নবী করীম (সাঃ) এর পূর্ণ অনুসরণ-অনুগমনই হইল ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ) এর শিক্ষা

হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘ঈদে মিলাদুন্নবী ও জাকের পার্টির আদর্শ-লক্ষ্য’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ নবী করীম (সাঃ) এর পূর্ণ অনুসরণ ও অনুগমনই হইল ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ) এর শিক্ষাঃ
বিজ্ঞাপন
ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ) প্রতি বৎসর আমাদের দ্বারে রাসূলে করীম (সাঃ) এর শিক্ষা, তাহার অনুসরণ ও অনুগমনের তাগিদ লইয়া আসে। হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) আল্লাহতায়ালার প্রিয় হাবীব এবং রাসূল। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) কে আল্লাহতায়ালা 'ছাইয়েদুল বাশার' বা মানব সর্দার বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। কারণ আল্লাহ্ বলেন,
وَ إِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ
অর্থাৎ-'নিঃসন্দেহে আপনি সর্বশ্রেষ্ঠ গুণ ও চরিত্রের অধিকারী।' (সূরা কালামঃ ৪) আল্লাহ্পাক হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) সম্পর্কে আরও বলিয়াছেন,
বিজ্ঞাপন
إِنَّكَ لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ ٥ عَلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ
অর্থাৎ-'আপনি নিশ্চয়ই রাসূলগণের একজন; (এবং) আপনি সরল পথে প্রতিষ্ঠিত।' (সূরা ইয়াসীনঃ ৩-৪)
আল্লাহ্পাক আরও বলেন-
বিজ্ঞাপন
وَ أَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوْهُ وَلَا تَتَّبِعُوْ السَّبِيلَ
অর্থাৎ-'এবং অবশ্যই ইহা আমার সরল পথ; তোমরা এই পথে গমন কর; বক্র পথে চলিও না।' (সূরা আনআমঃ ১৫৩) আল্লাহ্পাক রাসূলে করীম (সাঃ) এর পথকে সুদৃঢ় বা সরল পথ বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন এবং ইসলামকে পরিপূর্ণ দ্বীন রূপে নিরূপিত করিয়া ইহা সমগ্র মানব জাতির জন্য মনোনীত করিয়াছেন।
আল্লাহ্পাক ফরমান, 'যে ব্যক্তি মুহাম্মদের আজ্ঞাধীন, সে ব্যক্তি খোদাতায়ালার আজ্ঞাধীন'- অর্থাৎ আল্লাহপাক রাসূলে করীম (সাঃ) এর আদেশ পালনকে অবিকল স্বীয় আদেশ পালন বলিয়া ঘোষণা করিয়াছেন।
বিজ্ঞাপন
অতএব রাসূলে করীম (সাঃ) এর আদেশ প্রতিপালন না করিয়া, আল্লাহ্পাকের আদেশ পালন, প্রকৃতপক্ষে তাহা আল্লাহ্তায়ালার আদেশ পালন নহে। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব ছাহেব বলিয়াছেন, কোনো নির্বোধ যেন, এই দুই আদেশের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় না করে। যাহারা এই দুই আদেশের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করে এবং বলে, তাহারা কোনো একটি আদেশ মানে, অন্যটি মানে না, তাহারা বস্তুতঃ সুযোগ খুঁজিতে চায়- উহারাই প্রকৃত কাফের। সূরা আম্বিয়াতে আল্লাহ্ রাব্বুল আ'লামীন ফরমান, “তিনি (আল্লাহ) জানেন, তাহাদের (অর্থাৎ অন্যান্য নবীগণের) সম্মুখে ও পশ্চাতে কি আছে এবং তাহারা শাফায়াত করিতে পারিবে না, তাঁহাকে (রাসূলে করীম (সাঃ)) ব্যতীত, যাহার উপর আল্লাহ সন্তুষ্ট এবং যিনি আল্লাহ্র নিকট কবুলিয়াত লাভ করিয়াছেন এবং তাহারা (ঐ সকল নবীগণ) ভয়ে কম্পমান থাকিবেন।"
আল্লাহ্পাক কুরআন মজীদে আরও ফরমান, “যাহাদিগকে মানুষেরা কেয়ামতের দিন ডাকিবে তাহারা কেহই শাফায়াত করিতে পারিবে না; কেবল তিনিই পারিবেন, যিনি সত্যের স্বাক্ষী।"
উক্ত দুইটি আয়াত হইতে আল্লাহ্পাক যে রাসূলে করীম (সাঃ) এর শ্রেষ্ঠত্ব সকল নবী রাসূলের উপরে দান করিয়াছেন, তাহা বোঝা যায়। এখন প্রশ্ন হইল অন্যান্য নবীগণের উপর রাসূলে করীম (সাঃ) এর শ্রেষ্ঠত্ব কেন? এই প্রশ্নের উত্তর হইলঃ
বিজ্ঞাপন
★ আল্লাহ্পাক নবী করীম (সাঃ) -এর নূর দ্বারা বিশ্বব্রহ্মান্ড সৃষ্টি করিয়াছেন। অন্যান্য নবীগণকেও তদীয় নূর বা নূরে মুহাম্মদী দ্বারা সৃষ্টি করা হইয়াছে।
★ হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) কে আল্লাহ্পাক তাহার জাতপাক দর্শন করাইয়াছেন ও তদীয় জাতপাকের পরিপূর্ণ জ্ঞান দান করিয়াছেন; অন্যান্য নবীগণ তাহা লাভ করেন নাই।
★ আল্লাহতায়ালার জ্ঞানের পরিপূর্ণতার জন্যই হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর শ্রেষ্ঠত্ব এবং ইসলামের মাধ্যমে অর্থাৎ রাসূলে করীম (সাঃ) কে যে দ্বীন আল্লাহতায়ালা প্রদান করিয়াছেন, সেই দ্বীনের মাধ্যমে আল্লাহ্তায়ালার পরিপূর্ণ জ্ঞান লাভ সম্ভব; তাই সেই দ্বীনই শ্রেষ্ঠ। আর এই শ্রেষ্ঠত্বের কারণে হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর সার্বিক শ্রেষ্ঠত্ব।
বিজ্ঞাপন
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব ফরমান, “নিশ্চয়ই হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) আদম বংশের ছর্দার। রোজ কেয়ামতে তাহারই অনুগামীর সংখ্যা সর্বাধিক হইবে। পূর্ববর্তী সকল নবী (আঃ) হইতে তিনি সর্বাধিক সম্মানিত হইবেন। তদীয় শাফায়াতই সর্বপ্রথম হইবে। তিনিই সর্বাগ্রে বেহেশতের দ্বার খুলিবেন। তাহারই সম্মানে বেহেশতের দ্বার খুলিয়া যাইবে। রোজ কেয়ামতের দিনে তিনিই আল্লাহ্তায়ালার প্রশংসার পতাকা তুলিবেন। হযরত আদম (আঃ) ও অন্যান্য নবীগণ তাঁহারই পতাকাতলে সমবেত হইবেন।"
হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) বলেন, 'আমরা পরবর্তী কিন্তু কেয়ামতে আমরাই পূর্বগামী, ইহা গৌরবের বাক্য নহে। আমিই খোদার প্রিয়পাত্র ও রাসূলগণের অগ্রগামী, ইহা গৌরবের বাক্য নহে। আমিই শেষ নবী, ইহা অহঙ্কার নহে। আব্দুল মোত্তালেবের পুত্র আব্দুল্লাহ এবং তাহার সন্তান আমি মুহাম্মদ।'
হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) আরও বলেন, 'নিশ্চয়ই খোদাতায়ালা সৃষ্টি করিয়া উৎকৃষ্ট বিভাগে আমাকে রাখিয়াছেন। তৎপর তাহাকে দুই দলে বিভক্ত করিয়া উৎকৃষ্ট দলে আমাকে রাখিয়াছেন। তৎপর তাহাদিগকে বহু সম্প্রদায়ে বিভক্ত করিয়া উৎকৃষ্ট বিভাগে আমাকে রাখিয়াছেন। সুতরাং আমি তাহাদের সকলের মধ্য হইতে ব্যক্তি হিসেবে উৎকৃষ্ট ও বংশ হিসাবেও উৎকৃষ্ট। যখন সকলেই কেয়ামতের দিনে উত্থিত হইবে, তখন আমিই সর্বাগ্রে উঠিব, এবং তাহারা দল বদ্ধ হইবে, তখন আমিই তাহাদের খোদাতায়ালার নিকটে লইয়া যাইব। সকলেই যখন নির্বাক হতভম্ব হইবে, সকলের পক্ষ হইতে তখন আমি তাহাদের সুপারিশ করিব। যখন তাহারা নিরাশ হইবে, তখন আমিই তাহাদের আশা দিব। সকল প্রকারের বুজর্গী ও কুঞ্জিকা সেদিন আমার হাতেই ন্যস্ত থাকিবে। প্রশংসার পতাকাও আমার হস্তে থাকিবে। খোদাতায়ালার নিকট আদম বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মানী আমিই হইব। আমার চারিপাশে সহস্র ভৃত্য থাকিবে। যখন কেয়ামতের দিন আসিবে, তখন আমি নবীগণের ইমাম হইব। এবং তাহাদের পক্ষ হইতে খোদাতায়ালার নিকট কথোপকথনকারী ও শাফায়াতকারী হইব। ইহা গৌরব নহে।'
বিজ্ঞাপন
আল্লাহ্ বলেন, হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) না হইলে তিনি কিছুই সৃষ্টি করিতেন না; স্বীয় প্রভুত্বের পরিচয়ও দান করিতেন না। তিনি ঐ সময় হইতেই নবী ছিলেন, যখন আদম (আঃ) পানি ও কাদাতে ছিলেন।
হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা প্রসঙ্গে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, পরকালের উদ্ধার এবং চিরস্থায়ী মুক্তি হযরত ছাইয়েদুল আউয়ালীন ওয়াল আখেরীন (সাঃ) এর অনুসরণ করার উপর নির্ভরশীল। কারণ তাহার অনুসরণ দ্বারা মাহবুবিয়াতের মাকাম অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার প্রিয় মাকামে উপনীত হওয়া যায়। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর অনুগমন দ্বারা তাজাল্লীয়াতে জাতি অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার জাতের আর্বিভাবের মাকাম লাভ হয়। আবদিয়াত অর্থাৎ দাসত্বের মাকাম যাহা মাহবুবিয়াতের মাকাম লাভ হওয়ার পরে লাভ হয়, তাহাও এই অনুসরণ দ্বারা লাভ হইয়া থাকে। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর পূর্ণ অনুসারীগণকে বনি ইসরাইলীদের নবী তুল্য বলা হয়। উলুল আজম পয়গম্বরগণও তাহার অনুসরণ করিবার আকাংক্ষা করিয়াছেন। যদি হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর জামানায় হযরত মুছা (আঃ) জীবিত থাকিতেন, তাহা হইলে তাহার অনুসরণ ব্যতীত হযরত মুছা (আঃ) এর অন্য কোন উপায় থাকিত না। হযরত ঈসা (আঃ) এর আবির্ভাব এবং হযরত হাবীবুল্লাহ (সাঃ) এর পায়রবী করার কথাও সকলের জানা। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলিতেছেন, হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর হকিকত যাবতীয় হকিকতের হকিকত। পয়গম্বরগণ ও ফেরেশতাবৃন্দের হকিকত তদীয় হকিকতের প্রতিবিম্ব। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর হকিকত সকল হকিকতের মূল। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) ফরমান, 'আল্লাহতায়ালা প্রথমে সৃষ্টি করেন আমার নূর।' তিনি আরও বলেন, 'আমি আল্লাহ্পাকের নূর হইতে সৃষ্ট এবং মোমেনগণ আমার নূর হইতে সৃষ্ট'। তাহার মধ্যস্থতা ব্যতীত আল্লাহ্পাকের সান্নিধ্যে পৌঁছান অসম্ভব।'
উপরে কুরআন মজীদ হইতে, হাদীসে রাসূল (সাঃ) হইতে এবং হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব ও অন্যান্য ওলীয়ে কামেলগণের উদ্ধৃতি হইতে যাহা বুঝা গেল, তাহা হইল-
বিজ্ঞাপন
★ নবী করীম (সাঃ) সকল নবী (আঃ) হইতে ইহ ও পরকালে শ্রেষ্ঠ,
★ হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর শ্রেষ্ঠত্বের কারণ যেমন তদীয় নূর দ্বারা বিশ্বজগৎ সৃষ্টি তেমনি তাহার অনুসরণের মাধ্যমেই আল্লাহতায়ালার নৈকট্য পরিপূর্ণ লাভ করা সম্ভব যাহা অন্যান্য নবী (আঃ) এর অনুসরণের দ্বারা সম্ভব নয়,
★ হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর শ্রেষ্ঠত্বের জন্য তদীয় অনুসরণ সর্বশ্রেষ্ঠ,
বিজ্ঞাপন
★ আল্লাহ্পাক কুরআন মজীদে যাহা করিতে আদেশ বা নিষেধ করিয়াছেন, তাহা পালনই কেবল আল্লাহতায়ালার মহব্বত অর্জনের জন্য যথেষ্ট নয়; বরং আল্লাহতায়ালার শরীয়ত বা আদেশ নিষেধ প্রকৃত পালন হইল কুরআন মজীদের আদেশ-নিষেধ প্রতিপালনের সাথে হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর সুন্নাহর পরিপূর্ণ অনুসরণ এবং
★ আল্লাহতায়ালা তাহাদেরই ভালবাসে, যাহারা হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) কে ভালবাসেন ও তাহারই অনুগমন ও অনুসরণ করেন।
নবী-করীম (সাঃ) এর জীবনধারা শরীয়তের বাস্তব রূপঃ
বিজ্ঞাপন
হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর অনুগমন ও অনুসরণই প্রকৃতপক্ষে ইসলামের শরীয়ত বা তদীয় জীবন ধারা ইসলাম তথা শরীয়তের বাস্তব রূপ। আল্লাহ্পাক কুরআন মজীদে ফরমান, রাসূলে করীম (সাঃ) এর পথই সুদৃঢ় পথ বা সোজাপথ বা সিরাতুল মুস্তাকীম।
হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর পথ কি? এই পথ হইল নবুয়ত লাভের পর হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) যেভাবে জীবনের পরবর্তী দিনগুলি কাটাইয়াছেন, সেই পথ যাহা পূর্ণাঙ্গ শরীয়ত। অর্থাৎ নবুয়ত প্রাপ্তির পর হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) যে কর্মসূচীর মাধ্যমে জীবন অতিবাহিত করিয়াছেন, তাহাই প্রকৃত শরীয়ত বা পূর্ণাঙ্গ শরীয়ত।
হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) নবুয়ত প্রাপ্তির পরবর্তী ২৩ বৎসরের জীবনের কর্মকান্ডকে প্রধানতঃ দুইটি বিভাগে ভাগ করা যায়। ইহার একটি জাহেরী বা প্রকাশ্য বা দৃশ্যমান শরীয়ত। আর অন্যটি হইল গুপ্ত অর্থাৎ বাতেনী শরীয়ত।
জাহেরী শরীয়ত বলিতে বুঝা যায় আল্লাহ্তায়ালার আদেশ নিষেধ পালন করা; আর বাতেনী শরীয়ত হইল তাহাই যাহার দ্বারা জাহেরী শরীয়ত পরিশুদ্ধতা লাভ করে। আল্লাহ্ বলেন, তিনি এখলাস ব্যতীত কোনো ইবাদতই গ্রহণ করেন না। তাই বুঝা যায়, বাতেনী শরীয়ত ব্যতীত জাহেরী শরীয়ত পরিপূর্ণতা লাভ করে না। তাই জাহেরী ও বাতেনী শরীয়ত-উভয় শরীয়তই আল্লাহতায়ালা ও তদীয় রাসূলে করীম (সাঃ) এর শিক্ষা। এই উভয়বিধ শরীয়ত শিক্ষা ও আমলের উপরে নির্ভর করে ইসলামের প্রকৃত অনুসরণ। এই দুইয়ের কোনো একটা অবহেলা করিলে ইসলামের যথাযথ অনুসরণ হইবে না। শরীয়তে বলা আছে, আল্লাহ্পাক কুরআন মজীদের প্রতি আয়াত পাকেরই জাহেরী ও বাতেনী অংশ রাখিয়াছেন। শরীয়তের পূর্ণ জ্ঞান লাভ করিতে হইলে ও ইসলামের সম্পূর্ণ অনুসরণ করিতে হইলে তাই বাতেনী জ্ঞান প্রয়োজন।
বাতেনী শরীয়তের ব্যাখ্যা ও গুরুত্ব বর্ণনা করিয়া হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তদীয় মকতুবাত শরীফে বলিতেছেন, 'হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর বাহ্যিক মিরাছ আলমে খাল্কের বা জড়জগতের সহিত সম্বন্ধ রাখে আর অভ্যন্তরীণ মিরাছ আলমে আমর বা সূক্ষ্ম জগতের সহিত সম্বন্ধ রাখে। অভ্যন্তরীণ মিরাছ আলমে আমর বা সূক্ষ জগতের সহিত সম্বন্ধ রাখে তথায় যেন সবই ঈমান, সরল পথ ও হেদায়েত। অভ্যন্তরীণ মিরাছ দ্বারা সুসজ্জিত হইলে বাহ্যিক মিরাছ প্রাপ্তির শোকর গোজারী হয়। হযরত নবী করীম (সাঃ) এর পূর্ণ অনুসরণ ব্যতীত অভ্যন্তরীণ মিরাছ লাভ হয় না।'
কুরআন মজীদে বলা আছে, 'যে ব্যক্তি নাফসকে পবিত্র করিবে, সেই উদ্ধার পাইবে। যে ব্যক্তি নাফসকে অপবিত্র রাখিবে, সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হইবে।' নাফসে আম্মারা আল্লাহতায়ালার আদেশ-নিষেধ বা শরীয়ত বিরোধী এবং শরীয়ত অমান্যকারী। অতএব উহার বিশুদ্ধতা না হওয়া পর্যন্ত শরীয়তের সত্য হুকুম সমূহের প্রতি দলিল দ্বারা বিশ্বাস স্থাপন করা তাহার পক্ষে কঠিন। তাই নাফসকে বিশুদ্ধ করা একান্তই প্রয়োজনীয়। ইহা ছাড়া অন্য কোন উপায়ে মুক্তি পাইবার পথ নাই। নাফসকে বিশুদ্ধ করার পথই বাতেনী শরীয়ত।
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব ফরমান, শরীয়ত তিনভাবে বিভক্ত। যথাঃ এলেম, আমল, ও এখলাস।
★ এলেম অর্থাৎ শরীয়তের আদেশ-নিষেধ, হালাল-হারাম, ফরজ, ওয়াজেব, সুন্নত ইত্যাদি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা,
★ আমল অর্থাৎ উক্ত এলেম বা জ্ঞান অনুযায়ী কর্ম করা,
★ এখলাস অর্থাৎ হৃদয়ের বিশুদ্ধতা দ্বারা এলেম অনুযায়ী আমল করা।
শরীয়তের এই তিনটি অংশ সুসম্পন্ন না হইলে শরীয়ত পালন হইবে না। এলমে শরীয়তের বাহ্যিক ছুরাত, আমল ইহার শক্তি এবং এখলাস ইহার জীবন। উক্ত শরীয়ত যখন পূর্ণতা লাভ করিবে তখন আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি লাভ হইবে যাহা ইহ-পরকালের সর্ববিধ সৌভাগ্য হইতে শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ বলেন, আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টিই সর্বোত্তম। অতএব ইহ-পরকালের যাবতীয় সৌভাগ্য আল্লাহ্তায়ালার সন্তুষ্টি তথা শরীয়তের উপর ন্যস্ত আছে।
শরীয়তের যে তিনটি অংশ উপরে দেখান হইল, অর্থাৎ এলেম, আমল ও এখলাস উহাদের মধ্যে এখলাস বা উদ্দেশ্য ও হৃদয়ের বিশুদ্ধতা শরীয়তের মূল। হৃদয়ের বিশুদ্ধতার জন্যই এখলাসের প্রয়োজন, অন্য কোনো উদ্দেশ্যে নয়। আর এই এখলাস লাভ হয় আল্লাহতায়ালার সহিত ফানা লাভের পর তদীয় জাতি নূরের মাধ্যমে। 'এখলাস'-ই বাতেনী পথের ছায়ের-ছুলুক, উরুজ-নজুল, ফানা-বাকার উদ্দেশ্য, অন্য কিছু নয়; এখলাসের সহিত শরীয়ত পালন করিয়া আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনই তরিকত ও হকিকতের উদ্দেশ্য। এই কারণে তরিকত ও হকিকতকে শরীয়তের খাদেম বলিয়া হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব অভিহিত করিয়াছেন।
কিন্তু সকলের জ্ঞানে ইহা আসে না। সাধারণ মানুষ তরিকত ও হকিকতের উদ্দেশ্য বলিতে মনে করে মোজেজা প্রদর্শনের ক্ষমতা। অনেকে শরীয়তকে হাড্ডি ও হকিকতকে মজ্জা মনে করেন। প্রকৃত অবস্থা ইহার কোনো কিছুই নয়। অপরিণত ছুফীগণের মত্ততা প্রসূত বাক্য দ্বারাই সাধারণের মনে ঐ রূপ ধারণা হয়। তরিকত ও হকিকত বস্তুতঃ এখলাস বা হৃদয়ের পবিত্রতা অর্জনের পথ ও পবিত্রতার স্বাদ। ইহা সূফীগণের একচেটিয়া, তবে তাহা এখলাস অর্জনের মাধ্যম বৈ আর কিছুই নয়।
যেসব হালাত তরিকতের পথে সূফীগণ লাভ করেন, হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব উহাকে 'লম্ফ-ঝম্ফ' বলিয়া উপহাস করিয়া বলিয়াছেন- “উহার কোনো কিছুই উদ্দিষ্ট নয়। বরং মারিফতের পথের শিশুকে ভুলাইবার জন্য উহা খেলনা। ঐ সকল হাল অতিক্রম করিয়া খোদাতায়ালার সন্তুষ্টির মাকাম- অর্থাৎ এখলাস অর্জন ব্যতীত তরিকত ও হকিকতের পথ অতিক্রম করার অন্য কোনো উদ্দেশ্য নাই। প্রতিবিম্ব ও আত্মিক দর্শনের মাকাম সমূহ অতিক্রম করিয়া খুব কম লোকই উক্ত এখলাস ও রেজার মাকামে উপনীত হইতে পারে। অধিকাংশ লোক তাজাল্লী ও আত্মিক দর্শনকে মূল উদ্দেশ্য মনে করিয়া থাকে। তাই তাহারা নিজেদের ধারণার বশবর্তী হইয়া শরীয়তের কামালাত বা পূর্ণতা হইতে বঞ্চিত হয়।”
এখলাসের মরতবায় উপনীত হওয়া এবং খোদাতায়ালার রেজামন্দির মাকাম লাভ করা এলমে মারিফাত লাভের উপর নির্ভরশীল। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) বলিতেছেন যে, রাসূলে করীম (সাঃ) এর অছিলায় দশ বৎসর সাধনার পর তিনি এখলাসের মাকামে পৌঁছান ও আল্লাহতায়ালার রেজামন্দি লাভ করেন এবং এখলাস লাভের পর প্রিয়মত শরীয়তের যথাযথ আবির্ভাব প্রাপ্ত হন, যদিও শরীয়তের হকিকত ব্যতীত তাহার অন্য কোন লক্ষ্য ছিল না।
খোদাতায়ালা বলিয়াছেন, 'যাহা রাসূলে করীম (সাঃ) তোমাদের দান করিয়াছেন, তাহা তোমরা গ্রহণ কর এবং যাহা নিষেধ করিয়াছেন, তাহা হইতে বিরত থাক এবং আল্লাহতায়ালাকে ভয় কর' (আল কুরআন)। মোমিন বান্দার দেল যখন স্বতঃপ্রবৃত্ত ভাবে এই হালাত অর্জন করে, তখনই এখলাস বা উদ্দেশ্যের বিশুদ্ধতা আসে। এখলাস বা উদ্দেশ্য-বিশুদ্ধি নাফসের ফানা ও আল্লাহতায়ালাকে স্বীয় আত্মার মত ভালবাসিতে না পারিলে বা আল্লাহতায়ালার সহিত মহব্বতে জাতি সংঘটিত না হইলে লাভ হয় না।
হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) নাফসের বিশুদ্ধতা লাভ করিয়াছিলেন বলিয়াই তিনি আল্লাহতায়ালার জাতের জ্ঞানে জ্ঞানী হইয়াছিলেন। আর যিনিই আল্লাহতায়ালার জাতের জ্ঞানে জ্ঞানী হন, তিনি আল্লাহতায়ালার তাজাীয়াতে জাতি দ্বারা অন্তরের পবিত্রতা অর্জন করিয়া থাকেন। আল্লাহতায়ালাই সকল পবিত্রতা ও গুণের উৎস। তাই তদীয় জাতি নূর দ্বারাই নাফসের পবিত্রতা অর্জন সম্ভব। একই সাথে ইহ-পরকাল ও আল্লাহতায়ালার জ্ঞানে জ্ঞানী হওয়া সম্ভব। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এই সম্পদ লাভ করিয়াছিলেন মে'রাজের মাধ্যমে। মে'রাজ অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার জাতের সন্দর্শন লাভ করিবার পর হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর এই জ্ঞান লাভ হইয়াছিল। মহা পবিত্র মে'রাজের রাত্রিতে আল্লাহ্পাক সমস্ত সৃষ্টি রহস্য ও তদীয় প্রকারবিহীন সত্ত্বা তাহার হাবীবের নিকট প্রকাশ করেন।
রাসূলে করীম (সাঃ) এর এই বাতেনী কর্মকান্ড বা কর্মসূচী আদামত হইতে ঊর্ধ্বদিকে মাবুদিয়াতে ছেরফা ও হোব্বে ছেরফা পর্যন্ত বিস্তৃত ও ব্যাপক। ইসলামের চারটি অধ্যায়। যথাঃ শরীয়ত, তরিকত, হকিকত ও মারিফত।
শরীয়তঃ
আল্লাহতায়ালার আদেশ নিষেধ সম্পর্কে জানা ও তাহা পালন,
তরিকতঃ
বিশুদ্ধতা অর্জনের পথ-লতিকায়ে কালব হইতে শুরু করিয়া বেলায়েতে ছোগরা পর্যন্ত সব কিছুই তরিকতের অন্তর্ভুক্ত।
হকিকতঃ
বিশুদ্ধতা অর্জনের পথে পর্যায়ক্রমে ছালেকের আত্মিক অবস্থা বা পথ অতিক্রমের অভিজ্ঞতা। আকরাবিয়াত হইতে শুরু করিয়া হোব্বে ছেরফার মাকাম পর্যন্ত উহা বিস্তৃত।
মারিফতঃ
খোদাতায়ালার পরিচয় লাভের অভিজ্ঞতা। মারিফত বস্তুতঃ হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) আল্লাহ্তায়ালাকে চিনিবার যে পরিপূর্ণ পথ প্রদর্শন করিয়াছেন, তাহা। এই চারিটি অধ্যায় মিলাইয়া রাসূলে করীম (সাঃ) এর পথ বা দ্বীন যাহা ইসলাম নামে অভিহিত। এই চারটি মিলিয়া পূর্ণাঙ্গ ইসলাম বা পূর্ণাঙ্গ শরীয়ত।
উপরোক্ত আলোচনায় আমরা দেখিতে পাই যে, 'এখলাস' অর্থাৎ অন্তর ও উদ্দেশ্যের বিশুদ্ধতাই প্রকৃত ইসলাম-যাহা ফানা দ্বারা লাভ সম্ভব। হযরত নবী করীম (সাঃ) মে'রাজে গমন করিয়া আল্লাহতায়ালার জ্ঞানে জ্ঞানী হইয়াছিলেন আর উম্মতগণের জন্য তিনি অন্তরের বিশুদ্ধতা অর্জনের যে পথ প্রদর্শন করিয়া গিয়াছেন তাহাই হইল তরিকত। এই পথে চলিবার ফলে যে আত্মিক অবস্থা বা অভিজ্ঞতা মুরীদ বা ছালেক লাভ করেন তাহাই হকিকত এবং আল্লাহতায়ালার যে পরিচয় ছালেক সর্বশেষে লাভ করেন তাহা মারিফত। শরীয়ত তরিকত, হকিকত ও মারিফত-এই চার মিলিয়া পূর্ণাঙ্গ শরীয়ত।
এখলাসের মাকাম হাছিলের উপায়ঃ
'এখলাস' অর্জন শরীয়ত ও তরিকতের মূখ্য উদ্দেশ্য। এই এখলাস অর্জনের পথ ও পন্থা কি?
শয়তান মানুষের প্রকাশ্য দুশমন। আর শয়তানের আবাসস্থল মানুষের নাফস যাহা আগুন, পানি, মাটি ও বাতাস এই চারি উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত। তাই নাফসের স্বভাবও চারি উপাদানের ভিন্ন ভিন্ন স্বভাব দ্বারা গঠিত। তাই নাফসের সংশোধনের পথও জটিল। কেবলমাত্র ওলীয়ে কামেল ব্যতীত এই নাফসকে সংশোধন করিতে কেহ পারে না।
নাফসকে সংশোধন করিতে না পারিলে ইবাদতে কোন প্রকার এখলাস হাসিল হয় না। মানব দেহে শয়তানের আবাস স্থল নাফসের সংশোধন ছাড়া ইবাদত অর্থহীন। তাই, নাফস সংশোধন করিতে সক্ষম এমন ওলীয়ে কামেলের তত্ত্বাবধানে থাকিয়া শয়তান হইতে মুক্ত থাকিবার হেকমত অর্জন করা অত্যাবশ্যক। নাফস বা মানুষের সত্ত্বাকে পরিবর্তন করিতে পারেন একমাত্র পীরে কামেল, যিনি নিজে আল্লাহতায়ালার জ্ঞানে জ্ঞানী হন এবং আল্লাহতায়ালা তাহাকে দয়া করিয়া অন্তরের পবিত্রতা সহ আরও এমন কিছু গুণ দান করেন যাহা দ্বারা তিনি সমগ্র সৃষ্টির জ্ঞানে জ্ঞানী হইয়া যান। তাই তিনি সমস্ত মখলুকের হৃদয়ের কথা ও স্বভাব সম্পর্কে জানিতে পারেন। এই ব্যাপক জ্ঞানে জ্ঞানী মোর্শেদ তদীয় তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদী দ্বারা তদীয় মুরীদ সন্তানের নাফসকে ঐরূপে সংশোধন করিয়া দিতে পারেন যে, তাহার নাফস আল্লাহতায়ালার রাজিতে রাজী ও সন্তুষ্ট হইয়া যায়। তৎপর তাহা পরিশুদ্ধ ইবাদতে মনোযোগ দিতে সক্ষম হয়। ইহা সম্ভব হয় পীরে কামেলের খাছলতে খাছলত ধরিলে। আমার দয়াল পীর কেবলাজান হুজুর হযরত মাওলানা খাজাবাবা শাহ্সূফী এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব বলেন, 'পীরের খাছলতে খাছলত ধর-তবেই ত্রাণ ও শান্তি।' মোর্শেদে কামেল আল্লাহ্র জ্ঞান দ্বারা পরিচালিত হন। মোর্শেদে কামেলের পবিত্র রূহ হযরত নবী করীম (সাঃ) এর রূহ মোবারক ও আল্লাহতায়ালার সহিত যুক্ত থাকে। তাই মোর্শেদে কামেলের ইচ্ছা-অনিচ্ছা আল্লাহতায়ালার দ্বারা নির্ধারিত হয়। মোর্শেদে কামেলের ইচ্ছা-অনিচ্ছা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহপাকের ইচ্ছারই প্রতিফলন। তাহার নিকট আল্লাহ্পাক এই রূপ ক্ষমতা দান করেন যে, তিনি মানুষের নাফস বা প্রবৃত্তি সংশোধন করিয়া দিতে পারেন। তাই হযরত মাওলানা রুমী (রঃ) ছাহেব বলেন,
"হিছনা কুশাদ মারে রাজো জাল্লে পীর
দামনে আ নাফসে কোগ্রা ছাগীর।"
অর্থাৎ- 'তুমি যদি নাফসরূপী কালসাপ হইতে রক্ষা পাইতে চাও, তবে নাফস হন্তা মোর্শেদে কামেলকে শক্ত রূপে ধর।'
যদি মোর্শেদে কামেলের একনিষ্ঠ খেদমত করিয়া কোন ছালেক তদীয় নেক দৃষ্টি লাভ করিতে পারে, তবে তাহার দেহের সকল লতিফা একে একে জিন্দা হইবে। কালব, রূহ, ছের, খফি, আখফা, আব, আতশ, খাক, বাদ, নাফস, ৭০ হাজার লতিফা সম্বলিত লতিফায়ে কালেব ও সর্বদেহের ৩৩ কোটি লোমকূপে এস্মে জাত (আল্লাহ্ নাম) ও নাফী-এসবাত জেকের জারী হইবে। ছালেক তখন কালবী কর্ণে আসমান-জমিন ও বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সকল কিছুর ভিতরই যে আল্লাহতায়ালার জেকের হয়, তাহা শুনিতে পায়-তখন তাহার দেলই শুধু নয় সমগ্র দেহের কোথাও আর 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্' জেকের হইতে বিরত থাকে না- আর এই জেকের হইতে সৃষ্ট নূরের জোয়ারে শয়তানের আবাস স্থল নাফসে আম্মারার সকল বসতি ভাসিয়া প্লাবিত হইয়া যায়। তখন তাহাকে আর শয়তান ধোকায় ফেলিতে পারে না। তখন ছালেকের দেহের প্রতি অণু-পরমাণু আল্লাহতায়ালার পানে ধাবিত হয়। ইহাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ্পাক কুরআন মজীদে ফরমান,
بِأَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ ارْجِعِي إِلَى رَبِّكِ رَاضِيَةً مَّرْضِيَّةً فَادْخُلِي فِي عِبَادِي وَادْخُلِي جَنَّتِي
অর্থাৎ-'হে আল্লাহতে সন্তুষ্ট আত্মা! তুমি তোমার রবের দিকে অর্থাৎ তাহার সহিত মিলিত হইবার জন্য ধাবিত হও- আমার প্রকৃত এবাদতকারীদের মধ্যে প্রবিষ্ট হও এবং জান্নাতে দাখিল হও।' (সূরা ফাজরিঃ ২৭-৩০)
তখন বান্দা বা ছালেকের দেল হইতে আল্লাহ্ ব্যতীত সব কিছুই বাহির হইয়া যাইবে এবং আল্লাহর সাথে তাহার নেছবত মজবুত হইবে। তখন দুনিয়া ও আখেরাতের সব কিছুই হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া একমাত্র আল্লাহতায়ালা সন্তুষ্টিই তাহার কাম্য হইবে। তখন আল্লাহতায়ালা বান্দাকে সকল দিক হইতে রক্ষা করিয়া থাকেন। ছালেক তখন এমন দরজা লাভ করে যাহাদের সর্ম্পকে আল্লাহপাক শয়তানকে হুশিয়ার করিয়া দিয়া বলেন,
إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِم سُلْطَنُ
অর্থাৎ-'(হে শয়তান!) নিশ্চয়ই আমার খাছ বান্দাদের উপর তোমার কোনো ক্ষমতা নাই।' (সূরা হিজ্বরঃ ৪২)
এই স্তরে ছালেক উক্তরূপ আত্মিক অবস্থা লাভ করে। এই পর্যায়ে বান্দা তাহার অস্তিত্বকে আল্লাহ্তায়ালা কর্তৃক ধারণকৃত ও কর্মকে আল্লাহতায়ালার গুণ দ্বারা কৃত বলিয়া অনুভব করে।
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, যে পর্যন্ত না বান্দা স্বীয় নাফসকে এরূপভাবে ফানা করে যে, প্রভুর ইচ্ছাই তাহার ইচ্ছা হয়- ততক্ষণ তাহাকে দাসত্বের গন্ডিতে আবদ্ধ বলা যাইবে না। যে দাস নিজ বাসনার বা অভিলাসের বশীভূত, সে স্বীয় নাফস বা প্রবৃত্তির দাস বটে। সে শয়তানের উপাসনায় লিপ্ত। শয়তানের প্রবঞ্চনা আত্মার মহাব্যধি। আল্লাহ্পাক ফরমান, শয়তানের মক্কর দুর্বল। আত্মিক চিকিৎসকগণ বা কামেল পীর তাহা চিকিৎসা করিতে পারেন।
এই রূপে ছালেক যখন সম্পূর্ণরূপে আল্লাহতায়ালার ইচ্ছার সহিত নিজেকে ও নিজের ইচ্ছা ও সত্ত্বা বিলীন করিয়া দেয় তখন মানুষের হকিকত বা তত্ত্ব এবং জাত বা ব্যক্তিত্ব অর্থাৎ নাফসে নাতেকার স্বভাব তিরোহিত হয়- নাফসে নাতেকা বলিতে বলা হয় জ্ঞানধারী প্রবৃত্তি বা বাকশক্তিসম্পন্ন প্রবৃত্তি বা আমি বলিতে যাহার প্রতি ইঙ্গিত করা হয় তাহা। আবার উক্ত 'নাফসে নাতেকা তত্ত্ব' আদম নীস্তি যাহা অস্তিত্ব ও অস্তিত্ব গুণ সমূহের প্রতিবিম্ব প্রাপ্ত হইয়া নিজেকে অস্তিত্ববান ধারণা করিতেছে ও স্বাধীনভাবে নিজেকে জীবিত ও জ্ঞানধারী মনে করিতেছে অর্থাৎ জ্ঞান, দর্শন, শ্রবণ, চিন্তন, বর্ণন, কল্পন, সৃজন ইত্যাদি গুণ যে নাফস নিজের বলিয়া জানে ও বিশ্বাস করে। আল্লাহ্পাক এই অবস্থায় তাহার উপর অনুকম্পা দৃষ্টি দান করেন তখন তাহার মধ্য হইতে এই নিরেট মুর্খতা দূর হইয়া যায়। তখন সে বুঝিতে পারে যে, তাহার অস্তিত্ব, জ্ঞান, ক্ষমতা বা শক্তি, ইচ্ছা, কল্পন, শ্রবণ, দর্শন, চিন্তন, বর্ণন সকলই আল্লাহতায়ালার নিকট হইতে আগত। এই পূর্ণতা বা গুণসমূহ তাহার নহে। সে আরও বুঝিতে পারে যে, তাহার হকিকত বা তত্ত্ব হইল অন্ধকার বা নিছক ত্রুটি। আল্লাহতায়ালার অনুগ্রহে যখন এইরূপ দর্শন প্রবল হয়, তখন খোদাতায়ালা তাহার গুণ সমূহ ছালেককে প্রদান করেন। ছালেকও আমানত বা গচ্ছিত সম্পদ সমূহ মালিককে ফিরাইয়া দেয়। তখন সে নিজেকে নিস্তি বলিয়া জানে। তখন তাহার কোনো নাম নিশানা থাকে না। সে তখন অস্তিত্ব রহিত হইয়া যায়। উহাই ফানার পূর্ণতা।
যখন ছালেকের অনুভূতি এইরূপ হয় যে, তাহার নিজস্ব অস্তিত্ব অপসারিত হইয়াছে, ব্যক্তিত্ব ও চিহ্ন অপসারিত হইয়াছে এবং তাহা তাহার আসলের আসলের নিকট ফিরিয়া গিয়াছে তখন তিনি প্রতিবিম্ব ও এলমে হুছুলীর জগৎ হইতে মুক্ত হইয়া যান। এই সময় ছালেক বিশ্বজগৎ ও আল্লাহতায়ালা মধ্যে স্রষ্টা ও সৃষ্টি ব্যতীত অন্য কোনো রূপ পার্থক্য নির্ণয় করিতে পারে না। ছালেক তখন এমন এক স্তরে উপনীত হইয়া যান, তাহার দেহের প্রতি অণু-পরমাণু আল্লাহতায়ালার পবিত্র দরবারে উপনীত হইবার রাজপথ তুল্য হইয়া যায়। তখন উক্ত জ্ঞানধারী ব্যক্তি প্রতিবস্তুকে নিজের দিকে আকর্ষণ করিবার এবং নিজেই যাবতীয় বস্তুর দর্পণ তুল্য হইয়া যান। এইরূপ প্রতিচ্ছায়া ও দর্পণ তুল্য ব্যক্তি তাহার জ্ঞানকে দৃষ্টির বাহিরে যাইতে দেন না। আল্লাহ্পাকের অনুগ্রহে যখন প্রতিচ্ছায়া প্রাপ্তির বন্ধন মুক্ত হয় তখন সৃষ্টি জগতের অণু-পরমাণু সকলেই তাহার জন্য গুপ্তের গুপ্ত স্তরের দ্বার তুল্য হয়।
এইরূপ ব্যক্তি পূর্বে যাহাকিছু করিত, তাহা নিজের জন্য করিত, কিন্তু তাহার আত্মিক অবস্থা এই স্তরে আনীত হইবার পর যাহা কিছু করে, তাহা আল্লাহ্পাকের জন্যই করে; সে নিয়ত করুক বা না করুক। কালবী দর্শনে সে তখন নিজেকে একটি পানির প্রণালী বা স্রোতধারার মতন দেখে। তাহাতে যাহা কিছু পতিত হয়, তাহা বাহিরে গিয়া পড়ে। অতএব সে যাহা করে, তাহা তার নিজের জন্য করে না।
এই সময়ে উক্ত ছালেকের প্রতি প্রেম আল্লাহতায়ালার প্রেম সৃষ্টি করে; পক্ষান্তরে তাহার সহিত শত্রুতা বা হিংসা আল্লাহতায়ালার প্রতি হিংসা বা শত্রুতা সৃষ্টি করে। এইরূপে তাহার সম্মান ও সাহায্য আল্লাহতায়ালার সম্মান এবং সাহায্য রূপে পরিগণিত হয়। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর সহিত তদীয় সাহাবাগণের ঐরূপ সম্বন্ধ ছিল। অর্থাৎ সাহাবাগণের সহিত হিংসা করিলে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর সহিত হিংসা করা হয়। এই হেতু রাসূলে করীম (সাঃ) ফরমাইয়াছেন, "যাহারা আমার সাহাবাকে ভালবাসিল, তাহারা আমার জন্যই তাহাদিগকে ভালবাসিল। যাহারা উহাদের সহিত শত্রুতা করিল, তাহারা আমার জন্যই উহা করিল।" ঐরূপ ব্যক্তির মহব্বতই রাসূলে করীম (সাঃ) ও আল্লাহতায়ালার মহব্বত সৃষ্টি করিতে পারে।
হে জাকেরগণ! তোমরা জানিয়া রাখ, আমার দয়ালপীর কেবলাজান হুজুর, হযরত মাওলানা খাজাবাবা শাহ্সূফী এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব ছিলেন এমনই দরজার সাধক, যাহাকে ভালবাসিলে, যাহার তাবেদারী করিলে হকিকতে রাসূলে করীম (সাঃ) তথা আল্লাহতায়ালার তাবেদারী করা হয়; যাহার বিরুদ্ধাচারণ করিলে; হকিকতে রাসূলে করীম (সাঃ) তথা আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধাচারণ করা হয়।
আমিত্বকে চরমভাবে বিসর্জন দেয়ার পরই এই মাকামে উপনীত হওয়া যায়। হযরত পীর কেবলাজান হুজুর খাজাবাবা শাহ্সূফী এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব একদিন আমাকে বলিলেন, "তুমি যদি হেদায়েত করিতে চাও, তাহা হইলে 'আনা ফানার মাকাম' ত্বয় করিয়া আসিয়া হেদায়েতের জন্য কোমরে কাপড় বাঁধ। আটদিন করিয়া উপবাস থাকিবে, তোমাকে দেখিয়া লোকে মুচকি হাসিবে, কাহাকেও কিছু বলিতে পারিবে না, কাহারও নিকট কিছু চাহিতে পারিবে না। চারা কলা গাছের বুক ফাঁড়িয়া যদি কলার ছড়ি বাহির হয়, তবে সে কলা পোক্তও হয় না; ছোপও বালা হইয়া যায় অর্থাৎ অপরিপক্ক ব্যক্তি দ্বারা হেদায়েতের কাজ সম্ভব হয় না।” হেদায়েতের দায়িত্বভার তাহারই উপর আল্লাহ্ অর্পণ করেন, যাহাকে তিনি দয়া করিয়া কঠিন রেয়াজতের পথে তাহার আমিত্ব পরিপূর্ণরূপে ধ্বংস করিয়া দেন এবং ঐ ব্যক্তি পরিপূর্ণ অর্থে আল্লাহতায়ালার খাছ বান্দা হইয়া যান। এই স্তরে ছালেকদের জন্য আল্লাহ্পাক দুইটি পথ নির্ধারণ করিয়া দেন। একটি বেলায়েতে নবুয়তের পথ, অন্যটি কামালাতে নবুয়তের পথ। যাহারা বেলায়েতে নবুয়তের মাকামে থাকেন, তাঁহারা আল্লাহতায়ালার প্রেমের কোর্বে ডুবিয়া থাকেন। তাঁহারা আল্লাহ্ ছাড়া আর কিছুই বোঝেন না। এ মাকামে হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) বলিয়াছিলেন, 'হে আল্লাহ! আমিও নয়; শুধু আপনি' অর্থাৎ সে ব্যক্তি আল্লাহতায়ালার অস্তিত্বে নিজেকে বিলুপ্ত দেখেন। তিনি নিজের ভিতর দুনিয়ার কোনো কিছুরই জন্য আর আকর্ষণ বোধ করেন না।
রাসূলে করীম (সাঃ) যখন ঐরূপ আল্লাহতায়ালার কোর্বে ডুবিয়া যাইতেন, তখন আল্লাহতায়ালা তাহাকে হেদায়েতের দায়িত্ব দিয়া দুনিয়ার দিকে ঘুরাইয়া দিতেন। বলিতেন, '(হে রাসূল!) আপনি বলুন, আমিও তোমাদের মত মানুষ, তবে আমার উপর ওহী নাজেল হয়।' ঐরূপ হেদায়েতের দায়িত্বপ্রাপ্ত বা কামালাতে নবুয়তের মাকামে উন্নীত ব্যক্তিকে তখন সমগ্র মাখলুকাতের জ্ঞানে আল্লাহ্পাক জ্ঞানী করিয়া দেন।' তিনি যেমন আল্লাহতে একীভূত থাকেন, তেমনি মাখলুকাতের জ্ঞানে জ্ঞানী হন। তাহার সকল কাজ আল্লাহতায়ালার উদ্দেশ্যে সাধিত হয়। ইহাই এখলাস। আর যখন সকল কাজ আল্লাহতায়ালার উদ্দেশ্যে সাধিত হয়, তখন তাহা বিশ্ব মানবতার মঙ্গলের জন্য সাধিত হয়। আমার দয়াল পীর কেবলাজান হুজুর হযরত মাওলানা খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেবের প্রতি কাজ ঐরূপই ছিল যাহাতে বিন্দুমাত্র আনানিয়াত' ছিল না; যাহার সকল কর্ম আল্লাহতায়ালার উদ্দেশ্যে সাধিত হইয়াছিল এবং তাই তাহার সকল কর্ম বিশ্ব মানবের কল্যাণে নিবেদিত ছিল তাহা সাধারণ মানুষ বুঝুক আর নাই বুঝুক। আর যাহার কর্ম বিশ্ব মানবের জন্য, তিনি সকল ক্ষুদ্র স্বার্থের ঊর্ধ্বে। আল্লাহতায়ালার ইচ্ছা ও উদ্দেশ্যের সহিত নিজের ইচ্ছা উদ্দেশ্য একীভূত না হইলে অন্য কোনো রূপেই মানুষ ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠিতে পারে না।
হে জাকেরগণ! তোমরা যদি রাসূলে করীম (সাঃ) এর পরিপূর্ণ আদর্শ ও শিক্ষা অনুসরণ করিতে চাও, আল্লাহতায়ালার গুণে গুণান্বিত হইতে চাও, আল্লাহ্তায়ালার পরিপূর্ণ পরিচয় গ্রহণ করিতে চাও, ইসলামের সাম্য, সৌন্দর্য ও শান্তি অনুধাবন করিতে চাও ও তাহা হইতে অগ্রসর হইয়া হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর অনুসারী হইয়া রাসূলে করীম (সাঃ) এর পরিপূর্ণ মহব্বত অর্জন করিয়া বিশ্ব মানবের কল্যাণে মানব জাতিকে হেদায়েত করিতে চাও; তাহা হইলে আমার দয়াল পীর কেবলাজানের কদম মোবারক শক্ত করিয়া ধর- তাহার পাক কদমে নেছার হইয়া যাও। তাহার ইচ্ছাতে নিজের নাফস ও আনানিয়াত ফানা করিবার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ কর। তাহা হইলে আল্লাহ্পাক আমার দয়াল পীর কেবলাজানের তোফায়েলে তোমাদেরকে মাঞ্জিলে মাছুদে পৌঁছাইয়া দিবেন বলিয়া আশা করা যায়। ফকির লোকের মহব্বতই বেহেশতের কুঞ্জি। হোব্বুল ফুকারায়ে মেস্তাহুল জান্নাত।








