মহব্বতে এলাহি মারেফাত লাভের সর্বাপেক্ষা কার্যকরী মাধ্যম

হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘তৌহিদে ওজুদী ও তৌহিদে শহুদী এবং ছায়েরে আফাক ও আনফা’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ ছায়েরে আফাক ও আনফাস অর্থাৎ ছায়েরে এসমোজ্জাহের ও ছায়েরে এসমোল বাতেনের উপর জ্ঞানগর্ভ আলোচনা। এতদ্ব্যতীত মহব্বতে এলাহি বা খোদাপ্রেমই যে মারেফাত লাভের বা জাতের পরিচয় গ্রহণের সর্বাপেক্ষা কার্যকরী মাধ্যম- সে সম্পর্কীয় আলোচনাঃ
বিজ্ঞাপন
খোদাতায়ালার প্রভুত্ব স্বীকার করা প্রতি মানুষের জন্য ফরজ। কারণ সৃষ্টির আদিতে আলমে আরোওয়াহের জগতে মানুষ আল্লাহতায়ালার কাছে ওয়াদা করিয়া আসিয়াছে, দুনিয়ায় আসিয়া তাহারা সকলেই আল্লাহতায়ালার প্রভুত্ব স্বীকার করিবে।
এই ওয়াদা পূরণ করিতে হইলে আল্লাহকে খুঁজিতে হয়, তাহার নিকট পৌছাইতে হয় ও তাহার আদেশ নিষেধ মানিয়া চলিতে হয়। আল্লাহ বলেন, তিনি সত্তর হাজার নূর ও অন্ধকারের পর্দায় আবৃত। এই সত্তর হাজার পর্দা ভেদ করিয়া মানুষ কি করিয়া আল্লাহতায়ালার পরিচয় গ্রহণ করিবে ও তাহার প্রভুত্ব স্বীকার করিবে? সত্তর হাজার পর্দার কথা শুনিয়া স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, এক জীবনে তাহা কিরূপে অতিক্রম করা সম্ভব হইবে? তবে আল্লাহপাক ফরমান, মানুষের সাধ্যাতীত কোনো আদেশ তিনি দান করেন নাই। আল্লাহতায়ালা জুলুমও করেন না। তিনি মানুষের জন্য সকল কিছুই সহজ করিয়া দেন। আল্লাহতায়ালার রহমত ও ফজলের সীমা নাই। আল্লাহু জুল ফাজলুল আজীম।
মানুষের সাধ্যের মধ্যে কোন্ কাজ দ্বারা তাহা হইলে আল্লাহতায়ালার পরিচয় গ্রহণ করা যায়? আল্লাহ বলেন, যে আমার জেকের করে তাহাকে আমি স্মরণ করি। যে আমাকে পাইবার জন্য এক কদম আগাইয়া আসে; আমি তাহার দিকে দুই কদম আগাইয়া যাই।
বিজ্ঞাপন
আল্লাহতায়ালা নিজেকে গোপন রাখিবার জন্য মানুষ সৃষ্টি করেন নাই। নিজেকে প্রকাশ করিবার জন্যই তিনি সৃষ্টি জগৎকে সৃজন করিয়াছেন। আর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করিয়াছেন ইহজগতে তাহার কামালিয়াত ও গুণের প্রকাশস্থল হইবার জন্য। সৃষ্টির তাবৎ বস্তুর অণু-পরমাণু দিয়া তিনি মানুষকে সৃষ্টিও করিয়াছেন এমন ভাবে যাহাতে মানুষ যথাযথভাবে আল্লাহতায়ালার প্রকাশস্থল হইতে পারে। তাই সত্ত্বর হাজার পর্দার কথা যেমন আল্লাহপাক বলিয়াছেন, তেমনি সুসংবাদ দান করিয়াছেন যে, ফেরেশতা বা রূহ আল্লাহর উদ্দেশ্যে এতদূর পথ ছায়ের বা অতিক্রম করিতে পারে যাহার এক দিবস পৃথিবীর পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। আল্লাহপাক কুরআন মজীদে বলেন, "অফি আন ফুছেকুম আফালা তুবছেরুন"-অর্থাৎ আমার নিদর্শন সমূহ তোমাদের মধ্যেই আছে, তোমরা দেখ না কেন?
আল্লাহপাক যে সকল নিদর্শন সমূহ মানুষের ভিতরে দান করিয়াছেন তাহা হইল-কালব, রূহ, ছের, খফি, আখফা, নাফস, আব, আতশ, খাক, বাদ প্রভৃতি লতিফা সমূহ।
মোর্শেদে কামেলের পাক তাওয়াজ্জুহ দ্বারা যখন আল্লাহতায়ালার নূর এই সকল লতিফা সমূহের উপর আসিয়া পড়িতে থাকে, তখন ঐ সকল লতিফা সমূহে আল্লাহ নামের জেকের জারী হইয়া যায়। ঐ সকল লতিফা সমূহে যখন জেকের হইতে থাকে, শোগল বা মোরাকাবার মাধ্যমে ছালেক বা খোদাতালাশী ব্যক্তি বিভিন্ন লতিফার নূর দেখিতে পায়। একেক লতিফার নূর এক এক রংয়ের হইয়া থাকে। যেমন কালবের নূর সরিষা ফুলের মত হরিদ্রা রংয়ের। লতিফায়ে রূহের নূরের বর্ণ অগ্নিবৎ বা সোনালী। লতিফায়ে ছেরের নূরের বর্ণ সাদা-অতি তেজস্কর। লতিফায়ে খফির নূরের বর্ণ আকিক পাথরের মত কাল তবে দৃষ্টিরোধক নহে। লতিফায়ে আখফার নূরের বর্ণ সবুজ রংয়ের। লতিফা সমূহে আল্লাহতায়ালার নাম ও গুণ বাচক নামের জেকেরের দ্বারা ছালেকের লতিফায় আল্লাহতায়ালার নাম ও গুণ সমূহের অর্থাৎ আসমা ও সিফাতের নূর আসিয়া পড়ে। আল্লাহতায়ালা সকল শুভ গুণের উৎস। তাহার গুণবাচক নাম সমূহের নূরও সুন্দর। আল্লাহতায়ালার গুণবাচক নাম সমূহকে এক কথায় বলে আসমাউল হোসনা অর্থাৎ সৌন্দর্য ও কল্যাণময় নাম সমূহ। এই সুন্দর নাম সমূহের জেকেরের দ্বারা আল্লাহতায়ালার গুণ ও নাম সমূহের নূর আসিয়া লতিফা সমূহে পতিত হয়। লতিফা সমূহে নূর যে আসিয়া পড়িতেছে ছালেক তাহা তাহার মানস চোখে শোগল বা খেয়াল দ্বারা দেহের বাহিরে আলমে মেছালে দেখিতে পান। লতিফার রং দ্বারা কোন্ লতিফার জেকের হইতেছে তাহাও তিনি বুঝিতে পারেন। দেহের ভেতরের লতিফা সমূহে নূর পতনের দৃশ্য দেহের বাহিরে দেখিতে পারাকে বলে ছায়েরে আফাকী।
বিজ্ঞাপন
ছালেকের লতিফা সমূহে পার্থিব জীবনে বসবাসের জন্য যে গোনাহর কালিমা পড়ে, জেকেরের দ্বারা লতিফা সমূহ হইতে গোনাহর সেই সকল দাগ সমূহ উঠিয়া যায় যে রূপ উখা দিয়া ঘষিলে ধাতব পদার্থ হইতে জংয়ের দাগ উঠিয়া যায়। লতিফা সমূহ গোনাহর দাগ হইতে মুক্ত হয়। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) বলেন, প্রত্যেক ধাতব পদার্থ হইতে মরিচা তুলিবার জন্য যেমন উখা আছে, তদরূপ লতিফা সমূহ হইতে গোনাহর দাগ তুলিবার জন্য উখা আছে; সেই উখা হইল আল্লাহতায়ালার জেকের। এই রূপে নিজের দেহের সকল লতিফা সমূহের উপর আল্লাহতায়ালার জেকেরের দ্বারা যে নূর পতন হয়, তাহা দেখিবার নাম ছায়েরে আফাক। ছায়েরে আফাকের উদ্দেশ্য হইল, সকল লতিফা সমূহে আল্লাহতায়ালার ৮টি গুণবাচক নামের জেকেরের নূর দর্শন। আল্লাহতায়ালার এই আটটি গুণবাচক নাম হইল হায়াত, এলেম, কুদরত, এরাদত, সামাওয়াত, বাছারাত, কালাম ও তাকবীন। ছালেক যখন উল্লিখিত আটটি গুণাবলীর জেকের করেন, নূর দর্শন করেন এবং গুণাবলী সমূহে ছায়ের করেন, তখন এই ছায়েরকে ছায়েরে এসমোজ্জাহের বলিয়া অভিহিত করা হয়।
সিফাতে হাকীকী জাতের সহিত মিলিত হইয়া জাতকে ঐ নামে নামীয় করে। ঐ সমস্ত নামকে গুণ মিশ্রিত নাম বলা হয়। যেমন আলীম, কাদের, বছীর ইত্যাদি। এই সকল নামকে এসমোল বাতেন বলা হয়। উল্লিখিত গুণ মিশ্রিত নামের ছায়েরকে ছায়েরে এসমোল বাতেন বলা হয়। অনেকে ছায়েরে এছমোজ জাহেরকে হাড্ডি ও ছায়েরে এছমোল বাতেনকে হাড্ডির মধ্যের মজ্জা বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। কিন্তু ছায়েরে এছমোল বাতেন ছায়েরে এছমোজ্জাহের হইতে আরও গভীর, বলা যায় ছায়েরে এছমোজ্জাহের কোনো একটি ফলের বাহির আবরণের বর্ণনা: আর এছমোল বাতেন হইল ফলের ভিতরের শাসের বর্ণনা। একটি আমের বাহির আবরণে বা খোসায় বিচরণ করিলে আমটি কত বড়, কি রং তাহা বোঝা যাইবে। আর আমের শাসের মধ্যে গেলে তাহার প্রকৃত স্বাদ বোঝা যাইবে। তাই ছায়েরে এছমোজ্জাহের বা ছায়েরে এসমোল বাতেন অর্থাৎ ছায়েরে আফাক বা ছায়েরে আনফাস-এই উভয় ছায়েরেরই আবশ্যকতা রহিয়াছে। ছায়েরে আফাক বা ছায়েরে এছমোজ্জাহের দ্বারা পূর্ব কালের সূফীগণ, তাহাদের দেহের সাত লতিফায় জেকের জারী করাইতেন। সাত লতিফার প্রতি লতিফায় জেকের জারী করাইতে দশ হাজার করিয়া পর্দা তাহাদের অতিক্রম করিতে হইত বলিয়া তাহারা মনে করিতেন। এই রূপে সাত লতিফা সমূহে জেকের জারী করাইতে তাহারা সত্তর হাজার পর্দা ভেদ করিয়াছেন বলিয়া মনে করিতেন। সত্তর হাজার পর্দা ভেদ করিবার ফলে তাহারা আল্লাহতায়ালার সাক্ষাৎ লাভ করিতেন বা আল্লাহতায়ালার সহিত তৌহিদ প্রাপ্ত হইতেন বলিয়া মনে করিতেন। তখন তাহারা আল্লাহতায়ালার গুণ সমূহের পর্দায় ও গুণ মিশ্রিত নামের পর্দায় (ছায়েরে এছমোজজাহের ও ছায়েরে এছমোল বাতেন) ভ্রমণ করিয়া আল্লাহতায়ালার গুণে গুণান্বিত হইয়াছেন বলিয়া মনে করিতেন। বস্তুতঃ ইহা হইল তৌহিদে ওজুদীর চুড়ান্ত স্তর। বেলায়েতে ছোগরায় ছালেক বা তৎকালীন সূফীগণ আল্লাহতায়ালার নূর দর্শন করিতেন ঠিকই কিন্তু সকল নূরই জাতি নয়, আল্লাহতায়ালার সিফাতি নূরের প্রতিবিম্ব দেখিয়া তাহারা মনে করিতেন তাহারা আল্লাহতায়ালার জাতে বা মূল সত্ত্বায় পৌঁছাইয়াছেন। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে আল্লাহতায়ালার জাতি নূর বেলায়েতে ছোগরার স্তরে লাভ করা যায় না। আলাহতায়ালার জাতি নূর লাভ হয় বেলায়েতে উলিয়া ও কামালাতে নবুয়তের স্তরে। বেলায়েতে উলিয়া-যাহা ফেরেশতাদের বেলায়েত, সেই স্তরে পৌছাইলে ছালেকের আগুন, পানি ও বাতাস অর্থাৎ দেহের এই তিন উপাদানের যে সকল পার্থিব দোষ রহিয়াছে তাহা আল্লাহতায়ালার দায়েমী তাজাল্লী দ্বারা পবিত্রতা লাভ করে। আর কামালাতে নবুয়তের স্তরে পৌঁছাইলে ছালেকের দেহের মাটী লতিফা যাহা মানব দেহের প্রধান উপাদান তাহার উপরে আল্লাহতায়ালার সার্বক্ষণিক বা দায়েমী তাজাল্লী পড়িয়া পবিত্র হয়। ঐ স্তরের অর্থাৎ কামালতের নবুয়তের দায়েমী তাজাল্লীয়াতে জাতি নূরে ফানাপ্রাপ্ত ছালেক হেদায়েতের দায়িত্ব প্রাপ্ত হন।
বেলায়েতে ছোগরার স্তরে সূফীগণ আল্লাহতায়ালার গুণ সমূহের প্রতিবিম্বের পর্দায় ভ্রমণ করেন-কিন্তু কামালাতে নবুয়তের স্তরে আসিলে আর ছালেককে অন্তরমুখী হইয়া জেকের শোগল মোরাকাবা করিয়া ছায়ের করার খাটুনী করিতে হয় না। কামালতে নবুয়তের স্তরে বা তৎপূর্বে বেলায়েতে উলিয়ার স্তরে আল্লাহতায়ালার হাকীকী গুণ সমূহের নূরের ধারা যাহাকে দায়েমী তাজাল্লী বলে তাহা আপনা হইতে সার্বক্ষণিকভাবে আসিতে থাকে। বেলায়েতে উলিয়ার স্তরে ও কামালাতে নবুয়তের স্তরে ছালেক মোরাকাবা ও জেকের ছাড়াই যে আল্লাহতায়ালার দায়েমী তাজাল্লী বা সার্বক্ষণিক নূরের ধারা লাভকরেন, তাহাই প্রমাণ করে যে, সেই স্তরের ফানা প্রকৃত ফানা। কিন্তু পূর্বকালের সূফীগণ এই রূপ কোনো দায়েমী তাজাল্লী বা সার্বক্ষণিক নূরের ধারা পতনের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেন নাই। এই সার্বক্ষণিক নূরের বর্ষণ লাভের অভিজ্ঞতার কথা সূফীগণের মধ্যে সর্বপ্রথম উল্লেখ করেন হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব। তাহার পূর্ব যুগের সূফীগণ তাহাদের অভিজ্ঞতার যে বর্ণনা রাখিয়া গিয়াছেন তাহাতে তাহারা বলিয়াছেন যে, আল্লাহতায়ালার গুণ সমূহের নূর তাহারা কেবলমাত্র তখনই লাভ করিতেন যখন তাহারা আল্লাহতায়ালার গুণের পর্দার বা গুণ মিশ্রিত নামের জেকের ও মোরাকাবা করিতেন। যেহেতু হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের পূর্ব কালের সূফীগণ জেকের ও মোরাকাবা ছাড়া আল্লাহতায়ালার গুণ সমূহের নূর লাভ করিতেন না, তাই বোঝা যায়, তাহারা আল্লাহতায়ালার মূল জাত এমন কি তাহার হাকীকী সিফাত সমূহ হইতেও বহু নিম্নে বা দূরে ছিলেন। তাহারা যাহা লাভ করিতেন তাহা হইল আল্লাহতায়ালার গুণ সমূহের প্রতিবিম্ব বা জেলাল বা জেল্লী। অর্থাৎ আলমে মেছালের আয়নায় আল্লাহতায়ালার কামালাত ও হাকীকী সিফাতের যে প্রতিবিম্ব তাহারা নিজেদের মানস চোখে দেখিতেন তাহাকেই তাহারা আল্লাহতায়ালার গুণের নূর মনে করিতেন ও ঐ গুণ সমূহের জেল্লীতে বা প্রতিবিম্বের মধ্যে ছায়ের করিবার অর্থাৎ খেয়াল বা মোরাকাবা করিয়া তাহারা মনে করিতেন যে তাহারা আল্লাহতায়ালাকে লাভ করিয়াছেন। যেহেতু তাহাদের মধ্যে সার্বক্ষণিক আল্লাহতায়ালার নূর লাভের অভিজ্ঞতা প্রাপ্ত কোন সুফী ছিলেন না, তাই তাহারা এই হাকীকী সিফাতের সার্বক্ষণিক তাজাল্লী ও নূরের প্রতিবিম্বের পার্থক্য ধরিতে পারিতেন না। আলমে মেছালে তাহারা তাহাদের সাধনার ফল স্বরূপ যে সুন্দর মুখ দর্শন করিতেন তাহাই রব দর্শন মনে করিতেন। কিন্তু তাহা রব দর্শন নয়, সাধনার অবস্থা দর্শন। তবে ঐ সিফাতি নূরের প্রতিবিম্বের সহিত ফানা লাভ করিবারও কিছু ফল তাহারা লাভকরিতেন। এমনিভাবে সুদীর্ঘকালের নাফী-এজবাত জেকের দ্বারা তাহারা পার্থিব আকর্ষণ হইতে মুক্ত হইতেন। আলমে মেছালে তাহাদের সাধনার ফলাফলও দেখিতে পাইতেন, ইহাকে তাহারা আদামাত হইতে মুক্ত হওয়া মনে করিতেন।
বিজ্ঞাপন
আল্লাহতায়ালা মানুষকে শুভগুণ দ্বারা সৃষ্টি করিয়াছেন। আল্লাহতায়ালার শুভগুণ সমূহের কামালাতকে বলে ওজুদ। পার্থিব কামনা চলিয়া যাইবার পর তাহারা মনে করিতেন তাহাদের আদামাত চলিয়া গিয়াছে। তখন আদামাত বা কামনা-বাসনা মুক্ত দেহকে আল্লাহতায়ালার কামালাতের সমষ্টির সহিত ফানা প্রাপ্ত ওজুদ মনে করিতেন। বস্তুতঃ ইহাও ভ্রান্ত ধারণা-কারণ আল্লাহতায়ালার জাতি নূর বা জাতি নূরের সার্বক্ষণিক তাজাল্লী ছাড়া মানবদেহের আগুন, পানি, মাটি, বাতাস তাহাদের নীচু স্বভাব ত্যাগ করিতে পারে না। তাই নাফী-এজবাত জেকেরের দ্বারা পার্থিব আকর্ষণ কমিয়া বা নিঃশেষিত হইয়া গেলেও দেহস্থ উপাদান সমূহের যে নীচু স্বভাব তাহা বেলায়েতে উলিয়ায় ও কামালতে নবুয়তের স্তরে না আসিলে দূরীভূত হয় না। কোন ব্যক্তিকে স্বচক্ষে দেখিয়া সেই লোক সম্পর্কে ধারণা জন্মে; আবার তাহার ছবি বা আয়নায় তাহার প্রতিবিম্ব দেখিয়াও লোকটি সম্পর্কে ধারনা জন্মে। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের পূর্ব কালের সূফীগণ, এরূপ সিফাতে হাকীকী বা জাত মিশ্রিত সিফাতি নূরের প্রতিবিম্ব বা সিফাতে এজাফিয়ার প্রতিবিম্ব আলমে মেছালের আয়নায় বা আপন কালবের আয়নায় দেখিয়া আল্লাহতায়ালার হাই, আলীম, কাদির অর্থাৎ জীবন দাতা, সর্বজ্ঞানে জ্ঞানী, সর্বময় ক্ষমতায় ক্ষমতাবান, প্রভৃতি গুণবাচক নাম সম্পর্কে ধারণা লাভ করিতেন। আপন কালবে বা আলমে মেছালে এই সকল গুণের প্রতিবিম্ব দেখিবার কারণে তাহারা অনেক সময় ভবিষ্যতের ঘটনাবলী পূর্বেই বর্ণনা করিতে পারিতেন বা কামালাতের পরিচয় দান করিতেন।
ভবিষ্যত দর্শন অর্থ আল্লাহতায়ালার মারেফাত লাভ নয়। ভবিষ্যত বলার ক্ষমতা যাহা আলমে মেছালের আয়নায় অর্থাৎ কালব পরিস্কার হইলে হাকীকী কালব বা মহাকালবের যে প্রতিবিম্ব কালবে আসিয়া পড়ে তাহা হইতে আল্লাহতায়ালার মারেফাতের পথের যাত্রীগণ অতি অল্প সাধনার দ্বারাই লাভ করিতে পারেন। এই জন্য কারামাত প্রদর্শনকে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব কাঁচা সূফীদের লম্ফ-ঝক্ষ বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। আর বেলায়েত উলিয়ার স্তরে বা কামালাতে নবুয়তের স্তরে পৌছাইয়া আল্লাহতায়ালার দায়েমী তাজাল্লী লাভ করিয়া দেহকে পরিপূর্ণ পবিত্র করিবার পরই প্রকৃত ফানা লাভের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয় মাত্র। প্রকৃত মারেফাত লাভ হয় আরও উর্ধ্বে, হকিকত জগতের উর্ধ্বে মাবুদিয়াতে ছেরফা ও হোব্বে ছেরফা পার হইয়া কুওতে নজরিয়ার মাধ্যমে লা-তাইনস্থিত নিছক জাতে ফানা লাভকরিবার পরে। তাই ছায়েরে আফাক বা ছায়েরে আনফাসকে পূর্ববর্তী কালের সূফীগণ ছায়েরে ফিল্লাহ বা আল্লাহতায়ালার মধ্যে ভ্রমণ বলিলেও প্রকৃত পক্ষে তাহা হইল আল্লাহতায়ালার প্রতিবিম্বিত নূরের মধ্যে ছায়ের। এই ছায়ের যদিও আল্লাহতায়ালার পরিচয় গ্রহণে ও আল্লাহতায়ালার গুণাগুণ সমূহ অনুধাবন করিতে সাহায্য করে; তাহাকে ছায়েরে ফিল্লাহ বা আল্লাহর মধ্যে ছায়ের বলা যায় না। ইহা বস্তুত ছায়েরে এলাল্লাহ্ বা আল্লাহতায়ালার অভিমুখে ভ্রমণের একটি অতি প্রাথমিক স্তর।
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব উল্লেখ করিয়াছেন, জাতের মধ্যে কদমী ছায়ের বস্তুতঃ পক্ষে সৃষ্টির পক্ষে সম্ভবই নয়। হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ), যিনি আল্লাহতায়ালার সৃষ্ট শ্রেষ্ঠ মানব তাহাকেও আল্লাহতায়ালা তদীয় জাতে কদমী ছায়েরের অনুমতি দান করেন নাই। মে'রাজ রজনীতে নবীজী (সাঃ) জাতের প্রান্তে যখন পৌছাইলেন, তখন তাহার উদ্দেশ্যে বলা হইল, "কিফ ইয়া মুহাম্মদ"-অর্থাৎ হে মুহাম্মদ! আপনি থামুন। আল্লাহতায়ালার জাত মোজাররাদায় ছায়ের সম্ভব হয় না-যাহা সম্ভব হয়-তাহা হইল পবিত্র জাত মোজাররাদার দরশন-আর তাহা খোদাদত্ত নূরের শরীর ওজুদ মাওহুব লাহুর কুওতে নজরীয়ার দ্বারা দরশন। আকরাবিয়াতের শেষে কাওছের মাকামে ছালেক খোদাদত্ত শরীর ওজুদ মাওহুব লাহু লাভকরেন। নাফী-এজবাত জেকেরের দ্বারা ঐ খোদাপ্রেমের নবজাত শিশু বয়ঃ প্রাপ্ত হয়। ঐ ওজুদ মাওহুব লাহুই আল্লাহতায়ালার সিফাতের মধ্যে ভ্রমণ করিয়া সমস্ত সৃষ্টি বস্তুর সহিত সংযোগ স্থাপন করে ও আল্লাহতায়ালার জাতের দরশন লাভ করিয়া থাকে। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের প্রদর্শিত পথে এই রূপেই আল্লাহতায়ালার জ্ঞান লাভ হয়।
বিজ্ঞাপন
শুধু মাত্র নূর দরশনে এই তরিকার কামেল ব্যক্তি সন্তুষ্ট হন না। এই তরিকতে ছালেক বেলায়েতে ছোগরার পর বেলায়েতে কোবরা বা তদ্ঊর্ধ্ব জগতে উন্নীত হন জজবা বা আল্লাহতায়ালার মহব্বতের আকর্ষণ দ্বারা। এই তরিকায় জজবা' দ্বারাই ছুলুক' অর্জিত হয় ও আনফাস আফাকে পরিণত হয়। এখানে প্রথম সোপানই হইল মহব্বত ও জজবা, যাহা মকছুদ অর্জন করিবার প্রধান মাধ্যম। এই তরিকার ছুলুক বিহীন জজবাও মোর্শেদে কামেলের তোফায়েলীতে লাভ হয়। এই তরিকায় আকরাবিয়াতের স্তর হইতে খাটী ছুলুক নাই, অসম্পূর্ণ জজবাও নাই। এই তরিকার পরিচালকগণ হইলেন আম্বিয়াগণ-যাহারা সকল সময়েই নূর প্রাপ্ত হইয়া থাকেন। তাই নূরের প্রতি তাহাদের কোনো আকর্ষণ নাই। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব ফরমান, যে অবস্থায় জজবা প্রথম, সেই অবস্থাই শ্রেষ্ঠ।
যাহা হউক, ছায়েরে আফাক ও ছায়েরে আনফাস যাহা বেলায়েতে ছোগরায় লাভ হয় তাহা যেহেতু আল্লাহতায়ালার নূরের প্রতিবিম্ব মাত্র, তাহা যথেষ্ঠ বলিয়া মনে করিয়া থাকিলে আল্লাহতায়ালার মারেফাত লাভ হইবে না। তবে বেলায়েতে ছোগরার সর্বোচ্চ তৌহিদে ওজুদীর স্তর আল্লাহতায়ালার দিকে যাওয়ার পথে অন্যতম মাকাম। সাধক এক আল্লাহতায়ালার উদ্দেশ্যে সকল কিছুই ত্যাগ করিয়া এই স্তরে উন্নীত হন। মারেফাত জগতে অগ্রসর হইবার পথে ইহা একটি স্তর, তবে শেষ স্তর নয়। তাই ছায়েরে আনফাস বা ছায়েরে আফাক যাহাই বলা হউক না কেন, তাহাও নাফী করিতে হয় বা ফেলিয়া সম্মুখে অগ্রসর হইতে হয়। তবে এই মাকামে নূরের স্রোত খুবই প্রবল। ছালেকের ছয় বা দশ লতিফায় সিফাতে এজাফিয়া ও নূরে মুহাম্মদী-এই দুই প্রকার নূরের বন্যার প্রতিচ্ছবি ছালেক আপন কালবের আয়নায় বা আলমে মেছালের আয়নায় দেখিতে পান। আলমে মেছালে এই নূরের বন্যা এমনই প্রবল দেখা যায় যে সমস্ত সৃষ্টিকে নূরের সাগরে নিমজ্জিত দেখা যায়। সাগরে শৈবাল, পাহাড়-পর্বত, তৃন-উদ্ভিদ, হাংগর, তিমি, মৎস প্রভৃতি থাকিলেও দর্শকের চোখে শুধু পানি আর পানিই দেখা যায়। বেলায়েতে ছোগরা বা তৌহিদে ওজুদীর স্তরে ছালেক যখন ছায়েরে আনফাস বা আফাকে রত হন তাহা দ্বারাও সমগ্র সৃষ্টিকে তিনি নূরের সাগরে নিমজ্জিত দেখেন। সেই নূরের সাগর দেখিয়া অনেক ছালেক দিকবিদিক জ্ঞান শূন্য হইয়া যান। কিন্তু সৃষ্টি জগৎ সমূহকে এই ছায়েরে আফাক বা ছায়েরে আনফাস দ্বারা তফশিলীভাবে বা পৃথক পৃথক রূপে জানা যায় না। যেমন জানা যায় ছায়েরে এছমোজ্জাহের বা ছায়েরে এছমোল বাতেনের দ্বারা কাওছ ও বেলায়েতে উলিয়ার স্তরে।
বেলায়েতে ছোগরার স্তরে ছালেকের নাফস শক্তিপ্রাপ্ত হয় বা মোৎমাইন্নার গুণ লাভ করে। আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে কখনও কখনও এলহাম শুনিতে পায়। নিজেকে নূরের সাগরে নিমজ্জিত দেখিতে পায়। "অহুয়া মায়াকুম আয়নামা কুনতুম" অর্থাৎ তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সংগে আছেন-কুরআন মজীদের এই বাণীর সারমর্ম এলহামের দ্বারা ছালেক লাভ করিতে থাকে। অনেক সূফী সাধকই এই দায়েরাতে নেশাগ্রস্থ হইয়া পড়ে। ক্রমে ক্রমে সাধক নেশামুক্ত হইয়া আসল দায়েরা হইতে তাজাল্লীয়াতে বরকির দ্বারা বেলায়েতে কোবরার পথে অগ্রসর হন ও আল্লাহতায়ালার মহব্বতের দ্বারা পরিচালিত হন। বেলায়েতে কোবরার যে জ্ঞান-তাহাকে তরিকত পন্থীগণ আক্লে মায়াদ বা উৎপত্তিস্থলের জ্ঞান বলিয়াছেন। এই জ্ঞান আক্লে মায়াশ বা এলমে হুছুলী বা ইন্দ্রিয় গ্রাহ্যভাবে ধরা যায় না বা বোঝা যায় না। পক্ষান্তরে বেলায়েতে ছোগরা নূরের জেল্লীর জগৎ হইলেও তাহাতে ধরা ছোয়ার বা দেখিবার বা বুঝিবার কিছু থাকিয়া যায়। কিন্তু আকরাবিয়াত বা ঊর্ধ্ব জগতের যে জ্ঞান সেই জ্ঞান উৎপত্তিস্থলের জ্ঞান, যেখানে আকার বা আকৃতি নাই।
বিজ্ঞাপন
এই আকার বা আকৃতিবিহীন জগতের জ্ঞান এলমে হুজুরীর জ্ঞান যাহা শুধু মাত্র উপলব্ধি করা যায়; বর্ণনা করা দুঃসাধ্য। এই বেলায়েতে ছোগরার জগৎ হইতে ছালেকগণ যে স্তরে পৌঁছান, তাহা আম্বিয়া দিগের বেলায়েত; সেখান হইতেই আল্লাহতায়ালার হাকীকী সিফাতের জগৎ ও মহব্বত জগতের শুরু। আম্বিয়াগণের বেলায়েতের স্তরের পর তাহাদের কামালাতের স্তর শুরু হয়।
বেলায়েতে ছোগরা পর্যন্ত ফয়েজ পতন হয় কালব ও রূহের উপর। বেলায়েতে কোবরা হইতে ফয়েজ পতনের স্থান নিরূপিত হয় নাফস। আল্লাহতায়ালার হাকীকী সিফাতের নূর পতনের দ্বারা নাফস তাহার স্বভাব দ্রুত পরিবর্তন করে। ছালেক তখন "মান আরাফা নাফসাহু ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু" এই হাদীসপাকের তাৎপর্য উপলব্ধি করিতে শেখে। এই নাফস আল্লাহতায়ালার এলহাম দ্বারা পরিচালিত হয়। এই নাফস তখন আল্লাহতায়ালার হাকীকী নূর লাভ করিতে থাকে-তখন নাফসও আল্লাহতায়ালার হাকীকী নূর দ্বারা হাকীকী জ্ঞান লাভ করিতে থাকে। এই স্তরে নাফস যে জ্ঞান লাভ করে তাহা সাধারণ মানবীয় জ্ঞানের উর্ধ্বলোকের জ্ঞান। এই স্তর হইতে যে জ্ঞান রাজ্যের শুরু হয় তাহা হাদেস বা ধ্বংসী নয়; তাহা চিরস্থায়ী।
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের পূর্বতন ওলীগণের মতে জজবা, ছুলুক, আফাক, আনফাসের জ্ঞানের মধ্যেই বেলায়েত বা আল্লাহতায়ালার জ্ঞান সীমাবদ্ধ। কিন্তু হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব জজবার উৎস-মহব্বতে এলাহিকেই তরিকতের পথে অগ্রসর হইতে তথা জাতের পরিচয় গ্রহণের সর্বাপেক্ষা কার্যকরী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করিয়াছেন। এই মহব্বতের দ্বারাই অন্যান্য তরিকতের ছায়ের-ছুলুক, উরুজ-নজুলের ফলাফল এই তরিকায়ে মুজাদ্দেদিয়ায় লাভ হইয়া থাকে। যখন আল্লাহতায়ালার করুনায় মহব্বত বৃদ্ধি হইতে থাকে তখন গায়রুল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া অন্য সব কিছুর আকর্ষণ ঐ মহব্বতের আগুনে পুড়িয়া ছাই হইয়া যায়। ইহার ফলে ছালেকের সমস্ত মন্দ-স্বভাব দূর হইয়া যায়। ছায়ের ছুলুক অর্থাৎ আফাক ও আনফাসের জন্য যে খাটুনী অন্যান্য তরিকায় প্রয়োজন হয়; এই তরিকার ছালেকগণ তাহা মহব্বত দ্বারাই অর্জন করিয়া থাকেন।
বিজ্ঞাপন
মহব্বত অনুসরণ আনয়ন করে। মহব্বত যখন পূর্ণ হইয়া যায়; তখন অনুসরণকারীও কামেল হইয়া যায়। ইহাকে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব ছায়েরে মাহবুবী বলিয়াছেন। হযরত নবী করীম (সাঃ) এর হাদীস "যে যাহাকে ভালবাসে, সে তাহার সহিত থাকিবে।" মাহবুব আল্লাহতায়ালাকে যখন আফাক ও আনফাস দ্বারা পাওয়া যায় না; তখন মহব্বত দ্বারাই মাহবুবের নিকট পৌঁছানো যায়। আল্লাহ বলেন, যে আমাকে পাইবার জন্য চেষ্টা করে, আমি তাহাকে সাহায্য করি। মাহবুবের জন্য মহব্বত লইয়া সম্মুখে আগাইয়া আসিলে মাহবুবও তখন নিকটে আগাইয়া দাঁড়ান এবং প্রকৃত সংগী হইয়া যান। তাই তরিকায়ে মুজাদ্দেদিয়ার অনুসারীগণ আফাক ও আনফাস বাদ দিয়া মহব্বতের পথই অনুসরণ করেন। মাহবুব নবী করীম (সাঃ) এর অনুসরণ করা তাহাদের আবশ্যকীয় কাজ এবং নবী করীম (সাঃ) এর পছন্দনীয় শরীয়তের অনুসরণ তখন তাহাদের পছন্দনীয় কাজ হইয়া দাঁড়ায়। মহব্বতের কামালাত৩-এর চিহ্ন হইল শরীয়তের নিয়মাবলী ও বিধান সমূহ সঠিকভাবে অনুসরণ করা। ছুলুক ও জজবার উদ্দেশ্য হইল নাফসের স্বভাব সংশোধন করা। এই উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য আনফুসি ছায়ের খুবই প্রয়োজনীয়। কিন্তু ছায়েরে আফাক বা আনফুসিই ছালেকের মকছুদ নয়। মকছুদ আল্লাহতায়ালা।
এই তরিকায় আল্লাহতায়ালাকে পাইবার জন্য মহব্বতই প্রথম ও প্রধান উপায়। মহব্বতের বৈশিষ্ট্য হইল-মানুষ নিজেকে ভালবাসে; সন্তান-সন্তুতি, সহায়-সম্পদকে ভালবাসে। ইহা সবই আত্ম প্রীতি। এই তরিকায় ছায়েরে আনফুসীর ধারা হইল-সন্তান সন্তুতি ও পার্থিব সম্পদের প্রতি যে মহব্বত সেই মহব্বতকে আল্লাহমুখী করা ও পরে নিজের প্রতি যে মহব্বত থাকে সেই মহব্বতকেও আল্লাহমুখী করা। এই তরিকতে ছায়েরে আনফুসির অর্থ হইল নিজের অস্তিত্বকে ভুলিয়া যাওয়া ও নিজেকে পরিপূর্ণ রূপে ত্যাগ করা। এই ছায়েরের শেষ পর্যন্ত পৌঁছানো একান্তই আল্লাহতায়ালার দয়া ও মহব্বত দ্বারাই হইয়া থাকে। এই তরিকায় তাই ছায়েরে আনফুসির অর্থ হইল নিজের প্রতি মহব্বত সম্পূর্ণরূপে বিসর্জন দেয়া। আর এই নিজেকে ভুলিয়া যাইবার ও নিজেকে পরিপূর্ণরূপে পরিত্যাগ করিবার যে জ্ঞান তাহা লাভকরিবার জন্য আনফাস ছায়ের অর্থাৎ জেকেরের নূর দর্শনের ছায়ের চলিয়া যাইবার নাম আফাকী। তরিকায়ে মুজাদ্দেদিয়াতে ছায়েরে আফাক ও ছায়েরে আনফুসী তাই পৃথক। অন্যান্য তরিকায় নূর দর্শন যেমন ছায়েরে আফাক; এই তরিকায় বেলায়েতে কোবরার স্তরে নূর দর্শন করিতে না পারাই ছায়েরে আফাক। তাই এই তরিকার নিয়ম অন্যান্য তরিকার বিপরীত। নূর দর্শন নয়; আল্লাহতায়ালার মহব্বত দ্বারা আল্লাহতায়ালার নিকট পৌঁছানোই এই তরিকার বৈশিষ্ট্য। নূরকে বাদ দিয়া তাই খোদ আল্লাহতায়ালার প্রতি আকর্ষণ এই তরিকার মূল কথা। খোদ আল্লাহতায়ালার প্রতি আকর্ষণ পয়দা হইলে আল্লাহই তখন ছালেককে জাত পর্যন্ত পৌঁছানোর ক্ষমতা দেন।
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের পূর্বের যুগের সূফী সাধকগণ মনে করিয়াছেন যে ছালেকের কালবের পর্দা বা আয়নায় আল্লাহতায়ালার সিফাতের নূরের জেল্লী পতন হয় বলিয়া সেই নূরের দ্বারা ছালেকের নাফসের স্বভাব পরিবর্তন হয়।
বিজ্ঞাপন
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, আসলে নূরের প্রতিবিম্বের দ্বারা কালবে আল্লাহতায়ালার নাম ও গুণের প্রতিবিম্ব আসে বটে কিন্তু আল্লাহতায়ালার গুণ সমূহ আসিয়া নাফস পরিবর্তন করিতে পারে না। মনের ভিতর যে সকল আকর্ষণ নিজের প্রতি বা অন্যের প্রতি ছিল, তাহা আসমা ও সিফাতের নূরের জেল্লীতে চলিয়া যায়। তখন আল্লাহতায়ালার প্রতি মহব্বত সৃষ্টি হয় অর্থাৎ তখন আল্লাহতায়ালা যাহা বলেন বা যে বিধানই তিনি দান করেন, নাফস তাহা মানিয়া লয়। এই অবস্থায় মন একেবারে শূন্য হইয়া যায়। অর্থাৎ কাহারও প্রতি বা কোনো বস্তুরই প্রতি আর আকর্ষণ থাকে না। শূন্য হইলে পূর্ণ হয়। অর্থাৎ তখন মনে শূন্যতা সৃষ্টি হইয়া ভাল স্বভাব বা আল্লাহতায়ালার হাকীকী নূর গ্রহণের জন্য প্রস্তুত হয়।
মোহ মুক্তির জন্য বেলায়েতে ছোগরার জ্যোতির গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। এই জ্যোতি মোহমুক্তির পূর্বে আসিলে তাহাকে বেলায়েতে ছোগরার নূরের জেলাল বা প্রতিবিম্ব মনে করিতে হইবে। আর যদি মোহ মুক্ত হইবার পর নূরের আগমন দেখা যায় তাহাকে হাকীকী নূর মনে করিতে হইবে। এই হাকীকী নূর অবশ্য আল্লাহতায়ালার গুণাগুণ আনিতে পারে ও নাফসকে সংশোধন করিতে পারে। তাই বেলায়েতে কোবরার স্তরে যে ফয়েজ পতিত হয়, তাহার স্থান নির্বাচিত করা হইয়াছে নাফস। আর বেলায়েতে ছোগরার মাকামে প্রতিবিম্ব বা জেল্লী দেখা যায় কালবের আয়নায়। তাই বেলায়েতে ছোগরায় নূর পতন হয় কালবে।
বেলায়েতে ছোগরায় যে নূর আগমন করে, মুজাদ্দেদ ছাহেবের মতে তাহা হাকীকী নূর নহে; তাই তাহা নাফস সংশোধন করিতে পারে না। কিন্তু এই জেলাল বা প্রতিবিম্বের নূরের প্রয়োজনীয়তা হইল হৃদয় আয়নাকে অন্ধকার মুক্ত করা; মোহমুক্ত করা। ইহার পর অন্ধকার চলিয়া গেলে আল্লাহতায়ালার হাকীকী নূর আসিবার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়। বাদশাহর আগমনের পূর্বে পরিষদগণ রাজ দরবারে আসন গ্রহণ করেন। পরিষদগণের আগমন অর্থ বাদশাহের আগমন নয় কিন্তু তাহা অবশ্যই বাদশাহের আগমনের প্রতীক বা আগমনের ইংগিত বহন করে। বেলায়েতে ছোগরায় যাহাকে পূর্বতন সূফীগণ ছায়েরে আফাক ও আনফাস বলিয়া ধারণা করেন তাহাকে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব মারিফতের রাস্তার ধুলাবালি বলিয়াছেন। তবে এই স্তরকে বাদ দিয়া সম্মুখে অগ্রসর হওয়া যায় না।
বিজ্ঞাপন
আকরাবিয়াতের উপরে আল্লাহতায়ালার যে পরিচয় ছালেক বা সাধক লাভ করেন-তাহার বিবরণ কি? আল্লাহতায়ালার পরিচয় সম্পর্কে শরীয়তে বলা আছে, তোমরা যাহা বল তাহা হইতে তিনি উর্ধ্বে। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) বলেন, আল্লাহকে বোঝা যায় না। আল্লাহতায়ালা নিজে পরিচিত হইতে চাহিয়াছেন-তাই তিনি সৃজন করিয়াছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ফেরেশতা ও রূহ সেই সময়ের মধ্যে আল্লাহর সমীপে পৌঁছাইতে পারে যাহার দৈর্ঘ্য পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। অতএব "মান আরাফ নাফসাহু ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু" বা যে নিজেকে চিনিল, সে রবকে চিনিল-এই হাদীসপাকের তাৎপর্য যেন ৫০,০০০ বছরের পথ ব্যাপী বিস্তারিত। ছায়েরে এলাল্লাহ ও ছায়েরে ফিল্লাহর পরেও যদি আল্লাহকে বুঝিতে না পারা যায়, ছালেকের মানসিক অবস্থা কি দাঁড়ায়? যদিও আল্লাহপাককে বোঝা যায় না। হযরত আবুবকর সিদ্দিকী (রাঃ) ছাহেব না বুঝিতে পারার মারেফাত দান করার জন্য আল্লাহতায়ালার শোকর গুজার করিয়াছেন। আর হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, “যে স্বাদ গ্রহণ করিল না, সে কিছুই বুঝিল না।"
যে নিজেকে চিনিল, সে রব্বকে চিনিল। এই হাদীস পাকের ভেদ বুঝিবার দুইটি পথ। একটি নিজের দিক হইতে যাত্রা শুরু করিয়া আল্লাহতায়ালার জ্ঞান লাভ। আর দ্বিতীয়টি হইল আল্লাহতায়ালা হইতে শুরু করিয়া নিজের নিকট পৌঁছানো। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের পূর্ব যুগের সাধকগণ নিজের হইতে আল্লাহতায়ালা পর্যন্ত পৌঁছাইতে চাহিয়াছেন। আর হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী যে পথ নির্দেশ করিয়াছেন তাহা হইল আল্লাহ হইতে শুরু করিয়া নিজের মধ্যে পৌঁছানো। মহব্বতের দ্বারা মাহবুবের নিকট পৌঁছানো সহজ পথ। কারণ আল্লাহপাক যাহা করেন, তাহাই মঙ্গলজনক। যাত্রা তাই আল্লাহতায়ালা হইতে শুরু করাই মুজাদ্দেদিয়া তরিকার ছায়েরে আনফাসের বৈশিষ্ট্য।
আল্লাহপাক দুইটি পথে মানুষকে কবুল করেন বা গ্রহণ করেন। ইহার একটি পথের নাম এজতেবা, অন্যটির নাম এনাবত। এজতেবার রাস্তা হইল মোরাদের রাস্তা। আর যাহারা এনাবতের রাস্তা দিয়া চলেন তাহাদের মুরীদ বলে। প্রথমটি কামালাতে নবুয়তের পথ। দ্বিতীয়টি কামালাতে বেলায়েতের পথ। এই দুই পথই আল্লাহতায়ালার মনোনীত রাস্তা। আল্লাহপাক কুরআন মজীদে বলেন, আল্লাহপাক যাহাকে ইচ্ছা নিজের দিকে খাছ করিয়া লন। ইহা তাহার অসীম দয়া। এই এজতেবার রাস্তা দিয়া হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) ছাহেব ও হযরত উমর ফারুক (রাঃ) ছাহেব আল্লাহতায়ালার কবুলিয়াত লাভ করেন। হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) ছাহেবের মর্যাদা সম্পর্কে হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) বলেন, আমার কালবে যে জ্ঞান আল্লাহতায়ালা দান করিয়াছেন, তাহা আমি আবুবকরের কালবে রাখিয়াছি। আর হযরত উমর ফারুক (রাঃ) সম্পর্কে হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন, "আমার পরে যদি কেহ নবী হইতেন তবে তিনি হইতেন উমর। নবুয়ত বন্ধ হইয়াছিল বলিয়া হযরত আবুবকর (রাঃ) এবং হযরত উমর (রাঃ) ছাহেবদের নবী হইবার সুযোগ ছিল না। তবে নবী (আঃ) গণের কামালাত আল্লাহতায়ালা তাহাদের দান করিয়াছিলেন-উপরের হাদীস
বিজ্ঞাপন
দুইটি হইতে তাহাই বোঝা যায়। নবুয়তের শান ইহাই যে, আল্লাহতায়ালা প্রথমে কবুল করেন ও পরে প্রকাশ করেন। ইহা আল্লাহতায়ালার ফজল। যাহাকে ইচ্ছা তাহাকে ইহা দান করেন।
ছায়েরে এলাল্লাহ, ছায়েরে ফিল্লাহ, ছায়েরে এছমোল বাতেন ইত্যাদি সকলই আল্লাহতায়ালার বিভিন্ন নূরের দ্বারা সংগঠিত হয়। ছায়েরে এলাল্লাহ বা ছায়েরে আফাক ও আনফাস যাহা বেলায়েতে ছোগরার মাকামে লাভ হয় বা সিফাতে এজাফিয়ার নূর দ্বারা লাভ হয়, তাহা ছালেককে নিম্নলিখিত গুণ সমূহ দান করে,
★ তওবা বা পাপে নিবৃত্তি।
★ যোহদ বা দুনিয়া বিরাগ,
★ তাকওয়া বা আল্লাহকে ভয় করা।
★ রেয়াজত বা কঠোর ব্রত।
★ ফকর বা দরিদ্রতা, বা লিপ্সা ত্যাগ।
বেলায়েতে কোবরা ও বেলায়েতে উলিয়ার স্তরে তাজাল্লীয়াতে হাকীকী সিফাত লাভ করিলে ছালেক আরও বহু গুণ লাভ করেন। ইহার অন্যতম হইল আল্লাহতায়ালার মহব্বত বা এশকে এলাহি, খোদাতায়ালার দান ও বখশিষ গুণ, শোকর, ছবর, মাকামে রেজা ও তাওয়াক্কুলের পূর্ণতা লাভ হয়। কামালাতে নবুয়ত ও তঊর্ধ্ব মাকামে তাজাল্লীয়াতে জাতি নূর দ্বারা মহব্বতে জাতি, ইয়াকীন, এখলাস, তাসলিম ও মাকামে রেজা হাছিল হয়। বিশুদ্ধ জাতি নূরের তাজাল্লা পতন কামালাতে নবুয়ত হইতে শুরু হয় ও হোব্বে ছেরফার মাকাম পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। এই নূর দ্বারা আল্লাহতায়ালার শান ও ইতেবার বা মাহাত্মের নূর ছালেকের উপর পতিত হয়, যাহা ছালেক বিনা ছায়েরেই বা মোরাকাবা ছাড়াই দেখিতে পায়।
আকরাবিয়াতের স্তরে আল্লাহতায়ালার ইচ্ছা ও আকর্ষণ দ্বারা অগ্রসর হইয়া আল্লাহতায়ালার মহব্বতের রাজ্যে ছালেক প্রবেশ করেন। সিফাতে হাকীকী নূর আসিবার প্রাক্কালে তাজাল্লীয়াতে বরকী দ্বারা ছালেক তাহার প্রকাশ্য অস্তিত্ব নিঃশেষিত হইয়া যাইতে দেখেন। তখন ছালেক মহব্বত দ্বারাই আকর্ষিত হইয়া থাকেন। যাহা আম্বিয়া ও নবী (আঃ) গণের অনুসরণ ও তোফায়েলী দ্বারাই লাভ হয়।
হে জাকেরান! তোমরা যদি বেলায়েতে ছোগরার তৌহিদে ওজুদী বা পার্থিব আকর্ষণ হইতে মুক্ত হইয়া আল্লাহতায়ালার ওজুদ গুণের প্রতিবিম্ব নিজের মধ্যে লাভ করিয়া হায়াতে আবাদী লাভ করিতে চাও; বা তাহার উর্ধ্বে আল্লাহতায়ালার মহব্বতের আকর্ষণ দ্বারা আম্বিয়া ও নবী (আঃ) গণের বেলায়েত দ্বারা আল্লাহতায়ালার হাকীকী নূর ও জাতি নূর দ্বারা কামালাতে নবুয়তের মর্যাদা লাভ করিয়া এই পৃথিবী হইতে সকল গ্লানি মুক্ত হইয়া বেহেশতের ঘ্রান ও জিন্দেগীর স্বাদ পাইতে চাও, তাহা হইলে আমার দয়াল পীর কেবলাজান হুজুর হযরত মাওলানা খাজাবাবা শাহসূফী এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেবের প্রদর্শিত পথ অনুসরণ কর, তদীয় মহব্বত দেলে হাছিল করার চেষ্টা কর। আমার দয়াল পীর কেবলাজান হুজুর ছিলেন হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের পরিপূর্ণ নেছবতের অধিকারী এবং আল্লাহ ও রাসূলে পাক (সাঃ) এর পূর্ণ মহব্বত ও জ্ঞানের অধিকারী।
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের পর এত বড় ওলী আর পৃথিবীতে আসেন নাই। আল্লাহতায়ালার সমুদয় কামালতের পরিপূর্ণ জ্ঞানও আর কাহারও মধ্যে ছিল না। তোমরা যদি সেই জ্ঞান পরিপূর্ণ লাভ করিতে চাও, তবে নিজেকে সম্পূর্ণ রূপে তাহার কদমে রাখিয়া ইহ ও পরকালের সকল আকর্ষণ মুক্ত হইয়া তাহার ইচ্ছা দ্বারাই পরিচালিত হও। তাহার নিকট এইরূপ থাক যেমন ধৌতকারীর নিকট মুর্দা থাকে। তাহা হইলেই তদীয় কামালাত ও মহব্বত দ্বারা আল্লাহ ও রাসূল (সাঃ) এর পূর্ণ মহব্বত হাছিল হইবে। আর আল্লাহ ও রাসূলে পাক (সাঃ) এর পূর্ণ মহব্বতই খোদাতত্ত্ব জ্ঞানের পথের মূল পাথেয়, যাহা হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) কে ও হযরত উমর ফারুক (রাঃ) কে কামলাতে নবুয়তের মর্যাদা ও জ্ঞান দান করিয়াছিল। তোমরাও আমার পীর কেবলাজান হুজুরের মহব্বত ও তোফায়েলী দ্বারা ঐরূপ নেয়ামত লাভ কর, যে নেয়ামতের সংবাদ হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব রাখিয়া গিয়াছেন। দু'আ। ইতি।








