Logo

‘ছায়েরে এলাল্লাহ’ সম্পর্কে আলোচনা, আমানতের পরিচয়

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ২২:৩৮
‘ছায়েরে এলাল্লাহ’ সম্পর্কে আলোচনা, আমানতের পরিচয়
ছবি: সংগৃহীত

হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘তৌহিদে ওজুদী ও তৌহিদে শহুদী এবং ছায়েরে আফাক ও আনফা’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ "ছায়েরে এলাল্লাহ” সম্পর্কে আলোচনা, আমানতের পরিচয়, দেল ও দেহে কলেমা প্রতিষ্ঠার উপায়, দেহের প্রতি তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে কলেমা অংকনে পীরের ভূমিকা, কালবী জ্ঞানের ব্যাপকতা, আল্লাহপাকের নৈকট্য অর্জনের ক্ষেত্রে কালব, রূহ ও নাফসের ভূমিকা ইত্যাদি সম্পর্কীয় আলোচনাঃ

বিজ্ঞাপন

ছায়ের অর্থ-আত্মিক ভ্রমণ। আত্মিক ভ্রমণ সূফীগণ করিয়া থাকেন তিনটি উদ্দেশ্যে-

➡ আল্লাহতায়ালাকে পাইবার জন্য।

➡ আল্লাহতায়ালার নাম, গুণ, শান, শয়ুনাতের জ্ঞান লাভ ও সেই সব গুণে গুণান্বিত হওয়ার জন্য।

বিজ্ঞাপন

➡ সমগ্র সৃষ্টি জগত সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করিবার জন্য।ছায়েরে এলাল্লাহ হইল আল্লাহ অভিমুখে আত্মিক ছায়ের।

এই পৃথিবী হইতে আল্লাহতায়ালাকে পাইতে হইলে প্রথমে মানুষকে তাহার আত্মার জগতের গুণ ও জ্ঞান ফিরিয়া পাইতে হয়। পরে হুকুমের জগতের গুণ ও জ্ঞান ফিরিয়া পাইতে হয়। আত্মার জগত হইল আলমে আরোওয়াহ। আর হুকুমের জগত হইল আলমে আমর।

এই দুই স্তরের গুণ ফিরিয়া পাইলেই মানুষ আল্লাহতায়ালাকে পাইতে পারে ও তাহার সহিত সম্বন্ধযুক্ত হইতে পারে। ছায়েরে এল্লাল্লাহ বা আল্লাহতায়ালা অভিমুখে আত্মিক ভ্রমণের উদ্দেশ্য হইল উক্ত দুইটি গুণ অর্জন। তবে আল্লাহতায়ালার নাম, গুণ, শান, শয়ুনাত ও সৃষ্টি জগতের জ্ঞান লাভ না হইলে আল্লাহতায়ালা সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান লাভ হয় না। পার্থিব জীবনে আল্লাহতায়ালাকে সন্ধান করিবার গুরুত্ব বুঝিবার জন্য মানুষের জন্ম ইতিহাস জানা প্রয়োজন। মানুষ কোথা হইতে এই পৃথিবীতে আসিল, কোথায়ই বা সে যাইবে, সে তাহা জানে না। তবে কুরআন মজীদে আল্লাহপাক মানব সৃষ্টির ইতিহাস ও ভবিষ্যত বর্ণনা করিয়াছেন। মানুষের জন্ম ইতিহাস ও ভবিষ্যত সম্পর্কে হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর অনেক হাদীস রহিয়াছে। মানুষের এই ইতিহাস বর্ণনা করিতে যাইয়া হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) বলিয়াছেন, সৃষ্টির আদি হইতে কেয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ এই পৃথিবীতে আসিবে, তাহাদের আত্মা বা রূহকে একই সাথে একটি বিশেষ স্থানে সমবেত করা হইয়াছিল। সেই স্থানকে আলমে আরোওয়াহ বলা হয়। "আলমে আরোওয়াহ" এর অর্থ হইল আত্মার জগৎ। মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় আল্লাহতায়ালা মানুষের আত্মা বা রূহ আলমে আরোওয়াহ বা আত্মার জগত হইতে আনিয়া দেহে সন্নিবিষ্ট করেন।

বিজ্ঞাপন

কুরআন মজীদে আল্লাহপাক ফরমান, আত্মার জগতে বা আলমে আরোওয়াহতে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের পরে মানুষকে এই পৃথিবীতে পাঠান হইয়াছে। আল্লাহপাক সেই ঘটনাকে এই রূপে উল্লেখ করিয়াছেনঃ আদমকে সৃষ্টি করার পর তাহার এবং তাহার পরবর্তী প্রতি মানবের পৃষ্ঠদেশ হইতে তৎপরবর্তী মানব সন্তানের রূহকে পরম করুনাময় প্রভু আল্লাহপাক বাহির করিয়াছেন। অতঃপর তাহাদের একটি বিশেষ অংগীকারে আবদ্ধ করান। আল্লাহপাক তাহাদের জিজ্ঞাসা করেন, "আমি কি তোমাদের প্রভু নই"? এই প্রশ্নের উত্তরে সকলেই বলিয়াছিল, "বেশখ, আপনিই আমাদের প্রভু"। আল্লাহপাক কুরআন মজীদে সেই ঘটনার বর্ণনা যেমন দিয়াছেন, তেমনি স্মরণ করাইয়া দিয়াছেন, "তোমাদের ঐ ঘটনা ও অংগীকার স্মরণ করাইয়া দেওয়া হইল, যেন তোমরা জাগতিক জীবনে সেই ওয়াদা ভংগ করিলে কেয়ামতের দিনে বলিতে না পার, "আমরাতো অংগীকারের কথা ভুলিয়া গিয়াছিলাম"।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস হইতে উদ্ধৃত হাদীস শরীফে হযরত রাসূলে মকবুল (সাঃ) ফরমান, "অতি সূক্ষ্ম ও ছোট আকৃতিতে সকল মানবাত্মাকে আল্লাহপাক বাহির করিয়া এক জায়গায় সমাবেশ করেন। অতঃপর মুখোমুখি তাহাদের নিকট হইতে অংগীকার গ্রহণ করেন, "আমি কি তোমাদের প্রভু নই"? সকলেই উক্ত প্রশ্নের উত্তরে বলিয়াছেন, “বালা”-বেশখ, আপনিই আমাদের প্রভু।

মানবাত্মা সমূহ উক্ত অংগীকার গ্রহণ করিবার পর আল্লাহ বলিলেন, "সাত আসমান, সাত জমিন এবং তোমাদের সকলের পিতা আদমকে তোমাদের এই প্রতিজ্ঞার সাক্ষী বানাইলাম। কেয়ামতের দিনে তোমরা বলিতে পারিবে না যে, এই অংগীকার তোমরা ভুলিয়া গিয়াছিলে। আল্লাহতায়ালা ঐ শপথ অনুষ্ঠানে নির্দেশ দান করিলেন, "তোমরা কেহ আমার শরিক করিও না"।

বিজ্ঞাপন

উক্ত শপথ অনুষ্ঠানের পূর্বে আলমে আরোওয়াহর জগতে আরও একটি অনুষ্ঠান হইয়াছিল-আল্লাহপাক তাহার হোব্ব বা প্রেম প্রকাশের জন্য বিশ্ব জগৎ সৃষ্টি করিয়াছেন। বিশ্ব জগৎ সৃষ্টি করার পর আল্লাহপাক আসমান, জমিন, সাগর, পর্বতকে জিজ্ঞাসা করিলেন, কেহ তাহার প্রেম বা হোব্ব ও আমানত গ্রহণ করিবে কি না? আসমান-জমিন সকল কিছুই আল্লাহতায়ালার প্রেমের আমানত গ্রহণ করিতে অস্বীকার করিল। কবির ভাষায়,

"তুলিতে নারিল আসমান আমানত ভার

পড়িল ন্যাস্ততার দাও ভাগে পাগলার।"

বিজ্ঞাপন

আরশের উপর রক্ষিত "হোব্ব" বা প্রেম আল্লাহতায়ালার নিকট আরজ করিল, তাহা হইলে কি তাহার জন্ম বৃথা যাইবে? আল্লাহ তাহাকে জানাইলেন, তাহা হইবে না। আল্লাহ তখন আদম ও তদীয় সন্তানদের জিজ্ঞাসা করিলেন, তাহারা আল্লাহতায়ালার প্রেমের আমানত গ্রহণ করিতে রাজী আছে কিনা? মানুষ আল্লাহতায়ালার প্রেমের আমানত গ্রহণের প্রস্তাবে সম্মতি প্রকাশ করিল।

মানুষ যে আল্লাহতায়ালার প্রেমের আমানত গ্রহণ করিবার দায়িত্ব গ্রহণ করিল, ইহাতে সকলেই অবাক হইল। সকলেই ইহাকে মূর্খতা মনে করিল। আল্লাহপাকও কুরআন মজীদে ফরমান,

انَّا عَرَضْنَا الأَمَانَةَ عَلَى السَّمَوتِ وَ الْأَرْضِ وَالْجِبَالِ فَابَيْنَ أَنْ يَحْمِلْنَهَا وَ اَشْفَقْنَ مِنْهَا وَ حَمَلَهَا الإِنْسَانُ طَ إِنَّهُ كَانَ ظَلُومًا جَهُولاً -

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ-"আমি এই আমানতকে পাহাড়, আসমান, জমীনের নিকট রাখিলাম। তাহারা উহা বহনে অস্বীকার করিল এবং উহা হইতে ভীত হইল। মানুষ উহাকে উঠাইয়া লইল। নিশ্চয়ই ইহারা অত্যচারী ও মূর্খ”। (সূরা আহযাবঃ ৭২)

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলিয়াছেন, আল্লাহপাক যদিও তাহার আমানতের দায়িত্বভার গ্রহণ করিবার জন্য মানুষকে মূর্খ ও নিজের উপর জুলুমকারী বলিয়াছেন, তথাপিও তাহার প্রেমের মূর্গ বহন করিবার যোগ্যতাও মানুষকে দান করিয়াছেন। আল্লাহপাক বলিতেছেন, "ইন্নাল্লাহা খালাকা আদামা আলা ছরাতিহি"-অর্থাৎ-নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা আদমকে তাহার ছুরাতে সৃষ্টি করিয়াছেন। আল্লাহতায়ালা সকল প্রকার ছুরাত হইতে পাক অর্থাৎ তাহার ছুরাত বলিতে মানুষের জড় দেহের ছরাত বুঝায় না। এই ছুরাত হইল আল্লাহতায়ালার গুণ সমূহ যাহার প্রতিবিম্ব মানুষ ধারণ করে। আল্লাহপাকের গুণ সমূহ হইল হায়াত (আয়ু), এলেম (জ্ঞান), কুদরত, (ক্ষমতা), এরাদত (কল্পনা), সামাওয়াত (শ্রবন), বাছারাত (দর্শন), কালাম (বর্ণন) ও তাকবীন (সৃজন)। এই সকল গুণের প্রতিবিম্ব মানুষের মধ্যে থাকিবার কারণে মানুষ আল্লাহতায়ালার হোব্ব বা প্রেমের আমানত গ্রহণ করিতে পারে। বাদশাহর দান যেমন তাহারই উষ্ট্র বহন করিতে পারে তেমনি আল্লাহতায়ালার হোব্ব বা প্রেম মানুষই বহন করিতে পারে। অন্য কোন সৃষ্টির এই সকল গুণ নাই, তাই তাহাদের পক্ষে এই আমানত বহন করা সম্ভব নয়। আল্লাহপাক মানুষকে সৃষ্টিই করিয়াছেন তাহার হোব্ব বা প্রেমের আমানত ধারণ করিবার জন্য। তাই তাহার প্রেম ধারণ করা মানুষের পক্ষেই সম্ভব। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলিতেছেন, "যদি এই আমানতের বোঝা আসমান ও জমিন এবং পাহাড় সমূহকে সোপর্দ করা হইতো, তবে তাহারা নিশ্চিহ্ন হইয়া যাইতো। উহাদের কোনো চিহ্নই বাকী থাকিতো না। আল্লাহ যাহাকে এই আমানত দান করেন, তিনি আল্লাহতায়ালার খেলাফতের মর্যাদা লাভ করেন। সেই অবস্থায় উক্ত কামেল আরেফ কাইয়ূম' হইয়া যান ও সমস্ত সৃষ্টির জাহেরী ও বাতেনী কামালাতকে জারী রাখা তাহারই উছিলায় হইয়া থাকে।” যাহা হোক আল্লাহপাক তাহার জ্ঞান ও বিবেচনা শক্তি দিয়া আদমকে সৃষ্টি করিলেন ও পরবর্তীতে মানব পরম্পরায় প্রতি মানুষের পৃষ্ঠ দেশ হইতে তৎপরবর্তী বংশধরদের সৃষ্টি করিলেন। তাহারা সকলেই আল্লাহকে প্রভু মানিয়া লইল।

মানুষের মধ্যে এলেম বা বিবেক বৃদ্ধি ও প্রেমের যে আমানত আল্লাহ রাখিয়াছিলেন, তাহা অংগীকার অনুযায়ী দুনিয়াতে মানুষকে রক্ষা করিতে হইবে। অন্য কোন সৃষ্ট জীব বা বস্তু এই আমানত ভার গ্রহণ করে নাই। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাই মানুষকে আল্লাহতায়ালার প্রেমের পরিচয় ও প্রভুত্ব স্বীকার করিতে হয়। যিনি আল্লাহতায়ালার প্রভুত্ব স্বীকার করিয়াছেন এবং তাহার প্রতি প্রেম যথার্থ ভাবে প্রকাশ করেন, আল্লাহপাক প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সেই ব্যক্তিকে তাহার নৈকট্য ও প্রেম দান করেন। আল্লাহতায়ালার হোব্ব বা প্রেম ও নৈকট্যই বেলায়েত।

বিজ্ঞাপন

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তদীয় মকতুবাত শরীফে লিখিতেছেন, "বেলায়েত অর্থ ফানা এবং বাকা অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার সহিত পরিপূর্ণ বিলীন হইয়া যাওয়া ও স্থায়িত্ব লাভ করাকেই বোঝা যায়।

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বেলায়েতকে দুইভাগে ভাগ করিয়াছেন। "আম" ও "খাস"। আম বেলায়েতের অর্থ সাধারণ নৈকট্য। খাস বেলায়েত হইল বিশেষ নৈকট্য যাহা দয়াল নবী (সাঃ) এর সহিত বিশেষভাবে সংশ্লিষ্ট। খাস বেলায়েত বা বেলায়েতে মুহাম্মদীয়ার মধ্যে ফানা বা মিলন, বাকা বা স্থায়িত্ব পূর্ণতর হইয়া থাকে। যিনি এই নেয়ামত প্রাপ্ত হইলেন, ইবাদতের জন্য তাহার চর্ম কোমল ও দেল অনুগত হইল। ইসলামের জন্য তাহার বক্ষ উন্মুক্ত হইল। তাহার নাফস প্রশান্ত হইল। অতএব সেই ব্যক্তি স্বীয় প্রভুর প্রতি সন্তুষ্ট ও তাহার প্রভুও তাহার প্রতি সন্তুষ্ট হইলেন।

তাহার কালব বা অন্তঃকরণ স্বীয় প্রভু বা পরিচালকের জন্য শান্ত হইল। রূহ লাহুত সিফাত অর্থাৎ যে গুণাবলী খোদা নহে, আবার খোদা হইতে ভিন্ন নহে সেই সিফাতের বিকাশের দিকে পূর্ণ মনোযোগী হইল এবং ঊর্ধ্ব আরোহণ করিতে চলিল। তাহার লতিফায়ে ছের শয়ুনাত২ ও জাতের ইতেবারও সমূহের গুণাবলী লাভে মনোযোগী ও তাহা দর্শনে একাগ্রভাবে মনোযোগী হইল। এই মাকামে ছালেক তড়িৎভাবে তাজাল্লীয়াতে জাতী প্রাপ্ত হয়। তাহার খফি পবিত্রতা ও উচ্চতা হেতু হয়রান থাকে। আখফা আকার বা প্রকার বিহীন হয় ও তুলনাবিহীন মিলনে সম্মিলিত হয়। ছালেকের কালব, রূহ, ছের, খফি, আখফা সম্মিলিত হয় ও সম্মিলিত হইয়া এক অপূর্ব নূরময় জগত ছালেকের বক্ষে উম্মোচিত করিয়া দেয়। কালব, রূহ, ছের, খফি ও আখফায় তাহাদের নিজ নিজ মূল হইতে ফয়েজানের স্রোত পতিত হয়। এই কারণে ছালেকের বক্ষে সূর্যের বিভিন্ন রংগের মত রংগীন নূরের স্রোত প্রবাহিত হইতে থাকে। আলমে আমরের পাঁচ লতিফা হইতে পাঁচ রংগের নূরের পঞ্চ সমুদ্র রূহ হইয়া নাফসের উপরে পতিত হইলে মানুষের দেহের মধ্যে খোদাদ্রোহী লতিফা নাফস ও তাহার চরিত্র পরিবর্তন হয় ও নাফস মোৎমাইন্না প্রাপ্ত বা শান্তি প্রাপ্ত হয়।

বিজ্ঞাপন

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলিতেছেন, "বেলায়েতে মুহাম্মদীয়া" বা "বেলায়েতে খাসসার" উরুজ ও নজুল ৫, আরোহন এবং অবতরন, উভয় দিক অন্য সমস্ত বেলায়েত হইতে ভিন্ন। আখফা লতিফার ফানা ও বাকা এই বেলায়েতে মহম্মদীয়ার জন্য খাস। অন্যান্য বেলায়েতের উরুজ লতিফায়ে খফি পর্যন্ত। সে ক্ষেত্রেও তারতম্য আছে, কাহারও উন্নতি রূহ পর্যন্ত কাহারও ছের ও কাহারও বা খফি পর্যন্ত। ইহাই আম বা সাধারণ বেলায়েতের সীমা।

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) বলেন, "হযরত মুহাম্মদ (সঃ) মেরাজের রাত্রে সশরীরে আল্লাহতায়ালার নৈকট্য লাভ করিয়াছিলেন, আল্লাহপাকের বাণী অহী মারফত লাভ করিয়াছিলেন, বেহেশত ও দোযখ পরিভ্রমণ করিয়াছিলেন, সর্বোপরি স্বচক্ষে সামনা-সামনি আল্লাহপাককে দর্শন লাভ করিয়াছিলেন, এইরূপ মেরাজ হযরত রাসূলে করীম (সঃ) এরই মাত্র লাভ হইয়াছিল। হযরত রাসূলে করীম (সঃ) এর পূর্ণ অনুসরণকারী ও তদীয় পদানুগমনকারী ওলীগণও এই বিশিষ্ট মোর্তবার অংশপ্রাপ্ত হন। ওলীগণ যাহা দর্শন করেন, তাহা আসল বা মূলের ছায়ার মতন। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) বলিতেছেন, 'মাকামে বেলায়েত মাকামে নবুয়তের ছায়া এবং বেলায়েতে কামালাত কামালতে নবুয়তের ছায়া"। কলেমার উভয় অংশের জেকের অর্থাৎ নাফী এজবাত জেকের দ্বারা কলেমার উরুজ ও নজুল হিসেবে বেলায়েতের মাকাম হাসিল হয় ও মাকামে নবুয়তের কামালাত হাসিল হয়। বেলায়েতের মোর্তবা বা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আল্লাহতায়ালার আনুগত্য স্বীকার করিয়া তাহার নৈকট্য ও প্রেম লাভের মাধ্যম হইল দেলে, দেহে তথা সর্ব সত্ত্বায় কলেমা প্রতিষ্ঠা করিয়া আল্লাহতায়ালার প্রভুত্ব স্বীকার করা। দেলে ও দেহে কলেমা প্রতিষ্ঠা হইলে অর্থাৎ সর্ব সময়ে কলেমা শরীফের জেকের জারী রাখার গুণ হাসিল করিলে মানুষের পার্থিব আকর্ষণ বিলীন হইয়া যায়।

পার্থিব আকর্ষণ মুক্ত দেহকে ওজুদ বলা হয়। কলেমা শরীফের প্রথম অংশ অর্থাৎ “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ" ওজুদ প্রতিষ্ঠার সহিত জড়িত। ওজুদের মোর্তবার প্রকাশ সমূহ আলমে মেসালে বিন্দুর আকারে দেখা যায়। আর কলেমার দ্বিতীয়াংশ অর্থাৎ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ যাহা খালকের দাওয়াতের সংবাদ দেয়, তাহা কাশফী দৃষ্টিতে বৃহত্তর আকারে দেখা যায়। এই মাকামে ছালেক নেশাগ্রস্ত থাকেন এবং নেশাগ্রস্ত অবস্থায় কলেমার দ্বিতীয় অংশকে বিশাল সমুদ্রের মত দেখিতে পায়। মানুষের দেহ আলমে খালক অর্থাৎ সৃষ্টি জগতের উপাদান ও আলমে আমর অর্থাৎ নূরময় জগতের উপাদান লইয়া গঠিত। কলেমা শরীফ প্রতিষ্ঠার ফলে মানুষের দেহ তাহার আলমে খালকের উপাদান যেমন আগুন, পানি, মাটি, বাতাসের দোষ হইতে মুক্ত হয় অর্থাৎ পার্থিব আকর্ষণ হইতে মুক্ত হয়। তরিকতের পরিভাষায় ইহাকে আদামতের দোষ হইতে মুক্ত হওয়া বলে। তখন মানুষের দেহে শুধু মাত্র আলমে আমরের বা আরশের উপরের স্তরের গুণাবলী অবশিষ্ট থাকে।

বিজ্ঞাপন

কলেমা শরীফের জেকের দ্বারাই ইহা সংঘঠিত হওয়া সম্ভব। মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলিতেছেন, ছালেক যখন মোরাকাবা ও কলেমা শরীফের জেকের দ্বারা আল্লাহপাকের দিকে মোতাওয়াজ্জোহ হয়, একান্তভাবে মনোনিবেশ করে ও আল্লাহ ব্যতীত অন্য সকল কিছুই হইতে মুখ ফিরাইয়া লন, তখন আল্লাহতায়ালার আসমা ও সিফাতের অর্থাৎ নাম ও গুণের নূর ও এলেমী ছুরাতের প্রতিবিম্ব সমূহ প্রথমে ছালেকের কালবে ও পরে একে একে অন্যান্য লতিফা সমূহেও প্রতিষ্ঠিত হয়। ছালেক তখন আল্লাহতায়ালার গুণে গুণী হন। আদামতের প্রভাব তখন স্তিমিত হইলেও থাকিয়া যায়। তবে এই কলেমা শরীফের জেকের দ্বারা আদামাতের দোষ ক্রমেই স্তিমিত হইতে থাকে। আল্লাহ বলেন, 'নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালার দল বিজয়ী।' কলেমা শরীফের জেকের দ্বারা আদামাতের অবশিষ্ট অংশও লোপ পায় এবং নিজের আসল বা হাকীকী ছুরাত বা আল্লাহপ্রদত্ত গুণ সমূহের প্রতিবিম্ব ব্যতীত তখন ছালেকের দৃষ্টিতে আর কিছু আসে না। আরও উন্নতি করিলে ঐ প্রতিবিম্বও গোপন হইয়া যায়। এই মাকাম হইল মাকামে ফানা।

আলাহতায়ালার সহিত ফানা লাভের বেশ কয়েকটি স্তর রহিয়াছে। একটি আলমে আরোওয়াহর স্তরে, একটি আকরাবিয়াতের স্তরে, একটি কাওছের মাকামে ও একটি কামালাতে নবুয়তের স্তরে। আলমে আরোওয়াহর স্তরে যে ফানা তাহা হইল আসমা ও সিফাতের প্রতিবিম্বিত নূরে ফানা। আকরাবিয়াতের মাকামে যে ফানা তাহা হইল হাকীকী সিফাত সমূহের সহিত ফানা ও কাওছের মাকামে ফানা হইল

আল্লাহতায়ালার জাতী নূরে ফানা। কামালাতে নবুয়তের ফানা হইল সর্ব দেহের ফানা লাভ।

বিজ্ঞাপন

আলমে আরোওয়াহতে যে ফানা তাহাকে ফানা ফির রাসূলের মাকাম বলা হয়। আবার বেলায়েতে ছোগরার মাকামও বলা হয়। ইহাকে মা'ইয়াতের ৭ মাকামও বলা হয়। এই মাকাম খোদাতায়ালার আসমা ও সিফাতের অর্থাৎ নাম ও গুণ সমূহের প্রতিবিম্ব পতন স্থান। এই দায়েরাতে প্রকৃত মা'ইয়াত বা প্রকৃত ফানা সিদ্ধ হয় না। কারণ এই স্তরে প্রতিবিম্বের ঝলক ভিন্ন মূল জাতের সান্নিধ্য লাভ করা যায় না।

যদিও বেলায়েতে ছোগরার স্তর আল্লাহতায়ালার নাম ও গুণাবলীর প্রতিবিম্বের মাকাম, ইহার ব্যাপকতা অতিবিশাল। তরিকতের পীরানে পীরগণ বলেন, বলিতে গেলে ইহার সীমা পরিসীমা নাই। আল্লাহতায়ালা মানব দেহে জ্ঞান সংগ্রহ ও ধারণ করিবার যে আসবাব দান করিয়াছেন, তাহা হইল কালব। এই কালব দ্বারা যত জ্ঞান ধারণ করা যায়, তাহার সব কিছুই এই বেলায়েতে ছোগরার অন্তর্গত।

বেলায়েতে কোররা বা প্রকৃত নৈকট্যের মাকামকে বলা হয় আকরাবিয়াত। এই আকরাবিয়াত তথা হাকীকী সিফাতের অধ্যায়ের নিম্ন বিন্দু হইতে বাকী সব কিছু বেলায়েতে ছোগরার মধ্য সংশ্লিষ্ট। জেল্লীর মাধ্যমে আল্লাহপাকের যে নৈকট্য লাভ হয়, সেই নৈকট্য দ্বারাই আল্লাহপাক ও সৃষ্টিজগৎ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ সম্ভব হয়। বেলায়েতে ছোগরার পূর্ণ জ্ঞান যাহার লাভ হয়, তিনি দায়েরায়ে এমকান, আলমে খালক অর্থাৎ স্থূল জগৎ, আলমে আমর, আলমে আরোওয়াহ অর্থাৎ আত্মার জগৎ, ইহা ছাড়াও আল্লাহপাকের হাকীকী সিফাত সমূহের জেল্লী বা প্রতিবিম্বের জ্ঞান লাভ করেন। আলমে আরোওয়াহর স্তরে আল্লাহতায়ালার সিফাত সমূহের নিম্ন দিকের জ্ঞান লাভ করা সম্ভব হয়।

আল্লাহতায়ালার এই নৈকট্য অর্জন করিবার জন্য খোদাতালাশী ব্যক্তির কালব, রূহ, সের, খফি, আখফা, নাফস, আব, আতশ, খাক, বাদ, সত্তর হাজার লতিফা বিশিষ্ট কালেব, সুলতানুল আজকার বা সর্ব শরীরের জেকের ও সর্ব শরীরের ছবক বা সর্ব দেহে কলেমা শরীফের জ্ঞান হাসিল করিতে হয়।

এইরূপে মানুষ যখন সর্ব শরীরে কলেমা প্রতিষ্ঠা করিয়া নিজের আদামাতের দোষ তথা পার্থিব আকর্ষণ সম্পূর্ণ দূর করিতে সমর্থ হয়, অর্থাৎ আলমে আরোওয়াহতে প্রদত্ত আল্লাহতায়ালাকে দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আল্লাহতায়ালাকেই প্রভু হিসাবে স্বীকার করে, তখন মানুষ নিজের মধ্যে আলমে আরোওয়াহর গুণাবলী ফিরিয়া পায়। তখন আল্লাহতায়ালা তাহার হোব্ব বা প্রেমের আকর্ষণ দ্বারা সাধককে নিবিড় সান্নিধ্য দান করেন। আল্লাহতায়ালার এই নিবিড় সান্নিধ্যের মাকামই হইল আকরাবিয়াত। সাধনা দ্বারা যাহা কিছু সম্ভব তাহা বেলায়েতে ছোগরায় লাভ করিতে হয়। আর বেলায়েতে ছোগরা স্তরে ছালেক পৌঁছাইলেই আল্লাহতায়ালা তাহার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নিবিড় নৈকট্য দান করেন। আকরাবিয়াত বা তঊর্ধ্ব জগতের জ্ঞান হাসিলের জন্য আল্লাহতায়ালার প্রতি মহব্বত ও জজবাই পাথেয়। চেষ্টা ও সাধনার দ্বারা আল্লাহতায়ালার যতটুকু পরিচিতি, নৈকট্য ও হোব্ব বা প্রেম লাভসম্ভব তাহার সবটুকুই এই বেলায়েতে ছোগরার স্তরেই সম্ভব। তাই পূর্ব কালের ওলীগণ তাহাদের সাধনা এই স্তরেই সমাপ্ত করিতেন।

উপরের আলোচনায় ইহা স্পষ্ট হইয়াছে যে মানুষ পৃথিবীতে আসিবার পূর্বেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে, আল্লাহ ছাড়া আর কাহারো প্রভুত্ব সে স্বীকার করিবে না। কেবল আল্লাহকেই মানুষ প্রভু স্বীকার করিবে এবং তাহারই জন্য প্রেম প্রকাশ করিবে। সৃষ্টি জগতের অন্য কোন বস্তু বা ব্যক্তিকে তাহার প্রভু বা উদ্দেশ্য মনে করিবে না। আল্লাহতায়ালার দিদার ও তাহার সৃষ্টি জগতের পূর্ণ পরিচয় লাভ না করিলে আল্লাহতায়ালার পরিচয় ও তাহার ক্ষমতা ও শক্তির বিশালতা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ সম্ভব হয় না। আর মানুষের সমগ্র অস্তিত্বকে আল্লাহ মুখী না করিতে পারিলে আল্লাহ ছাড়া মানুষের অন্য যে কোন ব্যক্তি বা বিষয়ের প্রতি আকর্ষণ বা আনুগত্য থাকা বিচিত্র নয়। তাই খোদাতালাশীর প্রথম পদক্ষেপ হয়, আল্লাহ ছাড়া পার্থিব সকল বিষয় ও বস্তু হইতে আকর্ষণ মুক্ত হওয়া। মানুষের দেল যখন পুরাপুরি পার্থিব সকল আকর্ষণ হইতে মুক্ত হয়, তখনই দেলে আল্লাহতায়ালার জ্ঞান আসিতে থাকে। এই রূপে মানুষের, দেহ ও আত্মা সকলই যখন সৃষ্টি জগতের সকল কিছুরই আকর্ষণ মুক্ত হয়, তখন দেলে মহা কালব হইতে আল্লাহতায়ালার জ্ঞান আসিতে থাকে।

মানুষের দেল ও দেহ আল্লাহতায়ালা ভিন্ন অন্য জিনিষের আনুগত্য ও আকর্ষণ হইতে মুক্ত হয় পীরে কামেলের পাক তাওয়াজ্জুহ দ্বারা। পীরে কামেলের পাক তাওয়াজ্জুহ দ্বারা ছালেক বা খোদাতালাশীর দেল বা কালবে প্রথমে আল্লাহতায়ালার জাতী নাম আল্লাহ, পরে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ' এই কলেমা শরীফের জেকের প্রতিষ্ঠা করিতে হয়। দেল বা কালবে কলেমা শরীরের জেকের প্রতিষ্ঠা হওয়ার অর্থ হইল দেলে সর্ব ক্ষণ এই কলেমা শরীরের জেকের জারী থাকার গুণ লাভ করা। পীরে কামেলের পাক তাওয়াজ্জুহ ছাড়া সর্বক্ষণ অর্থাৎ শয়নে-স্বপনে-জাগরণে দেলের এই গুণকে অর্জন করা সম্ভব নয়। কেবল মাত্র মোর্শেদে কামেলই মানুষের দেল তথা সর্ব শরীরের প্রতি রেণুতে রেণুতে কলেমা শরীরের জেকের জারী করাইয়া দিতে পারেন। অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার নিকট মানুষ আত্মার জগতে যে প্রতিশ্রুতি প্রদান করিয়া আসিয়াছে, সেই প্রতিশ্রুতি পালনের একমাত্র সহায় ও সম্বল মোর্শেদে কামেল। মোর্শেদে কামেল আলমে আমরের অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার আরশের উপরের স্তরের যে নিদর্শন বা লতিফা মানব দেহে রহিয়াছে সেই নিদর্শন বা লতিফা সমূহে অর্থাৎ কালব, রূহ, সের, খফি, আখফা লতিফায় প্রথমে আল্লাহতায়ালার এসমে জাত বা আল্লাহ ও পরে কলেমা শরীফের জেকের জারী করান। পরে আলমে খালকের লতিফা সমূহ অর্থাৎ আব, আতস, খাক, বাদ, নাফস ও কালেব তথা সর্ব শরীরের জেকের জারী কারান। কালব আলমে আমরের লতিফা বিধায় ইহাতে অতি সহজে আল্লাহতায়ালার নাম ও কলেমা শরীরের জেকের জারী করানো সম্ভব হয়। পরে কালব ও রূহের যোগাযোগে আল্লাহতায়ালার জাত আহাদিয়াত হইতে সিফাতে এজাফিয়া ও সিফাতের হাকীকীর নূর দ্বারা আল্লাহতায়ালার ভেদের এক মহাজ্ঞান ভান্ডার ছালেকের কালবে আসিতে থাকে।

আলমে খালক, আলমে আমর, সিফাতে আসমাউল হোসনা ও তাজাল্লীয়াতে আফ্যাল বা আল্লাহতায়ালার ক্রিয়াগুণ সমূহের প্রতিবিম্ব রহিয়াছে মহাকালবে। মহাকালব আরশের উপরের জগতে বর্তমান। আরশ আলমে খালক ও আলমে আমরের মধ্য পর্যায়ে অবস্থিত। মহাকালব হইতে আসমা ও সিফাতের প্রতিবিম্বিত নূর আসিয়া মানব দেহের কালব রূপ আয়নায় পড়ে। তাই এই জগতে একটি নির্দিষ্ট স্থানে থাকিয়াও মানুষ সমগ্র সৃষ্টি জগৎ ও প্রতিবিম্ব জগতের জ্ঞান লাভকরে। মহাকালব হইতে আল্লাহতায়ালার নাম, গুণ ও শানের প্রতিবিম্বিত নূর আসিতে শুরু করে তখনই যখন কালব বা দেল পার্থিব আকর্ষণ হইতে মুক্ত হয়। যদিও কালব ও রূহ উভয়ই আলমে আমরের বা আরশের উপরের স্তরের লতিফা তবুও নাফসের প্রভাবে বস্তু জগতে আসিয়া কালব ও রূহ তাহার মূল গুণ হারাইয়া ফেলে। মোর্শেদে কামেলের পাক তাওয়াজ্জুহ দ্বারা ছালেক বা খোদাতালাশী ব্যক্তির নাফসকে রূহ ও কালব হইতে পৃথক করা হয়। তখন আল্লাহতায়ালার জাত আহাদিয়াতের নূর রূহের যোগাযোগে কালবে আসিতে থাকে। বেলায়েতে ছোগরার মাকামে অধিকার অর্জনের জন্য কালব, রূহ, সের, খফি, আখফা, নাক্স, আব, আতশ, খাক, বাদ, সর্ব শরীরের জেকের বা সুলতানুল আজকার, সর্ব শরীরের ছবক, দায়েরায়ে এমকান, দায়েরায়ে আ্যাল, আলমে আরোওয়াহ ও আলমে আমরের জ্ঞান হাসিল করিতে হয়। এই স্তরে পৌঁছাইবার জন্য মোর্শেদে কামেল তদীয় তাওয়াজ্জুহ দান করিয়া প্রথমে যে লতিফায় জেকের জারী করান তাহা হইল কালব।

লতিফায়ে কালব-সাধনার প্রথম স্তরে ছালেক আপন মুর্শিদে কামেলের অনুগ্রহ ও তাওয়াজ্জুহ দ্বারা যে লতিফা জাগ্রত বা জারী হইয়াছে বলিয়া অনুভব করে, তাহা হইল লতিফায়ে কালব। ইহার স্থান বাম স্তনের দুই অংগুলী নিম্নে হৃদপিন্ডের অভ্যন্তরে। মানুষকে আল্লাহতায়ালা যে জ্ঞানের আসবাব দান করিয়াছেন তাহা হইল লতিফায়ে কালব, যদিও সাধারণ মানুষ কালবকে জ্ঞান আহরনের আসবাব হিসেবে ব্যবহার করিতে জানে না। কালবকে জ্ঞানের আসবাব হিসেবে ব্যবহার করিতে পারিলে মানুষ সরাসরি আল্লাহতায়ালার জ্ঞানে জ্ঞানী হইতে পারিতো। হযরত রাসূলে করীম (সঃ) বাহ্যিক শিক্ষা লাভ না করিলেও কালবের জ্ঞানে জ্ঞানী হওয়ার কারণে জগতের বুকে তিনি সর্বযুগের সর্ব শ্রেষ্ঠ মহামানব হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করিয়াছিলেন। রাসূলে করীম (সঃ) কালব দ্বারা আল্লাহতায়ালা এবং সকল সৃষ্টির জ্ঞান লাভের যে পদ্ধতি শিক্ষা লাভকরিয়াছিলেন, সেই পদ্ধতি তিনি হযরত আবুবকর সিদ্দিকী (রাঃ) ও অন্যান্য সাহাবাবর্গকে শিক্ষা দান করেন। পরবর্তীতে আত্মা পরম্পরায় আজও কালবের জ্ঞান লাভ ও জ্ঞান ধারণ পদ্ধতি চর্চা চলিয়া আসিতেছে। এই জ্ঞান চর্চা যাহারা করেন, তাহারাই সূফী সাধক।

পীরে কামেলের তাওয়াজ্জুহ দ্বারা এই লতিফা জারী হইলে সদা সর্বদা আল্লাহতায়ালার নাম ও নাফী এজবাত বা কলেমা শরীফের জেকের জারী হইতে থাকে। মানব দেহে যে লতিফায়ে কালব, তাহা বস্তুত মহাকালবের একটি ক্ষুদ্রতম অংশ। সমষ্টিগত যে কালব বা মহাকালব তাহার জ্ঞান ছালেক লাভ করে দায়েরায়ে এমকানে ও আলমে আরোওয়াহর স্তরে বেলায়েতে ছোগরার মাকামে। এই মাকামে আল্লাহতায়ালার জাত আহাদিয়াতের নূর দ্বারা কালব মহাকালব হইতে জ্ঞান আহরণ করিতে শিক্ষা করিয়া থাকে। পীরে কামেলের তাওয়াজ্জুহ দ্বারা দায়েরায়ে এমকানে ছালেক তাজাল্লীয়াতে আফয়াল, তাজাল্লীয়াতে সিফাত ও তাজাল্লীয়াতে জাতের নূর গ্রহণ করিতে শিক্ষা করে।তাজাল্লীয়াতে আয়ালের দ্বারা পৃথিবী তথা সমগ্র সৃষ্টি জগতের সকল কর্ম যে আল্লাহতায়ালারই কর্ম, সেই জ্ঞান ছালেক লাভ করিতে পারে। তাজাল্লীয়াতে আফয়ালের নূর সিদ্ধ হইলে ছালেক আপন নাফসে বা দেহের মধ্যে সমগ্র সৃষ্টি জগতকে ধারণকৃত দেখে। এই স্তরে হালেক পৃথিবীর বার্ষিক ও দৈনন্দিন ঘূর্ণন, ঋতু পরিবর্তন, বৃক্ষ, লতা, ফল, ফুল, জীবের জন্ম-মৃত্যু কর্ম, সকলই যে আল্লাহতায়ালার তাজাল্লীয়াতে আফ্যাল দ্বারা নিরূপিত-তাহা বুঝিতে পারে। তাজাল্লীয়াতে সিফাত দ্বারা ছালেক আল্লাহতায়ালার আটটি গুণ সম্পর্কে ধারনা লাভ করে। এই আটটি গুণ হইল হায়াৎ, এলেম, কুদরত, এরাদত, সামাওয়াত, বাছারাত, কালাম ও তাকবীন। উক্ত আটটি সিফাতের প্রতিবিম্বের জ্ঞান অর্জিত হয় আলমে আরোওয়াহর স্তরে। কালবের এই রূপ তাজাল্লীয়াতে আফ্যালের নূর ধারণে যথাযথ যোগ্যতা জন্মিলে ছালেক সব রকমের অর্জন যোগ্য এলমে হুছুলীর জ্ঞান লাভ করে। ছালেক তখন আলমে খালক বা সমগ্র সৃষ্টি জগত, আলমে আরোওয়াহ, আলমে বরযখ বা কবর জগৎ, কিয়ামত, পুলছিরাত, আরশ, কুরছি, লওহ, কলম সব কিছুরই জেল্লী বা প্রতিবিম্ব ঘরে বসিয়া দেখিতে পায়। তাহার কাছে তখন অতীত ও ভবিষ্যত বলিয়া কিছুই থাকে না, সব কিছুই বর্তমান বলিয়া মনে হয়। তাহার নিকট সমস্ত দুরত্বও লোপ পায়। আত্মার নিকট দূর-কাছ বলিয়া কিছু নাই। তখন ছালেক-"আমাকে সৃষ্টির পূর্ব হইতে পশ্চিম ও প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত জ্ঞান দান করা হইয়াছে"- রাসূলে করীম (সঃ) এর এই হাদীস পাকের জ্ঞান লাভ করেন। বস্তুতঃ তরিকতের পীরানে পীরগণ বলিয়াছেন, এই কালবের জ্ঞান দ্বারা একমাত্র আল্লাহতায়ালার জাত ভিন্ন, আর সকল কিছুরই জ্ঞান লাভ করা যায়। আল্লাহতায়ালার হাকীকী সিফাতের জেল্লীর জ্ঞানও কালব দ্বারা লাভ করা যায়। আল্লাহতায়ালার আসমা ও সিফাতের অর্থাৎ নাম ও গুণের যে প্রতিবিম্বিত নূর আলমে আরোওয়াহ বা বেলায়েতে ছোগরা দায়েরা দ্বারা ছালেকের কালবে আসে, তাহা দ্বারা ছালেক সমগ্র সৃষ্টির রেণু পরমাণু যে আল্লাহতায়ালার জাতের সহিত সম্পর্কিত ও আল্লাহতায়ালার জাতের সহিত সংলগ্ন সেই জ্ঞান লাভকরেন। ছালেক তখন মা'ইয়াতের মাকামে আল্লাহতায়ালার নাম ও গুণাবলীর জেল্লী দ্বারা সমগ্র সৃষ্টি বস্তুর সম্পর্কেও জ্ঞান লাভ করিতে পারেন। ইহার সবই কালবী নেত্র দ্বারা জানা যায়। কালব আল্লাহতায়ালার জ্ঞান ভান্ডার। এই জ্ঞান ভান্ডারে ইহ-পরকালের সমস্ত জ্ঞান রক্ষিত আছে। এই জ্ঞানভান্ডারের জ্ঞান কেবলমাত্র কালবে আল্লাহতায়ালার সিফাতে এজাফিয়া, সিফাতে হাকীকী ও তাজাল্লীয়াতে আফ্যালের নূর দ্বারা অর্জন করা সম্ভব। যিনি কালবের জ্ঞান পুরাপুরি হাসিল করিতে পারেন, তাহার নিকট আল্লাহতায়ালার সমগ্র সৃষ্টি জগতের বিশাল জ্ঞান ভান্ডারের দ্বার খুলিয়া যায়।

দার্শনিক এবং বিজ্ঞানী নিউটন আল্লাহতায়ালার এই বিশাল জ্ঞান সমুদ্র সম্পর্কে বলিতে যাইয়া উল্লেখ করিয়াছেন, "তিনি জ্ঞান সমুদ্রের তীরে দুই একটি নুড়ি পাথর কুড়াইতে চেষ্টা করিয়াছেন মাত্র, জ্ঞান সমুদ্রের মধ্যে প্রবেশ করিতে পারেন নাই"। বস্তুতঃ ইন্দ্রিয় দ্বারা আল্লাহতায়ালার জ্ঞান লাভ করা যায় না। আল্লাহতায়ালা তাহার নিজ জাত ও সমস্ত সৃষ্টি জগতের জ্ঞান দান করিয়াছেন হযরত রাসূলে করীম (সঃ) কে। আর সেই জ্ঞান সংগ্রহের পদ্ধতি হইল, কালবে আল্লাহতায়ালার নূর দ্বারা জ্ঞান লাভ।

লতিফায়ে রূহঃ- রূহ এক নূরানী জ্যোতির্ময় চেতনা শক্তি, যাহার দ্বারা সকল জীব তাহার অনুভূতি লাভ করিয়া থাকে। কালবের সহিত সম্পর্কযুক্ত হিসেবে ইহার স্থান নিরূপিত। রূহ দ্বারাই সমগ্র সৃষ্টি রক্ষিত হইয়াছে বা ইহাকেই সৃষ্টির সার বস্তু বলা হয়।

হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব তদীয় মসনবী শরীফে রূহের যে বর্ণনা দান করিয়াছেন তাহা হইলঃ ইহা কোন পদার্থ নয়, ইহা আে রাব্বি। ইহা আল্লাহতায়ালার হুকুম বা আদেশ। হযরত রূমী (রঃ) ছাহেবের মতে সমগ্র সৃষ্টি জগতের একটিই মাত্র রূহ, তাহা হইল "রূহে আজম"। সৃষ্টির প্রতি বস্তুর সহিতই রূহে আজম সম্পর্ক যুক্ত। সেই সম্পর্ক দ্বারাই প্রতিটি জিনিষের অস্তিত্ব। প্রতি বস্তুই আল্লাহতায়ালার আদেশে এই রূহে আজম দ্বারা সন্নিবেশিত। তাই আল্লাহপাক কুরআন মজীদে বলিতেছেন, সমগ্র সৃষ্টি সর্বদা আল্লাহতায়ালার জেকের করিতেছে। "ইউছাব্বেহু লিল্লাহে মা ফিস সামাওয়াতে অমা ফিল আরদ" অর্থাৎ "আসমান ও জমিন এবং তন্মধ্যস্থিত সকল কিছুই আল্লাহতায়ালার জেকের করিতেছে।" আলমে আরোওয়াহর স্তরে যাহাদের সর্ব শরীরের জেকের জারী হইয়াছে, তাহারা অনুভব করিতে পারেন, তদীয় দেহ তথা সৃষ্টির সকল বস্তুর সহিতই আল্লাহতায়ালার জাত সন্নিবেশিত রহিয়াছে। আল্লাহতায়ালার জাত যেহেতু সকল বস্তুর রেণু পরমাণুর সহিত সন্নিবেশিত, তাই আল্লাহতায়ালার হুকুম 'রূহে আজম' এর সহিত প্রতি বস্তুর সন্নিবেশিত থাকাই স্বাভাবিক। তাই মানুষ যেখানেই থাকুক না কেন তাহার মৃত্যু ঠিক সময় মতই হইয়া থাকে। আল্লাহতায়ালার জাতের সহিত যে সমগ্র সৃষ্টির রেণু পরমাণু সম্পর্কযুক্ত তাহা রূহের মারফতে আল্লাহতায়ালার নাম, গুণ ও শানের প্রতিবিম্বিত নূর দ্বারা বেলায়েতে ছোগরার মাকামে সাধকগণ বুঝিতে পারেন। তবে হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রূমী (রঃ) ছাহেব যাহাকে রূহে আজম বলিয়াছেন তাহা হইল পরম আত্মা। পরম আত্মা ও জীব আত্মা-এই দুই লইয়াই মানুষের জীবন। মানব দেহে আল্লাহতায়ালার যে সকল নিদর্শন বা লতিফা আছে, তাহার মধ্যে রূহই সর্বোচ্চ আল্লাহতায়ালার সিফাতে এরাদত পর্যন্ত উরুজ করিতে পারে। এই রূহ দ্বারাই সিফাতে এরাদতের পর্দা হইতে নূর ধারণ করিয়া কালব আলমে আরোওয়াহ স্তরের জ্ঞান তথা আল্লাহতায়ালার সিফাত ও সমগ্র বিশ্ব জগতের ভূত ভবিষ্যতের জ্ঞান লাভ করিতে পারে। অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার নৈকট্য লাভের জন্য লতিফায়ে রূহের ভূমিকাই সর্বাধিক। কালবের মুখ্য ভূমিকা হইল জ্ঞান সংগ্রহ ও ধারণ করা। কালব মহাকালবের বাহিরের জ্ঞান লাভ করিতে পারে না। মহাকালব তাজাল্লীয়াতে আফ্যালের ধারক। ইহার বাহিরের জ্ঞান যাহা কালবে আসে তাহা রূহের সহিত কালবের যোগাযোগ দ্বারাই আসিয়া থাকে। রূহের সহিত কালবের এই যোগাযোগ পীরে কামেলের পাক তাওয়াজ্জুহ দ্বারাই সম্ভব। দায়েরায়ে এমকানে যে মুরীদ পীরের সহিত ফানা লাভ করে ও ফানা ফির রাসূলের মাকামে রাসূলে করীম (সঃ) এর সহিত ফানা লাভ করে, তাহা এই রূহের দ্বারাই সংঘঠিত হয়। ফানা ফিল্লাহর মাকামে যাইবার জন্য মুরীদ যে কামালাতে নবুয়ত, কামালাতে রেসালত ও কামালাতে উলুল আজমের পর্যায়ে সদা সর্বদা আল্লাহতায়ালার দায়েমী তাজাল্লী লাভ করিতে থাকে তাহাও পীরের রূহে বেমেছালী ছুরাতের সহিত মুরীদের রুহের ফানার মাধ্যমে শুরু হয় এবং তাহা পরবর্তীতে সর্ব শরীরের ফানা হিসেবে ছালেক অনুভব করিতে থাকে। তাই আল্লাহতায়ালার নৈকট্য অর্জনের জন্য যে লতিফা সব চেয়ে বেশী কার্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ তাহা হইল রূহ। রূহকে আল্লাহতায়ালার এরাদতের পর্দা পর্যন্ত উঠিতে যে লতিফার সাহায্য গ্রহণ করিতে হয় তাহা হইল লতিফায়ে ছের। এই কালব, রূহ ও ছের-তিনে মিলিয়া আল্লাহতায়ালার যে তাজাল্লীয়াতে জাতি নূর লাভ করে তাহাই রূহ হইতে নাফসে যাইয়া নাফসকে আল্লাহমুখী করে ও নাফস তাহার আম্মারা পর্যায় হইতে ক্রমে ক্রমে লাওমা, মোৎমাইন্না, মোলহেমা ও মোহাদ্দেসা পর্যায়ে উন্নীত হয়।

নাফসঃ-নাফসে আল্লাহতায়ালার জাতি নূরের আধিক্য যতই পড়িতে থাকে না ততই তাহার চরিত্র পরিবর্তন করিতে থাকে। দুনিয়ার আকর্ষণ হইতে মুক্ত হইয়া আল্লাহতায়ালার দিকে প্রত্যাবর্তন করে। নাফস আম্মারার পর্যায়ে পুরাপুরি দুনিয়ার ভোগ লিপ্সায় মত্ত থাকে ও আল্লাহ বিরোধিতা পোষণ করে। লাওমার পর্যায়ে নাফস কখনও দুনিয়ামুখী, কখনও আল্লাহমুখী হয়। মোৎমাইন্নার পর্যায়ে নাফস শান্তিপ্রাপ্ত হয় কিন্তু ইহাতে পরিপূর্ণ পবিত্রতা আসে না। মোৎমাইন্না লাভ হয় আলমে আরোওয়াহ বা বেলায়েতে ছোগরার স্তরে। সেই পর্যায়েও মানব দেহের পানি, আগুন ও বাতাসের কু-দোষ নাফসকে ক্লেদাক্ত করিতে পারে।

এই স্তরে মোরাকাবায়ে শরহে ছদর দ্বারা ছালেকের ছিনা এতই প্রশস্ত হয় যে, উহা বর্ণনা করা অসাধ্য, ঐ মোরাকাবায় ছালেক সমুদয় ফয়েযান নিজ দেলে বা বক্ষে আসিতে দেখে। এই মোরাকাবা দ্বারা সহ্য শক্তি অতিশয় বাড়িয়া যায়। সে তখন খোদাতায়ালার দিক হইতে যে কোনো কষ্ট সহ্য করিতে পারে। এই মোরাকাবা দ্বারা কালব, রূহ, ছের, খফি, আখফার মূল হইতে ছালেকের কালব, রূহ, ছের, খফি, আখফাতে পাঁচটি বিভিন্ন রংগের ফয়েজান আসিয়া পাঁচ রংগের পঞ্চ সমুদ্র সৃষ্টি করে, যাহা এতই রংগীন ও আকর্ষণীয় হয় যে, সেদিকে নিবিষ্ট হইয়া ছালেক দুনিয়ার খেয়াল ভুলিয়া যায়। সাধকগণ সাত, আট, দশ দিন পর্যন্ত ঐ খেয়ালে দুনিয়ার আহার, নিদ্রা ভুলিয়া থাকিতেন।

বেলায়েতে উলিয়ার স্তরেই এসমোল বাতেন বা আল্লাহতায়ালার নাম ও গুণের পরদায় ছায়ের শুরু হয়। বেলায়েতে উলিয়ার স্তরে আলমে খালকের তিন লতিফা অর্থাৎ আগুন, পানি ও বাতাসে খোদাতায়ালার জাত মিশ্রিত সিফাতি নূর পড়িয়া পবিত্র হইয়া যায় ও ঐ তিন লতিফায় ফানা লাভ হয়। উহার পর কামালাতে নবুয়তে যাইয়া আলমে খালকের বাকী লতিফা অর্থাৎ দেহের মাটির অংশও পবিত্র হইয়া সর্বদেহ আল্লাহতায়ালার সহিত ফানা লাভ করে। এই মাকামে বাতেন এতই প্রশস্ত হয় যে, ছোগরা বেলায়েতের প্রশস্ততা উহার সহিত তুলনা করিলে সামান্য মনে হয়। আকরাবিয়াতের ঊর্ধ্বে কামালাতে নবুয়তের মাকাম সমূহে আল্লাহতায়ালার দায়েমী তাজাল্লী দ্বারা যখন আগুন, পানি, মাটি ও বাতাসের দোষ সম্পূর্ণ রূপে চলিয়া যায়, তখনই নাফস পরিপূর্ণ রূপে পবিত্রতা লাভ করে। তাহার পূর্বে যে নাফস তাহাকে মোৎমাইন্নাপ্রাপ্ত বা শান্তি প্রাপ্ত নাফস বলা হয়। নাফস যখন কামালাতে নবুয়তের মাকাম সমূহে পরিপূর্ণ পবিত্রতা অর্জন করিতে পারে ঐ স্তরের সাধকগণ সদা সর্বদা আল্লাহতায়ালার এলহাম শুনিতে পান। ঐ স্তরের নাফস এলহাম শুনিতে পায় বলিয়া ইহাকে নাফসে মোলহেমা বলা হয়। তাহাদের সকল কার্যই আল্লাহতায়ালার এলহাম দ্বারা পরিচালিত হয়। আলমে আরোওয়াহর স্তরে অর্থাৎ বেলায়েতে ছোগরা স্তরে নাফসে মোৎমাইন্নাও আল্লাহতায়ালার এলহাম শুনিতে পারে। তবে তাহা শরীয়ত সিদ্ধ কিনা ছালেককে তাহা বিচার করিয়া লইতে হয়। নাফস যখন মোহাদ্দেসার পর্যায়ের গুণাগুণ লাভ করে, তখন সাধক মাটীর নীচে কবরে শায়িত ব্যক্তির আত্মার সহিত অর্থাৎ আলমে বর্জকের ব্যক্তিদের সহিত কথা বলিতে পারে। সাধকগণ আলমে বর্জক বা কবরে শায়িত ব্যক্তিবর্গের সহিত আলাপ আলোচনা করিতে বা তাহাদের অবস্থা জানিতে পারেন, ওলী-আল্লাহগণের জীবন কাহিনীতে এর বহু উদাহরণ রহিয়াছে। আলমে আমরের স্তরে আল্লাহতায়ালার নৈকট্য লাভের জন্য কালব, রূহ ও নাফসের গুরুত্ব সর্বাধিক। তাই তাহাদের সম্পর্কে বিষদ বলা হইল। ছের, খফি ও আখফা রূহকে আল্লাহতায়ালার বিভিন্ন নূর ধারনে সাহায্য করিয়া থাকে। কালব, রূহ ও সেরের মাধ্যমে নাফসের উপরে আল্লাহতায়ালার জাতি নূর পড়ে ও তাহা হইতে ৭০ হাজার লতিফা বিশিষ্ট কালেবের মাধ্যমে তাহা সর্ব শরীরে যাইয়া পড়ে। এই নূর এই রূপে মানব শরীরকে আগুন পানি, মাটি, বাতাসের দোষ হইতে মুক্ত করিয়া আদামাতের অন্ধকার হইতে মুক্ত করে। ছালেকের ওজুদ রাজ্য এই রূপে আদামাত হইতে মুক্ত হয়। তরিকতের পরিভাষায় এই স্তরকে তৌহিদে ওজুদী বলা হয়। ইহার পর যে স্তরে আল্লাহতায়ালার হাকীকী সিফাতের নূর দ্বারা আল্লাহতায়ালার গুণে ও স্বভাবে অর্থাৎ আখলাক, ফিতরাত ও সিফাতে ছালেক সজ্জিত হয়, তাহাকে তৌহিদে শহুদীর স্তর বলা হয়। উহা কাওছের মাকামে ওজুদ মাওহুব লাহু দ্বারা সংঘটিত হয়। আর আলমে

আমর বা বেলায়েতে ছোগরা বা আলমে আরোওয়াহর স্তরে তাহা আল্লাহতায়ালার সিফাতের নূরের জেল্লী বা প্রতিবিম্ব দ্বারা সংঘটিত হয়। আর কামালাতে নবুয়তের স্তরে তাহা আল্লাহতায়ালার দায়েমী তাজাল্লীতে লাভ হয়। দায়েমী তাজাল্লী অর্থ সর্ব সময়ে বা অনবরত নূরের ফয়েজ লাভ। এই পর্যায়ে ছালেক ১৫টি গুণ লাভ করে। গুণ গুলি হইল।

★ তওবা (পাপে নিবৃত্ত থাকিবার গুণ)

★ যোহদ বা দুনিয়াবিরাগ (বাসনা ত্যাগ)

★ তাকওয়া (আল্লাহতায়ালার ভীতিতে নিষিদ্ধ কাজ না করা)

★ রেয়াজত (কঠোর তপস্যা)

★ ফকর (দরিদ্রতা)

★ শোকর (কৃতজ্ঞতা প্রকাশ)

★ ছবর (অল্পে সন্তুষ্টি ও ধৈর্য ধারণ করিবার ক্ষমতা)

★ তাওয়াক্কুল (আল্লাহর উপর নির্ভরতা)

★ খওফ (আল্লাহর ভয়)

★ রেজা (আশা)

★ ইয়াকীন (বিশ্বাস)

★ এখলাস (উদ্দেশ্যের বিশুদ্ধতা)

★ তসলিম (নিজেকে ন্যস্ত করা)

★ রেজা (খোদাতায়ালা যখন যে অবস্থায় রাখেন তাহাতে রাজী থাকা।)

★ তাকমিলোল ইয়াকীন (পরিপূর্ণ বিশ্বাস)।

তোমরা তরিকতের নিয়ম পদ্ধতি যথাযথ পালন কর। পীরের কদমে কঠিন খেদমত কর। আল্লাহ তোমাদের দয়া করুন। আমীন!

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD