কামালাতের সহিত অহদাত লাভের জন্য চেষ্টা কর

হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘তৌহিদে ওজুদী ও তৌহিদে শহুদী এবং ছায়েরে আফাক ও আনফা’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ "তৌহিদে ওজুদী" ও তৌহিদে শহুদী প্রসংগে হযরত ইবনুল আরাবী (রঃ) ও হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানীর (রাঃ) মত পার্থক্যঃ
বিজ্ঞাপন
হযরত গউস পাক (রঃ) ছাহেব তদীয় "গুনিয়াতুত তালেবীন” কিতাবে বলিতেছেন, যাহারা শুধু মাত্র আল্লাহপাককে পাইবার আশা লইয়াই তাহাকে স্মরণ করে ও সেই উদ্দেশ্যে দুনিয়ার সকল আশা আকাংখাকে পরিত্যাগ করে, আল্লাহপাক তাহাদের উপর রাজী থাকেন। তাহাদের উপর রাজী থাকা ও তাহাদেরকে নেককারের সাহচর্যের উপযোগী বলিয়া মনে করা তাই সকলেরই কর্তব্য।
হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন, "হে মাবুদ! যে তোমার সহিত বন্ধুত্ব স্থাপন করে, সেই বন্ধুত্বই যেন তোমাকে ছাড়া অন্য কোনো কিছুকে দেখা ও শোনা হইতে তাহাকে অন্ধ ও বধির করিয়া দেয়, সে তোমার ভুবন ভুলানো সৌন্দর্যের মধ্যেই যেন মুগ্ধ ও মোহিত হইয়া থাকে। তোমার সৌন্দর্য এমনই অপূর্ব যে, তাহার মোকাবেলায় পার্থিব যে কোনো সৌন্দর্য ম্লান ও আকর্ষণহীন মনে হয়। হে মাবুদ! যে তোমার স্মরণকারী সে অন্য কোনো কিছুরই প্রতি আকর্ষণ বা আসক্তি অনুভব করে না, এই অবস্থায় তাহার ইরাদা সম্পূর্ণ খালেছ হয়।
যখন বান্দার মনে ভয়ের উদয় হয়, তখন সেই আল্লাহ ভীতি বান্দার অন্তরস্থিত আল্লাহ ব্যতীত সব কিছুকে জ্বালাইয়া দেয়। যখন আল্লাহর ধ্যান ও মহব্বত বান্দার মনে আসন করিয়া বসে, তখন তাহার অন্তরে আল্লাহতায়ালা ব্যতীত আর যাহা কিছু সকলই জ্বলিয়া যায়। হযরত গউস পাক (রঃ) ছাহেব বলেন, মহব্বতে এলাহী এমনই একটা বেদনা বিধুর আকাংখা ও প্রত্যাশা যে, তাহার প্রভাবে তাহার হৃদয়ের অন্য সকল দুঃখ ও বেদনা হালকা ও সহজ হইয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
আল্লাহতায়ালার প্রেমের আগুনে অন্তরে অন্য সকল কিছুর আকর্ষণ জ্বালাইয়া দেবার পর খোদাতালাশী ব্যক্তির হৃদয় যে হাল লাভকরে-তাহা হইল পার্থিব আকর্ষণ হইতে পাক ও পবিত্র হইবার অবস্থা। এই অবস্থায় ছালেক কাশফ বা কালবী নেত্রে নিজের দেহকে পুরাতন কাপড়ের মত ছিঁড়িয়া যাইতে দেখে। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব বলেন, সাপ যেমন খোলস পাল্টায়, তদরূপ দৈহিক ও ার্থিব আকর্ষণ ছালেকের হৃদয় হইতে ঝরিয়া যায়। হযরত মাওলানা ঘনী (রঃ) ছাহেব বলেন, "আমি যখন আমার অনস্তিত্বের প্রতি দৃষ্টিপাত করিলাম, তিনি অর্থাৎ আল্লাহ তাহার অস্তিত্ব ও প্রভুত্ব আমার নিকট প্রকাশ করিলেন। তুমি দুই ভুলিয়া যাও, তাহা হইলে থাকিবেন শুধু রবরূপী এক আল্লাহ।" হযরত শেখ মহিউদ্দিন ইবনুল আরাবী (রঃ) ছাহেব আল্লাহতায়ালাকে পাইবার পথে আত্মিক অভিজ্ঞতার এই হালকে তৌহিদে ওজুদী বলিয়াছেন।
ইহা সত্য যে আল্লাহতায়ালাকে অনুসন্ধানের পথে ছালেক আল্লাহতায়ালার অনুগ্রহে এমন একটি অবস্থায় পৌঁছান যে, তাহার হৃদয়ে এশকে এলাহী বা খোদাপ্রেম ছাড়া কিছুই আর অবশিষ্ট থাকে না। হৃদয়ের এই অবস্থা সে কালবী নেত্রে দেখিয়া থাকে। পার্থিব আকর্ষণ হইতে যে তাহারা মুক্ত হইয়া থাকেন তাহাও সত্য। কিন্তু এই অবস্থাকে তৌহিদে ওজুদী বলা সঠিক হইবে কিনা তাহা লইয়া সূফী সাধকগণের মধ্যে মতবিরোধ রহিয়াছে।
হযরত ইবনূল আরাবী (রঃ) ছাহেব ও তাহাদের অনুসারীগণের বক্তব্য হইল-
বিজ্ঞাপন
★ অজুদ সকল ভাল, কল্যাণকর বা শুভ গুণের সমাবেশ। আল্লাহতায়ালাই সকল শুভ গুণের সমষ্টি। আল্লাহতায়ালার সকল শুভগুণের সমষ্টি হইল ওজুদ। মানুষের সকল শুভ গুণ সমূহ আল্লাহতায়ালার শুভ গুণ বা ওজুদ হইতে আসিয়াছে।
★ মানুষ আল্লাহতায়ালা প্রদত্ত শুভগুণ সমূহ ও পার্থিব দেহের প্রবৃত্তি বা আদামত লইয়া গঠিত। আল্লাহতায়ালার প্রেমের আগুনে যখন ছালেক সকল পার্থিব ও দৈহিক আকর্ষণ হইতে মুক্ত হয়; মানুষকে যে শুভ গুণ সমূহ আল্লাহতায়ালা তাহার গুণ সমূহ হইতে প্রতিবিম্ব স্বরূপ দান করিয়াছেন; তখন শুধু সেই সকল গুণ সমূহ বর্তমান থাকে। আদামত ধ্বংস হইবার বা খসিয়া পড়িবার পর যেহেতু মানুষের মধ্যে তাহার শুভ গুণ সমূহই কেবল মাত্র বর্তমান থাকে, তাই সেই সকল শুভ গুণ সমূহের সমষ্টিকেও হযরত শেখ মহিউদ্দিন ইবনুল আরাবী (রঃ) ছাহেব ও তদীয় অনুসারীগণ ওজুদ বলিয়াছেন ও এই রূপ ব্যক্ত করিয়াছেন যে, তখন আল্লাহতায়ালার গুণসমূহ বা ওজুদে ছালেকের আদামত মুক্ত আল্লাহপ্রদত্ত গুণ সমূহ "অহদাত" বা ফানা লাভ করে বা একীভূত হইয়া যায়। ইবনুল আরাবী (রঃ) ছাহেব এই অবস্থাকেই বেলায়েত ও নবুয়তের শেষ অবস্থা বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন।
কিন্তু উক্ত রূপ ধারণা যে সঠিক নহে, তাহা হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করিয়া প্রকাশ করিয়াছেন। একটু চিন্তা করিয়া দেখিলে বোঝা যাইবে যে, হযরত ইবনুল আরাবী (রঃ) ছাহেবের এই ফানা প্রকৃত পক্ষে আল্লাহতায়ালার গুণের সহিত ফানাও নহে, ইহা হইল আল্লাহতায়ালার নাম ও গুণ সমূহের প্রতিবিম্বের সহিত ফানা।
বিজ্ঞাপন
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলিতেছেন, আল্লাহতায়ালার নাম, গুণ, শান ও জাতের গুণ পরস্পর সম্পর্কযুক্ত হইলেও আল্লাহতায়ালার জাত সকল কিছু হইতে, এমন কি তাহার হাকীকী গুণ সমূহ হইতেও পৃথক সত্ত্বা। এলেম অর্থাৎ জ্ঞান এবং কুদরত বা ক্ষমতা আল্লাহতায়ালার দুইটি হাকীকী গুণ। এ দুইটি গুণ যেমন আল্লাহতায়ালার হাকীকী গুণ হিসেবে জাতের অতিরিক্ত, তেমনি আল্লাহতায়ালার জাত বা মূল সত্ত্বারও এই দুইটি গুণ রহিয়াছে। আল্লাহতায়ালার জাত তাই তাহার গুণ নিরপেক্ষ সত্ত্বা। সিফাতে হাকীকী তাহার জাতের গুণ সমূহের বাহির আবরণ মাত্র। আল্লাহতায়ালার জাতের বাহির আবরণের যে সকল গুণ রহিয়াছে, বাহির আবরণ বাদ দিলেও জাতের সেই সকল গুণ চলিয়া যায় না, বরং আল্লাহতায়ালার জাতের সহিত সহ-অবস্থান রত ঐ সকল গুণ থাকিয়া যায়।
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তাই বলিতেছেন যে, এ কথা সত্য যে মানুষের পার্থিব মোহ বা আকর্ষণ একটি স্তরে যাইয়া ধ্বংস হয় এবং তখন ছালেকের মধ্যে আল্লাহ প্রদত্ত গুণাবলীর প্রতিবিম্ব ব্যতীত আর কিছুই থাকে না। কিন্তু তাহার অর্থ এই নহে যে তাহা আল্লাহতায়ালার গুণ সমূহের সহিত বা হাকীকী সিফাতের সহিত মিশিয়া যায়। ইহা সম্ভব নয়; কারণ আল্লাহতায়ালা মানুষকে যে গুণ দান করিয়াছেন তাহা আল্লাহতায়ালার নিজস্ব গুণের প্রতিবিম্ব। মানুষের জাগতিক জীবন বা অস্তিত্ব হইল আল্লাহতায়ালার গুণ সমূহের প্রতিবিম্বের বহিঃ প্রকাশ। তাই যখন পার্থিব আকর্ষণ চলিয়া যায় তখন মানুষের দেহে যাহা অবশিষ্ট থাকে, তাহা আল্লাহতায়ালার নাম ও গুণ সমূহের প্রতিবিম্বের নূর।
ছালেক আল্লাহতায়ালাকে পাইবার উদ্দেশ্যে এই স্তরে যে সাধনা করে, তাহার মূল কাজটি হয়, রূহ দ্বারা আল্লাহতায়ালার সিফাতে এজাফিয়ার নূর অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার নাম ও গুণের প্রতিবিম্বের নূর ধারণ করিয়া দেহের তেত্রিশ কোটি লতিফাতে আল্লাহতায়ালার নামের জেকের জারী করাইবার অবস্থা লাভ করা অর্থাৎ সর্ব শরীরে জেকের জারী করানোর অবস্থা সৃষ্টি করা। তখন সর্ব শরীরে আল্লাহতায়ালার নামের বা নাফী-এজবাত জেকেরের নূর উৎপাদিত হয়; সেই নূর দ্বারাই আদামাত বা পার্থিব আকর্ষণ ধ্বংস হইয়া যায়। এই রূপে সর্ব শরীরের জেকের জারী হইলে আল্লাহতায়ালার নামের নূরে সর্ব দেহ পরিপূর্ণ হইয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলিতেছেন যে, আগুন, পানি, মাটি ও বাতাসের সমন্বয়ে তৈরী স্থূল দেহে আল্লাহ নামের জেকের জারী করাইলে যে নূর সৃষ্টি হয় তাহা আল্লাহতায়ালার নাম ও গুণের প্রতিবিম্বের নূর, তাহাকে কোনো প্রকারে আল্লাহতায়ালার নিজস্ব নূর বলা যায় না। কারণ মানব দেহ আদামত বা নীস্তি, যাহার নিজস্ব কোনো নূর নাই। এই মানব দেহে আল্লাহতায়ালার নামের জেকেরের দ্বারা যে নূর উৎপন্ন হয় তাহা তাহার নাম ও গুণের প্রতিবিম্বের নূর। এই রূপ দৈহিক আকর্ষণ হইতে পবিত্র হইলে এবং সর্ব শরীরে জেকের জারী হইলে, আল্লাহতায়ালা যে সকল গুণ কল্পনা করিয়া ছালেককে সৃষ্টি করিয়াছিলেন তাহার একটি প্রতিবিম্ব ছালেক তাহার আত্মিক চোখে আল্লাহতায়ালার দয়ায় দেখিতে পায়। যে সকল গুণ কল্পনা করিয়া মানুষ সৃষ্টি করিয়াছিলেন, সেই সকল গুণের প্রতিবিম্বিত একটি রূপ তাহার মানস চোখে ভাসিয়া উঠে। হযরত মহিউদ্দিন ইবনুল আরাবী (রঃ) ঐ মানস চোখে দৃষ্ট প্রতিবিম্বিত গুণ সমূহের নূরকে 'রব' দর্শন বলিয়া অভিহিত করিয়া আল্লাহতায়ালার সহিত ফানা প্রাপ্তি হয় বলিয়া ধারণা ব্যক্ত করিয়া আল্লাহতায়ালার পথে সাধনা সমাপ্ত করিয়াছেন।
একটু চিন্তা করিলেই বোঝা যায়, আল্লাহতায়ালার রব সিফাত আল্লাহতায়ালার 'তাকবীন' বা সৃষ্টি করণ গুণের অধীনস্ত একটি এজাফি সিফাত মাত্র। আল্লাহতায়ালার হায়াত, এলেম, কুদরত, এরাদত, ছামাওয়াত, বাছারত প্রভৃতি হাকীকী সিফাতের অর্থাৎ জাত সংলগ্ন সিফাত সমূহের সর্ব নিম্ন সিফাতের অধীনস্ত একটি এজাফি সিফাত 'রব'। 'রব' আল্লাহতায়ালার জাতের সহিত সংলগ্ন সিফাত না হইবার কারণে ইহাকে প্রকৃত আল্লাহ দরশন বা আল্লাহতায়ালার জাতের দরশন বলা যায় না। তাই আল্লাহতায়ালার দরশন বা এই স্তরে আল্লাহতায়ালার সহিত ফানা লাভের চিন্তা যুক্তি বা বাস্তব নির্ভর নয়।
আল্লাহতায়ালা ছাড়া অন্য সকল কিছুরই কামনা-বাসনা যখন এশকে এলাহীর আগুনে জ্বলিয়া নির্মূল বা ধ্বংস হইয়া যায়, তখন বস্তুতঃ আল্লাহতায়ালা ঐ বান্দার উপরে রাজী ও খুশী হইয়া তাহার কালবে আলমে মেছালের সন্ধান দান করেন। তখন ঐ ছালেক কালবের আয়নায় আল্লাহতায়ালার বিভিন্ন কামালাতের রূপক বা চিত্রকল্প এবং পার্থিব বস্তু সমূহের রূপ দেখিয়া থাকেন; ইহাতে আল্লাহতায়ালার কামালাত ও সৃষ্টি জগৎ সম্পর্কে ছালেক জ্ঞান লাভ করিতে পারে। ছালেকের সাধনার অগ্রগতি বা ত্রুটি বিচ্যুতিও ছালেক তথায় দেখিতে পায়। ঐ স্তরে মানস চোখে বা কালবের আয়নায় ছালেককে আল্লাহ যাহা দেখাইয়া থাকেন তাহা হইল তাহার আপন ইবাদত ও আরাধনার দ্বারা তাহার সাধনার ফল লাভের চিত্ররূপ বা কায়ার আকার। আপন সাধনার কায়ার আকার দেখিয়া 'রব' দর্শন বলা যথাযথ যেমন নয়, তেমনি 'রবের' কল্পিত ছবি দেখিয়াও আল্লাহতায়ালার সাধনা ছাড়িয়া দেয়াও সঠিক নহে। কারণ ছালেকের প্রকৃত লক্ষ্য হইল আল্লাহতায়ালার জাতপাক; তাহার সিফাত, নূর বা নূরের তাজাল্লী বা প্রতিবিম্ব নয়।
বিজ্ঞাপন
নাফী-এজবাত জেকেরের দ্বারা ছালেক আদামাতমুক্ত হইয়া রূহের দ্বারা আল্লাহতায়ালার সিফাতে এজাফিয়া বা গুণ সমূহের প্রতিবিম্বের নূর ধারণ করে; তখন একই সাথে ছালেক আলমে আরওয়াহর গুণ ফিরিয়া পায়। দেহ ও আত্মা লইয়া মানবদেহ গঠিত। দেহ যখন তাহার জীব সত্ত্বা ও প্রবৃত্তি মুক্ত হয়, তখন অবশিষ্ট থাকে 'রূহ', যাহা আল্লাহতায়ালার গুণের প্রতিভূ। এই রূহ তখন মানুষের প্রবৃত্তি বা নাফসের পূর্ণ চালক হয়। তাই সেই অবস্থায় ছালেক আলমে আরওয়াহতে যেমন আল্লাহতায়ালার আদেশ নিষেধ বা শরীয়তের অনুশাসনের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য পোষণ করে, একই সাথে নূরে মুহাম্মদীর নূরও ছালেক তাহার কালব তথা সর্ব শরীরে কালবী নেত্রে দেখিতে পায়। তখন ছালেকের কালব কখনও কখনও আল্লাহতায়ালার 'এলহাম' শুনিতে পায়। এই এলহাম শরীয়তের বিধি বিধানের সহিত মিলাইয়া দেখিবার নির্দেশ রহিয়াছে। কারণ এই স্তরে এলহামের পরিশুদ্ধতা নিশ্চিত নয়।
যাহা হউক, আল্লাহতায়ালার সিফাতে এজাফিয়ার নূর লাভ, সর্ব শরীরের জেকেরের দ্বারা আল্লাহতায়ালার নাম ও গুণের প্রতিবিম্বের নূর লাভ, নূরে মুহাম্মদীর নূর লাভ, কখনও কখনও আল্লাহতায়ালার এলহাম শ্রবণ করার সৌভাগ্য ও আলমে মেছালে আল্লাহতায়ালার কামালত সমূহ ও সৃষ্টি জগতের 'রূপক' ছবি দেখা ও নিজের সাধনার প্রতিচ্ছবি দেখা এবং পার্থিব আকর্ষণ মুক্ত হওয়া ইত্যাদি সব মিলাইয়া পূর্ব কালের সূফীগণ ইহাকেই সাধনার সর্বশেষ স্তর মনে করিয়াছেন। এ কারণেই এই অবস্থাতে ইবনুল আরাবী (রঃ) ও তদীয় অনুসারীগণ ইহাকে তৌহিদে ওজুদী বা আল্লাহতায়ালার ওজুদের সহিত একত্রিত হওয়ার কথা বলিয়াছেন কিন্তু হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলিতেছেন, আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করা ও আল্লাহতায়ালার সহিত ফানা লাভ করা-এক কথা নয়। স্কুলদেহের আগুন, পানি, বাতাস ও মাটি নামক উপাদানের যে তমোদোষ, তাহা আল্লাহতায়ালার নাম ও গুণের প্রতিবিম্বের নূর দ্বারা দূর হয় না। পার্থিব আকর্ষণ মুক্ত হওয়া ও দেহের পরিপূর্ণ পবিত্রতা অর্জন করা-দুইটি ভিন্ন জিনিষ। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলিতেছেন, দেহের পবিত্রতা না আসা পর্যন্ত প্রকৃত পক্ষে আল্লাহতায়ালার সহিত প্রকৃত ফানা লাভ সম্ভব নয়। দেহের ফানা লাভ নাম ও গুণের প্রতিবিম্বের নূর দ্বারা সম্ভবও নহে। দেহের পবিত্রতা লাভ করিতে হইলে প্রয়োজন হয় আল্লাহতায়ালার জাতি নূর, যাহা বেলায়েতে উলিয়া ও কামালাতে নবুয়তের দায়েরাতে লাভ সম্ভব হয়। অবশ্য বেলায়েতে উলিয়ার স্তরে সিফাত মিশ্রিত জাতি নূর প্রাপ্ত হওয়া যায়। বেলায়েতে উলিয়ার স্তরে লাভ হয় আগুন, পানি ও বাতাসের পবিত্রতা; কামালাতে নবুয়তে মাটি পবিত্রতা লাভ করে। তাহারও পরে হকিকতের দায়েরাসমূহে অর্থাৎ হকিকতে কুরআন, হকিকতে কাবা ও হকিকতে সালাত, হকিকতের মুহাম্মদীর স্তরে আল্লাহতায়ালার জাতি নূর ছালেক লাভ করে। প্রকৃত ফানা ছালেক লাভ করে, আরও ঊর্ধ্বে হোব্বে সেরফা ও মাবুদিয়াতে সেরফায়। প্রতিবিম্ব দরশন ও মূল মানুষ দেখা যেমন এক নয়, তেমনি গুণের প্রতিবিম্ব দরশন ও গুণ সমূহ দরশন বা অর্জন এক কথা নয়। তাই বেলায়েতে ছোগরায় প্রকৃত ওজুদের সহিত অহ্দাত লাভ হয় না। ইহাই হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী ছাহেবের মূল বক্তব্য এবং যাহা যুক্তি সংগত বলিয়া পরবর্তী কালের সাধকগণ স্বীকার করিয়াছেন। হযরত ইবনুল আরাবী (রঃ) ছাহেব যে স্তরকে তৌহিদে ওজুদী বলিয়াছেন, সেই স্তর অতিক্রম করার অর্থ হইল আকরাবিয়াত বা আল্লাহতায়ালার প্রেমের সিংহদ্বারের সম্মুখে পৌঁছানো। এই তৌহিদে ওজুদী পর্যন্ত পৌঁছানোই মানুষের চেষ্টা ও সাধনা দ্বারা অর্জন স্বাপেক্ষ। ইহার পরবর্তী স্তর সমূহ অর্থাৎ আকরাবিয়াত ও তদুর্ধ্বের মাকাম সমূহ আল্লাহতায়ালা যাহাকে মহব্বত করিয়া নিকটে টানিয়া লন, তিনি ব্যতীত আর কেহ গমন করিতে পারেন না।
হযরত ইবনুল আরাবী (রঃ) ছাহেব ও তদীয় অনুসারীগণ সৃষ্টিকে ওজুদের প্রতিবিম্ব এবং সেই প্রতিবিম্ব ও তাহার আসলকে একই জানিয়াছেন। আয়নায় প্রতিফলিত কোন মানুষের প্রতিবিম্ব ও সেই মানুষের মধ্যে যে পার্থক্য রহিয়াছে, তাহা তাহারা নির্ণয় না করিয়া বলিতেন, আয়নায় দৃষ্ট ছবি মানুষটির কাল্পনিক রূপ। তাহারা বলিতেন পবিত্র জাত কল্পনার আয়নায় ছবি প্রতিবিম্বিত করিয়া সৃষ্টির রূপ দান করেন। তাহাই মোমকেনাত'। আল্লাহপাক তাহার কল্পনাগত সৃষ্টি তথা আপন ওজুদের প্রতিবিম্বকে নিজ কুদরতের দ্বারা বর্তমান করিয়া দিয়াছেন। তাহার ব্যাখ্যায় তাহারা বলিতেন সমস্ত সৃষ্টিই তিনি বা হামাউস্ত। আর এই অবস্থাকেই তাহারা খাতেমুন নবুয়াত ও খাতেমুল বেলায়েত বলিয়া জানিতেন।
বিজ্ঞাপন
আলমে আরোওয়াহ স্তরে আল্লাহতায়ালা 'কুন' বা হও বলিয়া যাহা সৃষ্টি করিয়াছিলেন, তাহা মানুষের নিজেরই জাতের হকিকত বা আমি অধ্যায়ের প্রতিবিম্ব। মানুষের হকিকত হাকীকী সিফাতের জগতে বর্তমান। তাহা আল্লাহর হাকীকী সিফাতের ন্যায় অবর্ণনীয়। ইহা সাধারণ জ্ঞানের অন্তর্গত নহে। উহা আল্লাহতায়ালার কল্পনার জগতে উন্মেষ লাভ করিয়া ধীরে ধীরে নিম্নে অবতরণ করিয়া স্থূল জগতে বাস্তব হইয়াছে। ইহা সৃষ্টির নিজেরই হকিকতের প্রকাশ। ইহা আল্লাহতায়ালার জাতের কোনো প্রকাশ নয়। এই অবস্থা বর্ণনা করিতে যাইয়া হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলিয়াছেন, যে রং করে সে শুধু রংই লাগায়। অর্থাৎ মানুষের যে হকিকত তাহা রূপের রং-এ রঙিন বা রঞ্জিত করিয়া প্রকাশ করা হইয়াছে। ইহা হাকীকী সিফাত হইতেই আসিয়াছে। যাহা আসিয়াছে তাহা সৃষ্টিরই হকিকত। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) প্রকৃত অবস্থা বিশ্লেষণ করিয়া বলিলেন, ইহা সৃষ্টির রংসহ সৃষ্টির হকিকতেই বহিঃ প্রকাশ। আল্লাহপাক সৃষ্টির ঐ হকিকতকে লক্ষ্য করিয়াই কুন বলিয়াছেন, নিজেকে উদ্দেশ্য করিয়া বা নিজের গুণকে উদ্দেশ্য করিয়া নয়। যাহা সৃষ্টি হইল তাহা তাহার সিফাতও নয়, জাতও নয়। যাহা সৃষ্ট হইল তাহা সৃষ্টিই। আল্লাহতায়ালা হাদীসে কুদসীতে বলেন, "আমি গুপ্ত ধন ভান্ডার ছিলাম, পরিচিত হইতে চাহিলাম, তাই সৃষ্টকে সৃষ্টি করিলাম।" আল্লাহতায়ালা নিজের নিকট নিজে পরিচিত হইতে চাহেন নাই, তাহা কাহারো প্রয়োজনও পড়ে না। আল্লাহতায়ালারও নিজের নিকট নিজে পরিচিত হইবার বাসনা ছিল না। স্রষ্টা ও সৃষ্টি-এই দুই অধ্যায় না থাকিলে পরিচয় প্রদান ও পরিচয় গ্রহণের প্রশ্ন আসে না। সুতরাং সৃষ্টিকে রূপ দান করিবার জন্যই বা আল্লাহতায়ালার পরিচয় গ্রহণকারীর অস্তিত্ব সৃষ্টি করার জন্যই তাহাকে তাহার হকিকত হইতে বাহির করিয়া আনিয়া রূপ দান করা হইয়াছে। সৃষ্টি তাহার হকিকত হইতে 'কুন' আদেশে অবতরণ করিয়া আলমে আরোওয়াহ জগতে আসিল। সৃষ্টি নিজে অর্থাৎ নাফস রূহের দ্বারা চেতনা লাভ করিয়া স্কুল শরীর লইয়া এই পৃথিবীতে আসিল।
ইবনুল আরাবী ও তাঁহার মতানুসারী সুফীগণ মানুষের ওজুদ অর্থাৎ পার্থিব আকর্ষণ মুক্ত দেহকে বলিলেন, ইহা কাল্পনিক দেহ, আসলে ওয়াজেবুল ওজুদই সৃষ্টিতে অবতরণ করিয়াছে।
পূর্ব কালের সূফীগণের দৃষ্টিতে ওজুদ বা ওয়াজেবুল ওজুদ কি? ওজুদ শুভগুণ সমূহের সমষ্টি ও উৎপত্তিস্থল। আদম প্রতিটি খারাপ গুণের উৎপত্তিস্থল। ওজুদ আল্লাহপাকের জন্য নির্দিষ্ট; কারণ সমস্ত গুণের উৎপত্তি তাহার মধ্যেই। সৃষ্টিকে তাহার ওজুদ বলিয়া মনে করা হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) শরীয়ত অনুযায়ী শেরেক বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। সৃষ্টিকে আল্লাহতায়ালার যথাযথ অবস্থার একই প্রকাশ বলিয়া পূর্ববর্তী সূফীগণ মনে করিতেন কিন্তু তাহা ভুল। ইহাতে আল্লাহপাকের সহিত শেরেক করা হয়। কিন্তু হযরত ইবনুল আরাবী ও তাঁহার অনুসারীগণ বলিতে চাহেন যে, সৃষ্টির ওজুদ আল্লাহতায়ালার ওজুদের যথাযথ। তবে আল্লাহতায়ালার ওজুদ চিরন্তন, আর সৃষ্টির ওজুদ চিরন্তন নহে। তবে ওজুদ হিসেবে ইহা আল্লাহতায়ালার ওজুদের অনুরূপ, বস্তুতঃ তাহা সত্য নহে। আল্লাহপাক এই অবস্থা হইতে পবিত্র। আবার অনেক সূফী আল্লাহতায়ালার ওজুদ বা ওয়াজেবুল ওজুদের সহিত সৃষ্টির ওজুদের অংশীদারিত্ব স্বীকার করিতেন না; কিন্তু তাহারাও সৃষ্টির ওজুদকে স্বীকার করিতেন এবং ইহার দোষ ত্রুটিকে কামালাত বলিয়া মনে করিতেন। তাহারা মনে করিতেন কোন বস্তুই জাতী অর্থে বা সহজভাবে খারাপ নয়। যেমন 'বিষ' মানুষের জন্য ক্ষতিকারক; কিন্তু সাপ বা অন্যান্য বস্তুর জন্য ইহা উপকারী।
বিজ্ঞাপন
কিন্তু হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) বলিতেছেন, হযরত ইবনুল আরাবী ওজুদকে যে হকতায়ালার ছুরাতে আয়েন' বলিয়াছেন বা যথাযথ আকৃতি বা প্রতিবিম্ব বলেন, তাহা নিম্নলিখিত কারণ সমূহের জন্য গ্রহণ যোগ্য নহে।
আল্লাহতায়ালার নাম ও গুণ সমূহ এবং জাত-পাক একে অপরের আয়েন বা অনুরূপ-এই ধারণা সঠিক নহে। পবিত্র জাত যেমন পৃথক অস্তিত্বধারী, তেমনি হাকীকী সিফাতও পৃথক অস্তিত্বধারী। জাতকে কেন্দ্র করিয়া সিফাত বর্তমান। এই সকল নাম ও গুণের পর্দাসমূহ আল্লাহতায়ালার জাতের সহিত অবর্ণনীয় অবস্থায় বর্তমান। নাম ও গুণ সমূহের পর্দা আল্লাহতায়ালার জন্যই যথাযথ, বান্দা বা সৃষ্টির জন্য নহে। আল্লাহতায়ালার নাম ও গুণ সমূহের মধ্যে পরস্পরের গুরুত্ব বা ভেদাভেদ নির্ণয় করা সম্ভব নহে। আল্লাহতায়ালার নাম ও গুণ সমূহের পরিপূর্ণতা থাকিলেও সেই সকল নাম ও গুণ সমূহ বস্তুতঃ জাত নির্ভর। জাত পাককে বাদ দিয়া নাম ও গুণের নিজস্ব কোনো ক্রিয়া নাই।
আল্লাহপাকের নাম, গুণ, শান, শয়ুনাত একই সাথে বর্তমান বা এজমালীভাবে অবস্থিত। নাম, গুণ শান, শয়ুনাতের একত্রিত বা সমষ্টিগত অবস্থাই তাইনে আউয়াল। সমষ্টিগত অধ্যায়ের পৃথক পৃথক অবস্থা সমূহ তাইনে ছানী-তে অবস্থিত।
বিজ্ঞাপন
আল্লাহতায়ালার নাম, গুণ ও অবস্থা বা অধ্যায়কে বা তাইনে আউয়ালকে হযরত ইবনুল আরাবী (রঃ) ছাহেব 'অহদাত' ও হকিকতে মুহাম্মদী বলিয়া জানিতেন। আর তাইনে ছানীকে অহদানিয়াত বলিয়া জানিতেন। হযরত ইবনুল আরাবী (রঃ) ছাহেব সৃষ্টিকে জাত মতলকের যথাযথ বলিয়া মনে করিতেন। আর সমস্ত সৃষ্টিকে আল্লাহতায়ালার জাতের বহিঃ প্রকাশ বলিতেন। তাহার মতে নিছক জাত ব্যতীত অন্য কোনো কিছুই সৃষ্টি জগতে বর্তমান নাই। বিভিন্ন সৃষ্টি যাহা বুঝিতে পারা যায় ও দেখা যায়, তাহা জাতেরই প্রতিবিম্ব। তাহাদের মতে যেমন প্রতিবিম্ব ও মূল মানুষের চেহারার মধ্যে পার্থক্য নাই; তেমনি জাত ও সৃষ্টির মধ্যে পার্থক্য নাই।
আল্লাহতায়ালার নাম, গুণ ও শানের সমষ্টিগত অবস্থা বা অহদাত এবং সমষ্টিগত অবস্থার পৃথক পৃথক অবস্থা বা অহদানিয়াত-এই দুই অবস্থা ব্যতীত যাহা প্রকাশ্যে দেখা যায়, তাহা তিন রকম। যেমনঃ-
★ তাইনে রুহী,
বিজ্ঞাপন
★ তাইনে মেছালী,
★ তাইনে জাছাদী।
এই তিন তাইনকে খারেজী তাইনও বলে। ইহারা সবই পবিত্র জাত হইতে নিম্নে অবস্থিত। তাইনে আউয়াল বা অহ্দাত, তাইনে ছানী বা অহদানিয়াত, তাইনে রূহী, তাইনে মেছালী ও তাইনে জাছাদী এই পাঁচ তাইনকে একত্রে খামোসও বলা হয়। এই পাঁচ অবস্থাই হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের মতে আল্লাহতায়ালা হইতে পৃথক। পক্ষান্তরে হযরত ইবনুল আরাবী (রঃ) এই সকল জ্ঞান সাপেক্ষ প্রতিবিম্ব বলিয়াছেন। ঐ সকল প্রতিবিম্ব সমূহের প্রতি দৃষ্টি একান্তভাবে রূপ বা ওজুদ গুলিকে ছরাতে আয়েন বা আল্লাহতায়ালার যথাযথ নিবদ্ধ হওয়ায় হযরত ইবনুল আরাবী (রঃ) ছাহেব উহার সমষ্টিকে হামাউস্ত বলিয়াছেন। ইহাই হযরত ইবনুল আরাবী (রঃ) ছাহেবের মতে অহদাতে ওজুদের অবস্থা। এই অহদাত বা একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা কল্পে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রঃ) ছাহেবের পূর্বকালের সূফীগণ "আনাল হক" বলিয়াছেন।
উপরে যাহা আলোচনা করা হইল তাহার সার কথা হইল কলেমা ছাবেত করিয়া পৃথিবীর সমস্ত কিছুর আকর্ষণ হইতে দেলকে মুক্ত করিয়া লইলে যাহা অবশিষ্ট থাকে তাহাকে হযরত ইবনুল আরাবী বলিতেছেন, "ওজুদ”। আর হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলিতেছেন ওজুদ আল্লাহতায়ালার নাম ও গুণাবলীর সমষ্টিগত কামালাত। আল্লাহতায়ালার সিফাতে এজাফিয়ার নূরে সর্ব দেহের জেকের খুলিয়া গেলে যে অবস্থা হয় তাহা হইল, আল্লাহতায়ালার গুণ সমূহের প্রতিবিম্ব লাভ। প্রতিবিম্ব ও আসল চেহারার মধ্যে তফাৎ রহিয়াছে। তৌহিদে ওজুদী স্তরের ফানা লাভ ও হোব্বে ছেরফা, মাবুদিয়াতে ছেরফা স্তরের ফানা লাভ-এই দুই এর মধ্যে যে পার্থক্য তাহা হইল একটি তৌহিদের ছুরাতে ফানা, অন্যটি তৌহিদের হকিকতে ফানা।
হযরত মহিউদ্দিন ইবনুল আরাবী (রঃ) ছাহেব বলিয়াছেন যে, বেলায়েতে ছোগরায় যে তৌহিদে ওজুদী লাভ হয়, সেই তৌহিদে ওজুদের স্তরেই বেলায়েতের সর্বশেষ অধ্যায় ও নবুয়তের সর্বশেষ অধ্যায়। এই স্তরে প্রকৃত অবস্থা যাহা হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) বিশ্লেষণ করিয়াছেন, তাহা হইল, হযরত ইবনুল আরাবী নূরে মুহাম্মদী ও হকিকতে মুহাম্মদীর মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করিতে পারেন নাই। নূরে মুহাম্মদী হইল রাসূলে করীম (সাঃ) এর সেই নূর যাহা দ্বারা সকল সৃষ্ট সৃষ্টি হইয়াছে। পক্ষান্তরে হকিকতে মুহাম্মদী হইল হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর সেই হাকীকী অবস্থা যে অবস্থায় তিনি হোব্বে ছেরফার মাকামে আল্লাহতায়ালার জাত পাকের দর্শন লাভকরিয়াছিলেন। সুতরাং কালবে বা ছয় লতিফায় বা দশ লতিফায় নূরে মুহাম্মদীর দরশন লাভ করা, আর হকিকতে মুহাম্মদীর স্তর লাভ করা এক কথা নয়।
ওজুদ সম্পর্কে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলিয়াছেন যে, ইহা খোদাতায়ালার জাত নয়, জাত ভিন্ন কামালাত সমূহের সমষ্টি। ইহা সৃষ্টি জগতের অংশ নয়। এমকান বা মোমকেনাতের অংশ নয়। ইহা জাতের দূরবর্তী প্রতিবিম্ব। তাই ওজুদের সহিত সৃষ্টি বা মোমকেনাতের ফানা লাভের প্রশ্ন ওঠে না। 'ওজুদ' বলিতে যে অর্থ সূফী ভাষায় প্রচলিত হইয়া গিয়াছে তাহা হইল পার্থিব আকর্ষণ মুক্ত দেহ। এই রূপ অর্থ করিলে আল্লাহতায়ালার অসীম সত্ত্বাকে সীমার মধ্যে আনা হয়।
কিন্তু ইহা সত্ত্বেও আল্লাহতায়ালার গুণ সমূহ বা কামালাতের সমষ্টিগত প্রকাশ বা ওজুদ যাহা বেলায়েতে ছোগরা বা তৌহিদে ওজুদের স্তরে লাভ হয় তাহার শুভ প্রভাবও সামান্য নহে। ওজুদ আল্লাহতায়ালার জাত হইতে নিম্নে অবস্থিত হইলেও ইহা কামালাতের সমষ্টি বিধায়, ইহা আল্লাহতায়ালার ক্রিয়া কলাপ বা আফ্যালে জাতিয়া সমূহের উপরে অবস্থিত। তাই তৌহিদে ওজুদী বা আল্লাহতায়ালার সিফাতে এজাফিয়া বা গুণ সমূহের প্রতিবিম্ব লাভ করিবার পর আল্লাহতায়ালার ক্রিয়া গুণ সমূহের নূর বা প্রভাব এই অবস্থায় ছালেকের মধ্যে আসিয়া পড়ে। যেমন পবিত্র কুরআনে প্রকাশ, 'যখন তুমি ধুলি নিক্ষেপ করিলে, তাহা আল্লাহতায়ালাই নিক্ষেপ করিলেন' অর্থাৎ আসলে আলাহতায়ালার ওজুদই ধুলি নিক্ষেপ করিলেন। মানুষের ওজুদ যেন আল্লাহতায়ালার ওজুদের প্রতিবিম্ব হিসেবে আল্লাহতায়ালার ওজুদের গুণ লাভ করিয়াছে বা তাহার স্বভাব লাভ করিয়াছে বা ঐ ওজুদে ফানা হইয়া গিয়াছে। 'হযরত নবী করীম (সাঃ) এর হাতে হাত দিলে আল্লাহর হাতে হাত দেয়া হয়'-ইহাও ঐ রূপ। কিন্তু ঐ স্থানে আল্লাহতায়ালার রূপগত কোনো কথা নাই। উহাই বেলায়েতে ছোগরা বা তৌহিদে ওজুদী প্রাপ্ত সাধারণ ওলীগণের অধ্যায়।
ওলীগণ এই স্তরে আপন শরীর থাকিতেও তৌহিদে ওজুদীর প্রভাবে প্রভাবিত হইয়া কারামত প্রকাশ করিয়া ফেলেন। ওলীগণ এই মাকামে ধ্যানরত অবস্থায় অনুভব করিতে ও দেখিতে পান যে আল্লাহতে হোলুল (প্রবেশ) হইয়া গিয়াছেন অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার কামালত সমূহের প্রতিবিম্বের মধ্যে লীন হইয়া গিয়াছেন। মোরাকাবা অবস্থায় ছালেক তখন আল্লাহতায়ালার কামালাতের একটি সমষ্টিগত প্রতিবিম্ব অন্তর চোখে দেখিতে পান। তাহারা মোরাকাবা অবস্থায় ইহাও দেখিতে পান যে, তাহার শরীর ধীরে ধীরে আকার শূন্য হইয়া নিঃশেষিত হইয়া গিয়াছে। এই নিরাকার হইবার দরশন আসলে বাস্তব ঘটনা অর্থাৎ ছালেকের তখন পার্থিব আকাংখা মুক্ত অবস্থা লাভ হয়। তাই হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব যাহা বাস্তবতা তাহা বোঝাইবার জন্য এই অবস্থাকে তৌহিদে ওজুদী না বলিয়া তৌহিদে শহুদী বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন।
এখানে ইহা বুঝিবার বিষয় যে কোনো বস্তুর প্রতিবিম্ব ও তাহার আসল এক কথা নয়; উভয়ে সমপৰ্য্যায় ভুক্তও নয়। তবে প্রতিবিম্বকে দেখিয়া আসলে বা মূলে পৌঁছানো সহজ হয়। আসলে যখন পৌঁছানো যায়, তখন প্রতিবিম্বে থাকা অবস্থায় যে জ্ঞান ছিল তাহা ধ্বংস হইয়া যায়। সেই জন্য ওজুদের অধ্যায়ে পৌঁছাইয়া ছালেক জ্ঞান হারাইয়া ফেলেন। আনাল হক বা আনা ছোবহানী বলেন। পুনরায় যখন জ্ঞান জগতে ফিরিয়া আসেন তখন সৃষ্টিকে 'হামাউস্ত' বলেন। ইহা সত্য প্রাপ্তি নয়, সত্য অর্জনের পথে একটি অবস্থা মাত্র। বেলায়েতে ছোগরা স্তর হইতে আকরাবিয়াত ও মহব্বতে আউয়ালের স্তরে আর এই উম্মত্ততার অবস্থা বিদ্যমান থাকে না।
ওজুদের বৈশিষ্ট্য বস্তুতঃ কি? জগতের মানুষের সাথে ইহার সম্পর্ক বিষয়ে কুরআন মজীদ ও হাদীসে কুদসীতে দেখানো হইয়াছে যে, আল্লাহতায়ালার ক্রিয়া জগতের সহিত, মানুষের মধ্যে যে আল্লাহর ওজুদের প্রতিবিম্ব রহিয়াছে, তাহার যোগাযোগ ঐ বেলায়েতে ছোগরা স্তরেই সম্ভব।
আল্লাহপাকের ওজুদের দুইটি অংশ রহিয়াছে। উহার একটি হাকীকী সিফাত যুক্ত জাতের দিকে, অন্যটি সৃষ্টির বাস্তবায়নের জন্য ক্রিয়াকলাপের দিকে। ওজুদ আল্লাহতায়ালার সেই কামালতের সমষ্টি যাহা গোপন ছিল ও প্রকাশ করিবার জন্য হাদীসে কদসীতে উল্লেখ করিয়াছেন। ওজুদ গোপন ছিল আদম হইতে। আল্লাহপাক মানুষের জন্ম-পূর্ব কাহিনী বলিতে যাইয়া বলিয়াছেন, "মানুষের জন্য এমন একটি সময় ছিল যাহা বর্ণনাযোগ্য নয়।" আমরা সাধারণভাবে এই অবস্থা বুঝিতে পারি না।
যে ওজুদ আদমের নিকট পরে প্রকাশিত হইল, উহাই সৃষ্টি জগতে বিকাশগত আদমের নিকটে গোপন ছিল। যে ওজুদ সৃষ্টির কাছে গোপন ধনভান্ডার ছিল, সেই ওজুদ অবশ্য সৃষ্টি সম্পর্কে অবগত ছিলেন। ওজুদ অধ্যায়ে সৃষ্টি প্রবেশ করিতে না পারিলেও ওজুদ সৃষ্টির উপর প্রতিবিম্ব ফেলিতে পারে।
প্রথমে সৃষ্টি ওজুদের সম্মুখে অক্ষম থাকিলেও তাহারা ওজুদের সম্মুখে আকার বিহীন অবস্থায় বর্তমান ছিল ও সেই আকার বিহীন অবস্থায় কুন আদেশ শ্রবণ করিয়াছিল। তাই সিফাতে হাকীকীতে তথা আকরাবিয়াতের অধ্যায়ে একদিকে জ্ঞান ও অন্য দিকে মুর্খতা বর্তমান। একদিকে হায়াত ও অন্য দিকে মৃত্যু বর্তমান। এই অবস্থা জগতে বসিয়া বোঝা যায় না। তখন ওজুদ ছিল বা আল্লাহতায়ালার কামালতের সমষ্টি ছিল, আর কিছুই ছিল না। এই "না" এর মধ্যে সমস্ত কিছুই বর্তমান ছিল। প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্য অন্য কথা। অজুদ মানে আছে, আর আদম অর্থ নাই। আমি 'আদম' অর্থাৎ নাই বলিতে কোথায় নাই-ইহা আদমের নিম্নের প্রকাশ্য অধ্যায়ে নাই-কিন্তু ঐ যে সৃষ্টি প্রকাশের পূর্বে কিছুই ছিল 'না'-র মধ্যেই বর্তমান, আর তাহা ওজুদের প্রতিবিম্ব বা আল্লাহতায়ালার কামালতের প্রতিবিম্ব বা আল্লাহতায়ালার এরাদত বা কল্পনাগুণের মধ্যে হাকীকী অবস্থায় বর্তমান ছিলাম। আল্লাহতায়ালার কল্পনাগুণের সমষ্টিগত অধ্যায় হইল মোর্তবা অহম; তাহার প্রতিফলন ঘটে আলমে মেছালের আয়নায়। আদম যখন ঝরিয়া যায় তখন তাহার মধ্যে যে আল্লাহতায়ালার কল্পনার হাকীকী রূপ তাহাই মোর্তবা অহম হইতে আলমে মেছালে ছালেক দেখিয়া থাকেন। ওজুদ আদমের মধ্যে প্রতিবিম্বিত হয়। আদম ওজুদে যাইয়া ওজুদকে আদম করিতে পারে না। কিন্তু ওজুদ তাহার প্রতিবিম্ব আদমের উপর ফেলিয়া প্রকাশ্য সৃষ্টির মধ্যে সকল গুণ দান করিতে পারে। ইহা ওজুদের বা আল্লাহতায়ালার কামালতের ক্রিয়া কলাপের অধ্যায়। আদম ওজুদকে আদম করিতে পারে না কিন্তু ওজুদ তাহার কামালতের সমষ্টির প্রতিবিম্ব আদমের উপর ফেলিয়া আল্লাহতায়ালার গুণে গুণান্বিত করিতে পারে। ইহাই হইল মূলতঃ ওজুদের সহিত আদামাতের পার্থক্য বা সৃষ্টির সহিত পার্থক্য। ওজুদের এই অবস্থা বোঝা যায় না, যদি না ওজুদের কামালাত ও গুণের আলোকে আলোকিত কোন ওজুদের প্রতিবিম্বের সংস্পর্শে না আসা যায় অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার কামালাত সমূহের প্রতিবিম্ব ধারী কোনো ওলীর সংস্পর্শে না আসা যায়। আল্লাহর এই কামালাতের গুণে গুণান্বিত ওলীকে পূর্বতন কালের সূফীগণ "হামাউস্ত" বলিতেন। আল্লাহতায়ালার কামালাত তাহার জাত হইতে পৃথক। তাই হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) আফসোস করিয়া বলিতেছেন, পূর্বকালের সূফীগণ ওজুদকেই আল্লাহ মনে করিয়াছেন। আল্লাহপাক কুরআন মজীদে নিজেকে বলেন,
هُوَ الْأَوَّلُ وَ الْآخِرُ وَالظَّاهِرُ وَالْبَاطِنُ
অর্থাৎ-'তিনিই আদি, তিনিই অন্ত, তিনিই ব্যক্ত, তিনিই অব্যক্ত।" (সূরা হাদীদঃ ৩) ইহা ওজুদ সম্পর্কেই সুসংবাদ। এই "হুয়া" আল্লাহপাক হইতে পৃথক সত্ত্বা, ইহা আল্লাহপাকের কামালাতের প্রকাশ। "হুয়া" বা "তিনি" সর্বনাম। সর্বনাম নামের অধিকারীর সম্পূর্ণ পরিচয় বহন করে না।
ওজুদ সম্পর্কে বুঝিতে যাইয়া একটি হাদীস শরীফ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই হাদীসটি হইল,
أَنَا مِنْ نُوْرِ اللَّهِ وَ كُلُّ شَيْءٍ مِنْ نُوْرِى
অর্থাৎ-'আমি আল্লাহর নূর হইতে, অন্য সকল কিছু আমার নূর হইতে।' আল্লাহর নূর হইতে নূরে মুহাম্মদীর সৃষ্টি; ইহা যেন এক বাতি হইতে অন্য বাতি জ্বালানো। উভয়ে পৃথক হইলেও নূরে মুহাম্মদী হইতেই সব কিছু সৃষ্টি। নূরে মুহাম্মদী ও অন্য সব কিছুর নিকট 'এক'-ই মূল। আল্লাহ স্বীয় নূর হইতে আর এক নূর ও আর এক অস্তিত্বের সৃষ্টি করিলেন। "হইতে" শব্দ আর এক অবস্থার প্রতি নির্দেশ করিতেছে। সেই সৃষ্টি যদি সসীম হয় তাহা হইলে উৎসও সসীম হইয়া যাইবে। অসীম সসীমে আসে না, অসীম সসীমে আসিলে উৎস খন্ডিত হইয়া যায়। সুতরাং এই হাদীস ওজুদ সম্পর্কের কথা, যাহা নূরে মুহাম্মদীর উৎস। আল্লাহতায়ালার নিছক জাত ছাড়া সব কিছুই গায়ের। অতএব ওজুদ আল্লাহ নয়-তাহা গায়ের, তবু ওজুদ যেহেতু আল্লাহতায়ালার কামালাতের সমষ্টি, সেই হেতু তাহা আল্লাহতায়ালার জাতের অতিরিক্ত; একান্ত অর্থেই গায়ের নয়। তৌহিদে অজুদী হইল তৌহিদের ছুরাত। ইহার হকিকত বহু উপরে মাবুদিয়াতে ছেরফা ও হোব্বে ছেরফায়। তবে বেলায়েতে ছোগরার স্তরে যে তৌহিদে ওজুদী লাভ হয় তাহা "নেছইয়ান মা সাওয়া আল্লাহ"-অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত অন্য সকল কিছু ভুলিবার অবস্থা। ইহা মারেফাত বা হকিকত নয়। ইহা মারেফাত ও হকিকত লাভের পথের একটি অবস্থা। তাই হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব ইহাকে মারেফাতের পথের ধুলাবালি বলিয়াছেন। ইহা মারেফাতের পথের একটি স্তর, সুতরাং ইহাকে অবশ্যই ইহার যথাযথ পটভূমি ও আংগিকে মানিতে হইবে। ইহা মারেফাতের ছুরাত হইলেও ছুরাতকে বাদ দিয়া হকিকত ও মারেফাতের কিছুই বোঝা যাইবে না। তৌহিদে ওজুদীর মধ্যে শরীয়ত খেলাপী কথা কিছু আসিতে পারে তবে বেলায়েতে কোবরার স্তরে পৌঁছাইলে পার্থক্য জ্ঞান বোঝা যায়। মোর্তবা জমার স্তরের পরে ফারাক বাদল জমা স্তরে তাহা বোঝা যায়। হাকীকী তৌহিদে আসিলে বোঝা যায় যে ওলীদিগের তৌহিদে ওজুদী হইল মূলতঃ তৌহিদে শহুদী।
তৌহিদের অধ্যায়ের সহিত সূরা এখলাস খুবই ঘনিষ্টভাবে জড়িত। "আল্লাহ এক। তিনি কাহারও মুখাপেক্ষী নন। তিনি কাহারও জনক নহেন। কাহারও সন্তানও নহেন। তাহার সম শ্রেণীর কেহ নাই।" ইহার তত্ত্ব ও খাছিয়াত এখলাস সৃষ্টি করে। এখলাস-এলেম ও আলমের সমষ্টিগত সুফল। এখলাস বলিতে চায় যে নিছক আল্লাহ ছাড়া আর সকল কিছুই অকিঞ্চিৎকর। সূরা এখলাসের প্রথমে রহিয়াছে 'কোল" অর্থাৎ 'বল'। এই 'বল' শব্দ আলাহপাক হইতে হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর উদ্দেশ্যে উচ্চারিত হইয়াছে। আল্লাহপাক রাসূলে পাক (সাঃ) কে বলিতেছেন "আল্লাহ এক, তিনি ছামাদ, তিনি কাহারও জাত নহে, জন্মদাতা নহে।" এই জ্ঞান যেন তিনি সকলকে প্রচার করেন। নিজে না বুঝিলে অন্যকে বোঝানো যায় না। নবী করীম (সাঃ) ইহার হকিকত অনুধাবন করিয়াছেন: তাহার পর অন্যকে এই তত্ত্ব বুঝিবার ও অনুধাবন করিবার সন্ধান জানাইয়াছেন। সূরা এখলাসের মধ্যে নবুয়ত ও তাবলীগ বা প্রচারের হাল বর্তমান। অন্যকে বলিতে পারার যোগ্যতা অর্জন করা বেশ কঠিন, নিজে বোঝা যত কঠিন, অন্যকে বোঝানো আরও কঠিন। আল্লাহকে এক বলিতেছি, এক বলিয়া বিশ্বাস করিতেছি অথচ এক বলিয়া বুঝিতে পারিতেছি না। এই আত্মিক সংকট খুবই গভীর, অন্ততঃ খোদাতালাসীদের নিকটে। ইহার পর আবার কোল হু আল্লাহু আহাদ অর্থাৎ সেই আল্লাহকে "তিনি" বলিতে হইবে-যে সর্বনাম অনুপস্থিতকে নির্দেশ করে। এই “এক” এর অনুসন্ধানে তৌহিদে ওজুদীগণ সাধনা করেন। এই একের কোনো সম জাতি নাই। "কোল হু আল্লাহু আহাদ" অর্থাৎ বল আল্লাহ এক। সেই আল্লাহ হুয়া দ্বারা পরিচিত বা হুয়া দ্বারা ইংগিতকৃত। এই আল্লাহ এক বা আহাদ ও সর্বনাম তিনি দ্বারা পরিচিত। এই এক বুঝিতে হইলে আইয়ামে জাহেলিয়াত যুগের অবস্থা স্মরণ করা আবশ্যক। তখন আল্লাহর ঘর কাবা শরীফের মধ্যেও মূর্তি ছিল। সেই কাবা ঘরের মূর্তি ভাংগিয়া সেই স্থানে এক আল্লাহর উপাসনাই ইসলামের নবীর তৎকালীন জাগতিক কৃতিত্ব। কিন্তু প্রতি মুসলমানের নিকট ইহার হকিকত হইল, তাহার দেহ যে মূর্তি সেই মূর্তির খেয়াল-খুশী যথেচ্ছাচারীতা বা নাফসের প্রবৃত্তি ধ্বংস করিয়া 'হুয়া" বা তিনি বলিয়া ইংগিতকৃত যে আল্লাহ, যিনি সমস্ত কামালাতের ও গুণের অধিকারী; তাহারই নিকট আত্মসমর্পণ করা। এই "হুয়া" হইল আল্লাহপাকের কামালাত অর্থাৎ জাত সংলগ্ন গুণাবলীর সমষ্টির প্রকাশ। আল্লাহপাক নিছক জাত অধ্যায়ে বিনা ওজুদে মওজুদ, বিনা সিফাতেই কাদের বা সর্বক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু যে সৃষ্টি বা যে মানুষকে ঈমান আনিতে হইতেছে তাহার জন্য সিফাত, ওজুদ ও ক্রিয়াকলাপ ছাড়া ঈমান আনার উপায় নাই। এই বিশ্বাসীকে তখন বিশ্বাস করিতে হয় যে আল্লাহ এক ও একক কিন্তু উহা "হুয়া” মাধ্যমে ইংগিতকৃত এক।
শ্রেষ্টতম সংস্কারক হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব মারেফাতের বিশ্লেষণের চিন্তাশীলদের লক্ষ্য করিয়া বলিয়াছেন যে, আল্লাহকে এক বলিয়া অসীম হিসেবে বিশ্বাস করিলে যদি কোনো সসীমতার ধারণা হয়, আল্লাহ তাহা হইতে পাক। ইহাতে পরিস্কার বোঝা যায় যে, আল্লাহকে যে পর্যায়ে এক বলা হয় এবং সত্যিই যিনি এক; সেই এক ও একক অধ্যায় আল্লাহ তথা হাকীকী সিফাতের প্রথম নিম্নগত "হুয়া" অধ্যায়। সেই হুয়াই হইল "বেলায়েতে হেপ্রার শীর্ষগত অবস্থা একক ও একত্ব বা একবাদ বা তৌহিদে ওজুদী। এই এক যদিও "হুয়া" ও ওজুদ, তথাপি ইহার বাস্তবতা অনস্বীকার্য। ইহা ইসলামী দরশন ও মারেফাতের শেষ কথা নয়। তবে সৃষ্টি জগত হইতে আলমে আরোওয়াহগত মোৎমাইন্ন্যা জগতে ছালেকের ঈমান ও বিশ্বাস অধ্যায়ে আল্লাহ এক। তৌহিদ ও একবাদে বিশ্বাসী হইলে যে সসীমতার ত্রুটি আসিতে পারে আল্লাহকে তাহা হইতে পাক জানা ও বলাই সঠিক কথা।
হে জাকেরানগণ! আল্লাহপাকের সমষ্টিগত কামালতের ওজুদ সম্পর্কে তোমাদের যাহা বলা হইল তাহার ছুরাত যাহা বেলায়েতে ছোগরার স্তরে তৌহিদে ওজুদী রূপে লাভ হয় এবং হকিকতে আহমদী বা হোব্বে সেরফার স্তরে সাধকের হাকীকী রূপের সহিত জাত পাকের অহদাত লাভ হয়, এই উভয় গুণের অধিকারী ছিলেন আমার দয়াল পীর কেবলাজান হুজুর হযরত মাওলানা খাজাবাবা শাহসূফী এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব। আল্লাহতায়ালার সকল কামালাত যাহা হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) ও হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) ছাহেবের ছিনা বা ছিনা হইয়া পীরানে পীরগণের দেলের যোগাযোগে আসিতেছিল, সেই কামালাত সমূহের সমষ্টির সকল কিছুরই পরিপূর্ণ প্রকাশ ছিল আমার দয়াল পীর কেবলাজান হুজুরের নিকটে। মারেফাত জ্ঞানের আকাশে তিনি ছিলেন পূর্নিমার পূর্ণ চন্দ্র স্বরূপ। তোমরা যদি তৌহিদে ওজুদী ও তৌহিদে হাকীকী-এই উভয় স্তরের মারেফাত লাভ করিতে চাও তাহা হইলে আমার দয়াল পীর কেবলাজান হুজুরের পাক কদম জড়াইয়া ধর। আমার দয়াল পীর কেবলাজান হুজুর যে ভাবে পরিচালিত করেন, সেইভাবে পরিচালিত হও। তাহার কামালাতের সহিত অহদাত১০ লাভের জন্য চেষ্টা কর। তাহা হইলেই তোমাদের জন্য তরিকতের পথে অগ্রসর হওয়া ও আল্লাহতায়ালার পরিপূর্ণ মারেফাত লাভ সহজ হইবে। আল্লাহপাক তোমাদেরকে আমার পীর কেবলাজানের কদমে নেছার হইবার যোগ্য করিয়া তুলুন। ইহাই তোমাদের প্রতি আমার উপদেশ। এই উপদেশ মানিয়া চলিবার আপ্রাণ চেষ্টা কর। তাহা হইলে তোমরা মাঞ্জিলে মাকছুদে পৌঁছাইতে পারিবে বলিয়া আশা করা যায়। দু'আ, ইতি।







