Logo

ঈদে মিলাদুন্নবীর তাৎপর্য ও নবী করীম (সাঃ) শ্রেষ্ঠত্ব

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ২২:১৫
ঈদে মিলাদুন্নবীর তাৎপর্য ও নবী করীম (সাঃ) শ্রেষ্ঠত্ব
ছবি: জনবাণী।

হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘ঈদে মিলাদুন্নবী ও জাকের পার্টির আদর্শ-লক্ষ্য’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ ঈদে মিলাদুন্নবীর তাৎপর্য এবং নবী করীম (সাঃ) এর শ্রেষ্ঠত্ব ও উম্মতের প্রতি নবীজীর প্রেমের গভীরতা নিয়ে আলোচনাঃ

বিজ্ঞাপন

আল্লাহপাক মানব জাতিকে অফুরন্ত নেয়ামত দান করিয়াছেন। মানুষের অস্তিত্ব, তাহার অংগ-প্রত্যংগ, ইন্দ্রিয়সমূহ (তথা চক্ষু, কর্ণ, জিহ্বা, নাসিকা ইত্যাদি), মানুষের চতুষ্পার্শস্থ তাবৎ সৃষ্টি তথা আলো, বাতাস, গাছ-পালা, বৃক্ষ-লতা, চন্দ্র-সূর্য ইত্যাদি সবই মানুষের জন্য আল্লাহপ্রদত্ত নেয়ামত। জীবনভর চিন্তা করিলেও আল্লাহর নেয়ামতের সংখ্যা নির্ধারণ সম্ভব নহে। তাই আল্লাহপাক বলেন,

وَ إِنْ تَعُدُّوا نِعْمَةَ اللَّهِ لَا تُحْصُوهَا

অর্থাৎ-"তোমরা গণনা করিলে আল্লাহর নেয়ামতের সংখ্যা নিরূপণ করিতে পারিবে না।” (সূরা নাহলঃ ১৮)

বিজ্ঞাপন

সমুদয় নেয়ামতের মধ্যে নবী-রাসূল বা ওলীয়ে কামেল সকল মানবজাতির জন্য শ্রেষ্ঠতম নেয়ামত-ইহাতে কোন সন্দেহ নাই। কারণঃ নবী-রাসূল বা ওলী-আল্লাহসকল আল্লাহর পরিচয় প্রাপ্তির মাধ্যম। আল্লাহ তাহার পরিচয় দেওয়ার জন্য মানুষ সৃষ্টি করিয়াছেন। মানুষের কর্তব্য তাহার পরিচয় গ্রহণ করা। আর খোদা পরিচয়ের অছিলা বা মাধ্যমই হইলেন নবী-রাসূল বা ওলীয়ে কামেলবর্গ। তাহাদের দেল বাহিত নূরের বাহনে চড়িয়া খোদাতায়ালা পর্যন্ত পৌঁছাইতে হয়। সকল নবী ও রাসূল (আঃ) গণের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম হইলেন আখেরী নবী ও রাসূল, নিখিল বিশ্বের ত্রাণকর্তা, হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ)। মূলতঃ তিনিই প্রথম সৃষ্টি। তিনিই সৃষ্টির কারণ বা উৎস।

একদা দয়াল নবী (সাঃ) প্রখ্যাত সাহাবী হযরত জাবের (রাঃ) ছাহেব কর্তৃক জিজ্ঞাসিত হন যে, প্রথম সৃষ্টি কে? রাসূলে করীম (সাঃ) জবাব দেন, হে জাবের! সর্বপ্রথমে আল্লাহতায়ালা তাঁহার নূর হইতে তোমার নবীর নূর সৃষ্টি করিয়াছেন। সেই নূর আল্লাহর শক্তি দ্বারা তাহারই ইচ্ছানুযায়ী আবর্তিত হইতেছিল। তখন কোন লওহ ছিল না, কলম ছিল না, বেহেশত ছিল না, দোযখ ছিল না, কোন ফেরেশতা ছিল না, আসমান, জমিন, পৃথিবী, গ্রহ, উপগ্রহ, চন্দ্র, সূর্য কিছুই ছিল না। যখন আল্লাহ সৃজন করিতে চাহিলেন, তখন সেই নূরকে (নূরে মুহাম্মদীকে) চার ভাগে বিভক্ত করিলেন। প্রথম ভাগের দ্বারা কলম, দ্বিতীয় ভাগের দ্বারা লওহ, তৃতীয় ভাগ দ্বারা আরশ সৃষ্টি করিলেন। বাকী চতুর্থ ভাগকে আবার চার ভাগে বিভক্ত করিলেন-উক্ত চার ভাগের প্রথম ভাগ হইতে আরশের ফেরেশতাগণকে, দ্বিতীয় ভাগ হইতে কুরসী এবং তৃতীয় ভাগ হইতে বাকী সমস্ত ফেরেশতা মন্ডলীকে সৃজন করিলেন। অতঃপর অবশিষ্ট চতুর্থভাগকে আবার চারভাগে বিভক্ত করিলেন-ইহার প্রথম ভাগ হইতে সাত স্তবক আকাশ, দ্বিতীয় ভাগ হইতে সাত স্তবক জমীন এবং তৃতীয় ভাগ হইতে বেহেশত-দোযখ সৃষ্টি করিলেন। চতুর্থ ভাগ আবার চার ভাগে বিভক্ত করিয়া ইহার প্রথম ভাগ হইতে ঈমানদারদের দৃষ্টিশক্তি, দ্বিতীয়ভাগ হইতে তাহাদের হৃদয়ের নূর এবং তৃতীয় ভাগ হইতে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ"-এই তৌহিদের নূর সৃজন করিলেন।

উল্লিখিত হাদীসের বর্ণনায় স্পষ্টতঃ বুঝা যায় যে, দয়াল নবী (সাঃ) প্রথম সৃষ্ট। তিনি আল্লাহর নূরে সৃষ্ট এবং তাবৎ বস্তু তাহার নূরে সৃষ্ট। অর্থাৎ রাসূলে পাক (সাঃ) আল্লাহতায়ালা এবং সমুদয় সৃষ্ট তথা অপরাপর নবী-রাসূল, ফেরেশতা, মানুষ, জ্বিন, পশু-পাখী ইত্যাদি সবকিছুরই মধ্যস্থতাকারী। তাই তিনি শুধু নিজ উম্মতের নবী নহেন; অপরাপর নবী-রাসূল (আঃ) ও ফেরেশতাদেরও নবী। কারণ সকলের হকিকতই দয়াল নবী (সাঃ) এর হকিকতে বা হকিকতে মুহাম্মদীতে নিহিত। যাহা কিছু নেয়ামত, রহমত, দয়া-অনুগ্রহ বা করুণা পৃথিবীর উপর জারী আছে-তাহা দয়াল নবী (সাঃ) এর মধ্যস্থতায় কায়েম রহিয়াছে। বিগত দিনের নবী-রাসূলগণের উপর যে সকল বিপদ-আপদ আপতিত হইয়াছে-দয়াল নবী (সাঃ) এর অছিলাতেই তাঁহারা সেই বিপদ-আপদ, ঝড়-ঝঞ্ছা থেকে রক্ষা পাইয়াছেন।

বিজ্ঞাপন

হযরত আদম (আঃ) সামান্য একটি ভুল করিয়াছিলেন-যাহার জন্য ৩৪০ বছর পর্যন্ত তিনি ক্রন্দন করিয়াছেন কিন্তু ক্ষমা মিলে নাই। অবশেষে নবী-করীম (সাঃ) এর অছিলাসহ ক্ষমা প্রার্থনা করিলে আল্লাহপাক তাহাকে ক্ষমা করেন।

হযরত আইয়্যুব (আঃ) ১৮ বছর অসুস্থ ছিলেন। ১৮ বছর অন্তে দয়াল নবী (সাঃ) এর অছিলাতেই তিনি রোগ মুক্তি লাভ করেন। তেমনি হযরত ইব্রাহিম (আঃ) নমরুদের অগ্নিকুন্ডে নিক্ষিপ্ত হইলে দয়াল নবী (সাঃ) এর অছিলাতেই সেই অগ্নি তাহার জন্য আরামদায়ক স্থানে পরিণত হয়।

ইমাম আজম আবু হানিফা (রাঃ) ছাহেব মহানবীর প্রশংসায় তদীয় কাছিদাতে বলেন,

বিজ্ঞাপন

★ হে আমার প্রাণপ্রিয় নবী (সাঃ)! আপনি এমনই শ্রেষ্ঠ গুণাধার যে, আপনি না হইলে আল্লাহ জগতের কোন সৃষ্ট বস্তুকে সৃষ্টি করিতেন না।

★ আপনার নূরের দ্বারাই চন্দ্র, সূর্য আলোকিত ও জ্যোতির্ময় হইয়াছে।

★ আপনারই পিতা হযরত আদম (আঃ) ভুল করার পর আপনারই অছিলা লইয়া ক্ষমা প্রাপ্তিতে কৃতকার্য হইয়াছেন।

বিজ্ঞাপন

★ হযরত ইব্রাহিম (আঃ) অগ্নিকুন্ডে নিক্ষিপ্ত হইলে আপনারই অছিলায় ঐ অগ্নি ঠান্ডা হইয়া নূরে পরিণত হইয়াছে।

★ হযরত আইয়্যুব (আঃ) মহারোগে আক্রান্ত হইয়া আপনাকে ডাকিবার অছিলাতেই আল্লাহতায়ালা তাহাকে রোগমুক্তি দান করিয়াছেন।

★ হযরত ঈসা (আঃ) আপনারই উচ্চ গুণাবলীর প্রশংসা করিতে করিতে আপনার সম্পর্কীয় সংবাদ প্রদান করিয়াছেন।

বিজ্ঞাপন

★ এই রূপে হযরত মুছা (আঃ) সর্বদা আপনারই অছিলায় কেয়ামতে নাজাত পাইবার জন্য দু'আ করিতেন।

★ আবার আখেরাতেও সমস্ত মানব, নবী-রাসূল এবং ফেরেশতা-সকলেই হাশরের মাঠে আপনারই পতাকার নীচে সমবেত হইবেন।

আদি হইতে অন্ত পর্যন্ত সমস্ত সৃষ্টির জন্য তথা নবী-রাসূল, মানব-জ্বিন, পশু-পাখী, গাছ-পালা, বৃক্ষ-লতা ইত্যাদির জন্য তিনি ছিলেন রহমত স্বরূপ। অর্থাৎ যাবতীয় রহমত প্রথমে হকিকতে মুহাম্মদীতে জমা হয়। অতঃপর তথা হইতে তাহা সৃষ্টির মধ্যে আবশ্যক মোতাবেক বন্টিত হয়। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন,

বিজ্ঞাপন

وَمَا أَرْسَلْنكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعُلَمِينَ

অর্থাৎ-('হে নবী!) আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্ব জাহানের জন্য রহমত ও করুণা স্বরূপ প্রেরণ করিয়াছি।' (সূরা আম্বিয়াঃ ১০৭)

তাফসীরে রহুল বয়ানে বর্ণিত আছে, একদা হযরত সোলায়মান (আঃ) নিজ তত্ত্ব উপবেশন করিয়া সমগ্র বিশ্ব ভ্রমণ করিতেছিলেন। সংগে ছিলেন সমকালীন সময়ের নবী (আঃ) গণ ও আলেম সকল। হযরত সোলায়মান (আঃ) তখতসহ উড়িতে উড়িতে একস্থানে আসিয়া তখত হইতে নীচে অবতরণ করিলেন এবং সকলকেই অবতরণ করিয়া সেই স্থান হাঁটিতে বলিলেন। কিছুক্ষণ হাঁটিয়া পুনরায় তখতে উঠিয়া স্থানত্যাগ করিলেন। তন্মধ্যে একজন তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, হে আল্লাহ নবী (আঃ)! আপনি এই ময়দান কেন পায়ে হাঁটিয়া অতিক্রম করিলেন? তিনি উত্তরে বলিলেন, এই ময়দানের সম্মানার্থে। পুনরায় তাহাকে প্রশ্ন করা হইল, কেন? তিনি বলিলেন, বর্তমানে এই ময়দান অনাবাদী ও জংগল। ভবিষ্যতে এমন দিন আসিবে যখন এই ময়দান আবাদ হইবে। তখন ইহার নামকরণ হইবে মদীনা-মানোয়ারা। এই পবিত্র নগরেই শেষ নবী (সাঃ) জীবনের শেষ দিন অতিবাহিত করিবেন-যাহার অছিলায় পবিত্র মাটি ধন্য হইয়া বিশ্ব জাহানের জিয়ারতগাহ হিসেবে চিহ্নিত হইবে।

বিজ্ঞাপন

ইঞ্জিল শরীফে দেখা যায়, একদা হযরত ঈসা (আঃ) অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় ফয়েজপূর্ণ ওয়ায করিতেছেন। সকল শ্রোতারাই আবেগে অভিভূত, অশ্রুসিক্ত। একজন মহিলা দাঁড়াইয়া হযরত ঈসা (আঃ) এর উদ্দেশ্যে বলিলেন, হে মসীহ (আঃ)! সে মাতাই ধন্যা-যাহার স্তন্য আপনি পান করিয়াছেন; সে কোলই ধন্যা-যে কোলে আপনি খেলাধুলা করিয়াছেন। ইহার জবাবে হযরত ঈসা (আঃ) বলিলেন, নিশ্চয়ই আমার মাতা বড় ধন্যা; কিন্তু আমার পরবর্তী সময় আরও একজন ধন্যা মাতা আসিবেন-যাঁহার কোলে খেলাধুলা করিবেন নবীদের সর্দার; তিনি শেষ নবী হইবেন। ইহার পরে হযরত ঈসা (আঃ) দয়াল নবী (সাঃ) এর নাম (সাঃ) মোবারক, শরীর মোবারকের গঠন প্রকৃতি ও জন্মবৃত্তান্তের বর্ণনা দিলেন।

সেই শ্রেষ্ঠতম নেয়ামত, করুণার আধার, নবীকুল শিরোমণি, রাহমাতুল্লিল যা'লামীন, নিখিল বিশ্বের ত্রাণকর্তা ধরাধামে আবির্ভূত হন আজ হইতে প্রায় সাড়ে চৌদ্দশত বছর পূর্বে রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে। তাঁহার ওফাৎ দিবসও ১২-ই রবিউল আউয়াল। রাসূলেপাক (সাঃ) এর শ্রেষ্ঠত্বের কারণে তাহার আবির্ভাব ও তিরোভাব দিবস হিসেবে ১২ই রবিউল আউয়াল অত্যন্ত গুরুত্ব ও তাৎপর্য বহন করে। প্রতি বছর তাই মহাধুমধামে ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্যের সহিত পালিত হয় ১২-ই রবিউল আউয়াল। এই দিবসকে বলা হয় পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী। ঈদ অর্থ খুশী; আর মিলাদুন্নবী হইল নবী করীম (সাঃ) এর জন্ম উৎসব। অর্থাৎ শ্রেষ্ঠতম নবী ও রাসূল (সাঃ), করুণার আধার, রহমতের ভান্ডার, হযরত দয়াল নবী (সাঃ) এর আগমন উপলক্ষে উদ্যাপিত ধর্মীয় কর্মকান্ডই ঈদে মিলাদুন্নবী।

পূর্বেই বলা হইয়াছে-নিখিল বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম নেয়ামত ও রহমত দয়াল নবী (সাঃ)। আল্লাহতায়ালা বলেন,

বিজ্ঞাপন

وَاذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ

অর্থাৎ-'তোমরা মহান রাব্বুল আ'লামীনের নেয়ামতের স্মরণ কর যাহা তোমাদেরকে প্রদান করা হইয়াছে।' (সূরা আলে ইমরান, ১০৩ নং আয়াত)

তিনি আরও বলেন, وَأَمَّا بِنِعْمَةِ رَبِّكَ فَحَدِّثْ অর্থাৎ-'এবং আল্লাহ তোমাদিগকে যে নেয়ামত দান করিয়াছেন তাহার আলোচনা কর, শোকরগোজার বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।' (সূরা দুহাঃ ১১)

বিজ্ঞাপন

অন্যত্র আল্লাহপাক বলেন,

لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُوْلاً مِّنْ أَنْفُسِهِمْ

অর্থাৎ- 'নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা মোমেনদের উপর হযরত রাসুলে পাক (সাঃ) কে প্রেরণ করিয়া বড় এহসান করিয়াছেন।' (সূরা আলে-ইমরানঃ ১৬৪)

আল্লাহতায়ালা কুরআন পাকে আরও বলেন, তোমরা যদি আমার দান সমূহে কৃতজ্ঞ হও, তাহা হইলে নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ বৃদ্ধি করিয়া দিব: যদি অকৃতজ্ঞ হও তবে জানিয়া রাখ, আমার শাস্তি অত্যন্ত কঠিন।"

হযরত আল্লামা জারকানী (রাঃ) স্বীয় তাছনিফে বলেন, আল্লাহ রাব্বুল আ'লামীনের দান সমূহের আলোচনাই তাহার শোকর বা কৃতজ্ঞতা এবং নেয়ামতের আলোচনা না করাই কুফর বা অকৃতজ্ঞতা।

উল্লিখিত কুরআনের আয়াত সমূহ থেকে ইহা স্পষ্টত যে, শ্রেষ্ঠতম নেয়ামত হিসেবে দয়াল নবী (সাঃ) এর আবির্ভাব দিবসে তাহার আলোচনা করা, বিশেষ করিয়া তাহার জীবন আদর্শ ও গুণাগুণ আলোচনা, তাহার প্রতি দরুদ ও ছালাম প্রেরণ করা এবং মহান খোদাতায়ালার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা ইত্যাদি অত্যন্ত ফজিলত পূর্ণ কাজ।

রাসূলে পাক (সাঃ) নিজ পরিচয় দানকালে বলেন যে, 'আমি ঊর্ধ্বতন পিতা ইব্রাহিমের দু'আ, ঈসার সুসংবাদ ও আমার মাতার স্বপ্ন।' হযরত ইব্রাহিম (আঃ) আল্লাহর নিকট দু'আ করিয়াছিলেন, "হে আমাদের পরওয়ারদেগার! উহাদের মধ্য হইতে একজন রাসূলের অভ্যুদয় কর, যিনি ঐ লোক সকলকে তোমার আয়াতসমূহ পাঠ করিয়া শোনাবেন এবং তাহাদিগকে কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দিবেন এবং তাহাদিগকে পাক-পাকিজা করিবেন। নিশ্চয়ই তিনি মহা পরাক্রমশালী ও মহাজ্ঞানী।" (সূরা বাকারা)।

হযরত ঈসা (আঃ) সুসংবাদ দান করিয়াছেন, “হে বনী ইসরাইল! আমি তোমাদের প্রতি একজন রসূল। আমার পূর্বে যে তাওরাত আছে আমি তাহার সত্যতা প্রতিপন্ন করিতেছি এবং একজন রাসূলের সুসংবাদ দান করিতেছি, যিনি আমার পরে আগমন করিবেন। তাহার নাম আহমদ।” (সূরায়ে সাফ)

তাই দয়াল নবী (সাঃ) বলিয়াছেন, আমি পিতা ইব্রাহিমের দু'আ ও ঈসা (আঃ) এর সুসংবাদ। মায়ের স্বপ্ন সম্পর্কে কিতাবে দেখা যায়-রাসূলে পাক (সাঃ) এর মাতা হযরত আমেনা পুত্রের জন্মের বহু পূর্বেই তাঁহার আগমনের ইংগিত পাইয়াছিলেন। পুত্র ভূমিষ্ঠ হওয়ার অব্যবহিত পরেই মাতা আমেনা দিব্য দৃষ্টিতে দেখিতে পান, বেহেশতী নূরে আসমান জমিন আলোকিত। আকাশের ফেরেশতারা দলে দলে তাহার ঘরে আসিয়া দয়াল নবীকে সালাম জানাইতেছেন। বলিতেছেন, মারহাবা ইয়া রাসূলাল্লাহ (সাঃ)। মারহাবা ইয়া হাবিবাল্লাহ (সাঃ)। শুধু ফেরেশতাগণই নহে, তাবৎ সৃষ্টি অর্থাৎ আসমান-জমিন, গ্রহ-নক্ষত্র, গাছ-পালা, বৃক্ষ-লতা, আকাশ-বাতাস তথা সৃষ্টিস্থিত প্রত্যেক অণু-পরমাণু সদ্য প্রসূত শিশু নবী (সাঃ) কে ছালাম দিতেছে। বলিতেছে, আছছালামু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ।

কেনইবা সালাম জানাইবে না? কারণ সৃষ্টি হিসেবে প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই সৃষ্টস্থিত সমুদয় অণু-পরমাণু আল্লাহ ও রাসূলের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিয়া আসিতেছে। সৃষ্টের বিকাশ হইয়াছে দুই ধাপে। প্রথমে আল্লাহর নূর থেকে নূরে মুহাম্মদী; অতঃপর নূরে মুহাম্মদী থেকে সমস্ত সৃষ্ট। তাই-ই সৃষ্টস্থিত প্রত্যেক অণু-পরমাণু বক্ষে ধারণ করিয়াছে আল্লাহ ও রাসূলের নাম সম্বলিত কলেমা শরীফ-"লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।" সর্বক্ষণই সমুদয় অণু-পরমাণুতে উক্ত কলেমা শরীফের জেকেরের ডংকা বাজিতেছে। হাজার হাজার বছর ধরিয়া চলিতেছে এই জেকের। আল্লাহর নামের সংগে যাহার নাম জড়িত-সেই মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) এর জেকের করিতেছে আসমান, জমিন, গ্রহ-তারা, বৃক্ষলতা, তথা সৃষ্টিস্থিত প্রত্যেক অণু-পরমাণু হাজার হাজার বছর ধরিয়া। সেই নূরে মুহাম্মদীর জাগতিক প্রকাশ শিশু মুহাম্মদ (সাঃ) এর আবির্ভাব দিবসে সংগত কারণেই প্রকৃতির হৃদয়ে আনন্দের বন্যা প্রবাহিত হয়; প্রকৃতিস্থিত সবকিছুই তাই প্রাণঢালা অভিনন্দন জানায় শিশু মুহাম্মদ (সাঃ) কে। আল্লাহতায়ালা পাক কুরআনে তাই বলেন,

وَ رَفَعْنَا لَكَ ذِكْرَكَ

অর্থাৎ-'আমি আপনার স্মরণকে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ও গৌরবময় করিয়াছি।' (সূরা আলাম নাশরাহঃ ৪)

শিশু মুহাম্মদ যে মুহূর্তে ধরাধামে আবির্ভূত হন সে মুহূর্তে আরও বেশ কিছু অলৌকিক ঘটনা ঘটে। যেমনঃ

∎ ঐ রজনীতে পারস্য সম্রাট খসরুর প্রাসাদ কাঁপিয়া উঠে এবং উহার চৌদ্দটি চূড়া ভাঙ্গিয়া পড়ে।

∎ উক্ত রজনীতে শামের তারবিয়া এবং পারস্যের ছাওয়া হ্রদ হঠাৎ শুষ্ক হইয়া যায়।

∎ পার্শীদের হাজার বছরের অগ্নিকুন্ড নির্বাপিত হয়।

∎ কাবা শরীফে রক্ষিত মুর্তিগুলি উপুর হইয়া পড়ে।

∎ কাবার প্রাচীর হইতে ধ্বনি হয়-মুহাম্মদ জন্মগ্রহণ করিয়াছে। মুহাম্মদ ধরায় আবির্ভূত হইয়াছে।

দয়াল নবী (সাঃ) ধরায় আসেন সমুদয় সৃষ্টির জন্যে, পৃথিবীস্থিত সমুদয় মানব জাতির জন্যে; কোন নির্দিষ্ট কওম বা জাতির জন্য নয়। রাসূলে পাক (সাঃ) এর পূর্ববর্তী নবী (আঃ) গণকে আল্লাহতায়ালা নির্দিষ্ট জাতি বা গোত্রের জন্য প্রেরণ করিতেন। যেমন, হযরত নূহ (আঃ) সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা বলেন,

لَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوْحًا إِلَى قَوْمِهِ

অর্থাৎ-"নিশ্চয়ই আমি নূহকে তাহার কওমের জন্য পাঠাইয়াছিলাম।" (সূরা আ'রাফঃ ৫৯)

হযরত হুদ (আঃ) সম্পর্কে বলিতেছেন,

وَ إِلَى عَادٍ أَخَاهُمْ هُوَدًا

অর্থাৎ-"আদ বংশের প্রতি তাহাদের ভাই হ্রদকে পাঠাইয়াছিলাম।" (সূরা আ'রাফঃ ৬৫)

হযরত ছালেহ (আঃ) সম্বন্ধে বলিতেছেন,

و إِلَى ثَمُودَ أَخَاهُمْ صِلِحًا

অর্থাৎ-“এবং ছামুদ জাতির প্রতি তাহাদের ভাই ছালেহকে পাঠাইয়াছিলাম।” (সূরা আ'রাফঃ ৭৩)

হযরত ঈসা (আঃ) সম্বন্ধে তিনি বলেন,

وَرَسُولاً إِلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ

অর্থাৎ-'তিনি (আল্লাহ) তাহাকে (ঈসাকে) ঈসরাঈল বংশীয়দের জন্য পয়গম্বর করিবেন। (সূরা আলে ইমরানঃ ৪৯) কিন্তু রাসূলে পাক (সাঃ) সম্বন্ধে আল্লাহপাক বলেন,

وَمَا أَرْسَلْنكَ إِلَّا كَافَّةً لِّنَّاسِ بَشِيرًا وَ نَذِيرًا

অর্থাৎ-'এবং আমি আপনাকে বিশ্বের সমস্ত মানবজাতির জন্য সুসংবাদ দাতা এবং ভীতি প্রদর্শনকারী হিসেবে রাসূল করিয়া পাঠাইয়াছি।' (সূরা ছাবাঃ ২৮)

দয়াল নবী (সাঃ) তাহার নবুয়তের ক্ষেত্র সম্পর্কে বলেন, "আমি বিশ্বের সমস্ত সৃষ্টির জন্যই রাসূল হইয়া আসিয়াছি।" (মেশকাত শরীফ)

সমস্ত সৃষ্টির নবী, রাহমাতুল্লিল আ'লামীন, করুণার ধন রাসূলে পাক (সাঃ) আজীবন তাই উম্মতের নাজাত, মুক্তি ও কল্যাণের জন্য খোদার দরবারে ক্রন্দন করিয়াছেন। যে উম্মত তাঁহার গলায় ফাস দেওয়ায় চেষ্টা করিল, যে উম্মতেরা তাহার বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করিল, পাথরের আঘাতে পবিত্র দেহ ক্ষত-বিক্ষত করিল, যে উম্মতের অত্যাচারে হিজরত করিতে তিনি বাধ্য হইলেন, সেই উম্মতের জন্যই তিনি কাঁদিয়া কাঁদিয়া আকুল হইতেন। বিবি খাদিজা (রাঃ) ও আবু তালেবের ইন্তেকালের পর মক্কার কোরায়েশরা তাঁহার উপর অত্যাচারের মাত্রা বহু গুণ বাড়াইয়া দেয়। একদা তিনি নামাজ পড়িবার জন্য নতজানু হইয়া বসিয়াছেন-এমন সময় ওকাবা নামক এক দুর্বৃত্ত একখানি চাদর দিয়া দয়াল নবী (সাঃ) এর গলায় ফাস লাগাইয়া পিছন দিক হইতে ধীরে ধীরে চাদরখানি মোচড়াইতে থাকে। ফলে নবীজীর শ্বাস রোধ হইবার উপক্রম হয়। এমন সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ)। তিনিই কোন রকমে দয়াল নবী (সাঃ) কে সেই বিপদ হইতে রক্ষা করেন।

ইহার কিছুদিন পর তিনি সত্য প্রচারে যান তায়েফ নগরে-মক্কা থেকে ১১২ কিলোমিটার দূরে। কিন্তু তায়েফ বাসীদের নিকট তিনি প্রত্যাখ্যাত হন। পাষন্ড তায়েফবাসীরা সত্যকে শুধু অস্বীকারই করে না; তদুপরি দয়াল নবী (সাঃ) এর উপর অত্যাচারের স্ট্রীম রোলার চালায়। একের হযরত যায়েদ (রাঃ)। তিনি তায়েফবাসীদের আক্রমণ থেকে দয়াল পর এক পাথরের আঘাতে তাহাকে জর্জরিত করে। সংগে ছিলেন নবী (সাঃ) কে হেফাজতের প্রাণপণ চেষ্টা করেন। কিন্তু একা কতটুকু সম্ভব? ফলে নবী করীম (সাঃ) এর সারা গা বাহিয়া রক্তের ধারা প্রবাহিত হয়। তিনি পুনঃপুন অজ্ঞান হইয়া পড়েন।

এই মর্মন্তুদ দৃশ্য দেখিয়া আসমানের ফেরেশতাগণ পর্যন্ত ক্রুদ্ধ হইয়া ছুটিয়া আসেন দয়াল নবী (সাঃ) এর নিকটে। হযরত জিব্রাইল (আঃ) তায়েফবাসীদেরকে ধ্বংস করিয়া দেওয়ার অনুমতি চান। কিন্তু করুণার সাগর অনুমতি না দিয়া বরং বলিলেন, "ভাই জিব্রাইল! ইহাদেরকে মারিও না। ইহারা হয়তো আমার সত্যকে উপলব্ধি করিতে পারে নাই। কিন্তু তাহাদের ঔরসে যাহারা আসিতেছে-তাহাদের অনেকেই এই সত্যকে উপলব্ধি করিয়া মোমিন হইতে পারে।"

অতঃপর মহান খোদাতায়ালার উদ্দেশ্যে হাত তুলিয়া দয়াল নবী (সাঃ) বলেন, “হে পাক পরওয়ারদেগার! তুমি তায়েফবাসীদের ক্ষমা করিয়া দাও। আমাকে ওরা বুঝে নাই, তাই এমন নিষ্ঠুর আচরণ করিয়াছে। যদি বুঝিত, কখনও এমন করিত না। তাহারা সত্যকে যে বুঝিতে পারে নাই-তাহা হয়তো আমারই অক্ষমতা-আমারই দুর্বলতা। যে ভাবে বুঝাইলে ওরা বুঝিত, সেই ভাবে হয়তো আমি বুঝাইতে পারি নাই। তুমি ওদেরকে ক্ষমা করিয়া দাও।"

উম্মতের প্রতি দয়াল নবী (সাঃ) এর মহব্বত বা দরদের কিছুটা নিদর্শন উপরের ঘটনার প্রতিফলিত হইয়াছে। মূলতঃ আহার নিদ্রা ত্যাগ করিয়া, পেটেতে পাথর বাঁধিয়া, পাহাড়ে-পর্বতে, গুহায়-গহবরে পড়িয়া উম্মতের ব্যথাতেই তিনি কাঁদিতেন। উম্মতের নাজাতের চিন্তাতেই তিনি মগ্ন থাকিতেন।

কিতাবে দেখা যায়, একদা মদীনা মনোয়ারাতে তিনদিন তিন রাত্র যাবৎ দয়াল নবী (সাঃ) নিখোঁজ ছিলেন। সেই অবস্থায় দয়াল নবী (সাঃ) কে না দেখিয়া সাহাবা সকল আহার-নিদ্রা ত্যাগ করিয়া তাঁহাকে খুঁজিতে লাগিলেন। কিন্তু কোথাও কোন সন্ধান পাইলেন না। হযরত উমর (রাঃ) ভাবিলেন, মদীনার মোনাফেকেরা হয়তো নবী করীম (সাঃ) কে হত্যা করিয়াছে। তিনি তাই খোলা তলোয়ার হাতে করিয়া মদীনার মোনাফেকদের উদ্দেশ্যে বলিতে লাগিলেন, "হে মদীনার মোনাফেকেরা! তোরা বল, আমার হাবীব (সাঃ) কোথায়? আল্লাহর হাবীবের খোঁজ যদি তোরা না দিতে পারস, তাহলে তোদের একজনেরও উমরের তরবারীর আঘাত হইতে নিস্তার নাই।"

হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) ছাহেব উমর (রাঃ) কে সান্তনা দিলেন। বলিলেন, হে উমর। ধৈর্য হারা হইও না। চল, আমরা দয়াল নবীকে (সাঃ) খুঁজিতে থাকি। হযরত আবুবকর (রাঃ) ও হযরত উমর ফারুক (রাঃ)-দুইজনে পথ চলিতেছেন। যাইতে যাইতে একটি পাহাড়ের নিকটবর্তী হইলেন। দেখিলেন, কিছু উট আর কয়েকজন রাখাল। উটগুলি মুখ উচু করিয়া কাঁদিতেছে। সাহাবাদ্বয় রাখালদের নিকট আল্লাহর হাবীবের সন্ধান জানিতে চাহিলেন। রাখালগণ বলিল, হে অনুসন্ধানকারীগণ! আল্লাহর হাবীবকে তো আমরা চিনি না। তবে আজ তিন দিন তিন রাত্রি যাবত এই পাহাড়ের গুহার মধ্যে একটি লোক উম্মতি, উম্মতি বলিয়া কাঁদিতেছেন। ঠিক তিন দিন যাবতই আমাদের উটগুলি ঘাস-পাতা খাওয়া বন্ধ করিয়া অঝরে কাঁদিতেছে। আপনারা যদি ঐ লোকটিকে এখান হইতে না লইয়া যান, তাহা হইলে আমাদের উটগুলি হয়তো না খাইয়া কাঁদিতে কাঁদিতে মারাই যাইবে। ইহা শুনিয়া হযরত আবুবকর (রাঃ) ছাহেব উমর (রাঃ) কে বলিলেন, হে উমর! যাহার ব্যাথায় ব্যথিত হইয়া, যাহার দুঃখে দুঃখিত হইয়া, যাহার শোকে শোকাতুর হইয়া বোবা পশু পাখী পর্যন্ত খানাপিনা ছাড়িয়া দেয়, তিনি আর কেহই নহেন, নিশ্চয়ই তিনি উম্মতের কান্ডারী রাহমাতুল্লিল আ'লামীন।

হযরত আবুবকর (রাঃ) ও উমর (রাঃ)-দুইজন গুহার মুখে গেলেন। দেখিলেন, উম্মতের কান্ডারী উম্মতি, উম্মতি বলিয়া কাঁদিতেছেন। প্রথমে হযরত আবুবকর (রাঃ) ছাহেব কান্নাভেজা কন্ঠে বলিলেন, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! আজ তিনদিন যাবৎ আপনার কোন খোঁজ নাই। আপনি কেমন করিয়া আমাদেরকে ভুলিয়া রহিলেন? আপনাকে আর উম্মতের জন্য কাঁদিতে হইবে না। আমি আমার জীবনের সমুদয় নেকী আপনার উম্মতের নাজাতের জন্য প্রদান করিলাম। আপনি আর কাঁদিবেন না। কিন্তু রাসূলে পাক (সাঃ) এর ক্রন্দন থামিল না। ইহা দৃষ্টে হযরত উমর (রাঃ) কাঁদিয়া আকুল হইলেন। নিকটবর্তী হইয়া তিনি বলিলেন, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি সেই উমর-যে উন্মুক্ত তরবারি লইয়া আপনাকে কাতেল করিবার জন্য গমন করিয়া পরে আপনার নূরানী চেহারা দর্শনে মুগ্ধ হইয়া ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলাম। সেই হইতে আজ পর্যন্ত আমার আমলনামার সমস্ত নেকী আপনার উম্মতের নাজাতের তরে প্রদান করিলাম। আপনি মাথা তুলুন, কান্না বন্ধ করুন; আপনার কান্না আমাদের সহ্য হয় না। হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ), হযরত উমর ফারুক (রাঃ)-কাহারোই আকৃতি দয়াল নবী (সাঃ) এর কান্না থামাইতে পারিল না। অবস্থা বেগতিক দেখিয়া তাহারা ফেরত আসিলেন। দেখা হইল হযরত আলী (কঃ) এর সাথে। হযরত আলীকে দয়াল নবী (সাঃ) এর খোঁজ প্রাপ্তির সংবাদ দিয়া তাহারা বলিলেন, হে আলী! আল্লাহর হাবীব পারিতেছেন না। তাহার ঠোটদ্বয় কাঁপিতেছে। হঠাৎ মা ফাতেমা দরজার পানে তাকাইয়া স্বামী ও অপর সাহাবাদ্বয়ের হৃদয়স্পর্শী কান্দার দৃশ্য দেখিয়া চিৎকার দিয়া স্বামীর বুকে পড়িয়া বলিতে লাগিলেন, "আবুবকর কাঁদে, উমর কাঁদে, তুমিও কাঁদ; বুঝেছি মদীনার মোনাফেকেরা আমার এতিম বাবাকে খুন করেছে।" হযরত আলী কান্নাভেজা কন্ঠে বলিলেন, হে ফাতেমা! দয়াল নবীকে কেহ খুন করে নাই। আজ তিন দিন হইল, এক গুহায় সেজদায় পড়িয়া উম্মতের নাজাতের জন্য ক্রন্দন করিতেছেন। বহু অনুনয় বিনয় করিলাম কিন্তু ফেরত আনিতে পারিলাম না। মনে হয়, মা ফাতেমা এবং হাসান-হোসেন ছাড়া তাহাকে ফেরত আনা সম্ভব নয়। তৎক্ষণাৎ হযরত আলী (কঃ), হযরত উমর ফারুক (রাঃ) এবং হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) একত্রে মা ফাতেমার হুজরার দরজায় আসিলেন। তিনজনই কাঁদিতেছেন; গন্ড বাহিয়া অশ্রু পড়িতেছে। হযরত আলী (কঃ) মা ফাতেমাকে কিছু বলিবেন কিন্তু আবেগে তিনি এক পাহাড়ের গুহার মধ্যে সেজদায় পড়িয়া উম্মতি, উম্মতি বলিয়া কাঁদিতেছেন। মা-ফাতেমা হাসান-হোসেনকে ডাকিয়া বলিলেন, হে হাসান-হোসেন! তোদের নানাজীর খবর পাওয়া গেছে। তোরা আয় আমার সাথে। মা ফাতেমা দৌড়ায়। পিছু পিছু হাসান-হোসেন দৌড়ায়। গুহার নিকটে পৌঁছাইয়া ফাতেমা চিৎকার দিয়া বলেন, আব্বাহুজুর! আজ তিনদিন হইল, তুমি কেমনে তোমার মাকে ভুলিয়া থাকিলে। তুমি যেখানেই যাও না কেন, এই দুঃখিনী মেয়েকে না বলিয়া তুমি বাহির হও না। অথচ আজ তিন দিন তিন রাত্র যাবত তোমার কোন খবর নাই। এই কয়েকদিনে একটি দানা-পানিও আমরা মুখে দেই নাই। হাসান-হোসেন আজ কয়েকদিন যাবত নানাজী, নানাজী বলিয়া কাঁদিতেছে। তুমি তোমার উম্মতের জন্য আর কাঁদিও না। তোমার এই দুঃখিনী মেয়ে সারা জীবনে যত নেকী অর্জন করিয়াছে-তাহা সমুদয়ই তোমার উম্মতের নাজাতের তরে প্রদান করিলাম। কিন্তু দয়াল নবী (সাঃ) মাথা তুলিলেন না। আরও অধিক বেগে কাঁদিতে লাগিলেন। মা ফাতেমার আর সহ্য হয় না। কলিজা ফাটা চিৎকার দিয়া মহান রাব্বুল আ'লামীনের উদ্দেশ্যে বলিয়া উঠেন, "হে পাক পরওয়ারদেগার! তুমি আমার আব্বাজীকে আর কাঁদাইও না। তাহার প্রেমাস্পদ উম্মতের জন্য আমি আমার কলিজার টুকরা, প্রাণের ধন, চোখের মণি হাসান-হোসেনকে কোরবানী মানত করিলাম।" তৎক্ষণাৎ আল্লাহপাক হযরত জিব্রাইলকে ডাকিয়া বলিলেন, হে জিব্রাইল! তুমি আমার বন্ধুকে কাঁদিতে বারণ কর। আমি আমার হাবীবের চোখের পানি, ফাতেমার চোখের পানি, সাহাবাদের চোখের পানি কবুল করিলাম। আমি আমার বন্ধুকে পরীক্ষা করিয়া দেখিলাম, তিনি কেমন উম্মতের কান্ডারী। হে জিব্রাইল! তুমি গিয়া বন্ধুকে বল আর কাঁদিতে হইবে না। তিনি ফাতেমাকে লইয়া, হাসান-হোসেনকে লইয়া যেন গৃহে ফেরত যান। আমি কথা দিতেছি, কেয়ামতের সেই কঠিন হাশরের দিনে আমার বন্ধুকে জিজ্ঞাসা না করিয়া একজন উম্মতকেও জাহান্নামে ফেলিব না।"

যে দয়াল নবী (সাঃ) আজীবন উম্মতের তরে অঝরে কাঁদিলেন, আহার, নিদ্রা ত্যাগ করিয়া দিবা-নিশি উম্মতের নাজাতের জন্য মহান খোদাতায়ালার দরবারে ক্ষমা ভিক্ষা চাহিলেন, সেই নবী করীমকে (সাঃ) কিছু উম্মত ব্যতীত কেহই চিনিতে পারে নাই। অথচ বনের হরিণ, জংগলের বাঘ, গাছ-পালা, বৃক্ষ-লতা, পাহাড়-পর্বত সবাই তাঁহাকে চিনিত-তাঁহাকে চলার পথে ছালাম প্রদান করিত। বলিত, আছছালামু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ! আছছালামু আলাইকা ইয়া হাবিবাল্লাহ!

একদা এক আনসারীর একটি উট ক্ষিপ্ত হইয়া উঠে। যাহাকেই সম্মুখে পায় তাহাকে উটটি কামড় মারে। দয়াল নবী (সাঃ) এর নিকট সংবাদ আসিলে তিনি সেই আনছারির গৃহে যাইতে মনস্ত করেন। কিন্তু সাহাবাসকল বাধা দেন। বলেন, উটটি ক্ষেপা কুকুরের মত যাহাকেই পায় তাহাকেই কামড়ায়। হুজুর, আপনি উটটির নিকট যাবেন না। কিন্তু সাহাবাগণের বারণ তিনি শুনিলেন না; উটটির নিকটে গেলেন। নিজ নবী (সাঃ) কে দেখিয়া উটটির মধ্যে আমূল পরিবর্তন দেখা দিল। জন্তুটি দয়াল নবী (সাঃ) এর সম্মুখে গর্দান মাটিতে স্থাপন করিয়া অধোবদন হইয়া রহিল। নবীজীকে সেজদা করিল। নবীজী ইহার গায়ে হাত বুলাইয়া মালিকের হাতে উটটিকে ফেরত দিয়া সাহাবাদের উদ্দেশ্যে বলিলেন, "আল্লাহর প্রতিটি সৃষ্টই জানে যে, আমি আল্লাহর রাসূল। কেবলমাত্র গোনাহগার ও নাফরমান মানুষ এই সত্যটি স্বীকার করিতে চায় না।"

দয়াল নবী (সাঃ) দুনিয়াতে আগমন করেন ১২-ই রবিউল আউয়ালে। আবার ৬৩ বছরান্তে এই তারিখেই তিনি দুনিয়া ত্যাগ করিয়া খোদাতায়ালার সান্নিধ্যে চলিয়া যান। তাই এই দিনে নবীজীর মহব্বতের ফয়েজ ওয়ারেদ হয়। দয়াল নবী (সাঃ) এর মহব্বতে যাহার চক্ষু হইতে এক ফোটা অশ্রু নির্গত হইবে, আল্লাহপাক তাহাকে নগদ বেহেশত দান করিবেন। দোযখ তাহার জন্য হারাম হইবে।

উপরের কাহিনী সমূহ থেকে বুঝা যায় যে, দয়াল নবী (সাঃ) এর সমগ্র সত্তাই ছিল প্রেমরসে সিক্ত। আর ইহাইতো স্বাভাবিক। কারণ তিনিতো পবিত্র জাতে উদ্ভূত প্রেমের প্রথম বিকাশ। প্রেমের কারণেই তিনি সৃষ্ট। প্রেমের রংগেই তিনি রঞ্জিত। তিনি যেমন প্রেমতত্ত্বে পূর্ণতা অর্জন করিয়াছিলেন; তেমনি জ্ঞানে, গুণে, মর্যাদায়, শ্রেষ্ঠত্বে কামালিয়াত বা পূর্ণতা অর্জন করিয়াছিলেন। আল্লাহতায়ালা তাহার হাবীবকে (সাঃ) উক্ত পূর্ণতা দান করিয়াছিলেন পবিত্র মেরাজ রজনীতে নিজের একান্ত সান্নিধ্যে আনিয়া।

একদা হযরত জিব্রাইল (আঃ) কে আল্লাহপাক বলিলেন, হে জিব্রাইল! তুমি যাও, আমার বন্ধুকে আমার দরবারে নিয়া আস। জিব্রাইল ফেরেশতার সংগে রাসূলে পাক (সাঃ) সেই পবিত্র রজনীতে এক এক করিয়া আসমানের সাতটি স্তবক পার হইলেন। সিদরাতুল মোনতাহাতে পৌছাইলেন। ফেরেশতা জিব্রাইল আর ঊর্ধ্বে গমন করিতে পারিলেন না। সে ক্ষমতা তাহাকে দেওয়া হয় নাই। তিনি বলিলেন, ইয়া হাবিবাল্লাহ! এবার আপনি একাই আপনার বন্ধুর দরবারাভিমুখে রওয়ানা হউন। এখান থেকে রাসূলে পাক (সাঃ) সম্মুখপানে অগ্রসর হইলেন। নূরের জগত, সিফাতের জগত পার হইলেন। সিফাতে হাকিকির আটটি মহাগ্রন্থ অধ্যায়ন করিলেন। সিফাতের জ্ঞান ও গুণ অর্জন করিলেন। অতঃপর আরও ঊর্ধ্বে উরুজ করিয়া প্রেম সাগরের গুপ্ত কোঠা হোব্বে সেরফায় পৌছাইলেন। সেখানে খোদাতায়ালা তদীয় পেয়ারা হাবীবের সাথে নিবিড় আলাপন সমাপ্ত করিলেন। তাহাকে সৃষ্টিতত্ত্বজ্ঞান ও স্রষ্ট্রাতত্ত্বজ্ঞানের পরিপূর্ণতা দান করিলেন। পবিত্র এ রজনীতে নবীজী দেখিলেন সমুদয় সৃষ্টি জগত। দেখিলেনঃ আরশ, কুরছি, লওহ, কলম, বেহেশত, দোযখ। দেখিলেন আলমে মেসাল ও মেসালের আয়নায় পাপীদের শাস্তির নমুনা।

তিনি হোব্বে সেরফা থেকে খোদাতায়ালার জাতের সান্নিধ্য লাভ করিলেন। দীদার লাভ করিলেন। ধন্য হইলেন খোদাতায়ালার (জাতের) দর্শন পাইয়া। ধন্য হইলেন খোদাতায়ালার হাস্যমুখী তাজাল্লা ও অনুপম সৌন্দর্য দেখিয়া। তিনি যাহা পাইলেন, পূর্ববর্তী কোন নবী-রাসূল তাহা পান নাই। তিনি খোদাতায়ালার অনুপম রূপ-লাবণ্য দেখিয়া এক অনাবিল শান্তি লাভ করিলেন। যে শান্তি প্রকাশ করার কোন ভাষা নাই। ইহা শুধু অনুভুতির ব্যাপার। ভুক্তভোগী খোদাদর্শক ব্যতীত আর কেহই ইহা বুঝিতে পারেন নাই।চায়

মেরাজান্তে দয়াল নবী (সাঃ) দুনিয়ায় আসিয়া খোদাতায়ালার নিকট কাঁদিতে লাগিলেন। এ ক্রন্দন উম্মতের জন্য। খোদাতায়ালাকে বলিলেন, হে মাবুদ! আমাকে তুমি যে নেয়ামত দান করিলে-ইতিপূর্বে তুমি যাহা কোন নবী রাসূলকে দাও নাই; আমি ইহাতে অবর্ণনীয় শান্তি লাভকরিয়াছি। কিন্তু আমার বর্তমান ব্যথা উম্মতের জন্য। আমি যাহা পাইলাম-উম্মতেরা কি তাহা পাইবে না? আল্লাহপাক বলিলেন, হে হাবীব! আপনি যে মেরাজতত্ত্ব লাভ করিলেন, যে প্রেমতত্ত্ব পাইলেন-তাহা আপনার উম্মতকেও দেওয়া হইল। আপনার সুযোগ্য উম্মতেরা দিনে পাঁচবার উক্ত মেরাজ লাভ করিবে। তাই দয়াল নবী (সাঃ) ঘোষণা করিলেন, "আসসালাতু মে'রাজুল মোমেনীন।" অর্থাৎ নামাজ মোমেনের জন্য মেরাজ।

সেই মেরাজতত্ত্ব, প্রেমতত্ত্ব বা স্রষ্টাতত্ত্বজ্ঞান অর্জনের জন্য আধ্যাত্মিক অনুশীলনের প্রয়োজন। আধ্যাত্বিক চর্চা ছাড়া মেরাজতত্ত্বজ্ঞান লাভ করা যায় না। বাতেনী জ্ঞান চর্চা ছাড়া মানবিক সুকুমার বৃত্তির বিকাশ সাধন হয় না; কু-প্রবৃত্তির ছোবল থেকে নিজেকে হেফাযত করা যায় না।

###

জাকের পার্টি প্রতিষ্ঠার পটভূমি এবং জাকের পার্টির মূলনীতিঃ

বর্তমান বিজ্ঞানের যুগ। এই যুগে বস্তুজ্ঞান চর্চার উৎকর্ষতা হইয়াছে, জাগতিক জ্ঞান চর্চার মাত্রা বৃদ্ধি পাইয়াছে; কিন্তু আধ্যাত্বিকতার অনুশীলন নাই। জাগতিক জ্ঞান চর্চার সাথে আধ্যাত্বিকতার সমন্বয় না থাকার কারণে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্রীয় জীবনে আজ শান্তি নাই। সর্বত্রই হিংসা, হানাহানি, অনাচার, অবিচার। মানবতা নাই। শিষ্টতা নাই। ভদ্রতা নাই। আদব নাই। লেহাজ নাই। গাছে ফল নাই। পানিতে মাছ নাই। জমিনে শস্য নাই। শুধু নাই আর নাই। শুধু শূন্যতা আর শূন্যতা।

মানবতা আজ ভূলণ্ঠিত। মানবতার প্রাণ আজ ওষ্ঠাগত। এই সংকট থেকে মানবতাকে রক্ষা করিতে হইলে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রয়োজন জাগতিক জ্ঞান চর্চার সংগে আধ্যাত্বিকতা অনুশীলনের সমন্বয় সাধন। উভয় জ্ঞানের যুগপৎ চর্চার মাধ্যমে যেমন মানুষের জাগতিক উন্নতি হইবে; তেমনি হইবে আত্মিক উন্নতি সাধন বা মানবিক গুণাবলীর বিকাশ।

আমার পীর কেবলাজান, চতুর্দশ হিজরীর মুজাদ্দেদ, হযরত মাওলানা খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব সাংগঠনিক পদ্ধতিতে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বস্তুজ্ঞান চর্চার পাশাপাশি আধ্যাত্বিক জ্ঞান চর্চার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন। তদীয় জীবনের শেষ উরসে তাই তিনি জাকের পার্টির ঘোষণা দিয়া যান। তাহার ওফাতের ৩৭ বছর পরে তাহার ইচ্ছানুযায়ী আমি ১৪১০ হিজরীর ১২-ই রবিউল আউয়াল মোতাবেক ১৪ই অক্টোবর ১৯৮৯ সালে রহমতের সময়ে জাকের পার্টি গঠন করি। সেদিন ছিল শনিবার অর্থাৎ আমার পীর কেবলাজানের জন্ম দিবস। একদিকে দয়াল নবীর (সাঃ) জন্মদিন, অন্যদিকে হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেবের জন্ম দিন। উভয় মহামানবের জন্মলগ্নে জন্ম হয় জাকের পার্টির-যাহার মূল নীতিমালা হইলঃ ইসলাম, ঈমান ও এহসান। এই তিনটি নীতির মধ্যে নিহিত আছে পরিপূর্ণ ইসলাম। আছে শরীয়ত, তরিকত, হকিকত ও মারেফাত। আছে রাসূলে করীম (সাঃ) এর ২৩ বছরের কর্মকান্ডের নিখুঁত সার-নির্যাস।

একদা দয়াল নবী (সাঃ) ও সাহাবাগণের মজলিসে একজন মোসাফিরের বেশ ধরিয়া হযরত জিব্রাইল (আঃ) আসিয়া বসেন। দয়ার নবী (সাঃ) কে পর পর জিজ্ঞাসা করেন, ঈমান কি? ইসলাম কি? এবং এহসান কি?

প্রথম প্রশ্নের উত্তরে রাসূলে করীম (সাঃ) বলিলেন। ঈমান হইলঃ

★ আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করা।

★ ফেরেশতাদের অস্তিত্বে বিশ্বাস করা।

★ আসমানী কিতাব সমূহে বিশ্বাস করা।

★ পয়গম্বরগণের উপরে বিশ্বাস আনা।

★ পুনরুত্থান দিবসে বিশ্বাস করা।

★ তকদীরে বিশ্বাস করা।

দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাবে রাসূলে পাক (সাঃ) বলিলেন। ইসলাম হইলঃ

★ দিনে পাঁচবার নির্ধারিত সময়ে নামাজ আদায় করা।

★ যাকাত প্রদান করা।

★ পূর্ণ রমজান মাসের রোজা রাখা।

★ সামর্থ্যবান হইলে হজ্জব্রত পালন করা।

তৃতীয় প্রশ্নের জবাবে রাসূলে পাক (সাঃ) বলিলেন। এহসান হইলঃ

★ এমনভাবে ইবাদত করা যেন তুমি খোদাতায়ালাকে দেখিতেছ অর্থাৎ খোদাতায়ালাকে দেখিয়া ইবাদত করাই এহসান। যদি ইহা সম্ভব না হয়, তবে মনে করিতে হইবে যে, খোদাতায়ালা তোমাকে দেখিতেছেন। উপরের আলোচনায় বুঝা গেল যে, ঈমান ও ইসলাম হইল শরীয়তের ইশারা এবং এহসান হইল মারেফাতের ইশারা বা মেরাজ তত্ত্বের ইশারা।

সুতরাং ইসলাম, ঈমান, এহসান-এই তিন নীতিমালায় সজ্জিত হইল জাকের পার্টি। এই পার্টি ওলী-আল্লাহগণের পার্টি। এই পার্টি জাকেরান, আশেকানদের পার্টি। এই পার্টির সদস্যগণের কতর্ব্যঃ সেই আশারের

▶ জাগতিক জ্ঞান চর্চার সাথে সাথে আধ্যাত্মিকতা চর্চার মাধ্যমে নিজেদের মানবিক গুণাবলীর বিকাশ সাধন করা। মত (গ্লাব) নটিক

▶ অন্যদেরকে আধ্যাত্বিক জ্ঞান অর্জনে উদ্বুদ্ধ করা। চিন লাদেন নিকা

▶ আর্তমানবতার সেবা করা।

বর্তমান জামানা মুসিবতের জামানা। জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে কেবল বিপদ আর বিপদ। অদূর ভবিষ্যতে সারা পৃথিবী ব্যাপী এক রক্তক্ষয়ী বিপদের ইশারা পাওয়া যায়। সেই বিপদে জাকের পার্টি নূহের তরী সম কাজ করিবে। নূহ (আঃ) এর তরীতে যাহারা আরোহন করিয়াছিলেন, কেবল তাহারাই মহা প্লাবন থেকে বাঁচিয়াছিলেন। তেমনি বিশ্বব্যাপী যে ভয়ংকর রক্তক্ষয়ী বিপদ আসিতেছে, সেই বিপদে জাকের পার্টির পতাকাতলে যাহারা সমবেত হইবে অর্থাৎ যাহারা নিজেদের জাহের ও বাতেনকে শরীয়তের জাহেরী ও বাতেনী পোশাকে সজ্জিত করিবে-তাহারাই কেবল উদ্ধার পাইবে। কেন না আমার পীর কেবলাজান ছাহেব বলিয়াছেন, "বিশ্বব্যাপী লোহার মই টানা হইবে। একমাত্র মোমিন ব্যতীত কেহই বাঁচিতে পারিবে না। মোমিন আল্লাহর কুওতের কেল্লায় হেফাজতে থাকিবে।" আর মোমিনতো তিনিই- যিনি দয়াল নবী (সাঃ) এর আদর্শের পূর্ণ অনুসারী।

জাকের পার্টি ক্ষমতাকেন্দ্রিক পার্টি নয়; আদর্শ কেন্দ্রিক পার্টি। রাসূলে পাক (সাঃ) এর পরিপূর্ণ আদর্শ প্রচার করা এই পার্টির মূল লক্ষ্য। সে দিন বেশী দূরে নয়, যেদিন বিশ্ব ব্যাপী জাকের পার্টির বিজয় ডংকা বাজিবে। আল্লাহপাকই সব ভাল জানেন।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD