রাসূলে পাক (সাঃ)-ই প্রথম সৃষ্টি তিনি আল্লাহর জাতি নূরে সৃষ্ট

হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘ঈদে মিলাদুন্নবী ও জাকের পার্টির আদর্শ-লক্ষ্য’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ নবী করীম (সাঃ) এর শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কীয় আলোচনাঃ
বিজ্ঞাপন
হিজরী বর্ষ পঞ্জিকার তৃতীয় মাস রবিউল আউয়াল। এই মাসের ১২-ই তারিখ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এক দিবস। কারণ, ১২-ই রবিউল আউয়ালে এই ধরার বুকে আবির্ভূত হন জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, নিখিল বিশ্বের ত্রাণকর্তা, করুণার আধার, রাহমাতুল্লিল আ'লামীন, উসওয়াতুন হাছানাহ, সারওয়ারে কায়েনাত, মোফাখারে মওজুদাত, হযরত আহমদ মুজতবা, মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ)। তাহার আবির্ভাবে পুলকিত হয় জগৎ বিশ্ব, আনন্দ মুখরিত হয় গাছ-পালা, বৃক্ষ-লতা, পশু-পাখী, আসমান-জমীন, ফেরেশতা তথা সমস্ত সৃষ্টিই। প্রকৃতির হৃদয়ে আনন্দ উথলিয়া উঠে।
তিনি ছাইয়েদুল বাশার বা মানব ছরদার। তিনি রাহমাতুল্লিল আ'লামীন বা জগতসমূহের জন্য রহমত। তিনি জাতে (সত্তায়) উদ্ভুত প্রেমের প্রথম বিকাশ। তিনিই সৃষ্টির কারণ ও উৎস। তাহাকে সৃষ্টি না করিলে আল্লাহতায়ালা আর কিছুই সৃষ্টি করিতেন না। আল্লাহ্পাক বলেন,
لَوْلاكَ لَمَا خَلَقْتُ الْأَفْلَاكَ
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ-'(হে নবী!) আপনাকে পয়দা না করিলে আসমান-জমীন কোন কিছুই পয়দা করিতাম না।'
রাসূলে পাক (সাঃ)-ই প্রথম সৃষ্টি। তিনি আল্লাহর জাতি নূরে সৃষ্ট এবং অপরাপর সমুদয় সৃষ্ট তাঁহারই নূরে সৃষ্টি। তিনি নিজেই বলিতেন,
أَنَا مِنْ نُوْرِ اللَّهِ وَالْخَلْقُ مِنْ نُّوْرِى
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ-'আমি আল্লাহর নূর হইতে এবং সৃষ্টি জগতের সবকিছু আমার নূর হইতে।' তিনি তখনও নবী ছিলেন যখন আদম (আঃ) মাটি ও কাদায়।
তিনি আদম বংশের ছরদার ও ইমাম। তাঁহার মধ্যেই সমস্ত সৃষ্টির তথা (ফেরেশতা, মানব, জ্বীন ইত্যাদির) হকিকত নিহিত। তিনি হাকিকাতুল হাকায়েক বা সমস্ত হকিকতের হকিকত। এই দৃষ্টিতে তিনি সকলের নবী। তিনি ফেরেশতাদের নবী, মানুষের নবী, পশু-পাখী, গাছ-পালা, বৃক্ষ-লতারও নবী, অপরাপর নবী-রাসূল (আঃ) গণেরও নবী। আল্লাহ্পাক এবং সকল সৃষ্টির মধ্যে তিনি মধ্যস্থতাকারী। যাবতীয় নেয়ামত, রহমত তাঁহারই মধ্যস্থতায় জগতের বুকে কায়েম রহিয়াছে। আল্লাহতায়ালার দয়া ও করুণা যতটুকু দুনিয়ার বুকে আসিতেছে তাহা তাঁহারই পাক দেল বাহিত হইয়া আসিতেছে।
তিনি রাহমাতুল্লিল আ'লামীন বা সারা জাহানের রহমত। তাঁহারই অছিলায় হযরত আদম (আঃ) ক্ষমা পান। তাঁহারই অছিলায় হযরত নূহ (আঃ)-এর কিছতি প্লাবনের তান্ডব সত্ত্বেও রক্ষা পায়। তাঁহারই অছিলায় হযরত আইয়্যুব (আঃ) রোগমুক্তি লাভ করেন। তাঁহারই অছিলায় হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর জন্য নমরুদের প্রজ্বলিত আগুন শান্তিময় স্থানে পরিণত হয়।
বিজ্ঞাপন
তিনি জ্ঞানে ও গুণে পরিপূর্ণ ছিলেন। আল্লাহর মনোনীত ধর্ম ইসলাম তাঁহারই মাধ্যমে পূর্ণত্ব পায়। তিনিই মে'রাজ লাভে ধন্য হন। তিনি খোদাতায়ালার সর্বাধিক সান্নিধ্য লাভ করেন। সৃষ্টিতত্ত্বজ্ঞান এবং স্রষ্টাতত্ত্ব জ্ঞানের পরিপূর্ণতা আল্লাহ্পাক তাঁহাকেই দান করেন।
তিনি সেই নবী ও রাসূল (সাঃ) যাহার উপর আল্লাক দরুদ ও ছালাম পাঠান, ফেরেশতারাও ছালাম পাঠায়। তিনি সেই নবী (সাঃ)-যাহার নাম আল্লাহ্র আরশে লিখিত। শুধু আরশে নহে, প্রত্যেক সৃষ্টির প্রতি অণু-পরমাণুতে আল্লাহর নামের সঙ্গে তাঁহার নাম অংকিত আছে। সৃষ্টির প্রতি অণু-পরমাণুর বক্ষে কলেমা "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ”- অংকিত আছে। আসমান-জমীন ব্যাপী এই কলেমার জেকের হইতেছে। যাহাদের রূহ জাগ্রত, কালব পরিচ্ছন্ন-তাহারা উল্লিখিত তথ্য নিজ হইতেই বুঝিতে পারে।2) نه تقاضااء منا(
তাঁহার নবুয়ত ও রেসালতের স্বীকৃতি দেয় প্রত্যেক সৃষ্টি। পাথর তাঁহাকে ছালাম দেয়, বৃক্ষ সেজদা করে, পশুও সেজদা করে। একমাত্র নাফরমান মানুষ তাঁহার নবুয়ত ও রেসালতের শ্রেষ্ঠত্ব মানিতে চায় না।
বিজ্ঞাপন
তিনি আদম বংশের গৌরব। নবী ও রাসূল (আঃ) গণের ছরদার। তিনিই প্রথম কবর হইতে উঠিবেন। তিনিই সর্বাগ্রে শাফায়াত করিবেন এবং তাহারই শাফায়াত সর্বপ্রথম কবুল করা হইবে। তাঁহারই হাতে আল্লাহ্পাকের প্রশংসার ঝান্ডা থাকিবে। সেই ঝান্ডার নীচে সমবেত হইবে সকল নবী-রাসূল, মোমিন-মুসলমান ও ফেরেশতা। তিনিই প্রথমে জান্নাতের দরজায় আঘাত করিবেন। তাঁহারই জন্যে প্রথমে জান্নাতের দরজা খোলা হইবে। হাশরের ময়দানে একমাত্র তিনিই ইয়া উম্মতি, ইয়া উম্মতি করিয়া ছুটাছুটি করিবেন। অন্য সকলেই ইয়া নাসি, ইয়া নাসি বলিবে। তাঁহার উম্মতের সংখ্যাই সর্বাধিক থাকিবে। তাঁহার শ্রেষ্ঠত্বের কারণে তদীয় উম্মতেরাও অন্যান্য উম্মতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলিয়া বিবেচিত হইবে। উম্মতে মুহাম্মদীকে তাই বলা হয় “খায়রুল উমাম” বা সমস্ত উম্মতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। অন্যান্য উম্মতের পূর্বে উম্মতে মুহাম্মদীই প্রথম বেহেশতে প্রবেশ করিবে।
তিনি নিজের সম্পর্কে বলেন, 'আমি (দুনিয়াতে) সব (নবীদের) শেষে আগমন করিয়াছি। কিন্তু কিয়ামতের দিন সকলের আগে থাকিব।'
তিনি আরও এরশাদ করেনঃ আমি গৌরব ব্যতিরেকেই বলিতেছি যে আমিই সর্বশেষ নবী- আর এতদসম্পর্কে আমার কোন অহংকার নাই। আমি মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মোত্তালিব। আল্লাহতায়ালা সমস্ত সৃষ্টি জগতকে সৃষ্টি করিয়াছেন এবং আমাকে উহার সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষদের মধ্যে বানাইয়াছেন। অতঃপর তিনি মানুষকে দুইভাবে বিভক্ত করিয়াছেন এবং আমাকে উহার উত্তম অংশে সৃষ্টি করিয়াছেন। পরে তিনি মানুষের মধ্যে গোত্র ও খান্দান সৃষ্টি করিয়াছেন এবং আমাকে উহার শ্রেষ্ঠ খান্দান হইতে বানাইয়াছেন। অতঃপর তিনি মানুষের জন্য গৃহিণী তৈরী করিয়াছেন এবং আমাকে উত্তম গৃহিণী হইতে সৃষ্টি করিয়াছেন। কাজেই আমি জাত ও বংশ মর্যাদার দিক দিয়া সর্বশ্রেষ্ঠ।
বিজ্ঞাপন
কিয়ামতের দিন যখন লোকদিগকে উত্থিত করা হইবে, তখন আমিই সর্বপ্রথম কবর হইতে নির্গত হইব। যখন মানুষেরা আল্লাহতায়ালার দরবারে প্রতিনিধি হিসাবে গমন করিবে, তখন আমি তাহাদের নেতা হইব। যখন তাহারা সকলেই নিশ্চুপ থাকিবে, তখন আমি একমাত্র বক্তা হইব। যখন তাহাদের সুপারিশ প্রত্যাখ্যাত হইবে, তখন কেবলমাত্র আমারই সুপারিশ কবুল করা হইবে। আর যখন তাহারা নিরাশ হইবে। তখন আমিই তাহাদের সুসংবাদদাতা হইব। সম্মান, বুজর্গী এবং নাজাতের চাবিকাঠি সেদিন আমার হাতেই থাকিবে। হাম্ন্দের ঝান্ডা সেদিন আমার হাতেই থাকিবে। আওলাদে আদমের মধ্যে আমিই সবচাইতে সম্মানীয় হইব। আমার চতুর্দিকে সেদিন এক হাজার খাদেম ঘোরাফেরা করিতে থাকিবে যাহারা উজ্জ্বল মোতির ন্যায় হইবে। আর কিয়ামতের দিন আমিই সমস্ত আম্বিয়াদের ইমাম, তাহাদের বক্তা এবং শাফায়াতের অধিকারী হইব। আর এ ব্যাপারে আমার কোন গর্ব নাই।
নবীজী (সাঃ) এর শ্রেষ্ঠত্ব উপলব্ধির জন্য নিম্নের ঘটনাটি প্রাণিধানযোগ্য।
এক সিরিয়া নিবাসী ইহুদী ইসলামের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হইয়া স্বধর্ম ত্যাগপূর্বক ইসলাম গ্রহণ করিলেন। ইসলাম গ্রহণ করিলেন সত্য, কিন্তু আল্লাহর রাসূল (সাঃ) কে তখনও তিনি দেখেন নাই। তাঁহার একান্ত বাসনা, প্রাণের অতৃপ্ত কামনা নবীজীকে দুই চোখ ভরিয়া দেখার। সেই অতৃপ্ত আকাঙ্খা লইয়া সিরিয়া হইতে মদীনার দিকে যাত্রা শুরু করিলেন। কয়েকদিন একাধারে পথ চলিয়া মদীনায় পৌঁছাইলেন। কিন্তু মদীনাতে আসিয়া শুনিতে পান যে মাত্র তিনদিন পূর্বে নবী করীম (সাঃ) ইহধাম ত্যাগ করিয়া খোদার সান্নিধ্যে চলিয়া গিয়াছেন। এক বুক আশা লইয়া মদীনায় আসিয়াছেন নবীজীকে দেখার জন্য, অথচ বসিব, মাত্র তিনদিনের জন্য তিনি নবীজীর সাক্ষাত পাইলেন না।
বিজ্ঞাপন
তাহার আর দুঃখের সীমা থাকিল না। হায় নবীজী! হায় নবীজী! রবে অঝোরে কাঁদিতে লাগিলেন। তাহার হৃদয়ের জ্বলন্ত অগ্নি তিনি এখন কিভাবে নির্বাপিত করিবেন? ভাবিলেন, নবী করীম (সাঃ) এর গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সাহাবীগণের নিকট হইতে কিছু শুনিতে পাইলে হয়তো তাহার দেলের আগুন কিছুটা হ্রাস পাইবে। তাই কতিপয় সাহাবার নিকট যাইয়া রাসূলে পাক (সাঃ) এর অবস্থা সম্পর্কে জানার জন্য জিজ্ঞাসা করিলেন। সাহাবাগণও নবীজীর বিচ্ছেদ যন্ত্রণায় যেমনি কাতর, তেমনি শোকে শোকাতুর ছিলেন।
প্রশ্নকারীর প্রশ্নের জবাবে বলিলেনঃ প্রিয় নবী (সাঃ) এর গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্যসমূহ বর্ণনা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নহে। তবে আপনি হযরত বেলাল (রাঃ) ছাহেবের সহিত দেখা করিতে পারেন। কেননা তিনি ছায়ার মত সারাজীবন নবীজীর সঙ্গে ছিলেন। কিন্তু হযরত বেলালকে যখন ঐ ব্যক্তি প্রিয় নবী (সাঃ)-এর অবস্থা সম্পর্কে বর্ণনা দেওয়ার অনুরোধ করিলেন, তখন তিনি বলিলেন, 'আমার পক্ষে রাসূলে পাক (সাঃ)-এর একটি বিবরণও পেশ করা সম্ভব নয়। আপনি বরং হযরত ফাতিমা (রাঃ)-এর শরণাপন্ন হন। তিনি তদীয় মহান পিতা সম্পর্কে সম্ভবতঃ কোন বিবরণ দিতে পারিবেন। হযরত ফাতিমা (রাঃ)-এর নিকট আরজ করিলে তিনি বলিলেন, আমার মহান আব্বাজানের প্রকৃত অবস্থার বিবরণ দেয়া আমার সাধ্যাতীত। আপনি এই উদ্দেশ্যে হযরত আলী (রাঃ)-এর সঙ্গে দেখা করুন। তিনি হয়তো এই সম্পর্কে আপনাকে একটি বিবরণ দিতে পারিবেন। এই ব্যক্তি হযরত আলী (রাঃ) এর নিকট গমনপূর্বক তাঁহার উদ্দেশ্য ব্যক্ত করিলেন।
হযরত আলী (রাঃ) ছাহেব বলিলেন, পৃথিবীতে যত কিছু আছে তাহার একটা বিবরণ আপনি প্রথমে আমার নিকট পেশ করুন। লোকটি বলিলেন, পৃথিবীতে অগণিত দ্রব্য সম্ভার আছে। এখানে মহান খোদাতায়ালার অনন্ত অসীম কুদরত ও হেকমতের বহিঃপ্রকাশ স্বরূপ তাহার কত বিস্ময়কর সৃষ্টি আছে তাহা জানা কোন মানুষের পক্ষেই সম্ভব নহে। অতএব পৃথিবীতে যত কিছু আছে তাহার বিবরণ পেশ করা কিভাবে আমার পক্ষে সম্ভব হইতে পারে? তৎক্ষণাৎ হযরত আলী (রাঃ) ছাহেব বলিলেন, আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনে পৃথিবীর যাবতীয় দ্রব্য সামগ্রীকে কালীল (৪:৭) বা সামান্য বলিয়াছেন আর প্রিয় নবী (সাঃ)-এর চরিত্র মাধুর্যকে 'খুলুকে আজীম' (৬৮ঃ৪) বা মহান শ্রেষ্ঠ বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছেন। যে বিষয়কে আল্লাহতায়ালা নগণ্য বলিয়াছেন তাহার বিবরণ দেওয়াই আপনার বা আমার পক্ষে সম্ভব হইতেছে না অথচ প্রিয় নবী (সাঃ) এর জীবন-চরিতকে 'মহান শ্রেষ্ঠ' বলিয়াছেন তাঁহার বিবরণ দেয়া আমার পক্ষে কি করিয়া সম্ভব হইতে পারে?
বিজ্ঞাপন
সেই খুলুকে আজীম, শ্রেষ্ঠতম মানব, নবীদের ইমাম, রাহমাতুল্লিল আ'লামীন রবিউল আউয়াল মাসের ১২ই তারিখে এই নশ্বর দুনিয়ায় তশরিফ রাখেন। ৬৩ বৎসর অন্তে আবার এই দিনেই তিনি দুনিয়া ত্যাগ করিয়া দারুল বাকায় চলিয়া যান। তাঁহার আবির্ভাব ও তিরোভাব দিবস হিসেবে ১২ই রবিউল আউয়াল মুসলিম জাহানের নিকট সমাদৃত, সম্মানিত। মহা ধুমধামে পালিত হয় এই দিবস।
অত্যাচারী কোরায়েশদের প্রতি নবীজীর প্রেমঃ
রাসূলে পাক (সাঃ) আল্লাহ্পাকের জাতে উদ্ভুত প্রেমের প্রথম বিকাশ। তাই তাঁহার সমস্ত অস্তিত্বে ছিল প্রেমের নূর। তিনি সমস্ত সৃষ্টিকেই নিজ প্রাণ অপেক্ষা ভালবাসিতেন। তাঁহার বিচ্ছেদে নির্জীব কাঠখন্ডও মাতৃহারা সন্তানের মত কাঁদিত। তিনি উম্মতপ্রেমিক ছিলেন। সারাটা জীবন উম্মতের নাজাত চিন্তাতেই অতিবাহিত করিলেন। আহার-নিদ্রা পরিত্যাগ পূর্বক উম্মতি উম্মতি বলিয়া কাঁদিলেন। অথচ এই উম্মতেরাই তাঁহাকে কত যে অত্যাচার, নির্যাতন, উৎপীড়ন করিল তাহার ইয়ত্তা নেই।
বিজ্ঞাপন
নবীজী (সাঃ) নবুয়তের দায়িত্ব প্রাপ্ত হন তদীয় চল্লিশ বৎসর বয়সে। নবুয়তের প্রথম তিন বৎসর গোপনে আল্লাহর তাওহীদের বাণী প্রচার করেন। সে সময়ে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নেন হযরত খাদীজা (রাঃ), হযরত আবুবকর (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত উসমান (রাঃ), হযরত তালহা (রাঃ), হযরত জায়েদ বিন হারিস (রাঃ) প্রমুখ। তিন বছর গোপনে সত্য প্রচারের পরে খোদাতায়ালার নির্দেশ আসে প্রকাশ্যে প্রচারের। পাক কুরআনে প্রকাশ-
فَاصْدَعُ بِمَا تُؤْمَرُ وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ
অর্থাৎ-'অতএব তুমি যে বিষয়ে আদিষ্ট হইয়াছ তাহা প্রকাশ্যে প্রচার কর এবং মুশরিকদের উপেক্ষা কর।' (সূরা হিজ্বরঃ ৯৪)
বিজ্ঞাপন
নবীজী (সাঃ) প্রকাশ্যে আল্লাহ্র একত্বের বাণী প্রচার শুরু করেন। তখনই শুরু হয় নবীজীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, ব্যাঙ্গ-বিদ্রুপ ও অত্যাচার।
মক্কায় কাফেরেরা নামাজরত অবস্থায় করতালি দিত। অশ্লীল বিদ্রুপ করিত। নবীজী (সাঃ) কে পাগল, যাদুকর ও কবি বলিয়া ঠাট্টা করিত। পবিত্র কুরআন পাঠের সময়ে তাহারা বলিত, “এই কুরআন তোমরা শুনিও না। কুরআন পাঠের সময় তোমরা অসংবদ্ধ বাক্য বলিতে থাক, ইহাতে তোমরা মুহাম্মদের প্রচার বন্ধ করিয়া তাহাকে পরাভূত করিতে পারিবে।"
একদা নবী করীম (সাঃ) কাবা শরীফে নামাজ আদায় করিতেছিলেন। এমন সময় ওকবা বিন আবী মৃত উটের গলিত অস্ত্র আনিয়া তাহার গলায় নিক্ষেপ করিল। পাঁচ বছরের বালিকা হযরত ফাতিমা (রাঃ) অতি কষ্টে পিতার গলা হইতে সেই গলিত অন্ত্র সরাইলেন। অন্য একদিন নামাজরত অবস্থায় পাপাত্মা ওকবা স্বীয় চাদর নবীজীর গলায় পেঁচাইয়া এমনভাবে বলপূর্বক টানিতে লাগিল যে, তাঁহার শ্বাসরোধের উপক্রম হইল। ইত্যবসরে হযরত আবুবকর (রাঃ) ছাহেব তথায় উপস্থিত হইয়া কুরআনের ভাষায় বলিতে লাগিলেন, 'তোমরা কি এমন একজন মানুষকে হত্যা করিবে এই একটি মাত্র কারণে যে, তিনি বলেন, আল্লাহ্ আমার প্রভু। বস্তুতঃ তিনি তোমাদের প্রভু আল্লাহর নিকট হইতে স্পষ্ট নিদর্শনসহ সমাগত হইয়াছেন। পাক কুরআনের বাণী শুনিবা মাত্র ওকবার অন্তরাত্মা কাঁপিয়া উঠিল। সে সন্ত্রস্ত হৃদয়ে সেই স্থান ত্যাগ করিল।
নবী করীম (সাঃ) মাঝে মাঝে কাবা শরীফে প্রবেশ করিয়া আল্লাহর একত্বের তথ্য বিশ্লেষণ করিতেন। একদা কাবা শরীফে একত্বের বাণী প্রচারকালে কতিপয় পৌত্তলিক কোরায়েশ একত্রে নবীজীকে নির্মমভাবে আক্রমণ করিল। এই সময় একটু দূরেই দাঁড়ানো ছিলেন হযরত খাদীজা (রাঃ) এর পূর্ব স্বামীর ঔরসজাত পুত্র হারেস বিন আবুহালা। তিনি ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াইয়া আসিয়া নবীজীকে এই আসন্ন বিপদ হইতে রক্ষা করার চেষ্টা করেন। পৌত্তলিকেরা তখন নবী করীম (সাঃ) কে ছাড়িয়া হারেসকে আক্রমণ করে। দুর্বৃত্তদের আক্রমণে ঘটনাস্থলেই হারেস নিহত হন। পৌত্তলিক কোরায়েশদের আক্রমণ ও অত্যাচার কেবলমাত্র নবীজীর উপরই সীমাবদ্ধ ছিল না। নবীজীর অনুসারী বর্গের উপরও পাষন্ডরা পাশবিক নির্যাতন চালাইত। তাদেরকে হত্যা করিত। "আম্মার" নামে জনৈক ক্রীতদাস, তদীয় পিতা ইয়াসের ও মাতা সোমাইয়া নবী-ধর্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন। পিশাচ আবু জেহেল সোমাইয়াকে বর্ণাঘাতে হত্যা করে। তাহার নির্মম অত্যাচারে ইয়াসেরও ইন্তেকাল করেন। নবী করীম (সাঃ) এর চোখের সামনেই তদীয় অনুসারীবর্গকে পাশবিক অত্যাচার করা হইতেছে, তাহাদেরকে হত্যা করা হইতেছে। উম্মত-প্রেমিক নবী ইহা কিভাবে সহ্য করিবেন? তাই তিনি তদীয় আসহাবদিগকে লোহিত সাগর অতিক্রম করিয়া সুদূর খ্রীষ্টীয় রাজ্য আবিসিনিয়ায় আশ্রয় নিতে বলিলেন। নবী করীম (সাঃ) এর পরামর্শে আসহাব দিগের প্রায় একশত জনের একটি দল স্বজাতি ও স্বগোত্রের নিষ্ঠুর অত্যাচারে জর্জরিত হইয়া মাতৃভূমি পরিত্যাগপূর্বক আবিসিনিয়ায় গমন করিলেন। আবিসিনিয়ার মহান ও উদারচেতা বাদশাহ নাজ্জাশী স্বদেশ হইতে বিতাড়িত ও উৎপীড়িত আসহাবদিগকে আশ্রয় দিলেন। কোরেশরা তাহাদেরকে ফেরত আনার জন্য আবিসিনিয়া পর্যন্ত গিয়াছিল বটে, কিন্তু বিচক্ষণ নাজ্জাশীর আশ্রয় হইতে নব দীক্ষিত মুসলমানদিগকে ফেরত আনিতে পারে নাই।
অতঃপর পৌত্তলিক কোরায়েশরা আল্লাহর একত্বের বাণী প্রচার হইতে বিরত রাখিবার জন্য নবীজী (সাঃ) কে প্রলোভন দেখায়। প্রলোভন দেখায় ধন-ঐশ্বর্যের, মক্কার একচ্ছত্র অধিপত্যের, এমনকি সম্ভ্রান্ত কুলে বিবাহের। কিন্তু কোন কিছুতেই নবী করীম (সাঃ) কে বশে আনিতে না পারিয়া কোরায়েশদের কতিপয় নেতা যায় আবু তালেবের নিকট। আবু তালেব নবী (সাঃ) এর চাচা। তিনিই রাসূলে পাক (সাঃ) এর প্রধান সহায় ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাহাকে সকলেই ভক্তি ও শ্রদ্ধা করিত। কোরায়েশ নেতৃবর্গ আবু তালেবের নিকট যাইয়া বলিল, "আপনার ভাইপো আমাদের উপাস্যের নিন্দাবাদ করে, আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে পথভ্রষ্ট ও আমাদেরকে জ্ঞানহীন বলিয়া কুৎসা করে। আপনি আপনার ভাইপোকে এই কুৎসা রটনা হইতে নিবৃত্ত করুন। অন্যথা আমরা তলোয়ারের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করিব।” কোরায়েশ নেতৃবর্গের হুমকীতে তিনি কিছুটা হতবিহ্বল হইলেও আপন ভাইপোকে সাহস দিয়া বলিলেন, "বৎস, আমি সমস্ত বিপদ বরণ করিয়া নিলাম। তুমি তোমার ধর্ম প্রচার কর। কেহই তোমার কোন ক্ষতি করিতে পারিবে না।"
আবু তালেবকে যুদ্ধে হুমকি দেওয়া হইল কিন্তু কোন কাজ হইল না দেখিয়া বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কোরায়েশ নেতৃবর্গ একত্রে মিলিত হইয়া একটি প্রতিজ্ঞাপত্র লিপিবদ্ধ করিল, যাহাতে লেখা হইল আবু তালেব তাঁহার ভাইপোকে তাহাদের হাতে অর্পণ না করা পর্যন্ত তাহারা হাশেম ও মোত্তালেব বংশীয় কাহারো সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক, প্রীতি-সম্ভাষণ, আদান-প্রদান ও কেনা-বেচা করিবে না। তাহাদের সাথে সর্ববিধ সামাজিক বন্ধন ছিন্ন করিবে। এক কথায় হাশেম ও মোত্তালেব বংশীয়দেরকে বয়কট করা হইল।
আবুতালেব ভাবিলেন- যত অত্যাচারই আসুক না কেন মুহাম্মদকে কাফেরদের হাতে অর্পণ করা যাইবে না। তিনি সকলকে লইয়া তাই 'শেব' নামক মক্কার এক সুদূর নির্জন প্রান্তে তাহাদেরই এক পৈত্রিক গিরি-গহ্বরে আশ্রয় নিলেন। এখানে তাহাদের দুঃখ-কষ্টের আর সীমা থাকিল না। ক্ষুধার জ্বালায় এই গহবরে হাশেমী ও মোত্তালেব বংশীয়রা ছটফট করিত। তরুলতার পল্লব খাইয়া কোনরকমে জীবন ধারণ করিত। দীর্ঘ তিন বৎসর তাহারা এই গিরি-গহ্বরের অবরুদ্ধ জীবনের নিরতিশয় দুঃখ-কষ্ট ভোগ করিলেন। অবশেষে নবুয়তের দশম বৎসরে আল্লাহ্পাকের কৃপায় গিরি-গহ্বর হইতে মুক্ত হইয়া তাহারা মক্কায় আসিলেন। মক্কায় আসার পরই আবু তালেব ইন্তেকাল করিলেন। আবু তালেরেব ইন্তেকালে নবীজী (সাঃ) পিতৃতুল্য পিতব্য, অকৃত্রিম বন্ধু ও একজন কল্যাণকামী অভিভাবক হারাইলেন। এর কিছুদিন পর হযরত খাদীজা ইন্তেকাল করিলেন। খাদীজা (রাঃ) এর মৃত্যুতে তিনি তাহার জীবনসঙ্গিনী, বিপদে আপদে সান্ত্বনাদায়িণী এবং একজন পরম হিতৈষী বন্ধুকে হারাইলেন। এদিকে কোরায়েশরা দেখিল-আবু তালেব নাই, বিবি খাদীজাও (রাঃ) নাই। মুহাম্মদকে সাহায্য-সহযোগিতা ও সান্ত্বনা দেওয়ার কেউ নাই। তাহাকে তাহার ধর্ম প্রচার হইতে ফেরানো এখনই উৎকৃষ্ট সময়। তাই তাহারা নবী (সাঃ)-এর উপর অত্যাচার বহুগুণে বাড়াইয়া দিল।
নবীজী (সাঃ) তাই জায়েদকে সঙ্গে করিয়া মক্কা হইতে তায়েফে গেলেন সত্য প্রচারের জন্যে। কিন্তু তায়েফবাসীরাও মক্কার পৌত্তলিকদের মত নবীজীকে প্রত্যাখান করিল। শুধু কি তাই? তাহারা অত্যাচারের সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ করিল। নবীজীর উপর বৃষ্টির মত পাথর নিক্ষেপ করিল। পাথরের আঘাতে আঘাতে তিনি ক্ষত-বিক্ষত হইলেন, দরদর করিয়া তাহার দেহ হইতে তাজা রক্ত নির্গত হইল। তায়েফবাসীদের এহেন অমানুসিক অত্যাচার সহ্য করিয়াও নবীজী সেখানে দশ দিন তদীয় কর্তব্য পালন করিলেন, আল্লাহ্র একত্বের বাণী প্রচার করিলেন। তায়েফ হইতে প্রত্যাখ্যাত হইয়া মক্কায় আসিলেন। পরবর্তী দুই বৎসর তাহার প্রতি মক্কাবাসীদের অত্যাচার ভীষণ হইতে ভীষণতর হইল। তিনি হিজরত করিতে সিদ্ধান্ত নিলেন। প্রথমে আসহাবদিগকে সংগোপনে মদীনায় হিজরতের নির্দেশ দিলেন। একে একে আবুবকর ও আলী ব্যতীত সকলেই কেবলমাত্র সত্যের জন্য সহায় সম্পদ সবকিছু ত্যাগপূর্বক মদীনায় হিজরত করিলেন।
কাফেরেরা দেখিল মুহাম্মদ (সাঃ)-এর অনুসারীরা আর মক্কায় নাই। তাহারা মদীনায় হিজরত করিয়াছে। তাহাদের আশংকা হইল, যে কোন সময় মুহাম্মদ (সাঃ) মক্কা ত্যাগ করিয়া মদীনায় চলিয়া যাইতে পারে। তাই তাহারা দ্রুত এক গুপ্ত সভা ডাকিল। সভায় মুহাম্মদ (সাঃ) কে হত্যার প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হইল। কাফেরদের হীন ষড়যন্তের কথা আল্লাহ্পাক ওহী মারফত নবী করীম (সাঃ) কে জানাইয়া দিলেন। একদা এক গভীর রজনী, দয়াল নবী (সাঃ) নিজ বিছানায় হযরত আলী (রাঃ) কে শোয়াইয়া অতি সংগোপনে গৃহ হইতে বাহির হইয়া হযরত আবুবকরকে সঙ্গে করিয়া মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলেন। গৃহে না পাইয়া কাফেররা তাঁহাকে পিছু ধাওয়া করিল। নবী করীম (সাঃ) কে ধরার জন্য একশত উট পুরস্কার ঘোষণা করা হইল। কিন্তু আল্লাহ্পাকের কৃপায় নবীজী (সাঃ) কয়েকদিন পথ চলিয়া মদীনায় পৌছাইলেন। মদীনাবাসীরা তাঁহাকে সাদরে বরণ করিলেন।
অত্যাচারী কোরায়েশরা মদীনা আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিল। মক্কার কোরায়েশদের সাথে মুসলমানদের বেশ কয়েকটি যুদ্ধ হইল। একমাত্র ওহুদের যুদ্ধ ব্যতীত সবগুলিতেই মুসলিম জাতি জয়লাভ করিল। ওহুদের যুদ্ধে নিজেদের ভুলেই মুসলিম জাতির পরাজয় হইল। কাফেরদের চতুর্মুখী আক্রমণে মুসলমান সৈন্যগণ যখন ছত্রভঙ্গ তখনি কাফেররা নবীজী (সাঃ) কে লক্ষ্য করিয়া তীর ও বর্শা নিক্ষেপ করিতে শুরু করিল। প্রতিপক্ষের অস্ত্রের আঘাতে নবী করীম (সাঃ)-এর ৪টি দাঁত মুবারক ভাঙ্গিয়া গেল। সাহাবা কেরাম আপন আপন প্রাণের মায়া ত্যাগ করিয়া নবী করীম (সাঃ)-এর চতুর্পার্শ্বে মানব বর্ম তৈরী করিলেন। সেই বর্ম ভেদ করিয়া শয়তান ইবনে কামিয়া বিদ্যুৎ বেগে ছুটিয়া আসিয়া প্রিয়নবী (সাঃ)-এর শির মুবারক লক্ষ্য করিয়া প্রচন্ড বেগে তরবারীর আঘাত করিল। সেই আঘাতে শিরস্ত্রানের দুইটি লৌহ-কড়া নবীজী (সাঃ)-এর কপালে বিদ্ধ হইলে তিনি অজ্ঞান হইয়া মাটিতে পড়িয়া গেলেন। ইহা দেখিয়া কাফেররা আনন্দ উল্লাস করিতে করিতে যুদ্ধ ক্ষেত্র ত্যাগ করিল। কিছুক্ষণ পরে নবীজীর জ্ঞান ফিরিল। হযরত আবু ওবায়দা ইবনুল জাররাহ (রাঃ) দাঁত দিয়া টানিয়া অতিকষ্টে লৌহশলা দুইটি বাহির করিলেন। ক্ষতস্থান হইতে ফিনকি দিয়া রক্ত ছুটিল। সেই রক্তে প্রিয়নবী (সাঃ)-এর নূরানী চেহারা মুবারক রঙ্গীন হইয়া উঠিল। এই সময় হযরত আলী (রাঃ) দ্রুতবেগে ঝরণা হইতে নিজের ঢাল ভরিয়া পানি আনিলেন, কিন্তু সে পানি প্রিয় নবী (সাঃ) পান করিতে পারিলেন না। তদ্বারা তাঁহার মুখখানী ধুইয়া দিলেন। এমন মর্মান্তিক অবস্থাতেও নবীজী তার কওমের প্রতি বিন্দুমাত্র গোস্বা হইলেন না, কোনরূপ অভিশম্পাত করিলেন না; বরং দুই হাত তুলিয়া খোদাতায়ালাকে বলিলেন, "হে আমার রব! তুমি আমার জাতিকে ক্ষমা কর। আমাকে ওরা বুঝে নাই। যদি বুঝিত, কখনও এমন করিত না। তাহারা সত্যকে যে বুঝিতে পারে নাই- তাহা হয়তো আমারই অক্ষমতা, আমারই দুর্বলতা। তুমি ওদেরকে দয়া করিয়া ক্ষমা কর।"
হায়রে ক্ষমা! যাহারা বছরের পর বছর তাহাকে অত্যাচার ও নিগ্রহ করিল। যাহাদের নির্যাতন ও উৎপীড়নে তিনি স্বদেশ ত্যাগে বাধ্য হইলেন। যাহারা তদীয় প্রাণ বধ করিবার জন্য সুদূর মদীনা পর্যন্ত আসিল, যাহাদের অস্ত্রের আঘাতে তিনি আহত হইলেন, দেহ ফাটিয়া রক্ত নির্গত হইল- তাহাদেরই জন্য ক্ষমা প্রার্থনা, তাহাদের জন্য এত দয়া ও করুণা। এমন নজীর পৃথিবীতে আছে কি? এমন অনিন্দ্য সুন্দর ক্ষমা প্রদর্শন তাঁহার পক্ষেই সম্ভব। কারণ মহান স্রষ্টা রাব্বুল আ'লামীন তাঁহাকে 'রাহমাতুল্লিল আ'লামীন' করিয়া দুনিয়ায় পাঠাইয়াছেন। তিনিতো সকলের জন্য রহমতস্বরূপ।
সেই রাহমাতুল্লিল আ'লামীন, করুণার ধন, উম্মত প্রেমিক নবী ও রাসূল (সাঃ) ১২ই রবিউল আউয়াল দিবসেই ইহধাম ত্যাগ করেন। এই দিনে তাই প্রিয়নবী (সাঃ)-এর মহব্বতের ফয়েয ওয়ারেদ হয়। নবীজী (সাঃ) এর মহব্বত অর্জনের ইহাই প্রকৃষ্ট সময়। নবীজী (সাঃ)-এর মহব্বতে যাহার চক্ষু হইতে একফোটা তপ্ত অশ্রু গড়াইয়া পড়িবে, আল্লাহপাক তাহাকে নগদ বেহেশত দান করিবেন।
নবীজীর প্রতি আসহাবদের প্রেমঃ
আসহাবগণ প্রিয়নবী (সাঃ) কে স্বীয় প্রাণ অপেক্ষাও বেশী ভালবাসিতেন। এমন বহু নজীর তাহাদের জীবনীতে আছে।
হিজরতের রাতে নবীগৃহ শত্রু কর্তৃক বেষ্টিত ছিল। নবী করীম (সাঃ) নিজ বিছানায় হযরত আলী (রাঃ) কে শুয়াইয়া রাতের অন্ধকারে অতি সংগোপনে গৃহত্যাগ করিলেন। কাফেরদের হাতে মরণ নিশ্চিত জানিয়াও হযরত আলী নবী করীম (সাঃ) -এর বিছানায় শুইয়া থাকিলেন। ইহা নবী প্রেমের গভীরতারই প্রমাণ বহন করে।
হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) নবী প্রেমে নিজের জানমাল সহায় সম্পদ সবই বিলাইয়া দিয়াছিলেন। কোন এক যুদ্ধে প্রিয়নবী (সাঃ) আসহাবগণের নিকট সাহায্য চাহিলেন। বলিলেন, তোমরা যে যাহা পার তাহা দিয়া যুদ্ধে শরীক হও। সকলেই সামর্থানুযায়ী যুদ্ধে শরীক হইলেন। কেউবা স্বীয় সম্পদের অর্ধেক, কেউবা এক চতুর্থাংশ, কেউবা এক দশমাংশ দিলেন, কিন্তু হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) নিজের যাহা ছিল সমুদয়ই প্রিয়নবী (সাঃ)-এর কদমে রখিলেন। নবীজী (সাঃ) জিজ্ঞাসা করিলেন, “ হে আবুবকর! আপনি আপনার সংসারের জন্য কি রাখিয়া আসিলেন?” জবাবে হযরত আবুবকর (রাঃ) ছাহেব বলিলেন, 'আল্লাহ এবং তদীয় রাসূলকে।' প্রেমের কি অপূর্ব দৃষ্টান্ত।
ইসলামের ইতিহাসের সর্বপ্রথম জেহাদ হইল বদর। এই জেহাদের পূর্বে প্রিয়নবী (সাঃ) সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে পরামর্শ করিলেন। একজন সাহাবী দন্ডায়মান হইয়া আরজ করিলেন, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা সেই সব লোক নই যে, হযরত মুসা (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের ন্যায় বলিব-আপনি ও আপনার রব কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করুন, আমরা তো এখানেই বসিয়া থাকিব।'
আমরা তো আরজ করি- "চলুন, যে দিকে আপনার প্রতিপালক আপনাকে আদেশ করেন সেদিকেই চলুন। সেই আল্লাহতায়ালার শপথ! যাহার হাতে আছে আমার প্রাণ, যিনি আপনাকে সত্য নবী হিসাবে প্রেরণ করিয়াছেন। আমরা ডানদিক হইতে লড়াই করিব, বাঁদিক হইতে লড়াই করিব, সম্মুখ হইতে লড়াই করিব এবং পিছনের দিক হইতে লড়াই করিব। আল্লাহতায়ালার শপথ, আমাদের একটি চক্ষুও উন্মুক্ত থাকিতে আমরা আপনাকে ছাড়িয়া যাইব না।"
ওহুদের ময়দানে যখন কাফেরদের নিক্ষিপ্ত তীর বৃষ্টির মত প্রিয়নবী (সাঃ)-এর দিকে আসিতে থাকে, তখন নবীজী (সাঃ) কে রক্ষার জন্য সাহাবাগণ মানববর্ম তৈরী করিয়া শত্রুপক্ষ হইতে আগত তীর নিজ নিজ বক্ষে ধারণ করিলেন, নিজেদের প্রাণ দিয়া নবীজী (সাঃ)-এর প্রাণ রক্ষা করিলেন। এমন অপূর্ব প্রেমের দৃষ্টান্ত আর খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে কি?
সাহাবা কেরামের দেলে এত অধিক নবীপ্রেম পয়দা হওয়ার কারণ এই যে, নবীজী (সাঃ)-এর প্রতি তাঁহাদের আনুগত্য ছিল অতুলনীয়। আনুগত্য দুই প্রকার। যথাঃ জাহেরী ও বাতেনী। সাহাবা কেরাম উভয় প্রকার আনুগত্যের পূর্ণতা অর্জন করিয়াছিলেন। মূলতঃ বাতেনী আনুগত্য ব্যতীত মহব্বতের লাইন পরিষ্কার হয় না। প্রিয়নবী (সাঃ)-এর প্রতি বাতেনী আনুগত্যের বিন্দু পরিমাণ ত্রুটি আসহাবগণের ছিল না বিধায় মহব্বতের ফয়েয তাহাদের দেলে সার্বক্ষণিকের জন্য জারি থাকিত। সেই মহব্বতের ফয়েযে তাহাদের দেল যাবতীয় অপবিত্রতা হইতে পাক হইয়া ১৪-ই রাতের পূর্ণিমার চাঁদের মত উজ্জ্বল হইত। সেই পাক দেল আর গোনাহের দিকে যাইত না। পাক ও পরিচ্ছন্ন দেলওয়ালা আসহাবগণের মাধ্যমে তাই প্রিয়নবী (সাঃ) এমনই এক কল্যাণ রাষ্ট্র গঠন করিয়াছিলেন যাহা আজও বিশ্বের যে কোন দেশের জন্য অনুকরণীয় ও অনুসরণীয়।
বিলুপ্তপ্রায় মানবতা উদ্ধারের উপায়ঃ
আজ পৃথিবীতে মুসলমানের সংখ্যা কম নয়। ১০০ কোটিরও উপরে। প্রায় ৪৮টি মুসলিম রাষ্ট্র আমাদের পৃথিবীতে। কিন্তু যে কল্যাণরাষ্ট্র নবী করীম (সাঃ) আসহাবগণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন তাহার নিদর্শন আজকের কোন মুসলিম রাষ্ট্রে নাই। সর্বত্রই চুরি, ডাকাতি, মারামারি, হানাহানি, ছিনতাই, খুন-খারাবী, হিংসা-বিদ্বেষ, জুলুম-অত্যাচার। তরুণ ও যুবক সমাজ আজ নেশায় বিভোর। মদ, গাজা, আফিম, হেরোইন, ফেনসিডিল তাহাদের নেশার সামগ্রী। নারী ও শিশু পাচার প্রতিদিন ঘটিতেছে। মানুষ মানুষকে হত্যা করিয়া তাহাদের হাড্ডি-মজ্জা, মগজ, যকৃত- প্লিহা ইত্যাদি বিক্রয় করিয়া মুনাফা লুটিতেছে। বিষমিশ্রিত বিস্কুট স্কিট খাওয়াইয়া অজ্ঞান করিয়া পকেটের টাকা পয়সা, ঘড়ি, কলম সবই আত্মসাৎ করিতেছে। সমাজের সর্বস্তরে দুর্নীতি। সবকিছুতেই ভেজাল। ভেজাল চাউলে, ডাউলে, লবণে, চিনিতে। ভেজাল মানুষের চরিত্রে। তাইতো কোথাও শান্তি নাই। মনুষত্ব আজ দলিত-মথিত, মানবতা আজ বিলুপ্ত প্রায়। চতুর্দিক হইতেই কানে ভাসিয়া আসে মানবতার সকরুণ আর্তনাদ। তাইতো কবি বলেন,
"আজ বিশ্ব মানবতা কাঁদে
যাতনায় অশ্রুসিক্ত মর্মভেদী ক্ষীণ আর্তনাদে।
নিভেছে আশার আলো
আধার ঘনায় পদে পদে।
জীবনের অগ্রগতি অবরুদ্ধ অনন্ত প্রমাদে।"
কিন্তু সমাজ, দেশ, রাষ্ট বা পৃথিবীর এহেন করুণ দশা কেন? কেন পাপ ও অন্যায়ের রাজত্ব সর্বত্র? কারণ প্রিয়নবী (সাঃ) এর আনুগত্যের অভাব। জাহেরী আনুগত্য থাকিলেও বাতেনী আনুগত্য নাই বলিলেই চলে। কিন্তু বাতেনী আনুগত্য ব্যতীত প্রিয়নবী (সাঃ) এর মহব্বত দেলে পয়দা হয় না। আর প্রিয়নবী (সঃ)-এর মহব্বত ব্যতীত দেল থেকে পাপ ও অন্যায়ের মোহ দূর হয় না। দেল পরিষ্কার হয় না। কিন্তু বাতেনী আনুগত্যের জন্য প্রয়োজন আধ্যাত্মিক অনুশীলন। আজ মানুষ কেবলমাত্র বস্তুজ্ঞান চর্চার দিকে ধাবিত হইতেছে, সেই তুলনায় আধ্যাত্মিকতার চর্চা নাই। বস্তুজ্ঞান চর্চার সাথে সাথে যদি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ আধ্যাত্মিক চর্চার দিকে মনোনিবেশ করে তবে সুন্দর ও কল্যাণ রাষ্ট্র সহজেই তৈরী হইতে পারে। কারণ, আধ্যাত্মিক চর্চার মাধ্যমে নৈতিক অবক্ষয় রোধ হয়, মানুষের সুকুমার বৃত্তি বিকশিত হয়।
জাকের পার্টির জন্ম এবং এই পার্টির সদস্যদের কর্তব্যঃ
আমার পীর কেবলাজান, চৌদ্দশত হিজরীর মুজাদ্দেদ, হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব সাংগঠনিক পদ্ধতিতে দেশ ও জাতির সর্বত্র আধ্যাত্মিকতা অনুশীলনের সুফল পৌছাইবার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করিয়াছিলেন। তদীয় জীবনের শেষ উরসে তাই তিনি জাকের পার্টির বিজয় ঘোষণা করিয়া যান। তাহার ওফাতের ৩৭ বছর পর তাহারই বাতেনী ইঙ্গিতে এবং আল্লাহতায়ালার এলহামী নির্দেশে আমি ১৪১০ হিজরীর ১২ই রবিউল আউয়াল মোতাবেক ১৪ই অক্টোবর ১৯৮৯ সালে রহমতের সময়ে জাকের পার্টি গঠন করি। সেই দিন ছিল শনিবার অর্থাৎ আমার পীর কেবলাজান হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেবের জন্মদিন। একদিকে রাসূলে পাক (সাঃ)-এর জন্মদিন, অপরদিকে খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেবের জন্মদিন। দুই মহামানবের জন্মলগ্নে জন্ম হয় জাকের পার্টি-যাহার মূল নীতিমালা হইলঃ ইসলাম, ঈমান ও এহসান। ইসলাম ও ঈমান হইল শরীয়তের ইশারা, আর এহসান তরিকতের ইশারা। ইসলাম, ঈমান ও এহসান মিলেই পূর্ণাঙ্গ শরীয়ত- যাহার মধ্যে আছে জাহেরা শরীয়ত, তরিকত, হকিকত ও মারেফাত ও প্রিয়নবী (সাঃ)-এর বাতেনী সুন্নত। এই পার্টির সদস্যদের কর্তব্য-
★ জাগতিক জ্ঞানচর্চার সাথে সাথে আধ্যাত্মিকতা চর্চার মাধ্যমে নিজেদের সৎ গুণাবলীর বিকাশ সাধন করা।
অন্যদেরকে আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জনে অনুপ্রাণিত করা এবং
★ আর্তমানবতার সেবা করা।
এই পার্টির নীতিমালা পুরাপুরি পালন করিলে দেলে আল্লাহ্ ও রাসূলের মহব্বত পয়দা হইবে। মহব্বতের স্রোতে দেল ধুইয়া পরিষ্কার হইবে। ১৪ই রাত্রির পর্ণিমার চাঁদের মত দেল উজ্জ্বল ও রৌশন হইবে। মানব চরিত থেকে হিংসা, দ্বেষ, স্বার্থপরতা, পাপাসক্তি দূর হইবে। ফলে একটি সুন্দর ও সুখী সমাজ সহজেই তৈরী হইবে।
জাকের পার্টি একটি ঐক্যবদ্ধ দল। আমার পক্ষ হইতে এই দলের চেয়ারম্যান আমার কনিষ্ঠ পুত্র মোস্তফা আমীর ফয়সল মুজাদ্দেদী। সে যাহা বলে তাহা আমার পক্ষ হইতেই বলে। কতিপয় জাকের বলিয়া বেড়ায়-এই পার্টি আমার নয়, আমার ছেলে মোস্তফা আমীর ফয়সলের। তাহার চাপে নাকী আমি এই পার্টির ঘোষণা দিতে বাধ্য হইয়াছি। এমন কথা একাধিকবার আমার কানে আসিয়াছে। তাই সকলেরই জ্ঞাতার্থে বলিতেছি যে, এই পার্টি আমার খাজাবাবার। তাহারই বাতেনী নির্দেশে আমি ইহার ঘোষণা দিয়াছি, কাহারো চাপে পড়িয়া নয়। যাহারা উক্তরূপ বিভ্রান্তি ছড়ায়, তাহারা আসলে জাকের নয়, মোনাফেক বলা চলে। তাহাদের থেকে তোমরা সতর্ক থাকিও।
এই পার্টি আদর্শ কেন্দ্রিক পার্টি। নবী করীম (সাঃ) -এর পরিপূর্ণ আদর্শ প্রচার করাই এই পার্টির উদ্দেশ্য। এই পার্টিই হেজবুল্লাহ বা আল্লাহর দল। আর আল্লাহ্ দলের বিজয় অবশ্যম্ভাবী। কেবল সময়ের ব্যবধান মাত্র। কালাম মজীদে প্রকাশ,
أُولَئِكَ حِزْبُ اللَّهِ ط أَلَا إِنَّ حِزْبُ اللَّهِ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
অর্থাৎ-“এরাই আল্লাহর দল; জানিয়া রাখ, নিশ্চয়ই আল্লাহর দল সফলকাম হইবে।” (সূরা মুজাদালাঃ ২২)








