হওয়ার পিছনে আরও কিছু কারণ আছে। আলোচিত মাকামগুলোর মধ্যে একমাত্র রেযার হকিকত আখেরাতে প্রকাশ পাইবে। অন্য কোন মাকামের হকিকত আখেরাতে প্রকাশ পাইবে না। আখেরাতে তওবার প্রয়োজন নাই। ফকর বা যোহদের দরকার নাই। তাওয়াক্কুলের বা ছবরের কোন প্রয়োজন নাই। আছে কেবলমাত্র রেযা বা খোদার সন্তুষ্টি বা প্রসন্নতা।
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছেঃ আল্লাহতায়ালা মু'মীনদের জন্য (জান্নাতে দীদার দেওয়ার উদ্দেশ্যে) জ্যোতিষ্মান হইবেন। অতঃপর তিনি বলিবেন-হে জান্নাতবাসী! তোমরা আমার কাছে প্রার্থনা কর। তখন তাঁহারা বলিবেন, আমরা আপনার সন্তুষ্টি ও প্রসন্নতা চাই; সর্বদা আপনি আমাদের প্রতি রাজী-খুশী থাকুন।"
বিজ্ঞাপন
পূর্ববর্তী কোন কোন নসিহতে বলা হইয়াছে যে, আল্লাহর অসংখ্য নেয়ামতের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম নেয়ামত হইল খোদার দীদার বা দর্শন। অথচ উল্লিখিত হাদীসে দেখা যায়, বেহেশতে মোমীনগণ দীদারে-এলাহী পাওয়ার পরেও খোদার নিকট রেযা বা খোদার সন্তষ্টি কামনা করিবে। দীদারে-এলাহী শ্রেষ্ঠতম নেয়ামত হওয়া সত্ত্বেও 'রেযা' কে ইহার চেয়ে বড় করিয়া দেখার মধ্যে রহস্য কি? আসলে দীদারে-এলাহীর স্থায়ীত্বের জন্য খোদাতায়ালার রেযা বা প্রসন্নতার প্রয়োজন। খোদাতায়ালা যদি প্রসন্ন না থাকেন তবে তাহার দীদার স্থায়ী নাও হইতে পারে। আর তাই খোদার ইচ্ছাতেই মোমীনগণ বেহেশতে তাহার রেযা বা সন্তুষ্টি কামনা করিবেন যেন খোদার দীদার স্থায়ী হয়; খোদা যেন তাঁহার জামাল মোবারকে পর্দা টানিয়া না দেন।
এই কারণে খোদার রেযাকে শ্রেষ্ঠতম নেয়ামত হিসাবে পাক কুরআনে ঘোষণা করা হইয়াছে। আল্লাহপাক ঘোষণা করেনঃ
ووَرِضْوَانٌ مِّنَ اللَّهِ أَكْبَرُ
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ-“এবং আল্লাহতায়ালার রেযা বা সন্তুষ্টিই শ্রেষ্ঠতম নেয়ামত।" (সূরা তওবাহঃ ৭২) 'সূরা ক্বাফ'-এ আল্লাহপাক ঘোষণা করেন,
لَهُمْ مَّا يَشَاءُونَ فِيْمَا وَلَدَيْنَا مَزِيدُ
অর্থাৎ-"ওখানে যাহা চাইবে, পাইবে আমা হইতে; পাইবে আরও অধিক।" (সূরা ক্বাফঃ ৩৫)
বিজ্ঞাপন
'আরও অধিক রহিয়াছে'-এই অংশের ব্যাখ্যায় কোন কোন মোফাস্স্সির বলিয়াছেন যে, জান্নাতবাসীদেরকে আল্লাহতায়ালা তিনটি পুরস্কারে ভূষিত করিবেন। যথাঃ-
★ এমন একটি নেয়ামত দান করিবেন, যাহা খোদ জান্নাতেও নাই। বিষয়টি এই রূপ যেমন, আল্লাহপাক পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করিয়াছেন,
فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَا أُخْفَى لَهُمْ مِنْ قُرَّةِ أَعْيُنٍ جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُوْنَ
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ-"কাহারও জানা নাই যে, এই রূপ লোকদের জন্য কত কিছু নয়ন জুড়ানো আসবাব যে গায়েবী ভান্ডারে মওজুদ আছে।" (সূরা সেজদাহঃ ১৭)
★ স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আ'লামীন জান্নাতবাসীদিগকে ছালাম পেশ করিবেন। ইরশাদ হইয়াছেঃ
سَلَمُ قَوْلاً مِّنْ رَّبِّ رَّحِيمٍ
অর্থাৎ-"তাহাদেরকে ছালাম বলা হইবে দয়াময় রবের পক্ষ হইতে।" (সূরা ইয়াসিনঃ ৫৮)
★ আল্লাহতায়ালা ঘোষণা দিবেনঃ "আমি তোমাদের উপর সন্তুষ্ট।"
জান্নাতবাসীদিগের জন্য আল্লাহপাকের ঘোষিত উল্লিখিত তিনটি পুরস্কারের মধ্যে আল্লাহর রেযা বা সন্তুষ্টিকে শ্রেষ্ঠ বলা হইয়াছে। আল্লাহতায়ালার এরশাদে যাহার প্রমাণ মিলে। আল্লাহ বলেন,
وَ رِضْوَانٌ مِّنَ اللَّهِ أَكْبَرُ
অর্থাৎ- "আর আল্লাহর সন্তুষ্টিই সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত।” (সূরা তওবাহঃ ৭২)
রেযার গুণ বা মাকাম অর্জনের তাগিদ আল্লাহপাক কুরআন মজীদের বিভিন্ন আয়াতে আমাদেরকে দান করিয়াছেন। ইবাদত-বন্দেগীই হউক অথবা অন্য কোন পুণ্য কর্মই হউক-সর্বক্ষেত্রে মানুষের পরম লক্ষ্য থাকা উচিৎ খোদার রেযা বা সন্তুষ্টি অর্জন করা। তবেই কল্যাণ।
আল্লাহতায়ালা বলেনঃ "যে ব্যক্তি স্বীয় মাল সম্পদ পবিত্রতা এবং পরিচ্ছন্নতা অর্জনের লক্ষ্যে দান করে এবং কাহারও অনুগ্রহের প্রতিদানে নহে, কেবল তাহার মহান প্রতিপালকের সন্তুষ্টি বা রেযার আশায়; সে অচিরেই পরিতুষ্টি লাভ করিবে।" (সূরা লাইলঃ রুকু-১)
আল্লাহপাক আরও ঘোষণা করেনঃ "এবং যাহারা আল্লাহর রেযা বা সন্তুষ্টির জন্য ধৈর্য ধারণ করিয়াছে, নামাজ কায়েম করিয়াছে এবং যাহা কিছু আমি তাহাদিগকে দিয়াছি তাহা হইতে কিছু গোপনে ও প্রকাশ্যে দান করিয়াছে এবং খারাপ কাজকে পুণ্য কর্মের দ্বারা দূরীভূত করিয়াছে, তাহাদের জন্যই রহিয়াছে পরকালের উত্তম গৃহ। (সূরা রায়াদঃ রুকু-৩)
রেযার মাকাম হাসিলের জন্য প্রয়োজন জাতি মহব্বতঃ
পঞ্চদশ মাকামের শ্রেষ্ঠতম হইল রেযার মাকাম। এই মাকাম তয় করা সহজ নয়। বিপদে-আপদে, বালা-মুছিবতে, রোগ-শোকে তথা সর্ব অবস্থায় খোদার উপরে সন্তুষ্ট থাকার মত আত্মিক অবস্থা তৈরী করিতে হইবে-ইহা অত্যন্ত কঠিন। এই জন্য প্রয়োজন জাতি প্রেমের পূর্ণতা; প্রয়োজন ছুলুক ও যযবার পরিপূর্ণতা। যতক্ষণ পর্যন্ত ছুলুক' ও যযবার' পূর্ণতা না হইবে, যতক্ষণ পর্যন্ত জাতি প্রেমের শেষ স্তরে পৌঁছানো না যাইবে; ততক্ষণ পর্যন্ত সর্বাবস্থায় খোদার উপর প্রসন্ন থাকার যোগ্যতা আসিবে না।
আবার খোদা প্রেম অর্জনও সহজ নহে। প্রেমের সাথে ওতপ্রোত সম্পর্ক আছে দুঃখ ও যন্ত্রণার। আল্লাহপাক ততক্ষণ পর্যন্ত কোন আশেকের দেলে প্রেম সঞ্চার করিবেন না; যতক্ষণ না পরীক্ষামূলক হাজার বিপদাপদ তাহার উপর আপতিত করিবেন। বিপদ-আপদ, বালা-মুছিবতের মানদন্ডে আল্লাহতায়ালা খোদাঅন্বেষীকে যাচাই করেন। কথায় বলে, "বিপদে বন্ধুকে চেন, রণাংগনে বীরে।"
খোদাপ্রেমিক হযরত শিবলী (রঃ) ছাহেব একদা ভাবোন্মত্ত হন। তাঁহার অবস্থার গুঢ় রহস্য উপলব্ধি করিতে না পারিয়া লোকজন তাঁহাকে উন্মাদ বিবেচনা করিয়া হাসপাতালে ভর্তি করিয়া দিল। অতঃপর তাঁহার কতিপয় বন্ধু বান্ধব তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিবার জন্য হাসপাতালে গিয়াছিল। হযরত শিবলী (রঃ) তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমরা কাহারা? তাহারা বলিলেন, আমরা আপনার বন্ধু, আপনাকে দেখিতে আসিয়াছি। ইহা শুনিয়া হযরত শিবলী (রঃ) ছাহেব তাহাদের দিকে প্রস্তর ছুড়িতে লাগিলেন। তাহারা প্রস্তরাঘাতের ভয়ে পলায়ন করিলেন। তখন হযরত শিবলী (রঃ) ছাহেব ইষৎ হাস্যে তাহাদিগকে বলিলেন, "তোমরা যে আমার বন্ধু বলিয়া পরিচয় দিলে, তোমরা তো মিথ্যাবাদী! কখনও তোমরা আমার বন্ধু নও, বন্ধু হইলে আমার প্রদত্ত দুঃখ-কষ্ট অম্লান বদনে ও সন্তুষ্ট চিত্তে সহিয়া লইতে।"
লতঃ খোদাকে চেনার পথে বিপদ-আপদ, দুঃখ-কষ্ট অনিবার্য ভাবেই আসিবে। আগত বিপদ-আপদে স্থির ও অবিচল থাকিলে আল্লাহ সেই বান্দার দেল প্রেম-নেয়ামতে ভরপুর করিয়া দিবেন। ফলে প্রেমের প্রভাবে প্রেমিক প্রেমাস্পদ (খোদাতায়ালা) হইতে আগত যাবতীয় দুঃখ কষ্টে সন্তুষ্ট থাকিবারও গুণ অর্জন করিবে।
খোদাপ্রেমিকের নিকট খোদা হইতে আগত সুখ ও দুঃখ-উভয়ই সমান মনে হয়। সুখ ও দুঃখ উভয়কেই প্রেমিক হাসি মুখে গ্রহণ করে। ইহা প্রেমের চিরন্তন স্বভাব। হযরত শেখ সাদী (রঃ) ছাহেব বলেনঃ একদা নিশিতে আমি লক্ষ্য করিলাম যে, একটি মোমবাতি একটি পতংগের সাথে ঝগড়া করিতেছে। মোমবাতি পতংগকে বলিতেছে, হে পতংগ। প্রেম করা তোমার কাজ নহে। অগ্নিশিখায় তোমার সামান্য একটু পাখনা দগ্ধ হইল, আর তুমি ছটফটানি শুরু করিলে; ইহাতো প্রেমিক প্রেমিকার স্বভাব নয়। আমার দিকে তাকাইয়া দেখ। মাথা হইতে পোড়া শুরু হইয়াছে, পা পর্যন্ত পুড়িতেছে; অথচ আমি একটুও নড়াচড়া করিতেছি না। ইহাই প্রেমের স্বভাব। প্রেমাস্পদের দিক হইতে যত দুঃখই আসুক না কেন, প্রেমিক তাহা হাস্য বদনে প্রফুল্লচিত্তে গ্রহণ করে। দুঃখের ভিতরও এক প্রকারের তৃপ্তি আছে-কেবলমাত্র প্রেমিক জনই তাহা আস্বাদন করিতে পারে।
হযরত জোনায়েদ বোগদাদী (রঃ) ছাহেব বলিয়াছেনঃ আমি একদা হযরত সারী সাক্বতী (রঃ) ছাহেবকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম; যে ব্যক্তি সত্যিকারের খোদাপ্রেমিক সে কি বিপদে-আপদে দুঃখিত বা চিন্তিত হয়? তিনি উত্তর করিয়াছিলেন, না, তেমন ব্যক্তি কখনও দুঃখিত হইতে পারে না। আমি পুনরায় জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম, যদি তাহাকে তরবারী দ্বারা আঘাত করা হয়? তিনি আবারও বলিলেন, না, তথাপিও খোদা প্রেমিক দুঃখিত হন না। এক আঘাত কেন-সত্তর আঘাত করিলেও তিনি বিন্দু মাত্রও বিচলিত বা দুঃখিত হন না।
উপরের আলোচনা হইতে বুঝা গেল যে, প্রেমের পূর্ণতা যখন আসে, রেযার মাকাম তখনই হাছিল হয়। প্রেম দুই প্রকারঃ জাতি প্রেম এবং সিফাতি প্রেম। 'রেযা'র মাকাম বা গুণ হাসিল করিতে হইলে কেবলমাত্র সিফাতি প্রেমই যথেষ্ট নহে, সেখানে প্রয়োজন জাতি প্রেম। তবে সিফাতি প্রেম থেকে ছবর বা ধৈর্যগুণ উৎপন্ন হয়; প্রেম সিফাতি হইতে জাতি পর্যায়ে পৌঁছাইলে 'রেযা'র গুণ আসে।
বিবি যুলায়খা পয়গম্বর হযরত ইউসুফ (আঃ) এর রূপ ও সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হইয়া প্রেমে পড়িয়াছিল। এই প্রেম ছিল সিফাতি প্রেম। যুলায়খার প্রেমের কথা যখন চতুর্দিকে ছড়াইয়া পড়িল, শহরের মহিলারা পরস্পর কানাঘুষা করা শুরু করিল। সেই সমস্ত মহিলাদেরকে স্বীয় প্রেমের রহস্য বুঝানোর জন্য একদা যুলায়খা ভোজ সভার আয়োজন করিল। ভোজ সভায় উক্ত মহিলাদেরকে নিমন্ত্রণ করা হইল। যখন মহিলারা ভোজ সভায় উপস্থিত হইল, তাহাদের সম্মুখে বিভিন্ন প্রকার খাদ্য ও ফল-ফলাদি উপস্থিত করা হইল। তথায় লেবুও ছিল। সেই লেবু কাটিবার জন্য যুলায়খা উপস্থিত মহিলাদের প্রত্যেকের হাতে একটি করিয়া চাকু দিল। তাহাদেরকে লেবু কাটিবার নির্দেশ দিয়া যুলায়খা তথায় ইউসুফ (আঃ) কে উপস্থিত হওযার আহবান করিল। হযরত ইউসুফ (আঃ) আসিলে লেবু কাটায় রত মহিলারা তাঁহার দিকে তাকাইল। তদীয় সৌন্দর্য দর্শনে তাহারা বিমুগ্ধ হইল, হতভম্ব হইল। সকলেই বলিয়া উঠিল, এই ব্যক্তি মানব নয়! ইনি কোন মহান ফেরেশতা। এই বিমূঢ়তার মধ্যে কখন যে তাহারা নিজেদের হাত কাটিয়া ফেলিয়াছে-তাহা টেরও পায় নাই। তৎকালে মিসরে দুর্ভিক্ষ হইয়াছিল। দুর্ভিক্ষ কবলিত ক্ষুধার্ত মানুষ হযরত ইউসুফ (আঃ) এর দর্শনে আগমন করিত এবং তাঁহার রূপ লাবণ্য দর্শনে এতই মোহিত হইত যে, তাহাদের ক্ষুধার অনুভূতি পর্যন্ত লোপ পাইত।
হযরত ইউসুফ (আঃ) আল্লাহর সৃষ্ট একজন মানুষ; তিনি স্রষ্টা নহেন। সৃষ্টির সৌন্দর্যের যেখানে এমন প্রভাব যে, ক্ষুধার্ত মানুষ ক্ষুধার যন্ত্রণার কথা বিস্মৃত হয়; সেখানে সমস্ত সৌন্দর্যের আধার মহান স্রষ্টার কৈফিয়তশূন্য রূপ ও সৌন্দর্যের প্রভাব কেমন হওয়ার কথা তাহা একটু চিন্তা করিলেই যে কেহ বুঝিতে পারে।
খোদাপ্রেমিক যখন তাঁহার পরিচ্ছন্ন কালবের আয়নায় খোদাতায়ালার নিদর্শনাদি, খোদাতায়ালার আফ্যালের নূর ও সিফাতের নূর দর্শন করে; তখন সেই খোদাপ্রেমিক এমন বিমোহিত হয় যে, কোন দিকেই তাঁহার কোন খেয়াল থাকে না। তাঁহার খাবার দাবারের খেয়াল থাকে না, পোশাকের খেয়াল থাকে না, খোদা হইতে আপতিত বিপদ-আপদের যন্ত্রণার অনুভূতিও থাকে না। খোদাতায়ালার বিভিন্ন সিফাতে ছায়ের পূর্বক অর্জিত জ্ঞান ও গুণের প্রভাবে যে কোন বিপদ-আপদ, বালা-মুছিবতে স্থির ও অবিচল থাকিতে সে সক্ষম হয়। কিন্তু তথাপিও এই স্তরের সাধকের মধ্যে রেযার হকিকতের গুণ আসে না। কারণ যথার্থ রেযার জন্য প্রয়োজন মহব্বতে জাতির পূর্ণতা যাহা হকিকতে মুহাম্মদীর দায়েরাতে খোদা প্রেমিকের অর্জিত হয়।
হকিকতে মুহাম্মদী হইল জাতে উদ্ভূত প্রেমের প্রথম বিকাশ। এখানে উল্লেখ্য যে, মানব সৃষ্টির মূখ্য উদ্দেশ্যই হইল প্রেম। নতুবা ইবাদতের জন্য তো ফেরেশতারাই যথেষ্ট ছিলেন। কেবলমাত্র ইবাদতের জন্য মানুষকে সৃষ্টি করা হয় নাই। মানব সৃষ্টির মূল কারণ খোদার প্রেম-যে প্রেমের গুণ ফেরেশতাদের মধ্যে নাই। এই জন্য একজন খোদা প্রেমিক প্রেমের প্রভাবে যখন অঝরে কাঁদে-আসমানের ফেরেশতাদের মধ্যে তখন চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। প্রেমিকের ক্রন্দন দৃষ্টে তাঁহারা বিস্ময়াবিষ্ট হন।
খোদাতায়ালার জাতে প্রথম যে প্রেম উদ্ভূত হয়-সেই প্রেমের একটি কনা মহান খোদা হকিকতে মুহাম্মদীর গভীর কেন্দ্রে রাখিয়া দেন। একজন খোদা প্রেমিক যখন তাহার সাধনা বলে এবং খোদাতায়ালার ফজলে হকিকতে মুহাম্মদীর দায়েরাতে উপনীত হয়, তখন সেই সাধক হকিকতে মুহাম্মদীতে রক্ষিত প্রেমকনার ধারক ও বাহকের যোগ্যতা অর্জন করে। তখনই তাঁহার মহব্বতে জাতি পূর্ণতা পায়। মহব্বতে জাতির পূর্ণতার প্রভাবে তাহার রেযার মাকামও সিদ্ধ হয়। কারণ এই স্তরে সাধকের উপর খোদার পক্ষ থেকে সুখ বা দুঃখ যাহাই আসুক না কেন তাহাতেই সে সন্তুষ্ট থাকে। সে তো সুখ বা দুঃখের মুখাপেক্ষী নহে; সে ভালবাসে সুখ ও দুঃখের কেন্দ্র বিন্দু পবিত্র জাতকে। তাই জাতের সন্তুষ্টিই তাহার সন্তুষ্টি হয়।
হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব এমন প্রেমিকদের সম্পর্কেই তদীয় মছনবীতে বলেনঃ
"ঈঁ আজব বুলবুলকে বকুশায়েদ দেহাঁ,
তা খোরাদ উখার রা বা গুলছেতাঁ।"
অর্থাৎ-আল্লাহ প্রেমিকদের আত্মা এমনই বুলবুল যে, ফুল ও কাঁটা উভয়কেই ভালবাসে। ইহার তাৎপর্য হইলঃ বনের বুলবুল শুধু ফুলকে ভালবাসে, কাঁটাকে নহে। কিন্তু আল্লাহ প্রেমিকগণ ফুল ও কাঁটা -উভয়কেই ভালবাসে। অর্থাৎ আল্লাহর তরফ থেকে আগত সুখকেও ভালবাসে এবং দুঃখকেও ভালবাসে।
মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব নিজের অবস্থা ব্যক্ত করিতে তাই বলিতেছেনঃ
"আশেকাম বর কাহর ও বর লোতফাশ বজিদ্দ,
আয় আজব মান আশেকে ঈঁ হার্দুজেদ্দ।”
অর্থাৎ-আমি প্রিয়পাত্রের (খোদাতায়ালার) কঠোরতা ও মেহেরবানী-উভয়কেই প্রকৃতরূপে ভালবাসি। দেখ! আমার অবস্থা কতই না আশ্চর্যজনক যে, দুইটি বিপরীত মুখী বস্তু উভয়টিকেই আমি ভালবাসি।
কাজেই তোমাদের নিশ্চয় ইহা বোধগম্য হইয়াছে যে, রেযার মাকাম হাছিল করিতে হইলে মহব্বতে জাতির পূর্ণতা অর্জন করিতে হইবে, ছুলুক ও যযবা পুরাপুরিই হাছিল করিতে হইবে। কিন্তু ইহা বড় কঠিন কাজ। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের মত সাধকেরও রেযার মাকাম সিদ্ধ করিতে দীর্ঘ বার (১২) বৎসর সময় লাগিয়াছিল।
"মাবদা ওযা মা'য়াদ" নামক পুস্তিকাতে তিনি বলেন, "ছুলুকের রাস্তায় কদম রাখার সময় হইতে ১২ বৎসর পরে এই ফকীরকে (মুজাদ্দেদ আলফেছানীকে) রেযার মাকাম দ্বারা সম্মানিত করা হয় এবং নাফসকে এমিনান বা প্রশান্তি দান করা হয়। অতঃপর ক্রমাগত আল্লাহর ফযল বা অনুগ্রহে মাকামে রেযা বা সন্তুষ্টি হাছিল হয়। এই ফকীর ঐ সময় পর্যন্ত এই দৌলত লাভে সক্ষম হয় নাই, যতক্ষণ না খোদাতায়ালার রেযা বা সন্তুষ্টির একটি আক্স বা প্রতিবিম্ব আলোকিত হইয়া সামনে আসে। ইহার পর নাফসে মুৎমাইন্না বা প্রশান্ত নাম্স স্বীয় মাওলার প্রতি রাজী হয় এবং তাহার মাওলা নাক্সে মুৎমাইন্নার প্রতি রাজী হন।"
মহব্বতে জাতি অর্জনের উপায়ঃ
পূর্বেই বলা হইল যে, রেযার মাকামের জন্য মহব্বতে জাতি শর্ত। কিন্তু এই মহব্বতে জাতি অর্জনের উপায় কি?
মহব্বতে জাতি অর্জন করিতে হইলে তথা রেযার মাকাম হাছিল করিতে হইলে প্রথমে প্রয়োজন পীর বা মোর্শেদের রেযা বা সন্তুষ্টি অর্জন। যতক্ষণ পর্যন্ত খোদা অন্বেষী পীরে কামেলের রেযা বা সন্তুষ্টি অর্জনে সক্ষম হইবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত খোদাতায়ালার রেযা বা প্রসন্নতা অর্জন তাহার জন্য দুরাশা মাত্র। এই প্রসংগে মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তদীয় "মাবদা ওয়া মা'য়াদ" পুস্তিকাতে বলেনঃ খোদার রেযা বা সন্তষ্টিকে পীরের রেযা বা সন্তষ্টির পশ্চাতে রাখা হইয়াছে। যতক্ষণ না কোন মন্ত্রীদ নিজেকে স্বীয় পীরের সন্তুষ্টির মধ্যে বিলীন করিয়া দেয়, ততক্ষণ পর্যন্ত সে খোদাতায়ালার রেযামন্দী লাভে সক্ষম হইবে না।"
আর পীরের রেযা বা প্রসন্নতা লাভ করিতে হইলে পীরের হাতে মৃতবৎ পড়িয়া থাকিতে হইবে; পীরের ইচ্ছায় স্বীয় ইচ্ছা বিলীন করিতে হইবে। পীর যখন যে নির্দেশ দেন-তাহা যথাযথ পালন করিতে হইবে। পীর যদি মুরীদকে বলেন আগুনে ঝাপ দিতে, মৃত্যু নিশ্চিত জানিয়াও তাহাকে তাহাই করিতে হইবে। তবেই পীরের রেয়া অর্জন সম্ভব হইবে। ওলী আল্লাহগণের জীবন কাহিনীতে ইহার এমন বহু নজির দৃষ্ট হয়। এই প্রসংগে আমার জীবনের একটি ছোট্ট ঘটনা তোমাদের বলি। এখানে উল্লেখ্যঃ কেবলমাত্র তোমাদেরকে শিক্ষাদানের জন্যে আমার জীবনের দুই একটি ঘটনা কোন কোন নসিহতে বর্ণনা করিতেছি-অন্য কোন উদ্দেশ্যে নয়। নতুবা আমারও ভয় হয়-নাজানি কোন রিয়া প্রকাশ পায় কিনা?
তরিকা প্রচার জীবনের শুরুর কথা। আমি তখন জাকের ক্যাম্পে থাকি। সেই সময়ে আলে খাঁ কান্দার একজন বৃদ্ধ এজমা বা হাফানী রোগীকে লইয়া এনায়েতপুরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হইলাম। সেই রোগী এমনই অসুস্থ ও দুর্বল ছিল যে, এক রশি হাটার ক্ষমতাও তাহার ছিল না। তাহাকে লইয়া চরভদ্রাসন স্টীমার ঘাটে গেলাম। স্টীমারে করিয়া স্থলচর ঘাটে গেলাম। সেখান হইতে বহু কষ্টে রোগীকে লইয়া এনায়েতপুর পৌঁছাইলাম। তিন দিন পীরের দরবারে থাকিলাম। তিন দিন অন্তে কেবলাজান হুজুর রোগীসহ আমাকে বিদায় দিলেন। বলিলেন, রোগী লইয়া তুমি ফরিদপুরে যাও। রোগীকে তাহার বাড়ীতে পৌঁছাইয়া দিবে। তুমি ব্যতীত এমন অসুস্থ রোগী কেহ লইতে সাহস করিবে না।
পীরের নির্দেশে রোগীসহ দরবার শরীফ ত্যাগ করিলাম। আল্লাহর কি ভেদ! আমরাও দরবার হইতে বাহির হইলাম; আর মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হইল। এমতাবস্থায় কি করি? দরবারে ফেরত যাইব-তাহারও উপায় নাই। কারণ তাহা হইবে আদবের খেলাফ। অগত্যা বৃষ্টির মধ্যেই ভিজিয়া রওয়ানা হইলাম। রোগীর অবস্থা ক্রমশঃ আশংকার দিকে গেল। একেতো হাফানীর রোগী, তাহার উপর বৃষ্টিতে ভেজা; ইহাতে রোগীর প্রাণ বায়ু বাহির হওয়ার উপক্রম হইল। এমতাবস্থায় সেক দিতে পারিলে রোগীর কষ্টের কিছুটা উপশম হইত। কিন্তু কোথায়বা আগুন পাই, কোথায়বা পাট কাঠি পাই। সেই সময় জাকেরদের প্রতি এনায়েতপুরবাসীদের সুদৃষ্টি ছিল না। চক্ষুলজ্জা পরিত্যাগ পূর্বক নিকটস্থ এক বাড়ীতে যাইয়া কিছু পাটকাঠি এবং আগুন চাহিলাম। রোগীর মরণাপন্ন অবস্থার কথা শুনিয়া লোকটির দয়া হইল। তিনি কিছু পাটখড়ি এবং একটু আগুন আমাদেরকে দিলেন। সেই পাটকাঠি জ্বালাইয়া আগুনের সাহায্যে রোগীর শরীরে উত্তাপ প্রয়োগ করিলাম। রোগীর অবস্থার কিছুটা উন্নতি হইল। অতঃপর আবার রওয়ানা হইলাম। পথিমধ্যে পড়িল বিশাল এক বিল। বিল পার হওয়ার কোন ব্যবস্থাই নাই। না আছে নৌকা; না আছে ভেলা। সাঁতরাইয়া বিল পার হওয়া ব্যতীত গত্যন্তর নাই। মহা বিপদে পড়িলাম। সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিলামঃ "সাঁতরাইয়া বিল অতিক্রম করিব। যদি রোগী পার করিতে না পারি, তবে রোগীর আগে আমিই মরিব।"
আমার সংগে আরও দুই জন জাকের ছিলেন। তাঁহাদিগকে বলিলাম যে, তোমাদেরকে আমি শক্ত করিয়া ভেলার মত বাঁধিয়া দেই। অতঃপর তোমাদের উপরে রোগীকে শোয়াইয়া দেই। তোমরা রোগীসহ সাঁতার দিবে; আর আমি তোমাদের এবং আমার বিছানাপত্রসহ সাঁতার দিব। তাহারা রাজী হইলেন। অতঃপর তাহাই করিলাম। বহু কষ্টে বিল পার হইলাম। তারপর আসিলাম স্থলচর ঘাটের দিকে। এখানে আসিয়া দেখি আর এক বিপদ। ঘাটের কিনারে একটি বট গাছ। প্রতি দিন বট গাছের উত্তরে স্টীমার নোংগর করে। কিন্তু আজকে স্টীমার নোংগর করিয়াছে বট গাছের দক্ষিণ পার্শ্বে। বট গাছের দক্ষিণে নোংগরকৃত স্টীমারের নিকটে যাইতে ছোট্ট একটি খাল পার হইতে হইবে। খালটি তেমন চওড়া নহে বটে; কিন্তু ইহার গভীরতা ও স্রোত-উভয়ই বেশী। ছোট্ট একটি নৌকা দেখিতে পাইয়া ইহার মাঝিকে বলিলাম, ভাই, আমরা বিপদগ্রস্থ, আমাদেরকে একটু উপকার করুন। খালের ঐ পারে আমাদেরকে নামাইয়া দেন। লোকটি জিজ্ঞাসা করিল, আপনারা কোথা হইতে আসিলেন? জবাবে বলিলাম, "এনায়েতপুর দরবার হইতে।" ইহা শুনিয়া লোকটি বিরক্তির ভাব চেহারায় আনিয়া বলিল, "আচ্ছা! আপনারা জাকের! আমি কোন জাকের আমার নৌকায় উঠাইব না।" আমি বলিলাম, "আপনাকে পঞ্চাশ টাকা দিব। আমাদেরকে পার করিয়া দিন।” জবাবে সে বলিল, "পঞ্চাশ কেন, পাঁচশত টাকা দিলেও নহে। কোন জাকের আমার নৌকায় উঠাইব না।" উপায় অন্তর না দেখিয়া দৌড়াদৌড়ি শুরু করিলাম। একটু দূরে খালের পার্শ্বস্থিত এক জেলের বাড়ীর উঠানে একজন বৃদ্ধকে কাজে রত দেখিয়া দৌড়াইয়া তাহার নিকট গেলাম। বলিলাম, আমাদেরকে একটু দয়া করুন। আমাদের সাথে মুমূর্ষ রোগী। কিভাবে ঐ পারে যাইব? কোন নৌকা নাই। স্টীমার ধরিতে হইবে। স্টীমার এখনই ছাড়িবে। সেই বৃদ্ধ জেলে একটি ছেলের সহযোগিতায় পানিতে ডুবন্ত একটি নৌকা উঠাইয়া আমাদেরকে পার করিয়া দিলেন। আমি জেলেকে অন্ততঃ দশটি টাকা দেওয়ার চিন্তা করিয়া বলিলাম, আপনি আমাদেরকে অনেক উপকার করিলেন। আপনাকে কিছু দিতে চাই। ইহা শুনিয়া তিনি বলিলেন, "সামান্য একটু উপকার আপনাকে করিলাম। ইহার বিনিময়ও কি গ্রহণ করিতে হইবে? তদুপরি আপনারা গুরুর বাড়ী হইতে আসিয়াছেন।" লোকটির কথায় আমি লজ্জিত হইলাম।
যাই হোক, বহু চড়াই-উৎড়াই পার হইয়া স্টীমারে চড়িলাম। আল্লাহপাকের দয়া হইল। আমরা ফরিদপুরে আসিলাম। রোগীকে তাহার বাড়ী আলে খাঁ কান্দায় পৌঁছাইয়া দিলাম।
এমন সব কঠিন পরীক্ষা পীরের তরফ হইতে মুরীদের উপর আসিবে। জীবনকে বাজী রাখিয়া পীরের উক্তরূপ আদেশ মুরীদকে প্রতিপালন করিতে হইবে। এখানে প্রয়োজন যেমন সাহসের; তেমনি মহব্বতের। যে মুরীদ জীবনের আশা পরিত্যাগ পূর্বক পীরের আদেশ প্রতিপালন করিতে পারিবে, কেবল সেই পীরের রেযা বা সন্তুষ্টি অর্জন করিতে পারিবে। পীরের রেযার পশ্চাতে আছে খোদার রেযা। মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব বলেন,
"চু তো যাতে পীরেরা কারদি কবু
হাম খোদা দর জাতাশ আমাদ হাম রসূল।"
অর্থাৎ-যেই মাত্র তুমি তোমার পীরের যাতকে কবুল করিলে তখনই আল্লাহ তোমাকে বান্দা হিসাবে, রাসূল (সাঃ) তোমাকে উম্মত হিসেবে স্বীকার করিলেন। আল্লাহ ও রাসূলের স্বীকৃতি তখনই তুমি পাইলে, যখন পীরের তরফ হইতে স্বীকৃতি পাইলে।
হে জাকেরান সকল! তোমরা পীরের খেদমত কর। পীরকে মহব্বত কর। জীবনকে বাজী রাখিয়া পীরের যে কোন হুকুম পালন কর। তাহা হইলে পীরের রেযা বা সন্তুষ্টি অর্জন করিতে পারিবে। ফলে পীরের তাওয়াজ্জুহ বলে আধ্যাত্মিক অনুশীলনের যোগ্যতা পাইবে। আধ্যাত্নিক চর্চার মাধ্যমে আল্লাহপাকের আফয়াল ও সিফাতকে অতিক্রম করিয়া জাতের সান্নিধ্যে পৌছাইতে পারিবে, মহব্বতে জাতির প্রভাবে খোদাতায়ালার রেযা বা প্রসন্নতার মাকাম হাছিল করিয়া অনন্ত জীবনকে সুখময় করিতে পারিবে। আল্লাহপাক তোমাদেরকে দয়া করুন। আমীন!





