খোদাপ্রেম লাভের একমাত্র পথ শরীয়ত ও সুন্নতের পরিপূর্ণ অনুসরণ

হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘ইবাদত ও মহব্বত’ بِسمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ প্রেম ও প্রেমের বিভিন্ন স্তর সম্পর্কে আলোচনাঃ
বিজ্ঞাপন
পূর্বের নসিহতে প্রেমের সংজ্ঞায় বলা হইয়াছে, প্রেম হইল হৃদয়ে উৎপন্ন এক শক্তি বা আকর্ষণ যাহা প্রেমাস্পদের ধ্যানে প্রেমিককে মগ্ন রাখে। প্রেমের জন্য দুইটি পক্ষের প্রয়োজন। প্রেম এক পক্ষে উৎপন্ন হয়: অন্য পক্ষের দিকে ধাবিত হয়। যে পক্ষে প্রেম উৎপন্ন হয় তাহাকে বলে প্রেমিক বা মোহেব এবং যে পক্ষের দিকে প্রেম ধাবিত হয় তাহাকে বলে প্রেমাস্পদ বা মাহবুব। প্রেমিকের হৃদয়ে যে অবস্থার কারণে প্রেম পয়দা হয়-তাহাকে বলা হয় প্রেমিকত্ব বা মোহেববিয়াত এবং যে অবস্থার ফলে প্রেমিক হইতে প্রেম প্রবাহ প্রেমাস্পদের দিকে আসিতে থাকে তাহাকে বলে প্রেমাস্পদত্ব বা মাবুবিয়াত। যেমন চুম্বক লৌহকে আকর্ষণ করে। চুম্বকের এই আকর্ষণকে প্রেম হিসাবে চিন্তা করিলে চুম্বক হইবে প্রেমিক এবং লৌহ হইবে চুম্বকের প্রেমাস্পদ বা মাহবুব। চুম্বকের ভিতর অবস্থাকে বলা হইবে প্রেমিকত্ব বা মোহেববিয়াত এবং লৌহের অবস্থাকে বলা হইবে প্রেমাস্পদত্ব বা মাহবুবিয়াত।
খোদাতায়ালার প্রেম বা মহব্বতের জ্ঞান ও গুণ বা নূর লাভের জন্য আধ্যাত্বিক জগতস্থিত কতিপয় দায়েরা ছায়ের করিতে হয়। যেমনঃ মহব্বতে আওয়াল, মহব্বতে ছানী ও মহব্বতে ছালেছ বা কাওছ। উল্লিখিত দায়েরা সমূহ বেলায়েতে কোবরার অধ্যায়ে অবস্থিত। যতক্ষণ পর্যন্ত বেলায়েতে কোবরায় উপনীত হওয়া না যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত মহব্বতের সত্যিকার জ্ঞান ও গুণ অর্জন করা যায় না।
বেলায়েত তিন প্রকার। যথাঃ-বেলায়েতে ছোগরা, বেলায়েতে কোবরা ও বেলায়েতে উলিয়া। বেলায়েত হইল আল্লাহ ব্যতীত সবকিছু ভুলিয়া যাওয়া। বেলায়েতে ছোগরা ওলী-আল্লাহগণের বেলায়েত; বেলায়েতে কোবরা নবী (আঃ) গণের বেলায়েত এবং বেলায়েতে উলিয়া ফেরেশতাদের বেলায়েত। ওলী-আল্লাহসকল চেষ্টা, সাধনা ও রেয়াযতের মাধ্যমে বেলায়েতে ছোগরা পর্যন্ত পৌঁছাইতে পারেন। ইহার উপরে বেলায়েতে কোবরায় যাওয়ার জন্য প্রয়োজন নবী করীম (সাঃ) এর সাহায্য, সহযোগিতা ও আনুগত্য। রাসূলে পাক (সাঃ) এর সহযোগিতা ব্যতীত কেহই বেলায়েতে কোবরায় প্রবেশ করিতে পারে না। কাজেই বুঝা যায় যে, খোদাতায়ালার জাতি ও সিফাতি প্রেম অর্জন করিতে হইলে রাসূলে পাক (সাঃ) এর সহযোগিতা ব্যতীত উপায় নাই। উল্লেখ্য যে, প্রেম দুই প্রকার। যথাঃ সিফাতি প্রেম ও জাতি প্রেম।
বিজ্ঞাপন
রূপ, সৌন্দর্য ও গুণাগুণ দৃষ্টে প্রেমিকের দেলে যে প্রেম পয়দা হয়-তাহা সিফাতি প্রেম। আর যে ক্ষেত্রে প্রেমিকের নজর প্রেমাস্পদের সত্ত্বা ব্যতীত অন্য কোন দিকে থাকে না-সেই ক্ষেত্রের প্রেমকে জাতি প্রেম বলা হয়।
খোদাতায়ালার জাত আছে; আসমা ও সিফাত বা নাম ও গুণাবলীও আছে। কাজেই খোদাতায়ালার প্রতি খোদাপ্রেমিকের প্রেমকেও দুইস্তরে ভাগ করা যায়। যথাঃ জাতি প্রেম ও সিফাতি প্রেম। আল্লাহতায়ালার গুণাবলী তাহার জাতকে কেন্দ্র করিয়া বর্তমান। জাত ও সিফাতকে একত্রে চিরস্থায়ী হাকীকী জগত বলে। আসমা ও সিফাতের জগতের নিম্নে আছে মহা নূরময় জগত-যেখানে আল্লাহতায়ালার আসমা ও সিফাত অর্থাৎ নাম ও গুণাবলীর প্রতিবিম্ব বর্তমান
প্রেম সম্পর্কে আলোচনায় বুঝা গেল যে, প্রেমের দুইটি পক্ষ-প্রেমিক ও প্রেমাস্পদ; প্রেম দুই প্রকার-জাতি প্রেম ও সিফাতি প্রেম এবং প্রেমের দুইটি অবস্থা-প্রেমিকত্ব ও প্রেমাস্পদত্ব। জাতের মর্তবায় প্রেমের দুইটি অবস্থা আছে। যথাঃ জাতি প্রেমিকত্ব বা মোহেববিয়াতে জাতি এবং জাতি প্রেমাস্পদত্ব বা মাহবুবিয়াতে জাতি। সিফাতের মর্তবায় প্রেমের দুইটি অবস্থা-সিফাতি প্রেমিকত্ব বা বিশুদ্ধ মোহেববিয়াতে সিফাতি এবং সিফাতি প্রেমাস্পদত্ব বা বিশুদ্ধ মাহবুবিয়াতে সিফাতি। এতদ্ব্যতীত আসমা ও সিফাতের প্রতিবিম্বের মর্তবাতেও প্রেমের দুইটি অবস্থা আছে। যথা আসমা ও সিফাতের জেলাল (প্রতিবিম্ব) এর মোহেববিয়াত (বা প্রেমিকত্ব) এবং জেলালের মাহবুবিয়াত।
বিজ্ঞাপন
আল্লাহতায়ালার জাতের মাহবুবিয়াতের (বা প্রেমাস্পদত্ব) প্রকাশ দয়াল নবী (সাঃ) এর জন্য খাস। জাতের মোহেববিয়াতের প্রকাশ হযরত মুসা (আঃ) এর জন্য খাস। আল্লাহতায়ালার আসমা ও সিফাতের মাহবুবিয়াতের পূর্ণ প্রকাশ হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর জন্য খাস। আসমা ও সিফাতের মোহেববিয়াতের বা প্রেমিকত্বের প্রকাশ-তাহার মাহবুবিয়াতের মত অন্যান্য পয়গম্বর (আঃ) এর উপর প্রমাণিত।
আবার আসমা ও সিফাতের জেলালের মোহেববিয়াতের প্রকাশ প্রেমিক আউলিয়াদের জন্য খাস্ এবং জেলালের মাহবুবিয়াতের প্রকাশ মাহবুব আউলিয়াগণের জন্য খাস্। খোদাঅন্বেষীদের মধ্যে দুই শ্রেণীর ছালেক আছে। এক শ্রেণীকে বলা হয় মুরীদ এবং অন্য শ্রেণীকে বলা হয় মোরাদ। মুরীদগণ চেষ্টা-সাধনা ও কঠোর ব্রতের মাধ্যমে যখন বেলায়েতে ছোগরার নূরময় জগতে পৌঁছায়-তখন তাহাদের উপর আসমা ও সিফাতের প্রতিবিম্বের মোহেববিয়াত বা প্রেমিকত্বের নূর ছয় দিক বা দশ দিক হইতে অবিরাম আসিতে থাকে। সেই নূর লাভ করিয়া মুরীদের নাফস অন্ধকার দোষসমূহ পরিত্যাগপূর্বক প্রেমিক আউলিয়ার মর্যাদা লাভ করে। অপরদিকে মোরাদ সামান্য সাধনাতেই বেলায়েতে ছোগরায় পৌঁছাইয়া আসমা ও সিফাতের জেলালের মাহবুবিয়াতের নূরে নিজ নাফসের কালিমা মুছিয়া ফেলিয়া খোদাতায়ালার মাহবুব আউলিয়ার আসনে উপবিষ্ট হন।
পূর্বেই বলিয়াছি, প্রেম দুই প্রকার। যথাঃ- জাতি প্রেম ও সিফাতি প্রেম। মোহেব আউলিয়া বা মাহবুব আউলিয়া জাতি বা সিফাতে হাকীকীর প্রেম-কোনটাই পান না; তাহারা পান জেলালের প্রেম। আর তাই বেলায়েতে ছোগরায় থাকিয়া খোদার যথার্থ প্রেম পাওয়া যায় না। খাঁটি প্রেম অর্জনে প্রয়োজন বেলায়েতে কোবরায় অনুপ্রবেশ। বেলায়েতে কোবরায় সাড়ে তিনটি দায়েরা বর্তমান। যথাঃ-আকরাবিয়াত, মহব্বতে আউয়াল, মহব্বতে ছানী ও কাওছ। আকরাবিয়াত আসমা ও সিফাতের দায়েরা, মহব্বতে আউয়াল আসমা ও সিফাতের মূল, মহব্বতে ছানী আসমা ও সিফাতের মূলের মূল এবং কাওছ আসমা ও সিফাতের আসলের মূলের মূল স্থান। কাওছের উপরে খোদাতায়ালার জাত মোজাররাদা'।
বিজ্ঞাপন
সাধক যখন বেলায়েতে কোবরার আকরাবিয়াতে পৌঁছায়-তথায় "সিফাতে এরাদতে" সাধকের রূহ ফানা প্রাপ্ত হয়। ইহার উপরে অর্থাৎ মহব্বতের দায়েরা সমূহে ছালেকের রূহ ছায়ের করে না; ছায়ের করে তদীয় রূহে বেমেছালী ছুরাত। ছালেক মহব্বতে আউয়াল বা মহব্বতে ছানী ছায়ের করিবার সময় অত্যন্ত সূক্ষ্ণ, পরিচ্ছন্ন ও বিশুদ্ধ নূর লাভ করে। এই নূরকে বুঝানোর কোন উপমা না থাকায় ওলী-আল্লাহসকল ইহাকে বে-কায়েফী (অবস্থা বর্ণনাতীত) বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। উক্ত বিশুদ্ধ ও পরিচ্ছন্ন নূর রূহে বেমেছালী ছুরাতের মাধ্যমে রূহে, অতঃপর রূহ হইয়া সাধকের নাফসে আসে। সাধকের নাফসের অবশিষ্ট দোষসমূহ দূর হয়। নাফস পূর্ণভাবে পবিত্র হয় এবং খোদাতায়ালার প্রেমে এমনই বিভোর হয় যে আল্লাহ ছাড়া কোন কিছুই আর তাহার খেয়াল থাকে না। প্রেমের জ্ঞান ও গুণ মহব্বতের এই দুই দায়েরাতেই আসে। এই প্রেমের বাহনে চড়িয়া প্রেমিক কাওছের মাকাম অতিক্রম করিয়া খোদাতায়ালার জাতে পৌঁছায়, জাতে ফানা হয় ও জাতের প্রেমে বিমোহিত হয়।
তবে উপরে বর্ণিত প্রেম নিছক প্রেম নয়। এই প্রেমে দৃষ্টি শান'ও ইতেবার' হইতে চলিয়া যায় না। যে প্রেমে দৃষ্টি জাত ছাড়া অন্য কোন দিকে থাকে না, যেখানে শান ও ইতেবারের কোন প্রভাব থাকে না-তাহাই নিছক প্রেম বা হোব্বে ছেরফা। এই দ্বিতীয় প্রকারের প্রেম রাসূলে পাক (সাঃ) এর জন্য খাস। সেই প্রেম অর্জনের জন্য মহব্বতের ময়দানে ব্যাপক ও বিস্তৃতভাবে ছায়ের প্রয়োজন এবং বিস্তৃত ছায়েরের জন্য ওজুদ মাওহুব লাহু নামক এক নূরের দেহও প্রয়োজন। এখানে "রূহে বেমেছালী ছুরাত" অকার্যকর।
যথার্থ ও পূর্ণাংগ সেই প্রেম অর্জনের জন্য মহব্বতের ময়দানে পাঁচটি মাকাম বর্তমান আছে। যথাঃ- হকিকতে ইব্রাহিমী, হকিকতে মুসবী, হকিকতে মুহাম্মদী, হকিকতে আহমদী ও হোব্বে সেরফা। হকিকতে ইব্রাহিমীর দায়েরাতে যে সাধক উপনীত হইতে পারেন, তিনি বিশুদ্ধ মাহবুবিয়াতে সিফাতি নূর বা কারেন্ট লাভ করেন। এই মাকাম অর্জনকারী সাধকের সমুদয় সত্ত্বায় খোদার প্রেম এত অধিক থাকে যে, খোদাতায়ালার যে কোন রকম প্রেমের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার ক্ষমতা সাধকের মধ্যে জন্মে। খোদাতায়ালা যদি আসমান ও জমীন দ্বারা যাতাকল তৈরী করিয়া-সেই যাতাকলের দ্বারাও যদি তাহাকে পিঁষিয়া ফেলেন-তবুও সেই খোদাপ্রেমিক খোদাতায়ালাকে ছাড়িতে পারেন না।
বিজ্ঞাপন
হযরত ইব্রাহিম (আঃ) তদীয় একমাত্র পুত্র ইসমাইলকে নিজ প্রাণাপেক্ষা অধিক ভালবাসিতেন। একদা হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর উপর সেই একমাত্র পুত্র ইসমাইলকে কোরবানী করার আদেশ আসে। ইহা ছিল তাঁহার [হযরত ইব্রাহিম (আঃ)] উপর প্রেমের অগ্নি পরীক্ষা। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) দ্বিধা করিলেন না। প্রাণাধিক পুত্র ইসমাইলের কোমল গলায় ছুরি চালাইতে মনস্থ করিলেন। পুত্রকে আল্লাহর উদ্দেশ্যের কথা বলায় পুত্রও দ্বিধাদ্বন্ধ না করিয়া খোদার ইচ্ছায় নিজেকে উৎসর্গ করিতে আগ্রহ প্রকাশ করিলেন। কি অপূর্ব প্রেম! একজন খোদার প্রেমের তলোয়ারে কাতেল করিবেন পুত্রকে। অপর জন নিজ জীবন খোদার প্রেমের স্বার্থে কোরবান করিবেন। অবশেষে নির্ধারিত স্থানে পিতা পুত্রের কোমল গলায় ছুরি চালনা করিলেন। আল্লাহর ইচ্ছা ছিল ভিন্ন। পুত্র কোরবানী না হইয়া তথায় একটি দুম্বা কোরবানী হইল। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) প্রেমের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইলেন।
হকিকতে ইব্রাহিমীর উপরে আছে হকিকতে মুসবীর দায়েরা-যে দায়েরায় উপনীত সাধক জাতি প্রেমিকত্ব বা মোহেববিয়াতে জাতি নূর লাভ করে; খোদার জাতের দর্শনের আকাংখায় ব্যাকুল হয়। ইহার উপরে আছে দায়েরায়ে হকিকতে মুহাম্মদী ও হকিকতে আহমদী। হকিকতে মুহাম্মদীতে উপনীত খোদাপ্রেমিক যেমন খোদাতায়ালাকে ভালবাসে, তেমনি খোদাতায়ালাও সেই প্রেমিককে ভালবাসে। উভয়ে উভয়কে ভালবাসেন। কিন্তু হকিকতে আহমদীর দায়েরায় উপনীত সাধকের মধ্যে খোদাকে ভালবাসার অবস্থা আর থাকে না। এখানে থাকে কেবল জাতি প্রেমাস্পদত্ব বা মাহবুবিয়াতে জাতি নূরের ফয়েয। এই স্তরে উপনীত সাধকের মধ্যে থাকে হতবুদ্ধিতা ও অজ্ঞতা; নিজেকে নিকৃষ্ট দর্শনের জ্ঞান ও অবস্থা। যে নিজেকে যত ছোট মনে করে-খোদাতায়ালা তাঁহাকে তত অধিক মহব্বত করেন। আর তাই আহমদীর দায়েরায় উপনীত সাধক খোদাতায়ালার অধিক প্রেম অর্জনে সক্ষম হন। ইহার উপরে আছে-হোব্বে সেরফা; যেখান হইতে সাধক নিজ ওজুদ মাওহুব লাহুর কুওতে নজরিয়ার মাধ্যমে নিছক জাতি প্রেমের শরাব পান করিয়া ধন্য হয়; শরাবের নেশায় সবকিছু ভুলিয়া যায়। এই মাকাম রাসূলে পাক (সাঃ) এর জন্য খাস। রাসূলে পাক (সাঃ) এর পরিপূর্ণ অনুসরণকারীরাও সেখানে পৌঁছাইতে সক্ষম। রাসূলে পাক (সাঃ) হোব্বে সেরফায় পৌঁছাইয়া খোদার নিছক জাতের প্রেমসুধা পানে কখনও কখনও এত অধিক বিভোর হইতেন যে, তিনি আল্লাহতায়ালার উদ্দেশ্যে বলিতেন,
اللَّهُمَّ اَنْتَ وَ مَا أَنَا وَ مَا سَوَاكَ تَرَكْتُ لَأَجْلِكَ -
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ-"হে আল্লাহ! শুধু তুমি; আমি না এবং তোমা ব্যতীত সবকিছু তোমারই জন্য ছাড়িয়া দিলাম।" ইহাই বেলায়েতে নবুয়তের চূড়ান্ত স্তর। এখান হইতেই আল্লাহতায়ালা দয়াল নবী (সাঃ) কে দুনিয়ার দিকে ঘুরাইয়া দিতেন। বলিতেন,
قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٍ مِّثْلُكُمْ يُوحَى إِلَى
অর্থাৎ- "বলুন! (হে নবী! আমি তোমাদের মতই মানুষ; তবে আমার উপরে অহী হয়।" (সূরা কাহাফঃ ১১০) ইহা কামালাতে নবুয়তের ইশারা।
বিজ্ঞাপন
খোদাতায়ালাকে ভালবাসা সবার জন্য ফরযঃ
আল্লাহতায়ালা পাক কালামে বলেন,
انْ كَانَ آبَاؤُكُمْ وَ اَبْنَاؤُكُمْ وَ إِخْوَانُكُمْ وَ أَزْوَاجُكُمْ وَ عَشِيْرَتُكُمْ وَاَمْوَالُ نِ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَ تجارَة تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَ مَسكِنُ تَرْضُوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُمْ مِّنَ اللَّهِ وَرَسُوْلِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيْلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ طَ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَسِقِينَ
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ-"যদি তোমরা পিতা-পুত্র, ভাই-ভগ্নি, আত্মীয়-কুটুম, ধন-সম্পত্তি, ব্যবসা-বাণিজ্য, বাসগৃহ প্রভৃতি যাহাকিছু তোমাদের আছে, তত্সমুদয়কে আল্লাহ, তাহার রাসূল ও আল্লাহর পথে জেহাদ অপেক্ষা অধিক ভালবাস, তবে আল্লাহর আদেশ আগমন পর্যন্ত প্রস্তুত থাক; আল্লাহ পাপিষ্ঠ দলকে পথ দেখান না। (সূরা তওবাঃ ২৪)
হাদীসে শরীফে বর্ণিত আছেঃ একদা কতিপয় লোক রাসূলে পাক (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করিয়াছিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সাঃ)! ঈমান কি? তিনি উত্তর করিয়াছিলেন, "আল্লাহ ও রাসূলকে সর্ববিধ পদার্থ হইতে অধিক ভালবাসার নামই ঈমান।"
খোদাপ্রেম লাভের একমাত্র পথ-শরীয়ত ও সুন্নতের পরিপূর্ণ অনুসরণঃ
বিজ্ঞাপন
খোদাতায়ালার ভালবাসা বা প্রেম লাভের উপায় কি? এই প্রসংগে আল্লাহপাক দয়াল নবী (সাঃ) এর উদ্দেশ্যে বলেন,
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّوْنَ اللَّهَ فَاتَّبِعُوْنِي
অর্থাৎ-“(হে নবী!) বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালবাস, তাহা হইলে আমাকে অনুসরণ কর।" (সূরা আলে ইমরানঃ ৩১)
বিজ্ঞাপন
উক্ত আয়াতের ভাবার্থ দাঁড়ায়, হে মানব মন্ডলী! তোমরা যদি খোদাতায়ালার প্রেম, পিরিতি, ভালবাসা অর্জন করিতে চাও, তবে যে জীবন বিধান বা শরীয়ত আমি আল্লাহর পক্ষ হইতে আনিয়াছি, যে জীবন বিধান অনুযায়ী আমি নিজেকে পরিচালিত করিতেছি-তাহা তোমরাও পালন কর, সেই বিধান অনুযায়ী তোমরাও নিজেদেরকে পরিচালিত কর অর্থাৎ আমাকে পরিপূর্ণভাবে অনুসরণ কর। যদি তোমরা আমাকে যথাযথ অনুসরণ করিতে পার, তবে আল্লাহর প্রেম পিরিতি তোমরা অর্জন করিতে পারিবে, আল্লাহর খাস হোব্ব-এশক-মহব্বতের ফয়েযে তোমরা তোমাদের দেল পূর্ণ করিতে পারিবে। আল্লাহতায়ালা তোমাদিগকে মহা পুরস্কারে পুরস্কৃত করিবেন। পাক কালামে আল্লাহতায়ালা বলেন,
يُحْبِبْكُمُ اللهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ ط وَاللَّهُ
غَفُورٌ رَّحِيم
অর্থাৎ-"আল্লাহ তোমাদিগকে ভালবাসিবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করিয়া দিবেন। অবশ্যই তিনি পরম দয়ালু ও করুণাময়।” (সূরা আলে ইমরানঃ ৩১)
উপরের আলোচনায় ইহা স্পষ্ট হইল যে, খোদার প্রেম-ভালবাসা অর্জনের একটাই পথ-তাহা হইল শরীয়ত ও সুন্নতের পরিপূর্ণ অনুসরণ। শরীয়ত ও সুন্নত কি? রাসূলে পাক (সাঃ) এর দীর্ঘ তেইশ বৎসরের (নবুয়তপ্রাপ্তিকাল হইতে ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত) সমুদয় কর্মসূচী ও কর্মকান্ডই শরীয়ত ও সুন্নত।
শরীয়ত ও সুন্নতের তথা আল্লাহর বিধান ও রাসূলে পাক (সাঃ) এর অনুসরণের সাতটি স্তর আছে। সপ্ত স্তরের মধ্যে প্রথম স্তরটি জাহেরা শরীয়তের সাথে সম্পৃক্ত। আর বাকী ছয়টি স্তর বাতেনী শরীয়তের মধ্যে নিহিত। শরীয়ত ও সুন্নতের সাতটি স্তরের জ্ঞান ও গুণ যিনি অর্জন করিতে পারেন, তিনিই কেবল রাসূলে পাক (সাঃ) এর যথার্থ অনুসারী। তিনিই আল্লাহতায়ালার মাহবুবিয়াতের পোশাকে সজ্জিত। আল্লাহর বিধান ও রাসূলের সুন্নতের সাতটি স্তরের সংক্ষিপ্ত পরিচয় এখানে তুলিয়া ধরিতেছি।
প্রথম স্তরঃ-
শরীয়তের জাহেরা অংশই আল্লাহর বিধান ও সুন্নতের প্রথম স্তর। এই স্তরে আবেদের নাফস খোদার ইবাদতে নারাজ থাকে। কোনভাবেই খোদার ইবাদত করিতে চায় না। আবেদ নাফসের বিরোধিতা সত্ত্বেও শরীয়তের বিধান পালন করে এবং রাসূলে পাক (সাঃ) এর সুন্নতের অনুসরণ করে। এই মাকামে আবেদের নাফস কুফরী ও এন্কারের মধ্যে অবস্থিত। জাহেরা আলেম ওলামা, আবেদগণ বা জাহেদগণ-সকলেই প্রথম স্তরের অনুসারী। নাফসের অবাধ্যতা সত্ত্বেও শরীয়ত ও সুন্নতের অনুসরণ করায় তাহারা সকলেই শরীয়তের ছুরাত প্রাপ্ত; তবে হকিকত হইতে বঞ্চিত। ইহা নাফসে আম্মারার প্লাটফর্ম। এই স্তরের নামাজি নামাজও আদায় করে; আবার মিথ্যা কথাও বলে। ন্যায়ের পথে থাকে; আবার প্রয়োজনে বা নিজ স্বার্থে অন্যায়ও করে। তবে অনুসরণের ছুরাত পাওয়ার জন্যে আল্লাহতায়ালা দয়া ও অনুগ্রহ করিয়া এই স্তরের অনুসারীদেরকে বেহেশত দান করিবেন। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, "অনুসরণের এই ছুরাত যেন অনুসরণের হকিকতের ন্যায় আখেরাতের পরিত্রাণের কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে এবং দোযখ হইতে ইহা রক্ষাকারী এবং বেহেশতের সুসংবাদ দানকারী। আল্লাহতায়ালার পূর্ণ দয়া যে, নাফসের এন্কারের (অস্বীকৃতি) দিকে লক্ষ্য না করিয়া কেবল আন্তরিক বিশ্বাসের উপরই যথেষ্ট ফরমাইয়াছেন এবং পরিত্রাণকে এই বিশ্বাসের সহিত জড়িত করিয়াছেন।" এই স্তরে নাফসের আল্লাহ বিরোধীতার কারণে খোদার প্রেম হইতে আবেদ বা আলেম বঞ্চিত থাকে।
দ্বিতীয় স্তরঃ-
পাক কালামে এবং রাসূলে পাক (সাঃ) এর বাণীতে এমন বহু কথা আছে যাহা কালবের পরিস্কারকরণ এবং নাফসের শোধনের সাথে সম্পর্কিত। যেমন আল্লাহ বলেন,
★ 'আমিতো তোমাদের মধ্যেই আছি, তোমরা দেখ না কেন?" (সূরা জারিয়াতঃ ২১)
★ "আল্লাহ আসমান জমীনের নূর।" (সূরা নূরঃ ৩৫)
★ "আল্লাহর আসন আসমান জমিন ব্যাপী।" (সূরা বাকারাঃ ২৫৫)
★ "তোমরা যেখানেই থাক না কেন, আল্লাহ তোমাদের সংগে আছেন।" (সূরা হাদীদঃ ৪)
আবার রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন,
★ "মোমেনের দেল আল্লাহর আরশ।"
★ "জেকেরের দ্বারা বাতেন পরিস্কার হয়।"
★ "মানবদেহে এক টুকরা মাংশপিন্ড আছে, যাহা পাক হইলে সমগ্র শরীর পাক হয়, যাহা নাপাক থাকিলে সমগ্র শরীরই নাপাক থাকে" ইত্যাদি।
উক্তরূপ বহু আয়াত ও হাদীস আছে যাহা খোদাঅন্বেষীকে আল্লাহ প্রাপ্তি সাধনায় উদ্বুদ্ধ করে। ফলে খোদাঅন্বেষী কোন কামেলের তত্ত্বাবধানে থাকিয়া কামেলেরই প্রশিক্ষণমত অনুশীলন করিয়া চরিত্র সংশোধনের চেষ্টা করে; বাতেন সংশোধনের সাথে সম্পর্কযুক্ত আল্লাহর বাণী ও হাদীসের নির্দেশ অনুসরণের প্রাণপন চেষ্টা করে। এই স্তরের আবেদ দ্বিতীয় স্তরের (শরীয়ত ও সুন্নতের) অনুসারী।
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব এই স্তরের অনুসারীদের উদ্দেশ্যে বলেন, "যাহারা শায়খের নিকট হইতে উপদেশ গ্রহণপূর্বক ছায়েরে এলাল্লাহর (আল্লাহর দিকে যাইবার পথের) বিরাট জংগল ও ময়দান অতিক্রম করিতে থাকেন, তাহারাই দ্বিতীয় স্তরের অনুসারী।"
তৃতীয় স্তরঃ- এই স্তর বেলায়েতে ছোগরার সাথে সম্পর্কযুক্ত। পূর্বেই বলিয়াছি, বেলায়েতে ছোগরায় খোদাতায়ালার আসমা ও সিফাতের জেলালের মোহেববিয়াত ও মাহবুবিয়াতের নূর পাইয়া এই স্তরের অনুসারী আল্লাহর বন্ধুত্বের মর্যাদা প্রাপ্ত হয়। কারণ এই স্তরে নাফস তার দোষণীয় স্বভাব পরিত্যাগ করিয়া খোদার উপর সন্তুষ্ট হয়।
নাফস নিজেই খোদার ইবাদতে মশগুল হয়; ইবাদতে তৃপ্তিও পায়। ফলে এই স্তরের অনুসারীদের ইবাদত কিছুটা হইলেও হকিকতের রংগে রংগীন হয়। শুধু ছুরাত নয়, ছুরাতের সাথে হকিকতের রং যুক্ত হওয়ায় এই স্তরের আবেদের ইবাদত কবুলিয়াতের যোগ্যতা পায়।
চতুর্থ স্তরঃ-
ইহা বেলায়েতে নবুয়ত ও কামালাতে নবুয়তের মর্যাদাধারী ওলী আল্লাহদের অবস্থা। তাঁহারা শরীয়ত ও সুন্নতের হকিকতপ্রাপ্ত সাধক। বেলায়েতে ছোগরা হইতে ছালেক উরুজ করিয়া বেলায়েতে কোবরা ও বেলায়েতে উলিয়াকে অতিক্রম করিয়া যখন কামালাতে নবুয়তের মাকামে পৌঁছায়-আল্লাহতায়ালা তখন তাহার বাতেন এত প্রশস্ত করেন যে, সেই সাধক জাহেরী শরীয়তে প্রকাশিত সর্ববিধ বিষয়ের জ্ঞান নিজ সত্ত্বার ভিতরেই পান। আল্লাহতায়ালার জাত, সিফাত ও আফয়াল সম্পর্কীয় জ্ঞান; কবর, মিজান, পুলছুরাত, হাশর, নশর, বেহেশত, দোযখ সম্পর্কে যাহাকিছু রাসূলে পাক (সাঃ) বলিয়াছেন-সে সম্পর্কিত জ্ঞান সে নিজের মধ্যেই লাভ করে। এই অবস্থায় ছালেক রাসূলে পাক (সাঃ) কে হাকীকী বা বাতেনী ভাবে অনুসরণ করিতে সক্ষম হয়।
এই স্তরের ছালেকদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, "এই স্তর ওলামায়ে রাসেখদের সাথে সম্পর্কযুক্ত। ওলামায়ে রাসেখ ঐ ব্যক্তি যিনি কুরআন ও হাদীসের মোতাশাবেহাতের কূট অর্থে যথেষ্ট অংশ রাখেন এবং কুরআন শরীফের সূরার প্রথমভাগে হরফে মোকাত্তায়াতের ভেদগুলি অবগত আছেন। মোতাশাবেহাত গোপন ভেদসমূহের অন্তর্ভুক্ত। এই কূট অর্থের উদ্দেশ্য সেইরূপ নহে-যেরূপ জাহেরা আলেমগণ করিয়াছেন। যেমন হাতের অর্থ শক্তি ও মুখমন্ডলের অর্থ আল্লাহতায়ালার জাতপাক করিয়াছেন, কেননা ঐগুলির সম্পর্ক জাহেরী এলেমের সংগে আছে। গোপন ভেদের সহিত উহার কোন সম্বন্ধ নাই। ঐ ভেদের অধিকারী আম্বিয়া (আঃ) গণ। এই ভেদসমূহ তাঁহারাই জ্ঞাত আছেন। অথবা অন্য লোক উত্তরাধিকার ও অনুসরণ সূত্রে অবগত আছেন।"
শরীয়ত ও সুন্নতের এই চতুর্থ স্তরের জ্ঞানী ও অনুসারী সাধকবর্গ খোদাতায়ালার জাতি প্রেম ও সিফাতি প্রেমের নূর প্রাপ্ত হন।
পঞ্চম স্তরঃ-আল্লাহপাক উলুল আজম পয়গম্বরদেরকে এমন কিছু নেয়ামত ও কামালাত দান করিয়াছেন, যাহা একান্তই আল্লাহর দয়া ও করুণা থেকে বর্ষিত। উলুল আজম পয়গম্বর (আঃ) গণের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম হইলেন হযরত রাসূলে করীম (সাঃ)। সংগত কারণে আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ তাঁহার উপর অধিক বর্ষিত হইয়াছে। রাসূলে পাক (সাঃ) এর উল্লিখিত সব কামালাত-যাহা আল্লাহর বিশেষ দয়া ও অনুগ্রহের ফসল-তাহা অর্জন করা এবং সেই সকল কামালাতের অনুসরণ করা শরীয়ত ও সুন্নতের ৫ম স্তরের অন্তর্ভুক্ত।
৬ষ্ঠ স্তরঃ-
আল্লাহপাক তদীয় পেয়ারা হাবীব (সাঃ) কে এমন আরও কতিপয় কামালাত দান করিয়াছেন যাহা অন্য কোন পয়গম্বরকে দান করেন নাই। এই সমস্ত কামালাত আল্লাহতায়ালার মাহবুবিয়াতের রং-এ রংগীন। যেমন হকিকতে আহমদী, হোব্বে সেরফা ইত্যাদি। যে স্তরে পৌঁছাইলে আল্লাহতায়ালার সেই প্রেম যাহা প্রথমে জাতে উদ্ভূত হইয়াছিল তাহা অবিরাম ধারায় বৃষ্টির মত সাধকের উপর বর্ষিত হইতে থাকে। এই মাকাম ও কামালাত একান্তই রাসূলে পাক (সাঃ) এর জন্য খাস। অনুসরণ ও উত্তরাধিকার সূত্রে যাহারা উল্লিখিত মাকাম সমূহে উপনীত হন তাহারা সেই সকল মহামূল্য কামালতে ভূষিত হন। তাহারাই শরীয়ত ও সুন্নতের ৬ষ্ঠ স্তরের জ্ঞানে জ্ঞানী হন। এখানে উল্লেখ্য যে, সুন্নতের প্রথম স্তর ব্যতীত বাকী পঞ্চ স্তর উরুজ বা ঊর্ধ্বারোহনের সাথে জড়িত; তরিকত, হকিকত ও মারেফাতের সাথে সম্পৃক্ত।
৭ম স্তরঃ-
শরীয়ত ও সুন্নতের ৬ষ্ঠ স্তর পর্যন্ত খোদাপ্রেমিক উরুজ করে এবং হোব্বে সেরফার মাকামে পৌঁছাইয়া থামিয়া যায়। তাহার উপরে কদমী ছায়ের নাই। ওজুদ মাওহুব লাহুর কুওতে নজরিয়ার ছায়েরের মাধ্যমে দর্শন জনিত আনন্দানুভূতি আছে মাত্র। ইহার পরই শুরু হয় নযুল বা অবতরণ। শরীয়ত ও সুন্নতের ৭ম স্তর নযুল বা অবতরণের সাথে সংশ্লিষ্ট। পূর্ববর্তী ছয়টি স্তরে শরীয়ত ও সুন্নতের যে জ্ঞান ছালেকের অর্জিত হয়, তাহার সমষ্টি আছে এই ৭ম স্তরে। খোদাতায়ালা যে সাধককে হোব্বে সেরফার মাকাম হইতে প্রেম রসে সিক্ত করিয়া যাবতীয় কামালাতে ভরপুর করিয়া মানব জাতির হেদায়েতের জন্য দুনিয়ায় পাঠাইয়া দেন তাহারাই শরীয়ত ও সুন্নতের ৭ম স্তরের জ্ঞানে জ্ঞানী।
ইসলাম আল্লাহর মনোনীত ধর্ম। এই ধর্মের পূর্ণতা প্রদান শেষ হয় দয়াল নবী (সাঃ) এর উপর। রাসূলে পাক (সাঃ) এর পরিপূর্ণ অনুসরণের মাধ্যমে যে উম্মত উল্লিখিত সাতটি স্তরের জ্ঞান ও গুণ অর্জন করিতে পারেন, তিনিও আল্লাহর মনোনিত ধর্ম ইসলামের পূর্ণ জ্ঞানী হন। সে উম্মত রাসূল (সাঃ) এর চরিত্রে চরিত্রবান হয়। বাতেনী দৃষ্টিতে রাসূলে পাক (সাঃ) এবং উক্ত উম্মতের মধ্যে তেমন কোন পার্থক্যই নির্ণয় করা যায় না। শুধু সেই উম্মতের মধ্যে এই অনুভূতি থাকে যে, সে অনুসরণকারী এবং রাসূল (সাঃ) অনুসৃত জন। সে যাহা কিছু পাইয়াছে, রাসূলে পাক (সাঃ) এর তোফায়েলীতেই পাইয়াছে। ইহা ছাড়া অন্য কোন পার্থক্য আর থাকে না। এই স্তরে উপনীত উম্মত রাসূলে পাক (সাঃ) এর মত যথাযথ ভাবে ফরয নামাজ আদায় করে। উল্লেখ্য, নামাজের মধ্যে বিভিন্ন ভাগ আছে। যথাঃ ফরজ, ওয়াযেব, সুন্নত, নফল ইত্যাদি। রাসূলে পাক (সাঃ) এবং তদীয় উম্মতের মধ্যে যে সকল উম্মত পূর্ণ অনুসরণের মাধ্যমে শরীয়ত ও সুন্নতের সাতটি স্তরের জ্ঞান অর্জন করিতে সক্ষম হইয়াছেন তাহারাই কেবল ফরয নামাজ ফরয হিসাবে আদায় করিতে পারেন। অন্য কাহারো পক্ষে তাহা সম্ভব হয় না। ফরয নামাজে নামাজী ও মাবুদের মধ্যে কোন পর্দা থাকিতে পারিবে না। যেমন রাসূলে পাক (সাঃ) এর ফরয নামাজে আল্লাহ ও তাঁহার মধ্যে কোন পর্দা থাকে নাই। তেমনি উল্লিখিত উম্মতসকল যাহারা শরীয়ত ও সুন্নতের পূর্ণ জ্ঞানে জ্ঞানী তাহারাও রাসূলে পাক (সাঃ) এর পাশাপাশি দাঁড়াইয়া নামাজ পড়িবার মত যোগ্যতা অর্জন করেন। ফলে তাহাদের ফরয নামাজ ফরয হিসাবেই আদায় হয়। কিন্তু যাহারা শরীয়তের পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করিতে পারেন নাই-তাহাদের ফরয নামাজ হকিকতে সুন্নতের অনুরূপে আদায় হয়; কারণ মাবুদ ও তাহাদের মধ্যে অছিলার পর্দা থাকে। অনুসরণের আবরণ তখনও অবশিষ্ট থাকে।
তরিকতের ইমাম, জগৎবিখ্যাত ইসলামী দার্শনিক হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব শরীয়তের ৭ম স্তর এবং এই স্তরে উপনীত সাধকদের সম্পর্কে বলেন, "এই স্তরে তাবে (অনুসরণকারী) এবং মতবু বা অনুসৃত ব্যক্তির সহিত এমন সমতা আসিয়া যায় যে, অনুসরণের নাম পর্যন্ত উঠিয়া যায় এবং তাবে ও মতবুর মধ্যে পার্থক্য জ্ঞান রহিত হইয়া যায়। মনে হয় যেন, তাবে মতবুর ন্যায় যাহা কিছু গ্রহণ করে তাহা আসল হইতেই গ্রহণ করে, যেন উভয় জনই একই ঝরণা হইতে পান করেন এবং উভয়ে একে অপরের ক্রোড়ে ও বিছানায় আছেন এবং চিনি ও পানির ন্যায় একত্রিত আছেন। অনুভব করা যায় না যে, কে তাবে (অনুসরণকারী) এবং কে মঞ্জু (অনুসৃত) এবং অনুসরণইবা কাহার জন্য। সম্বন্ধ এক হওয়ার জন্য বিপরীত সম্বন্ধের সেখানে কোনও অবস্থা নাই। এইখানেই ফরয নামাজের প্রকৃত ফরয আদায় হওয়ার সম্ভাবনা আছে। নচেৎ ফরয নামাজও নবীর অনুসরণে হয়তো সুন্নতই থাকিয়া যাইতে পারে। আগপাছ নহে, যেন পাশেপাশেই স্থান, উভয়ের সম্মুখেই শুধু মাবুদ মেহেরবান।---------
"আশ্চর্য ব্যাপার! এই মাকামে যত দূর সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখা গিয়াছে-অনুসরণের কোনও রূপ সম্বন্ধ দৃষ্টিপথে আসে নাই। তাবে ও মাতবুর পার্থক্য কখনোই দেখা যায় না, তবে অবশ্য এতটা তফাৎ আছে যে, তাবে নিজেই নিজেকে হযরত নবী করীম (সাঃ) এর অছিলা প্রাপ্ত ও উত্তরাধিকারী বলিয়াই জানেন। এই অবস্থার পার্থক্য বোধ অত্যন্ত সূক্ষ্ম অধ্যায়। এই অছিলা আসলে তোফায়েলী-যেখানে অছিলার পর্দা সম্মুখে আর আবরণকারী হিসাবে বর্তমান থাকে না, যাহা ছুলুক পদ্ধতির যেন বিশিষ্ট একমাত্র ধারাপথ-একটি মাকাম হইতে অন্য মাকামে উন্নীত হইতে ছুলুক পথে অছিলার পর্দা সদা সর্বদা যেন (হায়লুলা) আবরণকারী পর্দা হিসাবে বর্তমান থাকে। কিন্তু মুজাদ্দেদীয়া তরিকার জজবা ধারাপথে অছিলা নাম প্রচলিত থাকিলেও এই অছিলা পরদাকারী নয়, তাই ইহা তোফায়েলী; যাহার মোটামুটি অর্থ "মাধ্যম বা বরকতে প্রাপ্ত সম্পদ"। ইহাতে সন্দেহ নাই যে তাবে একটি আলাদা জিনিস, আর অছিলা ও ওয়ারেস অন্য জিনিস। যদিও অনুসরণের স্তরে সবাই সমান, কিন্তু তাবের (অনুসরণকারীর) প্রকাশ্যে মতবুর (অনুসৃতের) পরদার আবশ্যক। তোফায়েলী বা ওয়ারেসের মধ্যে কোনরূপ পরদার আবশ্যক নাই। এই সম্পদ আম্বিয়া (আঃ) গণের জন্য আসিয়াছে এবং উম্মতগণের ইহা অতি বড় সৌভাগ্য যে নবী (আঃ) গণের তোফায়েলে এই সম্পদে তাহারা ওয়ারেস হিসাবে অংশ পাইয়া থাকেন।" (মকতুব নং ৫৪, দ্বিতীয় খন্ড)
শরীয়ত ও সুন্নতের সাতটি স্তরের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া হইল। সাতটির মধ্যে কেবলমাত্র একটি স্তর তথা প্রথম স্তরটি জাহেরা আলেম ওলামাদের সাথে জড়িত। ইহাই জাহেরী শরীয়ত। বাকী ছয়টি স্তর বাতেনী শরীয়তের সাথে সম্পৃক্ত। বাতেনী শরীয়তের জ্ঞান বিবর্জিত জাহেরা আলেম-তিনি যত বড় এলেমধারীই হন না কেন, অনুসরণের দিক দিয়া তিনি বা তাহারা প্রথম শ্রেণীর দলভুক্ত। প্রথম স্তরের আলেমদের মধ্যে খোদার মহব্বত থাকে না। দ্বিতীয় স্তরের আলেমদের মধ্যেও প্রেমের কারেন্ট আসে না; তবে এই স্তর প্রথম স্তরের চেয়ে উন্নত। তৃতীয় স্তরের আলেমদের মধ্যে খোদার প্রেমের নূর আসিতে থাকে। ক্রমহিসাবে যতই ঊর্ধ্বে যায় ততই অধিক হারে তাহাদের উপর মহব্বতের নূর বর্ষিত হয়। ৭ম স্তরে উপনীত হইলে তাহাদের অনুসরণও যেমন কামেল হয়, খোদার প্রেমও তাহারা পূর্ণভাবে হাসিল করেন।
আল্লাহপাকের বাণী, "বলুন, (হে নবী!) তোমরা যদি আল্লাহকে ভালবাস তবে আমাকে অনুসরণ কর।" এই বাণীর মর্মার্থ তাহারাই যথার্থ উপলব্ধি করিতে পারেন যাহারা শরীয়ত ও সুন্নতের পূর্ণ অনুসারী (অর্থাৎ ৭ম স্তরের অনুসারী)।
সাতটি স্তরের একটি মাত্র জাহেরা শরীয়ত। আর বাকী ছয়টি স্তর বাতেনী শরীয়তের সাথে সম্পর্কযুক্ত। ছয়টি স্তরের মধ্যে প্রথম স্তরের আলোচনায় বলা হইয়াছে যে, বাতেনী শরীয়তের জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রয়োজন কামেল পীর; যিনি শরীয়ত ও সুন্নতের সবগুলি স্তরের জ্ঞান, গুণ ও যোগ্যতা অর্জন করিয়াছেন। উক্ত রূপ কামেল মোকাম্মেল ওলীর সান্নিধ্য, সাহচর্য, খেদমত ও মহব্বত ব্যতীত শরীয়তের উচ্চ স্তরের জ্ঞান অর্জন সম্ভব নহে। এই জন্যই বলা হয়, খোদা প্রাপ্তির প্রথম অবলম্বনই হইল পীরের মহব্বত। পীরের মহব্বত যাহার পূর্ণ হইল খোদাপ্রাপ্তির তথা খোদার প্রেম অর্জনের যাবতীয় পথ তাহার জন্য সহজ হইল। কারণ পীরের মহব্বতের আধিক্যের কারণে মুরীদের ফানা-ফিশ-শায়খ হাসিল হয়, যাহা ফানা-ফির-রাসূল ও ফানাফিল্লাহর একমাত্র অছিলা। জাহেরা আলেম সকল এই তথ্য বুঝিতে চান না। তাহারা শরীয়তের প্রথম অংশ পাইয়াই সন্তুষ্ট। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তাহাদের উদ্দেশ্যে বলেন, "জাহেরা আলেমগণ প্রথম শ্রেণীতেই খুশী। হায়! প্রথম শ্রেণীকেও যদি পূর্ণভাবে পূর্ণ করিয়া লইতেন, তাহারা শরীয়তকে অনুসরণের ছুরাতের উপরেই নিবদ্ধ রাখিয়াছেন। এই প্রকাশ্য অনুসরণ ব্যতীত আর কোন বিশেষ ও নিগুঢ়তম কার্য আছে বলিয়া তাহারা ধারণা করেন না। ওলী-আল্লাহগণের তরিকাকে, যাহা অনুসরণের স্তরসমূহ লাভের অছিলা, তাহাকে বেকার ও অনর্থক বলিয়া মনে করিয়াছেন। অধিকাংশ আলেমই হেদায়া ও বজদুবী (বায়জাবী শরীফ) কেতাব ছাড়া অন্য কাহাকেও পীর ও পথ প্রদর্শক বলিয়া জানেন না।
"যে কিটের বসবাস পাথরে গোপন
তাহাই তাহার কাছে জমীন ও আসমান।"
(মকতুব ৫৪, ২য় খন্ড)
হযরত শেখ ছাদী (রঃ) ছাহেব উক্তরূপ আলেমদের সম্পর্কে বলেন,
"বিশাল পাগড়ী আর জাঁকালো দাড়িতে,
নরের মহত্ব কিছু বাড়ে না তাহাতে।"
হে জাকেরান সকল! তোমরা যদি খোদাতায়ালার মহব্বত অর্জন করিতে চাও, শরীয়তের পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করিতে চাও, তবে আপন পীরকে ভালবাস। জগতের সবকিছুর চাইতে পীরকে অধিক ভালবাস। এই ভালবাসাই তোমাদিগকে আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছাইবে। রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন,
الْمَرْءُ مَعَ مَنْ أَحَبَّ
অর্থাৎ-"যে যাহাকে ভালবাসে সে তাহার সংগে থাকিবে।” এই হাদীসের মর্মানুযায়ী পীরের মহব্বতই তোমাদেরকে খোদা পর্যন্ত পৌঁছার মাধ্যম হইবে। খোদার প্রেমের নূর লাভে তোমরা ধন্য হইবে। আল্লাহ তোমাদের দয়া করুন। আমীন!







