Logo

আলোচনার বিষয়বস্তু তৌহিদে ওজুদী, তৌহিদে শহুদী ও তৌহিদে হাকীকী

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ২০:২৪
আলোচনার বিষয়বস্তু তৌহিদে ওজুদী, তৌহিদে শহুদী ও তৌহিদে হাকীকী
ছবি: জনবাণী।

হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘তৌহিদে ওজুদী ও তৌহিদে শহুদী এবং ছায়েরে আফাক ও আনফা’ بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ আলোচনার বিষয়বস্তু তৌহিদে ওজুদী, তৌহিদে শহুদী ও তৌহিদে হাকীকীঃ

বিজ্ঞাপন

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের পূর্বের যুগের সাধকগণ আল্লাহতায়ালাকে পাইবার পথে সাধনা করিয়া বেলায়েতে ছোগরার শেষ পর্যায়ে আল্লাহতায়ালার 'ওজুদ' বা শুভগুণের সমষ্টির সহিত "বিলীন বা ফানা প্রাপ্ত বা একত্ব বোধ করিয়াছেন এবং একমাত্র আল্লাহপাকের ওজুদকেই মওজুদ (বর্তমান) জানিয়াছেন ও গায়ের আল্লাহকে অস্বীকার করিয়াছেন। এই অনুভূতিই তৌহিদে ওজুদী।

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব অবশ্য এই আত্মিক অবস্থাকে 'তৌহিদে ওজুদী' বলেন নাই। তিনি বলিয়াছেন, ছালেক যখন পার্থিব আকাংখা মুক্ত হয়, তখন কাশফ বা আত্মিক চোখে নিজেকে "দেহ বিমুক্ত" দেখিয়া থাকেন। তাহার অর্থ এই নয় যে আল্লাহতায়ালার শুভগুণের সমষ্টিগত যে কামালাত, সেই কামালাতের সহিত ছালেক বিলীন হইতে পারিয়াছেন বা আল্লাহতায়ালাতে বিলীন হইতে পারিয়াছেন। তিনি বলেন, আল্লাহতায়ালাকে 'ওজুদের' মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তাহা হইলে আল্লাহতায়ালার অসীমত্বকে অস্বীকার করা হয়। তাই তিনি বলিয়াছেন, ছালেক যে নিজেকে আত্মিক চোখে "দেহ বিমুক্ত” অবস্থায় দেখে তাহা প্রকৃত পক্ষে 'তৌহিদে শহুদী' বা নিজের পার্থিব আকাংখা বিলীন হইবার ছুরাত-যাহা আলমে মেছালে ঐ রূপে ছালেকের চোখে দেখা দেয়। মানুষ তাহার দেহগত সত্ত্বা বা রূহগত সত্ত্বা-কোনো সত্ত্বা লইয়াই আল্লাহতায়ালার সহিত একীভূত হইতে পারে না।

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব ফরমান, আল্লাহতায়ালা সৃষ্টির আদিতে মানুষের যে গুণ সমূহ কল্পনা করিয়াছিলেন, সেই গুণ সমূহ হইল মানুষের হকিকত। আল্লাহতায়ালাকে পাইবার উদ্দেশ্যে ছালেক যখন স্কুল জগত ও আলমে আরওয়াহর স্তর পার হইয়া নাফী-এজবাত জেকেরের মাধ্যমে সেই হকিকতের জগতের গুণ লাভকরিতে পারে, তখনই কেবল হাকীকীস্তরে আল্লাহতায়ালার সহিত বিলীন হয়। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের মতে দেহগতভাবে আল্লাহতায়ালার সহিত একত্ব লাভ করা যায় না। ছালেক আল্লাহতায়ালার সহিত একত্ব লাভ করে হকিকতের দিক দিয়া। তাই মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব "তৌহিদে ওজুদী' মতবাদ গ্রহণ না করিয়া গ্রহণ করিয়াছেন, "তৌহিদে শহুদী" ও "তৌহিদে হাকীকী” মতবাদ।

বিজ্ঞাপন

বেলায়েতে ছোগরার সর্বশেষ স্তরে ছালেক যখন পার্থিব আকাংখা হইতে মুক্ত হন, তখন আল্লাহতায়ালার গুণ সমূহের কামালাতের প্রতিবিম্ব ছালেকের উপর প্রতিফলিত হয়। তাই ছালেক আল্লাহতায়ালার গুণসমূহের প্রতিবিম্ব নিজের মধ্যে দেখিতে পায়, তাহার পার্থিব আকাংখা চলিয়া যায়, দেহগত দোষও অনেকাংশে কমিয়া যায়। ইহাকে পূর্ব কালের সূফী সাধকগণ আল্লাহতায়ালার গুণ সমূহের প্রতিবিম্ব বা ওজুদের সহিত অহদাত' লাভ বলিতেন। তাই সাধনার এই স্তরকে বলিতেন "তৌহিদে ওজুদী।" কিন্তু হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলিতেছেন, এই ফানা হইল প্রকৃত পক্ষে আল্লাহতায়ালার তাজাল্লীয়াতে আফয়াল বা সিফাতে এজাফিয়ার স্তরের অহদাত। আল্লাহতায়ালার তাজাল্লীয়াতে আফয়াল হইল ক্রিয়া গুণের জ্যোতি। সিফাতে এজাফিয়া হইল আল্লাহতায়ালার হাকীকীগুণ সমূহের প্রতিবিম্ব। কিন্তু আল্লাহতায়ালার হাকীকী গুণ হইতেও পৃথক আল্লাহতায়ালার জাতপাক। আল্লাহতায়ালার সিফাতে হাকীকীর নূর ছালেককে হাকীকী গুণ সমূহ দান করিতে পারে। আর আল্লাহতায়ালার জাতি নূর প্রয়োজন আল্লাহতায়ালার জাতের হকিকত অনুধাবন করিবার জন্য। সিফাতে এজাফিয়া হইল আল্লাহতায়ালার হাকীকী গুণ সমূহের প্রতিবিম্ব। তাহা জাতপাক হইতে বহুস্তর নিম্নে। সিফাতে এজাফিয়া স্তরের উপরে সিফাতে হাকীকী স্তর। তাহার ঊর্ধ্বে শান ও ইতেবারের স্তর ও তৎপরে জাতের স্তর। তাই মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তৌহিদে ওজুদীর স্তরকে ছায়েরে এলাল্লার স্তর বা আল্লাহতায়ালার অভিমুখে যাত্রাপথে একটি স্টেশন বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। তবে

বলিয়াছেন, ইহাই শেষ ষ্টেশন নহে। তৌহিদে হাকীকী অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার হকিকতকেই হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব ছালেকের প্রকৃত গন্তব্য বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন

কিন্তু হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) এর পূর্বে সুফী সাধকগণ এই তৌহিদে ওজুদের স্তরে আসিয়া সাধনা সমাপ্ত হইয়াছে বলিয়া মনে করিতেন। তাহারা এই স্তরে আসিয়া কি লাভ করিতেন, কেনই বা সাধনা সমাপ্ত করিতেন, এখন তাহা আলোচনা করিব। তবে এই স্থানে উল্লেখযোগ্য যে, হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) নিজে, তদীয় পীর কেবলাজান হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ও হযরত মুজাদ্দেদ ছাহেবের ওয়ালেদ বা পিতা হযরত আবুল আহাদ (রঃ) ছাহেবও দীর্ঘকাল তৌহিদে ওজুদীর স্তরকেই তাহাদের সাধনার শেষ গন্তব্য স্থান মনে করিয়াছেন। পরবর্তীতে হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) এর নিকট আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে প্রকাশিত হয় যে, খোদাতায়ালার জ্ঞান সাধনায় তৌহিদে ওজুদী একটি সংকীর্ণ গলিপথ মাত্র এবং এই স্তরে যে মারেফাত লাভ হয়, তাহা মারেফাতের রাস্তার ধুলাবালি। ইহার পরে রহিয়াছে প্রশস্ত রাজপথ। হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব এই রাজপথের শেষ দেখিয়া যান নাই। এই স্তরে তাহার আত্মিক অভিজ্ঞতার কোনো বর্ণনা নাই। পক্ষান্তরে জানা যায়, হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব তদীয় মুরীদ হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব সম্পর্কে বলিয়াছেন যে, হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) এর মত ওলী আসমানের নীচে আর আসেন নাই। হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) ও হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব-এই দুই জনের পীর আল্লাহপাক স্বয়ং। তাই বোঝা যায়, আল্লাহতায়ালা সম্পর্কে চূড়ান্ত জ্ঞান লাভ করিয়াছিলেন নবী করীম (সাঃ) ও হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এবং হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) এর মধ্যবর্তী যুগের অধিকাংশ সাধকগণ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহতায়ালার জাতের জ্ঞান লাভ করেন নাই। তাহারা যাহা লাভ করিয়াছিলেন তাহা হইল আল্লাহতায়ালার সিফাতে এজাফিয়া বা হাকীকী গুণ সমূহের প্রতিবিম্বের নূর। তাই তাহাদের আত্মিক সাধনা ও অভিজ্ঞতা, আল্লাহ সম্পর্কীয় জ্ঞান ও গুণ অসম্পূর্ণ ছিল। এতদসত্ত্বেও তাহারা তাহাদের সাধনা সেখানেই সম্পূর্ণ করিতেন। কিন্তু হযরত মহীউদ্দীন ইবনুল আরাবী (রঃ), হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী (রঃ) ও হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের মত সূফী সাধকগণ কেনইবা তাহাদের সাধনা কেবল তৌহিদে ওজুদীর স্তরেই সম্পন্ন করিলেন? এই তৌহিদে ওজুদীর স্তরকেই কেন হযরত মহীউদ্দিন ইবনুল আরাবী খাতেমুন নবুয়ত ও খাতেমুল বেলায়েত বলিতেন?

বিজ্ঞাপন

ইহার প্রধান কারণ, ঐ সকল সূফীগণ সৃষ্টিকে ওজুদ বা আল্লাহতায়ালার শুভ গুণ সমষ্টির প্রতিবিম্ব মনে করিতেন। তাহারা মনে করিতেন যে, ওজুদের সহিত সৃষ্টির পার্থক্য সামান্যই মাত্র। কোনো মানুষের প্রতিবিম্ব আয়নায় দেখিলে আসল মানুষকে চেনা যায়। তাই প্রতিবিম্ব ও আসলের মধ্যে যেরূপ সম্পর্ক, তেমনি সম্পর্ক জাতপাক ও সৃষ্টির মধ্যে। সৃষ্টিকেই তাহারা জাতপাকের আয়েন বা যথাযথ মনে করিয়াছেন; তাই তাহারা বাস্তব স্থুল জগতের সৃষ্টিকে হামাউস্ত বা সবই তিনি মনে করিতেন।

বেলায়েতে ছোগরার স্তরে ছালেকের ছয় লতিফা বা দশ লতিফায় যে জেকের হয়, আত্মিক চোখে সেই জেকেরের নূরের তাজাল্লীতে সমস্ত আসমান জমিন প্লাবিত বলিয়া মনে হয়। "আল্লাহু নূরুস ছামাওয়াতে অল আরদ"-অর্থাৎ আল্লাহতায়ালা আসমান জমিনের নূর-এই ধারণা দ্বারা তাহারা মনে করিতেন সৃষ্টি জগত মানেই হইল আল্লাহতায়ালার ওজুদ বা গুণ সমূহের প্রতিচ্ছবি। যাহা হউক, তৌহিদে ওজুদী বুঝিতে হইলে বা এই প্রসংগে সূফীগণ ও মুজাদ্দেদ ছাহেবের মত-পার্থক্য বুঝিতে হইলে ওজুদ সম্পর্কে স্বচ্ছ জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। বস্তুতঃ হযরত ইবনুল আরাবী যাহাকে জাত পাক মনে করিয়াছেন, তাহা হইল আল্লাহতায়ালার হাকীকী সিফাত। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) এর মতে সৃষ্টির সহিত জাত পাকের সরাসরি কোন সম্পর্ক নাই। সৃষ্টির সম্পর্ক আল্লাহতায়ালার সিফাত সমূহের সহিত। যেমন রহমান আল্লাহতায়ালার সিফাতি নাম। যাহা দ্বারা সৃষ্টি আল্লাহতায়ালার রহমত লাভ করিয়া টিকিয়া আছে। সৃষ্টি যখন ছিল না, তখন রহমত দান করিবার প্রয়োজন পড়িত না। কারণ রহমত গ্রহণ করিবার কেহ ছিল না। ইহা তখন আল্লাহতায়ালার "তাকবীন” বা সৃষ্টিগুণের মধ্যে নিহিত ছিল। আবার মানুষ যখন সৃষ্টি হয় নাই, তখনও মানুষের হকিকত ছিল, তাহাও তখন আল্লাহতায়ালার হাকীকী সিফাতের মধ্যে নিহিত ছিল।

যে মানুষ আল্লাহতায়ালার কুন আদেশ শুনিয়া আলমে আরোওয়াহের জগতে আসিয়াছিল, তাহা ছিল মানুষের হকিকত বা আল্লাহতায়ালার কল্পনায় মানুষের কল্পিত গুণাবলী সমষ্টির প্রতিবিম্ব। মানুষের হকিকতকে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব সৃষ্টি জগতের অন্তর্গত নয় বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন- ইহা আল্লাহতায়ালার হাকীকী সিফাতের অন্তর্ভুক্ত বলিয়াছেন। ইহা আল্লাহতায়ালার এরাদত বা কল্পনার গুণ দ্বারা মোর্তবা অহমে' রূপ লাভ করে। ইহা সাধারণ জ্ঞানে আসে না। ইহা আল্লাহতায়ালার জাতের প্রকাশ নয়, আল্লাহতায়ালার কল্পনাগুণের প্রকাশ। হযরত মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেব বলেন, ইহা হাকীকী সিফাতও নয়, বরং সিফাতস্থিত সৃষ্টির হকিকত।

বিজ্ঞাপন

পক্ষান্তরে হযরত ইবনুল আরাবী (রঃ) বলিতেছেন যে, সিফাত সংযুক্ত জাতেরই বহিঃ প্রকাশ সৃষ্টি। যাহা সিফাত তাহাই জাত।

হযরত মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেব বলিতেছেন, সৃষ্টি জাতের প্রতিবিম্ব হইলে বোঝা যাইবে যে, আল্লাহতায়ালা কুন বলিবার সময়ে নিজের জাতকে উদ্দেশ্য করিয়াই কুন বলিয়াছেন এবং সর্বত্র জাতেরই প্রতিবিম্ব রহিয়াছে। কিন্তু প্রকৃত অবস্থা তাহা নহে। আল্লাহ যখন কুন বলেন, তখন তাহা সিফাতস্থিত সৃষ্টির হকিকতকেই কুন বলিয়াছেন। তাহার জাত বা সিফাতকে উদ্দেশ্য করিয়া কুন বলেন নাই। স্রষ্টা ও সৃষ্টি-দুইটি পৃথক অধ্যায়। আল্লাহতায়ালা বলিতেছেন, তিনি গুপ্ত ধনভান্ডার ছিলেন, নিজেকে প্রকাশিত করিতে তাহার ভাল লাগিল, তাই তিনি সৃষ্টি করিলেন। এই হাদীসে কুদসীর আলোকে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলিতেছেন, জাতের নিকট বা আপন হাকীকী সিফাতের নিকট নিজেকে প্রকাশিত করিবার কোনো প্রয়োজন আল্লাহতায়ালার ছিল না। নিজেকে নিজের নিকট পরিচিত কেহ করিতে চায় না। মানুষ পরিচিত হইতে চায় এমন লোকের নিকট যিনি তাহার গুণের সমাদর করিবেন। আল্লাহতায়ালাও এমন কোনো সৃষ্টির কথা মনে রাখিয়া সৃষ্টি করিলেন, যে সৃষ্টি আল্লাহতায়ালার গুণের প্রশংসা করিতে সক্ষম হইবে। মানুষের হকিকত সেই গুণ লাভ করিতে বা আল্লাহতায়ালার গুণ সমূহের প্রশংসা করিতে সক্ষম।

মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের পূর্ব কালের সূফী সাধকগণ ওজুদ বা মানব দেহ লইয়া অনেক চিন্তা ভাবনা করিয়া বলিলেন, মানব দেহ বস্তুতঃ ওয়াজেবুল ওজুদের প্রতিবিম্ব। ওয়াজেবুল ওজুদ জাতের সহিত সম্পর্কযুক্ত। ইহা সকল গুণের উৎপত্তি স্থল। ওজুদ সম্পর্কে বুঝিতে হইলে জানা প্রয়োজন যে, ওজুদের বিপরীত একটি অবস্থা আছে, যাহার নাম আদম বা নীস্তি। ওজুদের অবস্থা আল্লাহর সহিত এবং সৃষ্টির অবস্থা আদমের সহিত জড়িত। ওজুদ চিরস্থায়ী এবং আদম নীস্তি বা ধ্বংসী, তবে আল্লাহতায়ালার ওজুদ সসীম নহে; ইহা গুণের সমষ্টি। গুণের প্রকার আছে কিন্তু তাহা নিরাকার। "ওয়াজেবুল ওজুদ" বলিতে তাই কোনো নির্দিষ্ট আকার বোঝা যায় না, বোঝা যায় সমষ্টিগত কামালাত। এই ওজুদ আল্লাহতায়ালার ক্রিয়াকলাপের ঠিক উপরে অবস্থিত; তাই ইহার সহিত ক্রিয়াকলাপও কিছুটা যুক্ত। যেমন আল্লাহ বলেন, "যখন তুমি ধুলি নিক্ষেপ করিয়াছিলেন, তাহা আমিই করিয়াছিলাম।" আল্লাহতায়ালা বলিতেছেন, আল্লাহতায়ালার ওজুদই ধুলি নিক্ষেপ করিয়াছে। আল্লাহতায়ালার ওজুদ এক্ষেত্রে মানুষের ওজুদের সহিত মিশিয়া গিয়াছে বা লীন হইয়াছে। "নবী করীম (সাঃ) এর হাতে বায়াত হইলে আল্লাহতায়ালার হাতে বায়াত হওয়া হয়"-আল্লাহতায়ালার এই কথাও ঐ রূপ। ইহা আল্লাহতায়ালার আফ্যালে জাতিয়া বা ক্রিয়া গুণের অধ্যায়। এখানে আকারগত বা রূপ গত কোনো একত্ব নাই। তৌহিদে ওজুদীর বা ওজুদের একত্ব বলিতে তাই হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) গুণগত একত্ব বা ক্রিয়াগত একত্বের কথা বলিয়াছেন। আকারগত বা রূপগত একত্বের কথা এক্ষেত্রে আসিতে পারে না।

বিজ্ঞাপন

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলিতেছেন, ইহা বেলায়েতে ছোগরাগত বা সাধারণ ওলীদের অধ্যায়। এই অধ্যায় হইতেই ওলীগণের কারামত প্রকাশিত হইতে থাকে। তাহারা এই স্তরে মোরাকাবার মধ্যে দেখিতে পান যে তাহারা আকার শূন্য হইয়া গিয়াছেন, তখন তাহারা মনে করেন তাহারা আল্লাহতায়ালার মধ্যে লীন হইয়া গিয়াছেন। নিজেকে আকারশূন্য অবস্থায় দেখা যায় বলিয়া হযরত সেরহিন্দ (রাঃ) ছাহেব ইহাকে তৌহিদে শহুদী বলা সমীচীন মনে করিয়াছেন। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলিতেছেন মধ্যে নিঃশেষিত হওয়া নহে; ইহার অর্থ হইল ছালেক আত্মিকভাবে এই যে নিরাকার দেখা: তাহার প্রকৃত ব্যাখ্যা হইতেছে আল্লাহতায়ালার আলমে আরোওয়াহর গুণাগুণ লাভ করেন।

হযরত মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেব তদীয় বক্তব্য আরও সুষ্পষ্ট করিয়া বলিয়াছেন যে, আল্লাহতায়ালার জাত নিজে নিজে মৌজুদ; ইহা কোনো ওজুদ বা গুণ সমষ্টির উপর নির্ভরশীল নহে। আল্লাহতায়ালার সিফাত সমূহ তাহার জাতের সহিত বর্তমান। মুজাদ্দেদ ছাহেবের অনুসারী সূফীগণ বলেন, ওজুদ বা ওয়াজেবুল ওজুদ কিছুই জাত নহে; বড় জোর ওজুদ বা ওয়াজেবুল ওজুদকে জাতের প্রতিবিম্ব বলা যায়। সিফাত ছাড়া কোনো সৃষ্টি অস্তিত্ব পায় না। তাহা হইলে প্রশ্ন থাকে মানুষ কি আল্লাহতায়ালার জাতপাকের নৈকট্য লাভ করিতে পারিবে না? উহার উত্তরে তিনি বলিতেছেন, তাহা সম্ভব হইবে, তবে তাহা স্থুল দেহ বা আলমে আরওয়াহ বা রূহের জগতে নহে। তাহা সম্ভব হাকীকী স্তরে। সেই হকিকতগত নৈকট্য নাফসে মোলহেমার স্তরে ছালেক লাভকরিতে পারেন।

সৃষ্টির ওজুদ ওয়াজেবুল ওজুদের প্রতিবিম্ব। ওজুদের কোনো আকার বা ছুরাত নাই, তাহা আগেই বলা হইয়াছে। ইহার বিপরীতে আদম বা অনস্তিত্ব। ইহারও কোনো ছুরাত নাই। ওজুদের প্রতিবিম্ব তাহার বিপরীত যে আদম তাহাতে প্রতিবিম্বিত হয়। আদমস্থিত ওজুদের প্রতিবিম্ব প্রথমে সূক্ষ্ম ও গোপন সৃষ্টি হিসেবে প্রকাশিত হয়। হযরত ইবনুল আরাবী সৃষ্টিকেই ওজুদের প্রকাশ বলিয়াছেন। হযরত আরাবী (রঃ) ছাহেব সৃষ্টিকেই ওজুদ বলিয়াছেন এবং ওয়াজেবুল ওজুদকেই জাত পাক মনে করিয়াছেন। তাই তিনি সকল কিছুকেই "তিনি" বা "হামাউস্ত” বলিয়া মনে করিয়াছেন। অর্থাৎ প্রকারান্তরে ওয়াজেবুল ওজুদকেই আল্লাহ মনে করিয়াছেন। পক্ষান্তরে হযরত মুজাদ্দেদ ছাহেব ওয়াজেবুল ওজুদকে আল্লাহতায়ালার সৃষ্টিজগৎ সম্পর্কিত কামালাত মনে করিয়াছেন-এই কামালাত দ্বারাই আল্লাহতায়ালা সৃষ্টি জগৎ নিয়ন্ত্রণ করেন। ওয়াজেবুল ওজুদ সৃষ্টির কেন্দ্র। এই ওজুদ সৃষ্টির জন্যমকামালাত সমষ্টি। ওলীগণ সাধনা করিতে করিতে যখন এই ওজুদের নিকট উপনীত হন, তখন ওজুদকেই আল্লাহ বলিয়া ফেলেন-ওজুদেই ফানা হইতে চাহেন। ইহা আলমে আরোওয়াহ জগতে হওয়ায় ইহার নূর তীব্র। তাই সূফীগণ এই প্রতিবিম্বিত নূরের তীব্রতায় আকর্ষিত হন। এই ওজুদে ফানা লাভকেই হযরত মুজাদ্দেদ ছাহেবের পূর্ব কালের সুফীগণ এত্তেহাদীর ফয়েজ মনে করিতেন।

বিজ্ঞাপন

হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) বলেন, "আল্লাহতায়ালা সর্ব প্রথমে আমার নূর সৃষ্টি করেন, তাহা হইতে সকল বস্তু সৃষ্টি করেন। ইহা সৃষ্টি জগতের অধ্যায়। হযরত মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেবের মতে উহাও প্রতিবিম্বের অধ্যায়। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব প্রতিবিম্বকে প্রতিবিম্ব বলিয়া জানিতেন। মানব দেহের ওজুদ অর্থাৎ আদামাত মুক্ত দেহ সত্ত্বা হইল প্রতিবিম্বিত ওজুদ। আল্লাহতায়ালা তাহার শ্রেষ্ট সৃষ্টি মানুষকে তদীয় কামালাত সমূহের সমষ্টির অর্থাৎ ওজুদের প্রতিবিম্ব দান করিয়াছেন। তবে ওজুদের সরাসরি প্রতিবিম্ব হইল বেহেশতী মানুষ। মানুষ সৃষ্টির সময়ে আল্লাহপাক তদীয় ওজুদের প্রতিবিম্বকে প্রথমে ওজুদের বিপরীত আদম বা অনস্তিত্বের মধ্যে দান করিলেন। তাহার পর ওজুদের প্রতিবিম্ব আদামাতে মুড়িয়া আমাদের দান করিলেন। আল্লাহপাক আমাদের ওজুদের প্রতিবিম্ব দান না করিলে আমরা আমাদের দেহগত ওজুদ লাভ করিতাম না।

প্রতিবিম্ব দেখিয়া আসলকে খুঁজিয়া বাহির করা যায়। সেই রূপ ওজুদ হইতে বা আলমে আরোওয়াহর স্তর হইতে হকিকতের জগতে যাওয়া যায়। তবে সেই স্তরে জাগতিক জ্ঞান বা প্রতিবিম্বের জ্ঞানও ধ্বংস প্রাপ্ত হয়।

পাথির্ব মানুষ ওজুদের প্রতিবিম্ব ও আদামাতের মিশ্রণ। এই প্রতিবিম্বিত ওজুদ ইহজগতে প্রকাশিত হয়, যাহা বেলায়েতে ছোগরার স্তর। আদমের ভিতরের প্রতিবিম্বিত রূপ বাহিরে আসিয়া আকার প্রাপ্ত হয়। আদম তখন প্রতিবিম্বিত ওজুদের নিম্নে অবস্থান করে। নীচে পড়িয়া থাকা আদম আর তখন ওজুদকে আদমে পরিণত করিতে পারে না। ওজুদের প্রতিবিম্ব শুভগুণ সমষ্টির প্রতিবিম্ব। আদম হইল অশুভের সমষ্টি। ইহা তখন আর মঙ্গল সমষ্টি বা ওজুদকে বা শুভগুণকে পরিবর্তন করিতে পারে না। আদামাত হইতে যখনই ওজুদ বাহিরে আসে, তাহা আকার প্রাপ্ত হয়। কারণ অস্তিত্ব মানেই আকার।

বিজ্ঞাপন

আল্লাহ বলেন, "মানুষের উপর এমন এক সময় ছিল যাহা প্রকাশযোগ্য নহে।" ইহা সৃষ্টির আকারগত রূপ বা রূহগত রূপ লাভ করিবার পর্বে যখন মানুষের অস্তিত্ব ছিল আল্লাহতায়ারার কল্পনায়। তখন সৃষ্টি ছিল না। ছিলেন শুধুমাত্র আল্লাহ। আল্লাহ বলেন, "আমি গুপ্ত ধনভান্ডার ছিলাম। প্রকাশিত হইতে চাহিলাম। তাই সৃষ্টি জগৎ সৃষ্টি করিলাম।" আল্লাহতায়ালার ধন ভান্ডারের ধন গোপন ছিল, সেই ধন আল্লাহপাক নিজে ও তাহার প্রেম। ঐ হাদীস শরীফের দিকে খেয়াল করিলে দেখা যায়ঃ আল্লাহ বলেন, তিনি গুপ্ত ধন ভান্ডার ছিলেন অতীত কালে; বর্তমানে তাহা হইলে তিনি প্রকাশিত হইয়া গিয়াছেন। সৃষ্টি করিবার পর তাহার ধন আর গোপন নাই। আল্লাহতায়ালার সিফাত, কামালাত বা ওজুদ প্রকাশ করিবার জন্যই এই সৃষ্টি জগৎ। আল্লাহতায়ালার গোপন ধন ভান্ডার তাহার কামালাত বা ওজুদ। ইহার হকিকত আকরাবিয়াতের অধ্যায়গত হাকীকী সিফাত।

এই ওজুদের দুইটি দিক আছে। একটি হাকীকী সিফাত যুক্ত জাতের দিকে। অন্যটি সৃষ্টির বাস্তবায়নের জন্য ক্রিয়া কলাপের দিকে। ওজুদ নামক যে কামালাত তাহা গোপন ছিল বিকাশগত আদামাতের মধ্যে। ওজুদের বিকাশগত অবস্থায় সৃষ্টির কোনো জ্ঞান বিদ্যমান ছিল না। আল্লাহ বলেন, সৃষ্টির পূর্বে শুধুই তাহার গোপন ধন ভান্ডার বা তিনি বা তাহার কামালাত বা ওজুদ ছিল। আর কিছুই ছিল না। বস্তুতঃ কিছুই ছিল 'না'র মধ্যেই সব কিছুই ছিল। হয়তো প্রকাশ ছিল না; তাহা ভিন্ন কথা। ওজুদের মধ্যেই সব গুণ আছে, আর আদামাত মানে নাই। সৃষ্টির মধ্যে নাই কিন্তু ওজুদের মধ্যে আছে। ওজুদের মধ্যে যাহা ছিল আদামাতকে তাহার প্রতিবিম্ব ধার দেয়া হইয়াছে। এই আদম ওজুদে যাইয়া ওজুদকে আদামাত করিতে পারে না। কিন্তু ওজুদের প্রতিবিম্ব আদামাতকে পরিবর্তিত করিতে পারে। তখন ঐ আদামাতের মধ্যেই সৃষ্টির সবগুণ বর্তমান হইয়া যায়। এই সৃষ্টির কাছে ওজুদ গোপন ধন ভান্ডার। সূফীগণ সাধারণ ভাবে ওজুদকেই আল্লাহ মনে করিয়া থাকেন। তৌহিদে ওজুদীবাদী সূফীগণের ইহাই বিশ্বাস যে ওজুদ-ই আল্লাহপাক। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) আফছোস করিয়াছেন যে, "ওজুদকেই আল্লাহপাক বলিয়া উপাসনা করা হইতেছে। অথচ ইহ্য সূক্ষ্ম শেরেক।"

হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) ফরমান, 'তিনি আল্লাহতায়ালার নূর হইতে সৃষ্ট, অন্য সব কিছুই তাহার নূর হইতে সৃষ্ট।' এক নূর হইতে অন্য নূরের সৃষ্টি যেন একবাতি হইতে অন্য বাতি জ্বালানোর মত। নূরে মুহাম্মদী ও আল্লাহতায়ালার নূর পৃথক হইলেও নূরে মুহাম্মদী হইতে সমস্ত সৃষ্ট বস্তুর সৃষ্টি। নূরে মুহাম্মদী তাই সব কিছুরই মূল। নূরে মুহাম্মদী আল্লাহতায়ালার সৃষ্টি জগৎ সম্পর্কিত কামালাত হইতে সৃষ্ট বা ওজুদ হইতে সৃষ্ট। এই হাদীস ওজুদ সম্পর্কে ব্যক্ত। যে ওজুদ নূরে মুহাম্মদীর উৎস তাহাকে জাত বলা যায় না। তাহা হইলে জাত ও নূরে মুহাম্মদী উভয়কেই জাত বলিতে হয়। সে ক্ষেত্রে জাতকে খন্ডিত বলিতে হয়। কিন্তু বস্তুতঃ তাহা নহে, নূরে মুহাম্মদী আল্লাহতায়ালার সৃষ্টি জগৎ সম্পর্কিত সমষ্টিগত কামালাত হইতে সৃষ্ট। এই সমষ্টিগত কামালাত বা ওজুদ তাই জাত নহে। ইহা জাত হইতে গায়েরও নহে-তবে তাহা জাতের অতিরিক্ত। আল্লাহতায়ালার জাত ও সিফাতের সমষ্টিগত অবস্থা বা জাত মায়াস্ সিফাতকেই ওজুদ বলিয়া তরিকতের পীরানে পীরগণ নির্ধারণ করিয়া থাকেন।

বিজ্ঞাপন

ওজুদ যেহেতু জাত মায়াস সিফাতের প্রতিবিম্ব, তাই প্রতিবিম্বিত অবস্থায় শ্রেষ্ঠতম প্রকাশ ও নিদর্শন ওজুদ। তাই মহীউদ্দিন ইবনুল আরাবী ও তাহার মতাবলম্বী সূফীগণ এই ওজুদকেই বা এই ওজুদের তাইয়্যুনকেই লাতাইন বলিয়াছেন। এই লাতাইনের প্রকাশগত নূর এমনই তীব্র যে তাহার সামনে সাধকের বস্তু জগতের জ্ঞান ধ্বংস হইয়া যায়। হযরত ইবনুল আরাবী (রঃ) ছাহেব সিফাতযুক্ত জাতকে নিছক জাত মনে করিয়াছেন। তাহার নিকট সিফাত ও জাত-একে অন্যের যথাযথ। এই ওজুদ যেহেতু তাইয়ূনের অধীন, তাই এই সম্পর্কের জ্ঞান এলমে হুছুলির অর্ন্তগত। কিন্তু ইহা হকিকত জগতের জ্ঞান নহে। ইবনুল আরাবী বস্তুতঃ নূরে মুহাম্মদীকে হকিকতে মুহাম্মদী মনে করিয়াছেন। হকিকতে মুহাম্মদী হইল আল্লাহতায়ালার সৃষ্টি সম্পর্কীয় নিখুঁত কল্পনা। পক্ষান্তরে নূরে মুহাম্মদী হইল সেই সৃষ্টির নূর গত বা রূহগত রূপ। কল্পনা ও বাস্তব সষ্টির মধ্যে যে পার্থক্য ও ফারাক থাকিয়া যায়, নুরে মুহাম্মদী ও হকিকতে মুহাম্মদীর মধ্যে সেই পার্থক্য বিদ্যমান। নূরে মুহাম্মদী হইল সমস্ত সৃষ্টির উৎস। আর হকিকতে মুহাম্মদী হইল সৃষ্টি সম্পর্কীয় খোদাতায়ালার নিখুঁত কল্পনার রূপ। নূরে মুহাম্মদী যেমন সৃষ্টির উৎস, তেমনি ইহা সৃষ্টি জগৎ সম্পর্কিত জ্ঞানেরও উৎস। হাদীস শরীফে আছে, আল্লাহতায়ালা প্রথমে আমার নূর ও আমার জ্ঞান সৃষ্টি করেন। এই নূর বা জ্ঞান সবই সৃষ্টি জগতের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু আল্লাহতায়ালার হুকুম যেমন ধ্বংসী নহে, তেমনি তাহার কল্পনাও ধ্বংসী নহে। ছালেক স্কুল জগৎ হইতে ছায়ের করিয়া নূরে মুহাম্মদীর নূরের সাগরে নিপতিত হইলে তাহার পার্থিব জ্ঞান কিছু সময়ের জন্য হইলেও হারাইয়া ফেলেন। হযরত ইবনুল আরাবী (রঃ) এর মতে জাতের সহিত সিফাত মিশ্রিত কখনও এজমালীভাবে কখনও তফশিলীভাবে। যে ওজুদের সহিত এলেম সিফাত বিদ্যমান, হযরত ইবনুল আরাবী (রঃ) ছাহেব তাহাকে তাইয়্যুনে আউয়ালে ওজুদী বলিয়াছেন। এই তাইয়্যুনে আউয়ালে ওজুদীর কেন্দ্র হইল তাইয়্যুনে এলমী-তাহাই নূরে মুহাম্মদীর কেন্দ্রস্থল কিন্তু তাহা হকিকতে মুহাম্মদী নয়। কারণ হকিকত সৃষ্টির অর্ন্তগত নয়। তাহা সৃষ্টির পূর্ব অধ্যায়। তাইয়্যুনে এলমীও সীমার অর্ন্তগত বা সৃষ্টির অর্ন্তগত। কিন্তু তৌহিদে ওজুদীর অধ্যায়ে সূফীগণ যখন পৌঁছান, তখন শরীয়ত খেলাফী অনেক কথা তাহারা বলিয়া ফেলেন। এই কারণে তাহারা ওজুদকে জাত পাক ও তৌহিদে আউয়ালে ওজুদীকে লাতাইন বলেন। ইহা আসল হকিকত নয়। হযরত ইবনুল আরাবী (রঃ) উচ্চস্তরের সাধক হইলেও হকিকত বিচার ক্ষেত্রে তিনি সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে পারেন নাই।

বস্তুতঃ ব্যাপার হইল "ওজুদ আয়নে ওয়াজেবুল ওজুদ হইলেও তাহা তাইয়্যুনের অধীন থাকিয়া যায়। তাই কোনো তাইয়্যুনে ওজুদের সহিত অহদাতের বদলে তাইয়্যুন মুক্ত ওজুদের সহিত তৌহিদ বুঝিতে হইবে; তাহাই তাইয়্যুনে ওজুদের হকিকত। তাহা না হইলে ভুল ভ্রান্তির সম্ভাবনা থাকিয়া যায়। এই তাইয়্যুনে ওজুদীর হকিকত হইল তাইয়্যুন মুক্ত ওজুদ। সেই ওজুদের সহিত অহদাত প্রাপ্তিই হকিকতে তৌহিদে ওজুদীর নিগুঢ় অর্থ। তাইয়্যুনের অধীনতা মুক্ত ওয়াজেবুল ওজুদ হইল লাতাইনের জাত পাক। পক্ষান্তরে ইবনুল আরাবী ও তদানুসারী সুফীগণের ওয়াজেবুল ওজুদ হইল সমষ্টিগত সিফাতি কামালাতের সুদূর নিম্নবর্তী প্রতিবিম্ব। ইহাও অতীব মর্যাদা সম্পন্ন; তবে দুইয়ের পার্থক্য সম্পর্কে জ্ঞান অবশ্যই থাকা প্রয়োজন। সূফীগণ বস্তুজগত হইতে যাত্রা শুরু করিয়া যখন আলমে আরোওয়াহর স্তরে পৌঁছান, তখন তাহার উদ্দেশ্যস্থল যে আল্লাহ, তাহার সৃষ্টি জগত সম্পর্কিত কামালাত হিসেবে যাহা ওজুদ; তাহাতেই তাহারা আত্ম বিলোপ করিতে চাহেন। জাত পাকের সহিত আর সম্পর্ক করিতে পারেন না। হাজার হাজার মানুষ ঐ জগতে পৌঁছাইয়া মর্যাদাবান হইয়াছেন, যাহাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, "ওলী আল্লাহদের দুঃখীত বা গমগীন হইবার কিছুই নাই।" (সূরা ইউনুসঃ ৬২)

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের অনুসারীগণ বলেন, তৌহিদে ওজুদী হইল তৌহিদের ছুরাত। ইহার হকিকত আরও বহু উপরে। ঈমান আনার আবশ্যকতা ও যৌক্তিকতা এবং তাহার দর্শন ও হকিকত বর্তমান আছে তৌহিদে ওজুদীর মধ্যে। এই স্তরে "নেছইয়ান মা সাওয়া আল্লাহ" অর্থাৎ-'আল্লাহ ছাড়া সবকিছু ভুলিয়া যাওয়া'-এর হকিকত অনুধাবনের আবশ্যকতা রহিয়াছে।

বিজ্ঞাপন

ওজুদের সহিত যে বিলীনতা তাহাকে সূফী সাধকগণ "মোর্তবা জমা" বলিয়া থাকেন। ইহার পর রহিয়াছে "ফারাক বাদাল জমা"-যে অবস্থায় ছালেক আল্লাহপাকের জাত ও ওজুদের মধ্যে পার্থক্য বুঝিতে পারেন। শরীয়তের হকিকতে বা তৌহিদে ওজুদীর হকিকতে আসিলে তৌহিদে মুহাম্মদী আসিয়া যায়। তৌহিদে হাকীকীতে আসিলে বোঝা যায়; অন্যান্য ওলীদের ভাষায় যাহা তৌহিদে ওজুদী তাহা প্রকৃত পক্ষে হইল তৌহিদে শহুদী।

তৌহিদে ওজুদীর সহিত সূরা এখলাস-যে সূরাতে বলা হইয়াছে আল্লাহ এক ও অমুখাপেক্ষী, কাহারও তিনি জনক নহেন, কাহারও দ্বারা জাত নহেন এবং পুনরায় বলা হইয়াছে আল্লাহ এক ও অমুখাপেক্ষী, সেই সূরার সহিত বিশেষ যোগ রহিয়াছে। সূফীগণ সেই আল্লাহতায়ালার সাধনাই করেন, যে আল্লাহতায়ালা এক, যিনি কাহারও জাত নহেন বা জনক নহেন। সূরা এখলাস শুরু হইয়াছে "বল" শব্দ দ্বারা। শব্দটি বলা হইয়াছে নবী (সাঃ) কে উদ্দেশ্য করিয়া। হযরত নবী করীম (সাঃ) এই অমুখাপেক্ষী আল্লাহতায়ালার জ্ঞান ও বুঝ লাভ করিয়াছিলেন। এই বুঝ লাভের পর আল্লাহ হইতে নবী করীম (সাঃ) আদেশ প্রাপ্ত হইয়াছিলেন যেন তিনি এই এক ও অমুখাপেক্ষী আল্লাহতায়ালার জ্ঞান সকলের মধ্যে প্রচার করেন। তাই সূরা এখলাস নবুয়ত ও প্রচারের হকিকতের সহিত বিশেষভাবে সম্পর্কযুক্ত। তবে অন্যকে বলিবার মত যোগ্যতা অর্জন করা খুবই কঠিন কথা।

মানুষের ভিতর ও বাহির-এই দুই মিলিয়া মানুষ। ভিতর ও বাহির-এই দুইয়ের সমষ্টি লইয়া মানুষ। দেহকে বাদ দিয়া ভিতর সব সময় বোঝা যায় না। ভিতর ও বাহির-এই দুইটি পরস্পর বিপরীত শব্দ। কিন্তু দেহের বাহিরে দেখিলে অনেক সময় ভিতরের খবর পাওয়া যায়। যিনি ইহা দর্শন লাভ করিতে পারেন, তিনি একই সময়ে ভিতরে ও বাহিরে দরশন লাভ করিতে পারেন। কেউ সুন্দর কোনো দৃশ্য বা বস্তু দেখিয়া মুগ্ধ হইলে বোঝা যায় মুখে প্রকাশিত মনের ভাব দ্বারা। কিন্তু যেখানে রূপ বা আকার নাই, সে স্থানে ভিতর-বাহির, অতীত-বর্তমান, প্রথম-শেষ এক এক রূপ বোঝা যাইবে। আল্লাহতায়ালার কোনো আকার নাই। তবুও তাহাকে আমরা এক বলিয়া জানি, বুঝি ও বিশ্বাস করি। এই এক-এর নিরাকারত্ব বোঝাবুঝির হকিকতই সূরা এখলাসের হকিকত।

বিজ্ঞাপন

সাধারণভাবে আমরা এক, দুই, তিন সংখ্যার সহিত পরিচিত। সংখ্যাতত্ত্ববিদগণ জানেন-এক দুই তিন যাহাই হউক তাহাই "এক"-এরই পুনরাবৃত্তি মাত্র। সূরা এখলাসে যে এক, তাহা অমুখাপেক্ষী এক, কিন্তু ঐ এক সংখ্যাকে বুঝিতে হইলে, তাহার মূল্য জানিতে হইলে বা প্রমাণ করিতে হইলে পরবর্তী সংখ্যাগুলিরও প্রয়োজন। পৃথিবীতে এক দুই তিন এর জন্য তাহার উৎস আবশ্যক। আল্লাহ নিরাকার ও গায়ের এবং এক তথা আহাদ। তাই এখানে আল্লাহর পরিচিতি সিফাতের মাধ্যমে। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) যখন ইসলাম প্রচার করেন তখন কাবা ঘরে বহু মূর্তি রক্ষিত ছিল। আল্লাহ রাসূলে পাক (সাঃ) কে বলিলেন, কাফেরদের বলিয়া দিন, 'আল্লাহ এক।' মক্কার কাবা ঘরে যেমন বহু মূর্তির আবাস তেমনি মানুষের জীব আত্মা বা নাফস ও কালব যদি এক আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো কিছুকে মাকছুদ মনে করে তাহাও প্রকৃত পক্ষে বহু খোদা বা বহু উপাস্যের উপাসনার সামিল হইয়া যায়। তাই কালবকে আল্লাহতায়ালা ব্যতীত অন্য সকল কিছু হইতে পাক করাই প্রকৃত পক্ষে সূরা এখলাসের হকিকত লাভ। আল্লাহতায়ালা এক্ষেত্রে 'হুয়া' শব্দ দ্বারা তদীয় ওজুদকে ইংগিত করিয়াছেন। কিন্তু যাহার জন্য এই আদেশ তিনি মানুষ বা সৃষ্টি। তাহার উৎস জাত হইলেও তাহার রূপগত আবির্ভাব সিফাতের মাধ্যমে। সিফাতের মাধ্যমেই তিনি আল্লাহতায়ালার জাতকে অনুধাবন করিতে সহজ বোধ করেন। তবে আল্লাহতায়ালার সিফাত ভিন্ন হওয়ার অর্থ রহিম, করীম, খালেক এই সিফাতি নামের ভিন্নতা; ইহার দ্বারা আল্লাহতায়ালার পৃথক পৃথক অস্তিত্ব বুঝায় না। ইহা এক আল্লাহতায়ালার গুণ সমূহের ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ। তাই সিফাত সমূহের নীচে থাকিয়াই বা সম্মুখে রাখিয়াই আল্লাহকে এক জানিতে হয়। এই এক আল্লাহ অবশ্যই আল্লাহতায়ালার জাতের সর্বনাম বা "হু' বা 'হুয়া'। এই আল্লাহ অবশ্যই ওজুদ; তাহারই উপর ঈমান আনিতে হয়। তিনিই হইলেন আল্লাহ যিনি ছাড়া উপাস্য নাই। তিনিই বা হুয়াই প্রকাশ্য ও গোপন; আদি ও অন্ত।

এই "হুয়া"ই আল্লাহতায়ালার নিম্নবর্তী সর্বনাম বা ওজুদ। সৃষ্টির প্রথমেও তিনি, শেষেও তিনি। এই সর্বনামের নীচেই সৃষ্টি অধ্যায়ে মানুষ বর্তমান। ছালেক যখন আল্লাহতায়ালার নৈকট্য অভিলাষী হন,

তিনি "আল্লাহু” বলিয়া জেকের করেন। আল্লাহ শব্দের সহিত 'হু' বলিবার অর্থ হইল তিনি মনে করেন, "হু" বা হুয়াই বর্তমান। ছালেকের "আল্লাহু” সর্বনাম যাহা বিশেষ্যের অবিকল। কিন্তু বিশেষ্যের অবিকল হইলেও তাহা আসলের যথাযথ নয়।

ইহা আসলের আংশিক অবস্থা। যেমন "হুয়াজ জাহেরো, হুয়াল বাতেনো" ইত্যাদি। তাই এজাফী সিফাত সমূহ মানুষের মনের বিশ্বাসে আংশিকতার সমস্যা সৃষ্টি করিতে পারে, তাই প্রত্যেক এজাফী সিফাতের অসীমতার মধ্যস্থলে তাজাল্লীয়াতে বরকী" আসিয়া এক সিফাত হইতে সাধককে অন্য সিফাতে উন্নীত করে। উভয় সিফাতের মাধ্যমে সংখ্যাভিত্তিক সীমা বোধের আশংকা থাকিয়া যায়, সেই সমস্যা মিটাইবার জন্য এজাফী সিফাত সমূহ সীমাহীন ভাবে পৃথক পৃথক ভাবে পরিচিত হইতে থাকে। ইহাই "হুয়ার" পরিচয়

এই "হুয়া" জাতের নিকটতর বলিয়া ইহাকে নৈকট্যের মাকাম বলা হইয়াছে। যেমন আল্লাহ বলেন 'নিশ্চয়ই আমি তাহার নিকট বর্তমান।" এই নৈকট্য হইল হুয়ার নৈকট্য, সিফাতে এজাফিয়ার নৈকট্য বা ওজুদের নৈকট্য। এই ওজুদের নিকটতর অবস্থার পরে অর এক মারেফাত আছে যাহা হাকীকী সিফাতগত নিকটতম অধ্যায়, যে সিফাত সমূহ জাতকে কেন্দ্র করিয়া আকরাবিয়াত অধ্যায়ে বর্তমান।

তৌহিদে ওজুদী অধ্যায় প্রকৃত পক্ষে আত্মবিনাশের অধ্যায়। তৌহিদে ওজুদীর অধ্যায়ে ছালেক নিজেকে ওজুদের মধ্যে বিলীন করিয়া দিয়া আল্লাহতায়ালাকে বুঝিতে চেষ্টা করেন। আদামাত হইতে মুক্তিই হইল ওজুদের প্রকাশ-তাই আদামাতের বিনাশই হইল তৌহিদে ওজুদীর আসল কথা। আল্লাহতায়ালার ওজুদকে প্রকাশ করিতে হইলে তাহা প্রতিবিম্বিত আকারেই হউক বা অন্য কোনো প্রকারেই হউক অনস্তিত্বের আবশ্যক, কারণ এক ওজুদের উপর আর এক ওজুদ রাখা যায় না। এই জন্য আল্লাহতায়ালার সর্বব্যাপী ওজুদ প্রকাশ হইতে হইলে সর্বব্যাপী আদমের একান্ত আবশ্যক। তাই আদমই ওজুদের প্রকাশস্থল। তাই তরিকতের পীরানে পীরগণ বলিতেছেন, যে ওজুদ অনস্তিত্বের উপর প্রকাশিত, তাহাই "হুয়াজ জাহেরো।" ওজুদ ও আল্লাহ এক নয়। ওজুদ আল্লাহর কামালাত। ওজুব নামে আল্লাহতায়ালার আর এক কামালাত আছে। এই 'ওজুদ” ও "ওজুব"-দুইটিকে পাশা পাশি রাখিয়া বুঝিতে হয়। আল্লাহপাক গুণ, শান, দর্শন, অনুধাবন-সকল কিছু হইতেই দূরে। তাই সৃষ্টির কোনো কিছুই তাহার যোগ্য ইবাদত করিতে পারে না। হযরত মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেব বলেন, আল্লাহতায়ালার জাত ছাড়াও হায়াত, এলেম, কুদরত, এরাদত, ছামাওয়াত, বাছারত, কালাম ও তাকবীন নামে আরও আটটি হাকীকী বা অবিনাশী গুণ আছে। এই আটটি গুণের প্রতিবিম্বের সমষ্টি হইল ওজুদ। ইহার বিপরীত হইল আদামত বা অশুভ।

তৌহিদে ওজুদীবাদী সূফী তাহার সম্মুখে যে কোনো বস্তুকেই দেখেন না কেন, তাহা 'নাফী' করিয়া পরিত্যাগ করেন। এই কার্যে যখন তিনি সফল হন, সব বস্তুকে পরিত্যাগ করিতে যখন তিনি সক্ষম হন, তখন তিনি আল্লাহতায়ালার ওজুদে বিশ্বাসী হন। আল্লাহতায়ালার ওজুদই একমাত্র ওজুদ। সেই ওজদুই একামাত্র উপাস্য বলিয়া সাধক তাহার সাধনার পর্যায়ে অনুধাবন করিয়া থাকেন। এই ওজুদই ওয়াজেবুল ওজুদ। এই ওজুদেই তিনি আত্মবিলীন হন বা আত্মবিলীন হইতে চাহেন।

প্রকৃত তত্ত্ব হইল, হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের পূর্বের যুগের সাধকদের নিকট আল্লাহতায়ালা তাহার সিফাতে এজাফিয়ার জ্ঞান ব্যতীত হাকীকী ও জাতি নূরের জ্ঞান প্রকাশ করেন নাই। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর পর আল্লাহতায়ালা হযরত মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেবের নিকটই আল্লাহতায়ালার বিস্তারিত জ্ঞান হাকীকী ও জাতি নূরের মাধ্যমে দান করেন। তাই হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তাহার পূর্ববর্তী কালের সাধকগণ আল্লাহতায়ালার যে জ্ঞান লাভকরিয়াছেন, সেই জ্ঞানকে মহান আল্লাহতায়ালার মারেফাত লাভের পথের ধুলা বালি বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। তাই হযরত মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেবের পীর হযরত বাকীবিল্লাহ বলিয়াছেন, "আসমানের নীচে হযরত মুজাদ্দেদ (রাঃ) এর মত এত বড় ওলী আর আসেন নাই। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এবং মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব-এই দুই জনের পীর স্বয়ং আল্লাহ পাক।" হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) এই কথা দ্বারা ইহাই বোঝাইতে চাহিয়াছেন যে, আল্লাহতায়ালার মারেফাত বিস্তারিত ভাবে হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এবং হযরত মুজাদ্দেদ (রাঃ) এর নিকটই প্রকাশিত হইয়াছিল। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) এর যুগের পূর্ব কালের সূফীগণের নিকট তাহা ঐরূপ বিস্তারিত ভাবে প্রকাশিত হয় নাই।

তাই হযরত বাকী বিল্লাহ (রঃ) ছাহেব পীর হইয়াও স্বীয় মুরীদ হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবকেই নিজ পীরের মত ইজ্জত করিয়াছেন। মুজাদ্দেদ ছাহেবের নিকট হইতে তদীয় পীর হযরত বাকীবিল্লাহ আল্লাহতায়ালার জ্ঞান হাছিল করিতে চেষ্টা করিয়াছেন।

মারেফাততত্ত্বজ্ঞান আল্লাহতায়ালার খাছ দয়ার দান, তিনি যাহাকে ইচ্ছা দান করেন। ইহা লাভের জন্য যেমন আল্লাহতায়ালার ইচ্ছাও প্রয়োজন, তেমনি ছালেকের সাধনাও প্রয়োজন। আল্লাহতায়ালার দয়া লাভের জন্য সাধনা প্রয়োজন। কিন্তু আল্লাহতায়ালার দয়া ও ইচ্ছাই চূড়ান্ত। তাই সাধক হিসেবে পূর্ব কালের সাধকগণকে ছোট করিয়া দেখিলে চলিবে না। হযরত মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেবের পূর্ব পর্যন্ত হযরত মহীউদ্দিন ইবনুল আরাবী (রঃ) ছাহেব, হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব, হযরত মাওলানা জালাল উদ্দিন কুমী (রঃ) ছাহেব, বিস্তারিত না হইলেও আল্লাহতায়ালার মারেফাত যতটুকু লাভ করিয়াছেন, সেই মারেফাত জ্ঞানকে ভিত্তি করিয়াই আল্লাহতায়ালার পথে নিজ নিজ যুগের মানব কুলকে হেদায়েত করিয়াছেন। হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ), হযরত মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমী (রঃ) ছাহেব বা হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের সূফী সাধনার ক্ষেত্রে বা ইসলামী দর্শনের ক্ষেত্রে অবদান শত শত বৎসর ধরিয়া খোদাতত্ত্বজ্ঞান পিপাসু মানুষের নিকট সমাদৃত হইয়াছে। তাহারা খোদাতত্ত্ব জ্ঞান পিপাসু মানুষের মনের মণি কোঠায় অতীব শ্রদ্ধার আসন লাভ করিয়াছেন। পক্ষান্তরে হযরত মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেব বিস্তারিত মারেফাত জ্ঞান লাভকরিয়াছেন। ইহা সত্য। কিন্তু ঐ অতীব উচ্চতর জ্ঞান সকল সাধক লাভ করিতে পারেন নাই। তাই তাহাদের অনেকেই হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের মারেফাততত্ত্ব পরিপূর্ণ উপলব্ধি করিতে পারেন নাই। তাই সর্ব স্তরের মানুষ বা সাধারণ মানুষ সূফীতত্ত্বজ্ঞানী হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব, হযরত খাজা আজমেরী (রঃ) ছাহেব বা হযরত জালাল উদ্দিন রূমী (রঃ) ছাহেবের খোদাতত্ত্ব সাধনার জ্ঞান বা মারেফাততত্ত্ব যত খানি সহজে বুঝিতে পারেন, হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রঃ) ছাহেবের মারেফাততত্ত্ব ততখানি সহজে বুঝিতে পারেন না। এই জন্য সূফীতত্ত্ব সাধকগণ হযরত খাজা আজমেরী (রঃ) ছাহেব, হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব, হযরত মাওলানা জালাল উদ্দিন রূমী (রঃ) ছাহেব প্রভৃতি সাধকগণের সাধনা, কারামতি ও খোদাতত্ত্বজ্ঞান সম্বন্ধে তাহারা যে ধারণা দিয়া গিয়াছেন, তাহা সাধারণ মানুষ যতখানি চর্চা করেন, হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের মারেফাত লইয়া ততখানি চর্চা করেন না। হযরত মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেবের মারেফাততত্ত্ব লইয়া কম আলোচনা গবেষণার কারণ, হযরত মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেবের জ্ঞানের সংকীর্ণতা নয়; বিশালতা ও গভীরতা-যাহা অতি উচ্চ স্তরের সাধক ব্যতীত উপলব্ধি করিতে পারেন না।

হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) এর মারেফাতের পরিপূর্ণ জ্ঞান আল্লাহতায়ালার দয়ায় তিনিই পুনরুদ্ধার করিতে পারিয়াছেন। আর কেহ পারেন নাই।

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের খোদাতত্ত্বজ্ঞান সাধনার বা মারেফাততত্ত্ব জ্ঞানের পরিপূর্ণ উত্তরাধিকারী বর্তমান জামানার মুজাদ্দেদ হযরত মাওলানা খাজাবাবা শাহসূফী এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব। তিনি যে পরিপূর্ণ খোদাতত্ত্বজ্ঞান লাভ করিয়াছিলেন, ইহা উপলব্ধি করিবার জ্ঞানই বা কয় জনের? যিনি বা যাহারা এই তত্ত্ব জ্ঞান লাভ করেন নাই, তাহারা এই জ্ঞানের স্বাদও বুঝিতে পারিবেন না। আমার দয়ালপীর, কেবলায়ে কাবা, হযরত এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব সারা জীবন পাবনা জেলার এনায়েতপুরের মত একটি ছোট্ট গ্রামে কাটাইয়া গেলেন, কিন্তু সর্বস্তরের মানুষ তাঁহাকে চিনিতে পারে নাই। খোদাতত্ত্বজ্ঞানের যে ভেদ তিনি লাভ করিয়াছিলেন, তাহাও কে কতটুকুই বা বুঝিল?

তৌহিদে ওজুদী, তৌহিদে শহুদী বা তৌহিদে হাকীকীর সমুদয় মারেফাত হযরত মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেবের নেছবত হইতে আমার দয়াল পীর কেবলাজান হুজুরের অর্জন ছিল। পীরে কামেল ব্যতীত খোদাতত্ত্বজ্ঞান লাভের দ্বিতীয় কোনো পথ নাই। আমার দয়াল পীর কেবলাজান হুজুর বর্তমান জামানায়, হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের মারেফাত ও খোদাতত্ত্ব জ্ঞানের পরিপূর্ণ অধিকারী।

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব যে রূপ আল্লাহতায়ালার পরিপূর্ণ মারেফাত জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন, সেই মারেফাত জ্ঞান যদি তোমরা লাভ করিতে চাও, তাহা হইলে আমার দয়ালপীর কেবলাজান হুজুরের পাক দেলে দেল মেশাও, তাহার দেল সাগরে ডুব দাও, তাহার পরিপূর্ণ মহব্বত ও দয়া অর্জন করিবার জন্য চেষ্টা কর। তদীয় পাক দেল মোবারক হইতে আল্লাহতায়ালার মারেফাত জ্ঞানের তাজাল্লী তোমরা লাভ করিতে পারিবে। আল্লাহ তোমাদের দয়া করুন। আমীন!

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD