'তৌহিদে ওজুদী' ও 'তৌহিদে শহুদী' সম্পর্কে আলোচনা

হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘তাজাল্লীয়াতে জাত, তাজাল্লীয়াতে সিফাত ও তাজাল্লীয়াতে আফয়াল’ بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ 'তৌহিদে ওজুদী' ও 'তৌহিদে শহুদী' সম্পর্কে আলোচনাঃ
বিজ্ঞাপন
সাধকগণ সাধনা দ্বারা আল্লাহতায়ালার পরিচয় গ্রহণ করিয়া তাহাদের সাধনালব্ধ অনুভূতি ও জ্ঞান যে ভাবে বর্ণনা করিয়াছেন, তাহাকে প্রধানতঃ দুই ভাগে ভাগ করা হইয়াছে। যথাঃ
★ তৌহিদে ওজুদী,
★ তৌহিদে শহুদী।
বিজ্ঞাপন
গউস পাক হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রঃ) ছাহেব, হযরত জালাল উদ্দিন রূমী (রঃ) ছাহেব, হযরত মহীউদ্দিন ইবনুল আরাবী (রঃ) ছাহেব, হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব, পারস্যের সূফী সাধক ও কবি হাফিজ (রঃ) ছাহেব আল্লাহতায়ালার পরিচিতি যে ভাবে বর্ণনা করিয়াছেন, তাহাকে তৌহিদে ওজুদী বলা হইয়াছে। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রঃ) ছাহেব ও তদীয় অনুসারীগণ যে ভাবে আল্লাহপাকের পরিচয়ের অনুভূতি ও জ্ঞান বর্ণনা করিয়াছেন, তাহাকে তৌহিদে শহুদী বলা হইয়াছে।
'তৌহিদ' শব্দের অর্থ একত্ব। 'ওজুদ' অর্থ সত্ত্বা বা অস্তিত্ব। তৌহিদে ওজুদী হইল এক খোদাতায়ালাকেই মওজুদ (বর্তমান) জানা এবং খোদা ব্যতীত আর যাহা কিছু আছে তাহাদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা।
ছালেক যখন আপন পীরের তাওয়াজ্জুহ প্রাপ্তিতে সফল হয়, তখন ধীরে ধীরে সে দুনিয়ার আকর্ষণ ও নাফসের দাসত্ব মুক্ত হয়। পীরের দয়ায় আপন দৈহিক খাঁচা হইতে বাহির হইয়া ঊর্ধ্ব দিকে ছায়ের শুরু করে। অতঃপর আত্নিক ছায়েরের মাধ্যমে ছালেক খোদাতায়ালার আসমা ও সিফাতের প্রতিবিম্বিত নূরময় জগতে প্রবেশ করে। ক্রমান্বয়ে ছালেকের উপরে নূরের পতন বৃদ্ধি পায় এবং নূরের প্রখরতায় ছালেক বাহ্যিক জ্ঞান বা অর্জন সাপেক্ষ জ্ঞান হারাইয়া ফেলে। যে দিকেই তাকায়, সে দিকেই দেখে খোদার নূর। নূর ছাড়া আর কিছুই দেখে না; এমন কি নিজেকেও দেখিতে পায় না। ফলে নূর হইতে আর নিজেকে কিংবা অপরাপর সৃষ্টিকে পৃথক করিতে না পারিয়া বলিয়া ফেলে 'হামাউস্ত' বা সকলই তিনি। এই মাকামে খোদা ব্যতীত আর কোন কিছুই দৃষ্টিপথে না পরায় ছালেক ছোকর (নেশা) ও জজবা হেতু খোদাতায়ালার অস্তিত্ব ব্যতীত গায়ের আল্লাহর অস্তিত্বকে অস্বীকার করে। এই অবস্থাই তৌহিদে ওজুদী।
বিজ্ঞাপন
তৌহিদে শহুদী হইল বহুবিধ বস্তু বর্তমান থাকা স্বত্ত্বেও কেবল একমাত্র খোদাতায়ালাকেই দর্শন করা এবং খোদা ব্যতীত আর যাহা কিছু আছে তাহা দৃষ্টি পথে না পতিত হওয়া।
মূলতঃ তৌহিদে ওজুদীবাদীগণ যে মাকাম হইতে তাহারা খোদার অস্তিত্ব ব্যতীত সবকিছুর অস্তিত্বকে অস্বীকার করেন এবং যেখানে তাহারা তাহাদের মারেফাত চর্চা শেষ করেন- সেই বেলায়েতে ছোগরা জগত হইতে যখন কোন ছালেক খোদাতায়ালার দয়ায় ঊর্ধ্বে তথা মূল মারেফাত রাজ্যে প্রবেশ করেন তখন তাহাদের বিভ্রান্তি কাটিয়া যায়। সৃষ্টিকে স্রষ্টা হইতে পার্থক্য করার জ্ঞান তাহাদের জন্মে। তখন তাহারা বুঝিতে পারেন যে, পূর্ববর্তী বেলায়েতে ছোগরার মাকামে বা দায়েরায়ে জেলালে তৌহিদে ওজুদীর প্রবক্তাগণ তৌহিদের যে ব্যাখ্যা দেন তথা খোদা ব্যতীত আর কোন কিছুরই অস্তিত্ব নাই, তাহা সঠিক নয়। মূলতঃ দেলে খোদাপ্রেম আধিক্যের কারণে খোদার নূর ছাড়া দৃষ্টি পথে আর কিছুই দেখা যায় না; তাই উম্মত্ততা আসা স্বাভাবিক। এবং ওজুদবাদীদের খোদার অস্তিত্ব সম্পর্কে উক্ত ব্যাখ্যা উন্মত্ততা প্রসূতই বটে। সূর্য উদয়ের সাথে সাথে আকাশের নক্ষত্র গুলো আর দেখা যায় না; সূর্যের প্রখর আলোর কারণে নক্ষত্রগুলো আসলে দৃষ্টি সীমায় আসে না। ইহার অর্থ এই নয় যে, আকাশে নক্ষত্র নাই। সূর্য যেমন আছে, নক্ষত্রগুলোও তেমনি আছে। তদ্রুপ সাধকের দেলে খোদা প্রেমের সূর্য উদয় হওয়ার কারণে নক্ষত্রতুল্য এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ড অন্তর্হিত হয়। খোদার দয়া ও অনুকম্পায় সাধকের দৃষ্টির প্রখরতা যখন বৃদ্ধি পায় তখন স্রষ্টাকে যেমন দেখিতে পায়, তেমনি সৃষ্টিকেও দেখিতে পায়। তাহার দ্বিত্ব জ্ঞান আসে। যেমন দিনের বেলায় দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে সূর্যের সাথে নক্ষত্রগুলোকেও দেখা সম্ভব।
স্রষ্টা সম্পর্কে সাধকের এই অনুভূতিই তৌহিদে শহুদী। মূলতঃ খোদাতায়ালার দয়া ও অনুকম্পায় তৌহিদে ওজুদীই ধীরে ধীরে তৌহিদে শহুদীতে পরিণত হয়।
বিজ্ঞাপন
সাধকগণের মধ্যে আল্লাহ সম্পর্কীয় জ্ঞান ও অনুভূতির বাহ্যদৃষ্টিতে পার্থক্য মনে হইলেও তাহাদের মধ্যে একটি ঐক্য রহিয়াছে। আল্লাহপাকের জ্ঞান ও পরিচয় সম্পর্কে এই ভিন্ন অনুভূতি বস্তুতঃ আল্লাহতায়ালার সম্পর্কে ভিন্ন মত নয়।
আল্লাহপাকের পরিচয় গ্রহণ করিবার দুইটি স্তর আছে। ইহাদের একটি হইল কামালাতে বেলায়েত' ও অন্যটি কামালাতে নবুয়ত২। উভয় স্তরের সাধকগণকেই প্রথমতঃ কালবে বা দেলে কলেমা প্রতিষ্ঠিত করিতে হয়। অর্থাৎ দেলকে আল্লাহ ছাড়া অন্য সকল কিছুর আকর্ষণ হইতে মুক্ত করিতে হয়। এই অবস্থায় ছালেক বা সাধক যে বৈশিষ্ট্য আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে প্রাপ্ত হন, তাহা হইল-
★ তাহার হৃদয়ে পার্থিব কোন বস্তু বা ব্যক্তির আকর্ষণ থাকে না।
বিজ্ঞাপন
★ তিনি আল্লাহতায়ালা ছাড়া অন্য কোন কিছুর প্রভুত্ব স্বীকার করেন না।
★ তাহার দেল পার্থিব চাহিদা ও আকর্ষণ হইতে মুক্ত হওয়ার কারণে পার্থিব স্বার্থ ও মোহ হইতে পাক পবিত্রতা লাভ করে।
এমতাবস্থায় তাহার দেল পার্থিব মোহ ও দৈহিক প্রবৃত্তি মুক্ত অস্তিত্ব লাভ করে। তাহার দেল আর পার্থিব বা দেহের চাহিদার অধীন থাকে না। তাহার দেল এক 'দেহ নিরপেক্ষ অস্তিত্ব' লাভ করে। মুর্শিদে কামেল ব্যতীত পৃথিবীর অন্য কেহই মানুষকে পার্থিব মোহ হইতে মুক্ত করাইতে পারেন না।
বিজ্ঞাপন
'দেহ নিরপেক্ষ অস্তিত্ব' কথাটি উদাহরণ দ্বারা বুঝানো যায়। মৃত্যুর পরে ব্যক্তির দেহের আগুন, পানি, মাটি ও বাতাস-জগতের আগুন, পানি, মাটি ও বাতাসের সহিত মিশিয়া যায়। কিন্তু তাহার যে অস্তিত্ব তাহার দেহকে পরিচালিত করিত, সেই অস্তিত্ব থাকিয়া যায়। এই অস্তিত্বই পরকালে শাস্তি বা শান্তিময় পুরস্কার লাভ করে। মানুষের আসল অস্তিত্ব তাই দেহ ভিত্তিক নয়; দেহ নিরপেক্ষ। জন্মের সময়ে অনেক শিশু পূর্ণাংগ দেহ লইয়া জন্ম গ্রহণ করে। কিন্তু তাহার দেহ পূর্ণাংগ হইলেও তাহার দেহকে পরিচালনার জন্য যে অস্তিত্ব প্রয়োজন, সেই অস্তিত্ব অর্থাৎ প্রাণ স্পন্দন শিশুর মধ্যে থাকে না। মাতৃ জঠরে শিশুর জন্মের চারি মাস পরে তাহার প্রাণ স্পন্দন শুরু হয়। জন্ম ও মৃত্যু-এই কথাই আমাদের বলিয়া দেয় যে, আমাদের অস্তিত্ব দেহ-নিরপেক্ষ। দেহ শুধু বস্তুজগতে সেই অস্তিত্বকে ধারণ করিবার জন্য।
বস্তু জগতের দেহের চাহিদা ও দাসত্ব হইতে মুক্ত হওয়াই বস্তুতঃ কলেমা শরীফ প্রতিষ্ঠিত হইবার মূল কথা। ছালেকগণ যখন এই গুণ লাভ করে, তাহার কালবে আল্লাহতায়ালার সিফাতে এজাফিয়ার নূর মহাকালব হইতে আসিতে থাকে। সাধনার এই পর্যায়কে সূফীগণের পরিভাষায় বেলায়েতে ছোগরা বলা হয়। এই পর্যায়ে সাধকের দেলে বা কালবে সাত-তলা আসমান হইতে জমিনের নীচে তাহাতাছ ছারা পর্যন্ত আরশ, কুরছি, লওহ, কলম সব কিছুরই জেলাল তাহারা দেখিতে থাকেন। এই পর্যায়ে সাধক তাহার ছয় বা দশ দিক হইতে আল্লাহতায়ালার নূরের তুফান দেখিতে পান, যে নূরের তুফানে তিনি নিজেকে, এমন কি সমস্ত সৃষ্টি জগতকে নিমজ্জিত দেখিতে পান। এই স্তরে আসিয়া ছালেক তাহার ছয় লতিফা বা দশ লতিফার নূরের দ্বারা ছয় বা দশ রাজ্যের বাদশা হইয়া যান। নূরের প্লাবনে নিজের সর্বাংগ নিমজ্জিত দেখিয়া এই মাকামে আসিয়া হযরত মনসুর হাল্লাজ (রঃ) ছাহেব নিজেকে আল্লাহতায়ালার নূর হইতে পৃথক করিতে না পারিয়া "আনাল হক" বলিয়াছিলেন।
অনেকে সূফীগণের এই সকল উক্তিকে ভাব প্রবণ ও আবেগ প্রবণতার উদাহরণ বলিয়াছেন। এই সকল সাধকগণ যেহেতু সমস্ত সৃষ্টিকে আল্লাহতায়ালার নূরে প্লাবিত দেখেন, তাই ঐ স্তরের সাধক 'হামা উস্ত' বা সকলই তিনি এই উক্তি করিয়া থাকেন। এই সকল উক্তি শরীয়তের দিক নিদের্শনায় সমালোচিত হইয়াছে। ঐ সকল উক্তিকারী অনেক সাধক শরীয়ত অনুযায়ী লাঞ্ছিত ও শাস্তি প্রাপ্ত হইয়াছেন।
বিজ্ঞাপন
আগেই বলা হইয়াছে, সাধকগণ দেহ নিরপেক্ষ বা আদামাতের তমোদোষ মুক্ত অস্তিত্ব লাভ করেন। এই তমোদোষ মুক্ত যে অস্তিত্ব; তাহাকে সূফী পরিভাষায় 'ওজুদ' বলা হয়। এই স্তর বস্তু জগতে আসিবার পূর্ব স্তর অর্থাৎ আলমে আরোওয়াহর স্তর। এই স্তরে যে উন্নীত হওয়া সম্ভব; "মৃত্যুর পূর্বেই মরিয়া যাও"-রাসূলে করীম (সঃ) এর এই হাদীসই তাহার প্রমাণ।
প্রথমে আল্লাহই (জাত ও সিফাত) ছিলেন, আর কিছুই ছিল না। অতঃপর সৃষ্টির বাস্তবায়নের জন্য বলিলেন 'কুন'। তখন কি ভাবে এই আদেশ দান করিয়াছিলেন?
সাধকগণ বলিয়া থাকেন, তখন কুন আদেশ আসিয়াছিল জাতপাক হইতে। জাতপাকের ইচ্ছা ছাড়া সিফাত সমূহের নিজস্ব ইচ্ছা থাকে না। জাতপাকের ইচ্ছা ছাড়া সিফাতের কুন বলিবার ক্ষমতাও নাই।
বিজ্ঞাপন
আল্লাহতায়ালা সৃষ্টি করিলেন কেন, এই প্রশ্নের যে উত্তর পাওয়া যায়, তাহা হইল আল্লাহপাক ছিলেন গুপ্ত ভান্ডার। তিনি নিজেকে প্রকাশ করিতে চাহিলেন, তাই তিনি সৃষ্টি করিলেন। তাহার এই গুপ্তধন তাহার মহব্বত।
আল্লাহতায়ালার সৃষ্টি করিবার ইচ্ছা তাহার এরাদত বা ইচ্ছা সিফাতের দ্বারা আর সৃষ্টি করিবার ক্ষমতা তাহার কুদরত ও তাকবীন সিফাতের দ্বারা কার্যকর হইল। আর এই হুকুম সমূহ বাস্তবায়ন হইল তাহার আফ্যালে জাত দ্বারা। আল্লাহপাক "কুন" বলিলেন, ইহাতে রূহ সমূহ সৃষ্টি হইলে আল্লাহপাকের ইংগিতে নূরে মুহাম্মদী আসিয়া তাহা ধারণ করিল। ইহা আলমে আরোওয়াহর স্তর। দেলে কলেমা প্রতিষ্ঠিত হইবার পর ছালেক এই আলমে আরোওয়াহর গুণ লাভ করে। একই সাথে তাহার আলমে আরোওয়াহর অস্তিত্বের মধ্যে আল্লাহতায়ালার সিফাতে এজাফিয়ার কামালাত সমূহের প্রতিবিম্ব যাহা আলমে আরোওয়াহতে বিদ্যমান ছিল, তাহা ফিরিয়া আসে। এই সকল সিফাতে এজাফিয়ার মধ্যে রহিয়াছে হায়াৎ, এলেম, কুদরত, এরাদত, সামাওয়াত, বাছারত, কালাম ও তকবীনের প্রতিবিম্ব অর্থাৎ জীবন, জ্ঞান, ক্ষমতা, ইচ্ছা, শ্রবণ, দর্শন, কথন, সৃজন প্রভৃতি। আল্লাহতায়ালার এই সকল গুণের সমষ্টির প্রতিবিম্ব ছালেকের মধ্যে তখন প্রতিফলিত হয়।
যাহা হউক, আল্লাহতায়ালার এরাদত সিফাতের পর্দা পর্যন্ত যে ছালেকের উরুজ এবং এরাদতের পর্দায় যে ছালেকের রুহের উরুজের সমাপ্তি, তাহার কালবে কলেমা প্রতিষ্ঠিত হইবার কারণে তাহার কালবের আয়নায় মহাকালব হইতে আগত সমস্ত সৃষ্টি জগতের জেলাল তথা আল্লাহতায়ালার সিফাতে এজাফিয়া ও সিফাতে হাকীকীর জেলাল দেখিতে পাইয়া, সাধক তাহার অস্তিত্বকে নূরের সাগরে নিমজ্জিত দেখেন। তখন তিনি সকল বস্তুকেই প্রতিবিম্বের নূরের তুফানে বা প্লাবনে হারাইয়া ফেলেন। তিনি সিফাতে এরাদতের পর্দা পর্যন্ত উরুজ করিয়া "সকল কিছুই তিনি" বলিয়া থাকেন। ইহা তাহার ঐ সিফাতে এরাদতের পর্দা পর্যন্ত উরুজের অনুভূতি।
বিজ্ঞাপন
★ আল্লাহপাক বলেন,
اللَّهُ نُورُ السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ
অর্থাৎ- 'তিনি আসমান ও জমিনের নূর।'
বিজ্ঞাপন
রাসূলে করীম (সঃ) বলেন,
منْ نُورِ اللَّهِ وَالْخَلْقُ مِنْ نُوْرِى أنا من نورا
অর্থাৎ- 'আমি আল্লাহতায়ালার নূর হইতে সৃষ্ট। আর সমগ্র জগত আমার নূর হইতে সৃষ্ট।'
★ আর প্রতিবিম্বের দায়েরা পর্যন্ত যে ছালেকের উরুজ, তিনি বলিতেছেন 'সমস্তই তিনি'।
আল্লাহপাক ও রাসূলে করীম (সঃ) এর উক্তি ও দায়েরায়ে জেলাল পর্যন্ত উরুজকারী ছালেকের উক্তির মধ্যে তাহা হইলে পার্থক্য কোথায়? তৌহিদে ওজুদবাদী সাধকগণ আদামাতের তমোদোষ মুক্ত হইয়া আল্লাহপাকের আসমা ও সিফাতের প্রতিবিম্বিত নূর দেখিতেছেন ও সেই নূরে সমস্ত জগত ও নিজেকে নিমজ্জিত দেখিতেছেন। তাই সকল কিছুকেই তিনি বলিতেছেন।
তৌহিদে ওজুদীর সমর্থক সাধকগণ একথাও বলিতেছেন যে, আল্লাহতায়ালা বলিতে আল্লাহতায়ালার যে অস্তিত্ব বোঝা যায় সেই অস্তিত্ব তাহার গুণের বা সিফাতের সমষ্টি। অর্থাৎ প্রকারান্তরে তাহাও "ওজুদ" বা "শুভ" গুণ সম্বলিত অস্তিত্ব। আল্লাহতায়ালার শুভ গুণ সম্বলিত অস্তিত্ব এবং ছালেকের তমোদোষ মুক্ত আল্লাহতায়ালার সিফাতে এজাফিয়া বা শুভ গুণের প্রতিবিম্বের অস্তিত্বের মধ্যে যে ঐক্য তাহাকেই "তৌহিদে ওজুদী" বলা হইয়াছে।
কিন্তু এই ক্ষেত্রে মনে রাখিতে হইবে যে তৌহিদে ওজুদীর মতবাদের সাধকগণ যে স্তরে যাইয়া সমস্তই "তিনি" বলিতেছেন তাহার সীমা সিফাতে এজাফিয়া তথা দায়েরায়ে জিলালের নূরময় জগত পর্যন্ত বিস্তৃত।
কিন্তু আল্লাহতায়ালা সম্পর্কে সাধকগণের জ্ঞানের সীমা ঐ পর্যন্তই সীমিত নয়। আল্লাহপাক ইহার পরও সুসংবাদ দিতেছেন, তিনি বলিতেছেন,
نَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيد
অর্থাৎ- "আমি মানুষের জান-রগ হইতেও নিকটে।" (সূরা কাফঃ১৫) আল্লাহপাক আরও ফরমান,
انَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللَّهَ طَ يَدُ اللَّهِ فَوْقَ
أيديهم
অর্থাৎ-"নিশ্চয়ই যাহারা তোমার নিকট বায়াত হয়, তাহারা আল্লাহর নিকট বায়াত হয়। তাহাদের হস্তের উপর আল্লাহর হাত।" (সূরা ফহিঃ ১০) অন্যত্র আল্লাহপাক ফরমান,
وَمَا رَمَيْتَ ادْرَمَيْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ رَمَى
অর্থাৎ-“(হে মুহাম্মদ) যখন তুমি কাফেরদের প্রতি ধুলা নিক্ষেপ করিয়াছিলে, তাহা তুমি কর নাই, বরং আল্লাহই নিক্ষেপ করিয়াছিলেন।" (সূরা আনফালঃ ১৭)
হাদীসে কুদসীতে আল্লাহপাক আরও ফরমান, নফল ইবাদত করিতে করিতে বান্দা আমার এমন নৈকট্য হাসিল করে যে আমি তাহার পঞ্চ ইন্দ্রিয় হইয়া যাই, যাহার দ্বারা সে দেখে, শোনে, কথা বলে, চলে-ফেরে ইত্যাদি।
এই স্তরে আকরাবিয়াতের অধ্যায় বা কামালাতে নবুয়তের অধ্যায়। এই স্তরে সাধকের শুধুই ওজুদ নহে, তাহার দেহও পবিত্র হয়। আকরাবিয়াতের মাকামে বা তাহার ঊর্ধ্বে মাকাম সমূহে উন্নীত ছালেকের ফানা ও বাকা সিদ্ধ হইবার পর তাহার নিজস্ব কোন কর্ম বা ইচ্ছা থাকে না। তাহার কর্ম ও ইচ্ছা আল্লাহতায়ালার দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত। এই স্তরে যাহা হয় তাহা হকিকতে আল্লাহর অনুভূতি হইয়া যায়। কিন্তু এই স্তরে উন্নীত হওয়া সাধনা সাপেক্ষ নয়। আল্লাহতায়ালার দয়ায় ছালেক এই স্তরে উন্নীত হন। এই স্তরের ছালেক কামালাতে নবুয়ত বা তাহার ঊর্ধ্বের মাকামের ছালেক। তাহাদের দেলই শুধু নয়; তাহাদের দেহও পবিত্রতা লাভ করে। অর্থাৎ দেহের সকল তমোদোষ মুক্ত হয়। তখন তাহারা আল্লাহপাকের এলহাম শুনিবার স্তরে উন্নীত হন। এই স্তরে উন্নীত ছালেক নাফসে মোলহেমা প্রাপ্ত হন, বর্তমান জামানার মানুষ টেলিফোনের সাহায্যে বা বেতার যন্ত্রের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সংবাদ ইথার হইতে শ্রবণ করিতে পারে। এই স্তরের ছালেকও তেমনি আল্লাহপাকের এলহাম শুনিতে পারে এবং কালবের পর্দায় মহাকালব ও আলমে মেছালে রক্ষিত সৃষ্টি জগতের আদি অন্তের সকল বস্তু ও ব্যক্তির হাকীকী প্রতিরূপ দেখিতে ও শুনিতে পারে। তখন তাহার দেহের আদামতের ব্লাক বোর্ডে আর কোন কালিমা থাকিতে পারে না।
পক্ষান্তরে বেলায়েতে ছোগরায় বা প্রতিবিম্বের মাকামে সাধকগণ কেবলমাত্র আলমে আরওয়াহর স্তরে অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার নূরের প্রতিচ্ছবি তথা কালবে প্রতিফলিত মহাকালবে রক্ষিত সৃষ্টি জগতের প্রতিচ্ছবি দেখিতে পান। তাহারা আল্লাহপাকের এলহাম শুনিতে পান না। মহাকালবে আসমান, জমিন, আরশ, কুরছি লওহ, কলমের প্রতিচ্ছবি দেখিলেও এলমে হুজুরী অধ্যায়ে ব্যক্তি বা বস্তুর বা ঘটনার যে হাকীকী রূপ তাহা তাহাদের জ্ঞানের পর্দায় আসে না।
এলহাম আসে আল্লাহপাকের জাত হইতে। কিন্তু যাহারা আল্লাহপাকের জাতের সহিত পরিচিত হন নাই, কেবল সিফাতের প্রতিবিম্বের সহিত পরিচিত হইয়াছেন, তাহারা আল্লাহপাকের এলহাম শুনিতে পান না। আল্লাহপাক সম্বন্ধে তাহাদের ধারণা সিফাতের প্রতিবিম্বিত নূরের ধারণা ভিত্তিক। তাই তাহারা সমস্ত বস্তুতে আল্লাহতায়ালার নূর দেখিয়া সকল কিছুকেই "তিনি" বলেন। আল্লাহপাক স্বয়ং বলিতেছেন তাহার নূরে আসমান জমিন সৃষ্টি।
যাহারা আল্লাহতায়ালার এলহাম শুনিবার স্তরে আল্লাহতায়ালার দয়ায় উন্নীত হন, তাহারা জানেন সকল বস্তু আল্লাহর নূর হইতে সৃষ্টি হইলেও সকল কিছু হইতেই আল্লাহতায়ালার এলহাম আসে না ও সম্ভবও নয়।
যে সকল ছালেক আকরাবিয়াতের মাকামে উন্নীত হন, আকরাবিয়াতের অধ্যায়ের শেষ মাকাম কাওছ হইতে তাহারা আল্লাহতায়ালার জাতের সহিত পরিচিত হইতে থাকেন। কাওছের মাকামে আসিলে ছালেক খোদা দত্ত শরীর "ওজুদ মাওহুব লাহু" প্রাপ্ত হন। এই 'ওজুদ মাওহুব লাহু' দিয়া ছালেক আল্লাহতায়ালার জাত আহাদিয়াতের সহিত ফানা প্রাপ্ত হন। আল্লাহতায়ালার জাতের সহিত "ওজুদ মাওহুব লাহু” দ্বারা পরিচিত হইবার পর ও জাতের সহিত ফানা লাভের পর অন্য সকল কিছুর মধ্যে আল্লাহতায়ালার নূর থাকিলেও তাহার সমস্ত কিছুই "তিনি" বলিবার মত বিভ্রান্তি বা বিভ্রম আর এই মাকামের ছালেকের থাকে না। 'ওজুদ মাওহুব লাহু' বা যে খোদাদত্ত শরীর এই মাকামে উন্নীত ছালেক পাইয়া থাকেন তাহার দ্বারা সকল বস্তুতে যে নূর রহিয়াছে সেই নূর দ্বারা ছালেক সকল বস্তুর ভালমন্দ, শুভ-অশুভ বিচার করিতে পারে। সুতরাং আকরাবিয়াতের মাকাম বা তদূর্ধ্বের মাকামে নূর দ্বারা সৃষ্টসমূহের শুভ অশুভের মধ্যে পার্থক্য করিতে ছালেকগণের অসুবিধা হয় না।
যে সাধক আকরাবিয়াতের মাকাম অতিক্রম করেন নাই, তাহার মধ্যে আল্লাহতায়ালার জাত ও দায়েরায়ে জেলালের নূরের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়ের অপারগতার বিভ্রম থাকিয়া যায়। তাই তিনি নূর দেখিয়া "হামা উত্ত" বা সকলই তিনি বলিয়া ফেলেন।
আকরাবিয়াতের মাকামের শেষ অধ্যায়ে যাইয়া সাধক কেবল জাতের সহিত পরিচিতই হন না, ফানাও লাভ করেন। কামালাতে নবুয়ত, কামালাতে রেছালত, কামালাতে উলুল আজম স্তরের সাধকগণের দেহ পবিত্র হওয়ায় সাধকের সমগ্র ওজুদই আল্লাহপাকের সহিত ফানা লাভকরে। আর যাহারা হকিকতে কাবা ও হকিকতে সালাতের মাকামে উন্নীত হন তাহারা আল্লাহতায়ালার জাতের সহিত বিনা প্রতিবন্ধকতায় মিলিত হন। তাহারও ঊর্ধ্বে রহিয়াছে দায়েরায়ে হোব্বে ছেরফা ও মাবুদিয়াতে ছেরফা; যে মাকামদ্বয়ে সাধক ওজুদ মাওহুব লাহুর কুওতে নজরীয়ার দ্বারা ছায়ের করেন। এই মাকামে কদমী ছায়ের চলে না। কুওতে নজরীয়ার মাধ্যমেই ছালেক পবিত্র জাতে ফানা ও বাকা লাভ করেন।
হযরত মহীউদ্দিন ইবনুল আরাবী (রঃ) ছাহেব সহ অন্যান্য যে সকল সাধকের যে সকল উক্তির ভিত্তিতে তৌহিদে ওজুদের মতামত প্রচার করা হয়, সেই সকল উক্তি বস্তুতঃ একটি স্তর হইতে অর্থাৎ বেলায়েতে ছোগরা বা জেল্লীর স্তর হইতে আল্লাহপাক সম্পর্কে অনুভূতি। এই প্রসংগে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের বক্তব্য হইল, আল্লাহপাকের জাত ছাড়া আরও আটটি হাকীকী সিফাত রহিয়াছে, যাহা জাতকে কেন্দ্র করিয়া বর্তমান। এই সকল সিফাত আল্লাহতায়ালার জাতপাকের ন্যায় চিরস্থায়ী। এই আটটি সিফাতের প্রতিবিম্ব হইল সিফাতে এজাফিয়া। এই সিফাতে এজাফিয়ার যে অধ্যায়; সেই অধ্যায়ের সমষ্টিগত কামালাত হইল ওজুদ। এই ওজুদের বিপরীত অবস্থা হইল আদামাত বা অনস্তিত্ব। আলমে আরোওয়াহ তাহার নিম্নে অবস্থিত।
সূফী সাধকগণের একাংশ বলিতেছেন, আল্লাহপাক এই সৃষ্টি জগত সৃষ্টি করিয়াছেন তাহার পরিচয়ের আয়না হিসাবে। এই বিশ্ব জগৎ ব্যাপী বিস্তৃত আয়নায় তাহার আসল পরিচয় রহিয়াছে। তিনি সর্ব অস্তিত্বের সমষ্টিকে আপন ওজুদের প্রকাশ স্থল করিয়াছেন। আল্লাহর ওজুদের কথা বলা হয় বা আল্লাহতায়ালার ওজুদ সম্পর্কে ধারণা করা হয়। এই ওজুদ প্রকাশ করিবার জন্য অনস্তিত্বের আবশ্যক। কারণ, এক ওজুদের উপর আর এক ওজুদ রাখা যায় না।
সুতরাং আল্লাহতায়ালার সর্বব্যাপী ওজুদকে প্রকাশ করিতে হইলে সেই আদম প্রয়োজন যে আদম অনস্তিত্বের গুণ লাভ করিয়াছে। তাহারা বলেন, এই অনস্তিত্বে পরিণত আদমই আল্লাহতায়ালার প্রকাশ স্থল। তাই তাহাকে হুয়াজ জাহেরো বলা হইতেছে। তবে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের মত ব্যাখ্যা করিয়া বলা যায়, এই ওজুদ আল্লাহতায়ালার প্রকাশ স্থল হইলেও এই ওজুদ ও জাতপাক এক নয়। এই ওজুদ হইল আল্লাহপাকের এক কামালাত।
ওজুদের কথা বলিতে গেলে আল্লাহতায়ালার অস্তিত্ব সম্পর্কে একটা সুনির্দিষ্ট ধারণা করিতে হয় যাহা তাহাকে সীমার মধ্যে আনয়নের শামিল। আল্লাহতায়ালার যে ওজুদ তাহা জ্ঞান মূলক ওজুদ। এই জ্ঞান সূফীগণ তাহাদের ছায়েরে আনফুসী দ্বারা লাভ করেন। এই ছায়েরে আনফুসী হইল তাহার নাফসে আম্মারার সহিত সম্পর্ক ছিন্নতার পরে প্রাপ্ত সম্পদ। কাওছের মাকাম হইতে ছালেক ওজুদ মাওহুব লাহু দ্বারা আল্লাহতায়ালার জাতপাকের পরিচয়ের জন্য ছায়েরে আনফুসি শুরু করেন। সূফীগণ এই স্তরে যে জ্ঞান লাভ করেন, তাহা ভাষায় ব্যক্ত করা যায় না। একান্তই ইহা তাহাদের নিজস্ব অনুভূতি ও সম্পদ।
বস্তুতঃ তৌহিদে ওজুদী ও তৌহিদী শহুদী-উভয়স্তরের সাধকগণই পার্থিব মোহমুক্ত হন। তৌহিদে ওজুদীর সমর্থক সাধকগণ আল্লাহতায়ালার জাতপাকের সহিত মিলিত হন নাই বিধায়, তাহারা সর্বত্রই আল্লাহতায়ালার অস্তিত্ব দেখিতে পান। পক্ষান্তরে যে সাধক আকরাবিয়াতের মাকামের ঊর্ধ্বে উন্নীত হইয়াছেন তিনি শুধুই পার্থিব মোহ হইতে মুক্ত নহেন, আল্লাহতায়ালা এই ছালেক বা সাধককে আপন জাতের সহিত বিলীন করিয়া তাহার সকল ইচ্ছা ও কর্ম নিয়ন্ত্রণ করেন। ছালেক এই স্তরে তাই আল্লাহতায়ালার জাত ও সিফাতের মধ্যে বিভ্রম মুক্ত হন।
আগেই বলা হইয়াছে, কলেমা প্রতিষ্ঠিত কালব সাধারণ মোমিনের কালব নয়; এই কালব এখলাস প্রাপ্ত ও তাহাতে আল্লাহতায়ালার গুঞ্জায়েশ রহিয়াছে। পূর্ণ আরেফগণ আলমে আরোওয়াহ হইতে আরও উন্নীত হইয়া জাত মিশ্রিত হাকীকী সিফাতে ফানা হইয়া আইনুল ইয়াকীন প্রাপ্ত হইয়া নিখুঁত মোমিনত্ব লাভ করেন। ইহাই কুন প্রকাশের জগত বা আল্লাহতায়ালার এলহাম শুনিবার জগৎ। এই কুন ভাষা বিমুক্ত কুন।
হে জাকেরানগণ! তোমরা যদি আধ্যাত্মিক তত্ত্ব তৌহিদী ওজুদী ও তৌহিদে শহুদীর পূর্ণাংগ জ্ঞান লাভ করিতে চাও; জামানার সর্বশ্রেষ্ঠ সিদ্ধ পুরুষ, আউলিয়াকুল শিরোমণী, জামানার সর্বশ্রেষ্ঠ মুজাদ্দেদ আরেফে কামেল, খাজাবাবা হযরত শাহসূফী এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেবের মহব্বত দেলে পয়দা করিবার চেষ্টা করিতে থাক। তদীয় হুকুম ও আদেশ নিষেধ পূর্ণাংগ রূপে মানিয়া চল। পূর্ণাংগ রূপে শরীয়তের বিধান পালন কর। শরীয়ত, তরিকত, হকিকত, মারেফাত-এই চার মিলিয়া পূর্ণাংগ শরীয়ত। ইহার একটিও খেলাফ করিও না। ইহার যে কোন অংশের খেলাফ হইলে খোদাপ্রাপ্তি তত্ত্ব তুমি হাসিল করিতে পারিবে না।
আমার দাদাপীর দস্তগীর হযরত শাহসূফী সৈয়দ ওয়াজেদ আলী (কুঃ) ছাহেব ফরমাইয়াছেন, পুংখানুপুংখরূপে শরীয়তের বিধান মানিয়া চল, তাহা হইলে তোমাদের জন্য মারেফাতের জ্ঞান হাসিল করা সহজ হইবে। এই পূর্ণাংগ শরীয়তের জ্ঞান যাহার সমষ্টি হইল খোদাতত্ত্বজ্ঞান-এই খোদাতত্ত্বজ্ঞান যদি তোমরা লাভ করিতে চাও, তাহা হইলে আপন পীরের দামনকে শক্ত করিয়া ধর; আপন পীরে কামেলকে অনুসরণ কর। তাই আশেকান সকল গাহিয়াছেন,
"পীর রাজী যার উপরে
খোদা রাজি তার উপর।"
আপন পীরের দেলে দেল মিশাইতে চেষ্টা কর। পারস্যের মহাকবি হাফিজ বলিয়াছেন, "তোমার পীর যদি শরাব দিয়া জায়নামাজ ধুইয়া তদ্ উপরে নামাজ পড়িতে বলেন; তুমি তাহাই কর।"
তাহা হইলে সর্বশেষ ছবক, নাফী এজবাত জেকের, সুলতানুল আজকার; বেলায়েতে ছোগরার দায়েরা সমূহ, বেলায়েতে কোবরার দায়েরাসমূহ, বেলায়েতে উলিয়া, কামালাতে নবুয়ত, কামালাতে রেছালত, কামালাতে উলুল আজম, শরহে ছদরের ফয়েজ, হোব্বে ছেরফা, মাবুদিয়াতে ইত্যাদি মাকামসমূহ তোমাদের জন্য খুলিয়া যাইবে। মানুষের ওজুদ রাজ্য কোটি কোটি লতিফার দ্বারা সজ্জিত।
তোমার পীরের সহিত তুমি সম্পূর্ণ মিশিয়া যাও তাহা হইলে তোমার মধ্যে সমগ্র ওজুদ রাজ্য প্রকাশিত হইবে। ফানা ফিশ শেখ ও ফানা ফির রাসূলের মাকামে যখন তুমি যাইবে তখন তুমি তাহা অনুভব করিবে, বুঝিতে পারিবে ও দেখিতে পারিবে। তখন তুমি পূর্ণাংগ সূফী সাধকের দরজায় পৌছাইবে এবং আল্লাহতায়ালার হাকীকী সিফাতে আল্লাহপাক তোমাকে উন্নীত করিবেন। তাই হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) বলিয়াছেন,
"চু তো যাতে পীরেরা কারদি কবুল
হাম খোদা দর জাতাশ আমাদ হাম রসূল।"
অর্থাৎ-যেইমাত্র তুমি তোমার পীরের জাতকে কবুল করিলে, তখনই রাসূলে করীম (সাঃ) তোমাকে উম্মত বলিয়া স্বীকৃতি দিলেন, আল্লাহ তোমাকে বান্দা হিসেবে কবুল করিলেন। আল্লাহ ও রাসূলে করীম (সাঃ) এর স্বীকৃতি সেই মুহূর্তে তুমি পাইলে যে মুহূর্তে তোমার পীর তোমাকে স্বীকৃতি দিলেন।
তাই হে জাকেরানগণ! তোমরা যদি প্রকৃতপক্ষে এই অমূল্য নেয়ামত, সূফীতত্ত্ব জ্ঞানের গুপ্ততত্ত্ব হাসিল করিতে চাও; তাহা হইলে খাজাবাবার মহব্বত ও তদীয় হুকুম আহকাম ঠিক মত পালন কর। তাহা হইলে আল্লাহপাক তোমাদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের জ্ঞান দান করিবেন। প্রকৃত নাফসে মোলহেমা দান করিবেন।
তাই পীরের মত দরদী আর কেহ নাই। কেহ হইবেও না। তামাম পৃথিবীর যে কোন স্থানেই তুমি থাক না কেন, তোমার পীর সেই স্থানেই সাহায্যের হাত বাড়াইতে পারেন। তাই গউস পাক (রঃ) ছাহেব বলিয়াছেন, 'তদীয় মুরীদ যে কোন স্থানেই থাকুন না কেন, তিনি তাহার মুরীদকে সদাসর্বদাই সাহায্য করিতে সক্ষম। পীরের মত অমূল্য ধন ভাগ্যগুণে মেলে। দয়ালপীর দস্তগীর খাজাবাবা হযরত এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেবের বড় ছাহেবজাদা আলহাজ্ব খাজা হাশেমউদ্দিন (রঃ) ছাহেব আমাকে বলিয়াছিলেন, "আমি একদিন গভীর রাতে আব্বাজান হুজুরকে দেখি তিনি দাদাপীর দস্তগীর হযরত শাহ্সূফী সৈয়দ ওয়াজেদ আলী (রঃ) ছাহেবের বাড়ীর দিকে ফিরিয়া কাঁদিতেছেন। আমি আব্বাজান হুজুরকে বলিলাম, "আপনিতো জামানার মুরাদ ফকীর। আপনি কেন দাদাপীর ছাহেবের বাড়ীর দিকে ফিরিয়া কাঁদিতেছেন?" তখন আব্বাজান হুজুর বলিলেন, "বাবা, বেহেশতেও পীরের প্রয়োজন।" পীরের সহিত মুরীদের কি নিবিড় সম্পর্ক, তাহা পীর এবং মুরীদই জানে। পীরে কামেলের সহিত যখন মুরীদ সম্পূর্ণ মিশিয়া যায়, মুরীদ তখন সর্বত্রই আপন পীরে কামেলকে দেখিতে পায়। তখন মুরীদ আপন মুর্শিদে কামেলের রূহকে নিজের রূহ জানে। এই স্তরে মুরীদের রূহ সম্পূর্ণরূপে পীরে কামেলের রূহের সহিত বিলুপ্তি লাভ করে। পীরের রূহ মোবারক রাসূলে করীম (সাঃ) এর পবিত্র রূহে বেমেছালীর সহিত পূর্ব হইতেই বিলুপ্ত থাকে। এই পর্যায়ে আসিয়া রাসূলে করীম (সঃ), পীর ও মুরীদ একই দস্তরখানায় উপবিষ্ট হন। তখন মুরীদ ফানা ফিশ শেখ ও ফানা ফির-রাসূলের মাকাম লাভ করিয়া খোদাতত্ত্ব জ্ঞানের এক অপূর্ব গুপ্তভান্ডার লাভ করে। আল্লাহপাক তোমাদের ঐ পর্যায়ে উন্নীত হইবার সুযোগ দিন। আমীন!





