ঈদে মিলাদুন্নবীর (সাঃ) তাৎপর্য এবং শরীয়ত ও সুন্নতের আদেশ-নিষেধ

হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘ঈদে মিলাদুন্নবী ও জাকের পার্টির আদর্শ-লক্ষ্য’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ ঈদে মিলাদুন্নবীর (সাঃ) তাৎপর্য এবং শরীয়ত ও সুন্নতের আদেশ-নিষেধ প্রতিপালনের গুরুত্ব সম্পর্কীয় আলোচনাঃ
বিজ্ঞাপন
হিজরী বর্ষ পঞ্জিকার তৃতীয় মাসের নাম রবিউল আউয়াল। মুসলমানদের নিকট, আশেকে রাসূলদের নিকট এই মহিমান্বিত মাসের গুরুত্ব সর্বাধিক। এই মাসের ১২-ই তারিখে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব, রাহমাতুল্লিল আ'লামীন, করুণার আধার, উসওয়াতুন হাছানাহ, সারওয়ারে কায়েনাত, মোফাখ্যারে মওজুদাত, হযরত আহমদ মুজতবা, মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ) এই নশ্বর পৃথিবীতে পদার্পণ করেন। আর এই কারণেই ১২-ই রবিউল আউয়াল মহা পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ) হিসেবে মুসলিম বিশ্বে উৎযাপিত হয়। "ঈদ” অর্থ খুশি। 'মিলাদুন্নবী' অর্থ নবী করীম (সাঃ) এর জন্ম। কাজেই ঈদে মিলাদুন্নবী অর্থ নবী করীম (সাঃ) এর জন্ম উপলক্ষ্যে আনন্দ উৎসব করা।
প্রতি বৎসর ১২-ই রবিউল আউয়ালে তোমরা লক্ষ লক্ষ জাকেরান ও আশেকান একত্রিত হইয়া মহাধুমধামের সাথে, যথাযোগ্য মর্যাদায় দেলে অকুন্ঠ ভক্তি ও চোখে মহব্বতের পানি লইয়া, দয়াল নবী (সাঃ) কে ছালাম প্রেরণ কর। সকলেই সু-মধুর সুরে বল, ইয়া নবী ছালাম । তোমাদের সুরে আলাইকা, ইয়া রাসূল ছালাম আলাইকা সুর মিলাইয়া সেদিন আকাশ-বাতাস, গাছ-পালা, বৃক্ষ-লতা, প্রত্যেক অণু-পরমাণুই প্রাণ ভরিয়া দয়াল নবীকে ছালাম জানায়। তাহারাও বলে, ইয়া নবী ছালাম আলাইকা.........।
প্রতি বছর ১২-ই রবিউল আউয়াল আসে। প্রতি বছর বিশেষ ভাবে এই দিন পালন করা হয়। কিন্তু এই দিনের শিক্ষা, এই দিনের তাৎপর্য তাহা নয়। আশেকে রাসূলদের জন্য প্রতিটি দিন, প্রতিটি মাস, প্রত্যেকটি বছর, এমনকি সারাটা জীবনই যেন ঈদে-মিলাদুন্নবী (সাঃ)। তাই প্রত্যেকটি দিনই আল্লাহ ও রাসূল (সাঃ) এর আদেশ-নিষেধ পরিপূর্ণ ভাবে প্রতিপালন করা উচিত। রাসূলে পাক (সাঃ) এর পরিপূর্ণ অনুসরণ ও অনুগমন ব্যতীত সফলতার দ্বারে পৌঁছানো সম্ভব নয়। রাসূলে-পাক (সাঃ) এর অনুসরণের মাধ্যমেই ইহলৌকিক ও পারলৌকিক মুক্তি, খোদাতায়ালার সন্তুষ্টি বা রেজামন্দী লাভ সম্ভব। এই শিক্ষা ও পয়গাম নিয়েই প্রতি বছর রবিউল আউয়াল মাস আসে।
বিজ্ঞাপন
রাসূলে-পাক (সাঃ) এর আগমনের সময় সারা পৃথিবীর অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় ছিল। মিথ্যার ফুৎকারে সত্যের প্রদীপ নিভিয়া গিয়াছিল। সর্বত্রই মুর্তিপূজা, প্রতিমা পূজা, দেব-দেবীর পূজা, সূর্য-পূজা, অগ্নিপূজা ইত্যাদি ধর্মীয় কর্ম হিসেবে প্রচলিত ছিল। তৌহিদের নাম মাত্র ছিল না। আরবের অবস্থা ছিল আরও ভয়াবহ। সর্বত্রই চুরি-ডাকাতি, হত্যা, রাহাজানী, খুনাখুনি, অনাচার-অবিচার, ব্যভিচার, পর-নারী হরণ, নারী নির্যাতন, দ্বন্ধ-কলহ, হিংসা-বিদ্বেষ, মদ্যপান, জুয়া, সুদ-ঘুষ ইত্যাদি অসামাজিক ও অমানবিক কার্যকলাপ ছিল বর্বর আরব জাতির নিত্য দিনের কর্মকান্ড। সামাজিক মর্যাদা হানীর আশংকায় কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়া হইত। ক্রীতদাসপ্রথা চালু ছিল। গরু-ছাগলের মত মানুষ কেনাবেচা হইত। ক্রীতদাসদের সিংহের কবলে ছাড়িয়া দিয়া আনন্দ-কৌতুক করা হইত। দাস-দাসীদের সাথে কুকুর বিড়ালের চেয়েও হীন আচরণ করা হইত। মানবতা বলিতে কিছুই ছিল না। সর্বত্রই পশুত্বের দাপট। জাতির এমনি এক শোচনীয় অবস্থায়, যুগের এমনি এক ক্রান্তিলগ্নে রাব্বুল আ'লামীন তদীয় পেয়ারা হাবীব (সাঃ) কে দুনিয়ায় প্রেরণ করিলেন, অজ্ঞতার ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত, পাপাচার ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন, সত্যের আলো থেকে বঞ্চিত, পথহারা, আল্লাহভোলা মানব সমাজকে সত্যের আলো প্রদান করিয়া যাবতীয় পাপাচার ও অসামাজিক কার্যকলাপ থেকে ফিরাইবার জন্য।
সমাজের এই দুরবস্থা, মানুষের এই অধঃপতন, সর্বত্রই অন্যায় ও পাপের ছড়াছড়ি দেখিয়া তিনি ব্যথিত হইলেন। তাদেরকে উদ্ধারের চেষ্টায় যুবকদেরকে লইয়া একটি কল্যাণধর্মী সংগঠনও তৈরী করিলেন। সেই সংগঠনের মাধ্যমে বেশ কিছু দিন মানব কল্যাণে তিনি নিজেকে নিরলস ব্যস্ত রাখিলেন। এমনিভাবে দিন অতিবাহিত হইতে লাগিল। তৎপর তিনি হেরা পর্বতের গুহায় নির্জনে ধ্যান শুরু করিলেন। দীর্ঘদিন লোকালয় ত্যাগ করিয়া নির্জন হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন থাকিলেন। অবশেষে তাঁহার চল্লিশ বছর বয়ঃকালে মহান খোদাতায়ালা হেরাপর্বতের গুহায় হযরত জিব্রাইল (আঃ) এর মাধ্যমে প্রথম অহী প্রেরণ করিলেন।
রাসূলে পাক (সাঃ) কে উদ্দেশ্য করিয়া হযরত জিব্রাইল (আঃ) বলিলেন, রামরা” অর্থাৎ পাঠ করুন। রাসূলে পাক (সাঃ) বলিলেন, "আমি পড়িতে পারি না।” হযরত জিব্রাইল (আঃ) হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কে সজোরে আলিংগন করিয়া পুনরায় তাহাকে বলিলেন, "ইক্করা" অর্থাৎ পাঠ করুন। নবী পাক (সাঃ) এইবারও পূর্ববৎ উত্তর দিলেন, "আমি পড়িতে পারি না।” হযরত জিব্রাইল (আঃ) আবার তাহাকে দৃঢ়ভাবে আলিংগন করিলেন। এইরূপ তিনবার আলিংগন করিবার পর হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) এর হৃদয়ের দ্বার খুলিয়া গেল। জ্ঞানের দরজা উন্মুক্ত হইল। তিনি অনর্গল পড়িয়া যাইতে লাগিলেন, ইক্করা বিছমে রাব্বিকাল লাজি খালাক......। রাসূলে পাক (সাঃ) একজন নিরক্ষর লোক, উম্মী উপাধিতে ভূষিত। অথচ তিনি অনর্গল পড়িয়া যাইতে লাগিলেন। এই যে বিদ্যা-ইহাই এলমে ছিনা নামে পরিচিত।
বিজ্ঞাপন
রাসূলে পাক (সাঃ) কে মহান খোদাতায়ালা ধীরে ধীরে জ্ঞানের পরিপূর্ণতা দান করিলেন। মে'রাজের রাত্রির কথা সকলেই জানা। আল্লাহপাক তদীয় হাবীবকে নিজ সান্নিধ্য প্রদানের জন্য, জ্ঞানের পরিপূর্ণতা এবং নিজ জাতপাকের দর্শন দানের জন্য ফেরেশতা সম্রাট হযরত জিব্রাইল (আঃ) কে পাঠাইলেন। রাসূলে পাক (সাঃ) হযরত জিব্রাইল (আঃ) এর সংগে বোরাকে চড়িয়া আসমানের সপ্তম স্তর পার হইয়া সিদরাতুল মোনতাহায় পৌঁছাইলেন। তথায় জিব্রাইল ফেরেশতাকে পিছনে রাখিয়া বেলায়েতে ছোগরা বা নূরময় জগত, বেলায়েতে কোবরা বা সিফাতের জগত, শানের জগত, মহব্বতের সমুদয় জগত পার হইয়া যেইমাত্র হোব্বে ছেরফা ও মাবুদিয়াতে ছেরফায় পৌঁছাইলেন, তখনই আল্লাহপাক বলিলেন,
قِفْ يَا مُحَمَّدُ
অর্থাৎ-'হে মুহাম্মদ, আপনি থামুন।'
বিজ্ঞাপন
এই হোব্বে ছেরফা ও মাবুদিয়াতে ছেরফা হইল খোদাতায়ালার জাতপাকের নিকটতম দুই ইতেবার'। ইহার উপরে জাতপাকের মধ্যে রাসূলে পাক (সাঃ) কে আর প্রবেশ অনুমতি দেওয়া হইল না, কারণ তিনিও সৃষ্ট। হোব্বে ছেরফা ও মাবুদিয়াতে ছেরফা সৃষ্টির জন্য খোদাতায়ালার দিকে সর্বশেষ দুই দায়েরা। রাসূলে পাক (সাঃ) কে সেখানে লইয়া মহান খোদাতায়ালা জ্ঞানের পরিপূর্ণতা দান করিলেন, সমুদয় পর্দা উন্মোচিত অবস্থায় নিজের পবিত্র জাতের দর্শন দান করিলেন, সকল গুপ্ত ভেদ প্রকাশ করিলেন, সৃষ্টি রহস্য এবং স্রষ্টা রহস্যের সবটুকুই ব্যক্ত করিলেন; যাহা ইতিপূর্বে কোন নবী রাসূলকে দান করেন নাই। রাসূলে পাক (সাঃ) এর প্রার্থনায় এই মহা নেয়ামত আল্লাহপাক তদীয় উম্মতকুলকে দান করিলেন। সেখান হইতে আল্লাহপাক রাসূলে করীম (সাঃ) কে দুনিয়ায় ঘুরাইয়া দিলেন পাপের অন্ধকারে নিমজ্জিত মানব সমাজের হেদায়েতের জন্যে। নবুয়ত প্রাপ্তির পর হইতে দীর্ঘ ২৩ বৎসর তিনি তদীয় হেদায়েত কর্ম অব্যাহত রাখিলেন। হাজার বাধা বিপত্তি, কোরায়েশদের অত্যাচার-নির্যাতন, উৎপীড়নের মুখে দায়িত্ব পালনে কোন রকম শিথিলতা প্রদর্শন করেন নাই। তিনি ধীরে ধীরে ব্যক্তি সংস্কারের মাধ্যমে রাষ্ট্র সংস্কার করিলেন। পাপাসক্ত, বর্বর আরববাসী রাসূলে করীম (সাঃ) এর প্রদর্শিত পথে চলিয়া, তদীয় সান্নিধ্যে ও সাহচর্যে থাকিয়া আদর্শ চরিত্রবান হইলেন, ঝঞ্চা-বিক্ষুব্ধ অশান্ত আরবে শান্তি নামিয়া আসিল।
মানুষ পাপ করে, অন্যায় করে, কিন্তু কেন মানুষ পাপ করে? কেন অপরাধ করে? মানুষের সমস্ত পাপ ও অন্যায়ের মূলে রহিয়াছে তাহার নাফস। নাফস-আগুন, পানি, মাটি বাতাসের সমন্বয়ে সৃষ্ট এক অশুভশক্তি। যাবতীয় অন্যায় ও কু-কর্মের উৎপত্তিস্থল এই নাফস। এই নাফস হইতেই সমুদয় পশু স্বভাবের সৃষ্টি। কাম-ক্রোধ, লোভ-মোহ, মদ-মাৎসর্য, হিংসা-কিনা, রিয়া, কামনা-বাসনা ইত্যাদি সবকিছুই নাফসের সৈন্য-সামন্ত। রাসূলে পাক (সাঃ) এর আবির্ভাব কালে পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষ আপন আপন নাফসের গোলাম ছিল। প্রত্যেকের রূহই আপন আপন নাফসের শৃংখলে আবদ্ধ ছিল। নাফসের কাজই হইল কু-কর্মে লিপ্ত থাকা, পাপাচারে নিমজ্জিত থাকা, খোদাতায়ালার বিরুদ্ধাচারণ করা। প্রত্যেকটি মানুষই আপন আপন নাফসের দাস বা গোলাম হওয়ায় সর্বদাই মনিবরূপী নাফসের হুকুম পালনে তাহারা ব্যস্ত থাকিত। ফলে প্রত্যেকের দ্বারাই পাপ ও অন্যায় কর্ম সম্পাদিত হইত। সারাটা দেশেই পাপের রাজত্ব কায়েম ছিল।
হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) নাফসে আম্মারাকে গ্রেফতার করিবার ব্যবস্থা করিলেন। নাফসকে দুর্বল করিবার দিক-নিদের্শনা দান করিলেন। এই দিক-নির্দেশনাই শরীয়ত বা সিরাতুল মুস্তাকিম। রাসূলে পাক (সাঃ) এর প্রদর্শিত পথে চলিয়া, তদীয় সান্নিধ্য ও সাহচর্য্যে থাকিয়া, তদীয় অনুসারীদের নাফস দুর্বল হইল, খোদাতায়ালার বিরুদ্ধাচারণ ত্যাগ করিল। প্রত্যেকেরই নাফস পাপ ও অন্যায় ত্যাগ করিয়া আম্মারার স্তর হইতে মোৎমাইন্ন্যার স্তরে পৌঁছাইয়া খোদাতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করিল। এইভাবে রাসূলে করীম (সাঃ) এর আত্মিক প্রভাবে আরবে শান্তি নামিয়া আসিল।
বিজ্ঞাপন
নবীজী (সাঃ) এর শিক্ষক খোদাতায়ালা স্বয়ংঃ
দুনিয়ায় রাসূলে করীম (সাঃ) এর কোন শিক্ষক ছিল না। দুনিয়াবী কোন জ্ঞান তিনি বই-পুস্তক থেকে অর্জন করেন নাই। তাহার শিক্ষক ছিলেন স্বয়ং খোদাতায়ালা। এই জন্য তিনি জ্ঞানের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহন করিয়া সমস্ত শাখার তথা সৃষ্টিতত্ত্বজ্ঞান ও স্রষ্টাতত্ত্বজ্ঞানের পরিপূর্ণতা অর্জন করিয়াছিলেন। আল্লাহপাক বলেন,
عَلَّمَهُ شَدِيدُ الْقُوَى
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ-'অসীম ক্ষমতার অধিকারী (আল্লাহ) তাহাকে (মুহাম্মদ কে) শিক্ষা দিয়াছেন। (৫৩ঃ ৫)। আল্লাহপাক আরও বলেন,
وَهُوَ بِالْأُفُقِ الْأَعْلَى
অর্থাৎ-'তিনি (মুহম্মদ) দিগমন্ডলের সর্বোচ্চস্থানে পৌছিয়াছেন।' (৫৩ঃ ৭)
বিজ্ঞাপন
তাই আল্লাহপাক কুরআন মজীদে বলেন,
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّوْنَ اللَّهَ فَتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ
অর্থাৎ-("হে নবী!) আপনি বলিয়া দিন (হে মানব মন্ডলী,) যদি তোমরা সত্যিই আল্লাহকে ভালবাসিতে চাও, তাহা হইলে আমার অনুসরণ কর। ফলে আল্লাহতায়ালা তোমাদিগকে ভালবাসিবেন, আর তোমাদের যাবতীয় গোনাহ তিনি মাফ করিয়া দিবেন।" (৩ঃ ৩১)
বিজ্ঞাপন
শরীয়ত ও সুন্নতের অনুসরণ অপরিহার্যঃ
আল্লাহপাকের প্রেম, পিরিতি, ভালবাসা লাভ করিতে হইলে, আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি অর্জন করিতে হইলে, তদীয় হাবীব রাসূলে-পাক (সাঃ) কে অনুসরণ করিতে হইবে, তাহার পদাংক অনুসরণ করিতে হইবে। অর্থাৎ শরীয়ত ও সুন্নতের পরিপূর্ণ অনুসরণ করিতে হইবে। শরীয়ত কি? শরীয়ত শব্দটি 'শারয়ুন' শব্দ থেকে উদ্ভুত। 'শারয়ুন' শব্দের আভিধানিক অর্থ-সহজ সরল পথ, প্রধান সড়ক ইত্যাদি। আর শরীয়ত শব্দের আভিধানিক অর্থ বৃহত্তম জন সড়ক, প্রকান্ড নদী ইত্যাদি। শরীয়ত এমনই এক বৃহত্তম সড়ক যাহা আদামাত হইতে শুরু হয় এবং ২৪ দায়েরা অতিক্রম করিয়া তথা কালব, রূহ, ছের, খফি, আখফা, নাফস, আব, আতস, খাক, বাদ, ৭০ হাজার লতিফা বিশিষ্ট লতিফায়ে কালেব, সুলতানুল আজকার, দায়েরায়ে এমকান, বেলায়েতে ছোগরা, আকরাবিয়াত, মহব্বতে আউয়াল, মহব্বতে ছানী, কাওছ, ছায়েরে এস্মোজ্জাহের, ছায়েরে এস্মোলবাতেন, বেলায়েতে উলিয়া, মোরাকাবায়ে শরহে ছদর, কামালাতে নবুয়ত, কামালাতে রেছালত, কামালাতে উলুল আজম, তৎপর ইবাদতের পথে হকিকতে কুরআন, হকিকতে কাবা, হকিকতে সালাত, মাবুদিয়াতে ছেরফা এবং মহব্বতের পথে হকিকতে ইব্রাহিমী, হকিকতে মুছবী, হকিকতে মুহাম্মদী, হকিকতে আহমদী এবং হোব্বে ছেরফা পর্যন্ত বিস্তৃত। পরিপূর্ণ শরীয়তের চারটি অংশ-জাহেরা শরীয়ত, তরিকত, হকিকত ও মারেফাত। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব শরীয়তকে তিনটি অংশে ভাগ করিয়াছেন।
★ এলেম-বিশ্বাস দুরস্ত করিবার পর ফরজ, ওয়াজেব, সুন্নত, নফল, মোস্তাহাব ও সন্দিহান ইত্যাদি বিষয় সংক্রান্ত জ্ঞান অর্জন।
বিজ্ঞাপন
★ আমল-অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী আমল করা। এবং
★ এখলাস-ইবাদতের বিশুদ্ধতা অর্জন। এখলাসের মাকাম সিদ্ধ হয় খোদাপ্রাপ্তির পথে, মারেফাত সাধনার সর্ব শেষ স্তর হোব্বে ছেরফা এবং মাবুদিয়াতে ছেরফায়। এই কারণেই হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) মারেফাতকে শরীয়তের খাদেম বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। পূর্বের নসিহতে এখলাসের বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করা হইয়াছে।
শরীয়ত প্রদানের উদ্দেশ্য কি? মানব সৃষ্টিরই বা উদ্দেশ্য কি? মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য প্রসংগে আল্লাহপাক বলেন,
বিজ্ঞাপন
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونَ
অর্থাৎ-'মানুষ ও জ্বিনকে শুধুমাত্র ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করা হইয়াছে।' আবার হাদীসে কুদসীতে আল্লাহপাক বলেন,
كُنْتُ كَنزًا مَخْفِيًا فَأَحْبَبْتُ أَنْ أَعْرَفَ فَخَلَقْتُ الْخَلْقَ لأَعْرَفَ
অর্থাৎ-'আমি গুপ্ত ধন ভান্ডার ছিলাম। অতঃপর পরিচিত হইতে ভালবাসিলাম। তাই সৃষ্টকে সৃষ্টি করিলাম।' পরিচিতি বাসনা জাগ্রত হওয়ার সাথে সাথে জাত পাকে প্রথমে প্রেম বা হোব্ব উদ্ভূত হয়।
উল্লিখিত পবিত্র কুরআনের বাণী ও হাদীসে কুদসী থেকে জানা যায় যে স্রষ্টা মূলতঃ নিম্নলিখিত উদ্দেশ্যে মানুষ সৃষ্টি করিয়াছেন। উদ্দেশ্য সমূহ নিম্নরূপঃ-
★ নিজ পরিচয় প্রদান।
★ নিজের গুণাবলীর প্রকাশ।
★ প্রেম প্রকাশ এবং
★ প্রভুত্বের হক আদায় করা অর্থাৎ সৃষ্টি স্রষ্টার ইবাদত করিবে-এই উদ্দেশ্যে।
আল্লাহপাক উল্লিখিত উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য প্রথমে যাহা সৃষ্টি করিলেন, তাহা হইল-নূরে মুহাম্মদী। তৎপর সেই নূর হইতে অপরাপর সমস্ত কিছু সৃষ্টি করিয়াছেন। আল্লাহপাক বলেন,
لَوْلَاكَ لَمَا خَلَقْتُ الْأَفْلَاكَ وَ لَمَا أَظْهَرْتُ رَبُوبِيَّتِي
অর্থাৎ-'(হে নবী,) যদি আপনাকে সৃষ্টি না করিতাম, তাহা হইলে কিছুই সৃষ্টি করিতাম না এবং আমার প্রভুত্বও প্রকাশ করিতাম না।'
রাসূলে পাক (সাঃ) কে সর্ব প্রথমে সৃষ্টি করিয়া মহান খোদাতায়ালা দুনিয়াতে শেষ নবী হিসেবে প্রেরণ করেন এবং তাহার মাধ্যমেই মানবজাতির জন্য খোদাপ্রদত্ত যাবতীয় নেয়ামতের পরিপূর্ণতা দান করেন। আল্লাহপাক ফরমান,
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُم وَ اَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَ رَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
অর্থাৎ-'আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীন পূর্ণাংগ করিলাম এবং আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে মনোনীত করিলাম।' (সূরা মায়েদাঃ ৩)
আল্লাহপ্রদত্ত নেয়ামত সমূহ অসংখ্য যাহা গণনায় শেষ করা সম্ভব নয়। তবে মানব জাতির জন্য তাহার অন্যতম করুণা হইল, নবী রাসূল প্রেরণ এবং তাহাদের মাধ্যমে শরীয়ত প্রদান। কারণ শরীয়তের আমলের ভিতর দিয়াই মানুষ তাহার উদ্দিষ্টস্থল খোদাতায়ালার জাতপাক পর্যন্ত পৌছাইতে পারে, খোদাতায়ালার রেজামন্দী বা সন্তুষ্টি অর্জন করিতে পারে; খোদাতায়ালার প্রেম, পিরিতি, ভালবাসা লাভ করিতে পারে।
মানুষের সাথে এক দুষ্ট সংগী আছে যাহার নাম নাফস। মানুষকে খোদাবিমুখ রাখাই তাহার কাজ। অভিশপ্ত শয়তান নাফসের সাহায্যকারী। আল্লাহপাক নবী-রাসূল প্রেরণ করিয়া তাহাদেরকে শরীয়তের জ্ঞান দিয়া দুনিয়ায় পাঠাইয়াছেন, মানুষকে নাফসে আম্মারা ও শয়তানের হাত হইতে রক্ষা করিয়া, তাহাদের দাসত্ব হইতে মানুষকে উদ্ধার করিয়া খোদামুখী করিবার জন্য, খোদাতায়ালার প্রেম, পিরিতি, ভালবাসা শিক্ষাদানের জন্য। সর্বশেষে আসিলেন রাহমাতুল্লিল আ'লামীন, করুণার ধন, হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ); যাহাকে শরীয়তের জ্ঞানরূপ নেয়ামতের পরিপূর্ণতা দান করা হইল।
পূর্ণাংগ শরীয়ত কিঃ
পরিপূর্ণ এ শরীয়ত কি? রাসূলে পাক (সাঃ) এর পূর্ণ জীবন চরিত্রই এই পূর্ণাংগ শরীয়ত। তাহার প্রতিটি কথা, প্রতিটি বাণী, প্রতিটি কর্ম, প্রতিটি ইশারা, ইংগিত সবই শরীয়তের অন্তর্ভুক্ত।
এক কথায় রাসূলে পাক (সাঃ) এর সমুদয় কর্মসূচী ও কর্মকান্ডই শরীয়ত। রাসূলে পাক (সাঃ) এর জীবনাদর্শের দু'টো দিক পরিলক্ষিত হয়। একটি প্রকাশ্য-যাহা জাহেরী শরীয়ত। অন্যটি গুপ্ত-যাহা বাতেনী শরীয়ত। দুইটি দিকের বা ধারার সমন্বয়ই পরিপূর্ণ শরীয়ত। পরিপূর্ণ এই শরীয়ত মানুষের জন্য বাংকার স্বরূপ। বাংকার অর্থ আন্ডার গ্রাউন্ড সেল্টার (Underground Shelter) অর্থাৎ ভূগর্ভস্থ নিরাপদ আশ্রয়স্থল। বাংকারে কেহ আশ্রয় গ্রহণ করিলে শত্রুর ভয়াবহ আক্রমণ তাহার কোন ক্ষতি করিতে পারে না। তেমনি শরীয়তের বাংকারে যে প্রবেশ করে; নাফসে আম্মারা এবং শয়তান তাহার কোনই ক্ষতি করিতে পারে না। এই কারণেই শরীয়তের যাবতীয় হুকুম আহকাম পুংখানুপুংখ ভাবে পালন করিতে হয়। জাহেরী শরীয়ত পুরাপুরী আমল করিলে বাতেনী শরীয়ত অর্জন সহজ হয়। জাহেরী শরীয়ত বাদ দিয়া বাতেনী শরীয়ত অর্জন করা এবং খোদাতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন মোটেই সম্ভব নয়। হযরত ইমাম মালেক (রঃ) বলেন যে, যাহারা শরীয়তকে বাদ দিয়া মারেফাতকে খোদাপ্রাপ্তির একমাত্র মাধ্যম মনে করে, তাহারা জিন্দিক' এবং মারেফাতকে বাদ দিয়া যাহারা শুধুমাত্র শরীয়তকে যথেষ্ট মনে করেন তাহারা ফাসেক'। তিনি আরও বলেন, "শরীয়ত ও তরিকত একে অপরের সম্পূরক। ধর্ম ও কর্ম জীবনের সমন্নয় সাধনই ইসলাম। ইসলামের পরিপূর্ণ রূপই শরীয়ত ও তরিকত অর্থাৎ পূর্ণাংগ শরীয়ত।”
নবুয়তের কামালত এখনও অব্যাহতঃ
রাসূলে পাক (সাঃ) মানব জাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত। রাসূলে পাক (সাঃ) এর ইন্তেকালের সাথে সাথে নবুয়ত শেষ হয়। কিন্তু মহান খোদাতায়ালা নবুয়ত শেষ হইলেও নবুয়তের কামালাতকে জগতের বুকে নেয়ামত হিসেবে বহাল রাখিয়াছেন। রাসূলে পাক (সাঃ) এর ইন্তেকালের পর এই জমীন, এই ভূ-পৃষ্ঠ আল্লাহ পাকের দরবারে ফরিয়াদ করিল, “হে খোদা! কেয়ামত পর্যন্ত আমাকে কি এই রূপেই থাকিতে হইবে যে, আমার উপর আর কোন নবী চলাফেরা করিবে না?" আল্লাহতায়ালা বলিলেন, শীঘ্রই এই উম্মতের মধ্যে আমি এমন লোক প্রেরণ করিব যাহাদের অন্তকরণ নবীদের অন্তকরণের সদৃশ্য হইবে।” এবং তাহাদের সংখ্যা হইবে ৩০০ জন আউলিয়া, ৭০ জন নজীব, ৪০ জন আওতাদ, ১০ জন নকীব, ৭ জন আরেফ, ৩ জন মোখতার ও একজন গাউস। যদি গাউসের ইন্তেকাল হয় তাহা হইলে তিন জন মোখতারের মধ্য হইতে একজনকে গাউসের পদে বা মুরাদ ফকিরের পদে উন্নীত করা হয়। মোখতারের শূন্য পদ পূরণ করিবেন সাত জন আরেফের একজন আরেফ। তৎপর আরেফের শূন্যপদ পূর্ণ করিবেন ৪০ জন নকীবের একজন। নকীবের শূন্যপদ পূরণ করিবেন ৪০ জনের একজন আওতাদ। তৎপর ৭০ জন নজীবের মধ্য হইতে একজন উক্ত আওতাদের স্থান পূর্ণ করেন। আর ৩০০ জন আউলিয়ার একজন আসিয়া উক্ত নজীবের স্থলবর্তী হয়। অতঃপর সমগ্র দুনিয়া হইতে একজনকে বাছিয়া লইয়া উক্ত তিনশতের শূন্যস্থান পূরণ করা হয়। এই অবস্থা কিয়ামত পর্যন্ত চলিতে থাকিবে। ইহাদের মধ্যে কাহারও কালব হযরত মুসা (আঃ) এর মত, কাহারও কালব হযরত ঈসা (আঃ) মত, কাহারও কালব হযরত নূহ (আঃ) ও হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর মত। উল্লিখিত ৪৩১ জনের আধ্যাত্বিক সংসদ যাহা কেয়ামত পর্যন্ত চলিতে থাকিবে। সংসদের প্রত্যেক সদস্যই এক একজন ওলী-আল্লাহ। যাহাদের চরিত্র রাসূলে পাক (সাঃ) এর চরিত্রের অনুরূপ। তাহারাই জগতের বুকে শরীয়তের পতাকাকে উড্ডীন রাখিয়াছেন, পরিপূর্ণ শরীয়তকে কায়েম রাখিয়াছেন এবং শরীয়তকে যাবতীয় বেদাত ও কুফরীর হাত হইতে রক্ষা করিতেছেন। তাহারাই নবীদের ওয়ারেছ বা উত্তরাধিকারী। তাহারাই পূর্ণাংগ শরীয়তের শিক্ষাদাতা। বর্তমান সময়ে আধ্যাত্মিক জগতের সকল ওলীয়ে কামেলদের ছর্দার, আমার পীর কেবলা হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ ছেঃ আঃ) ছাহেব। যিনির তাওয়াজ্জোয়ে এত্তেহাদীর বলে আজও খোদাতালাশী ব্যক্তিগণ পূর্ণাংগ শরীয়ত তথা জাহেরী ও বাতেনী শরীয়তের সুবাস পাইতেছেন।
বাতেনী শরীয়তের শিক্ষাদাতা পীরে কামেলঃ
জাহেরী শরীয়তের জ্ঞান মাদ্রাসা বা ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র থেকে শিক্ষা করা যায়। কিন্তু বাতেনী শরীয়তের শিক্ষাকেন্দ্র হইলেন পীরে কামেল স্বয়ং। তাহার সান্নিধ্যে, সাহচর্যে ও খেদমতের মাধ্যমে বাতেনী শরীয়তের জ্ঞান অর্জন করিতে হয়। বাতেনী শরীয়তের জ্ঞান ব্যতীত নাফসে আম্মারা বা শয়তানের হাত হইতে রক্ষা পাওয়া সম্ভব নয়। শরীয়তের জাহেরী আমল দ্বারা নাফসের হাত হইতে উদ্ধার পাওয়া যায় না। তবে জাহেরী শরীয়তের আমল ব্যতীত বাতেনী শরীয়তের দরজা উন্মুক্ত হয় না। এই কারণে জাহেরী শরীয়তের আমলকে ফরয বা অপরিহার্য করা হইয়াছে। বাতেনী শরীয়তের আমল বা জ্ঞান অর্জন ব্যতীত নাফসের কু-প্ররোচনা হইতে বাঁচা সম্ভব নয়, কালবকেও পরিচ্ছন্ন করা সম্ভব নয়। আর পরিচ্ছন্ন কালব ব্যতীত খোদাতায়ালাকে পাওয়াতো দূরের কথা, পরকালের মুক্তিই সম্ভব নয়। আল্লাহপাক বলেন,
إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ
অর্থাৎ-'পরিচ্ছন্ন কালব (কালবিন ছালিম) ব্যতীত যে আল্লাহর সদনে হাজির হইবে সে মুক্তি পাইবে না।' (সূরা শুআরাঃ ৮৯) আর এই কারণেই কালবের বিদ্যা বা বাতেনী শরীয়তের জ্ঞান অর্জন ফরজ। পীরে কামেলের সান্নিধ্য বা খেদমত ব্যতীত বাতেনী জ্ঞান বা কালবের বিদ্যা অর্জন সম্ভব নয়। তাই পীরের সান্নিধ্যে বা সাহচর্যে থাকিয়া খেদমত করাও ফরজ। পীরে কামেলের তাওয়াজ্জোয়ে এত্তেহাদীর শক্তিতে সমস্ত লতিফা জাগ্রত হয়, ধীরে ধীরে কোটি কোটি লতিফা জাগ্রত হয় এবং প্রত্যেক লতিফার সাথে আল্লাহর নূরের সংযোগ সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ ছালেকের বা মুরীদের অজুদের চতুষ্পার্শ্বে আল্লাহ পাকের নূরের এক বর্ম তৈরী হয়। এই নূরের বর্ম ভেদ করিয়া শয়তান আর তাহার কোনও ক্ষতি করিতে পারে না। কিন্তু নাফসে আম্মারার শক্তি তখনও বলবত থাকে। নাফসে আম্মারার কু-স্বভাব দূর হয় বেলায়েতে ছোগরায়। তথায় আল্লাহপাকের আসমা ও সিফাতের নূরের প্রতিবিম্বে ছালেকের নাফস পরিশোধিত হয় ও কু-কর্ম ত্যাগ করিয়া মোৎমাইন্ন্যায় উপনীত হয়। তৎপর বেলায়েতে কোবরার মহব্বতে আওয়ালের দায়েরায় সিফাতি নূরের ফয়েজে নাফসের অবশিষ্ট দোষ সমূহ তথা কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য, হিংসা, কিনা, রিয়া, কামনা, বাসনা, ইত্যাদি সম্পূর্ণ বিদূরিত হইয়া নাফস মোলহেমার গুণাগুণ লাভ করে, আল্লাহর সাথে কথোপকথনের যোগ্যতা লাভ করে।
বাতেনী শরীয়তের জ্ঞান অর্জনের পথে তিন প্রকারের তাজাল্লীর সাথে ছালেক পরিচিত হয়। যথাঃ
★ তাজাল্লীয়াতে জাত,
★ তাজাল্লীয়াতে সিফাত ও
★ তাজাল্লীয়াতে আফয়াল।
তাজাল্লীয়াতে জাতী নূরের প্রকাশ ঘটে কামালাতে নবুয়তে এবং তঊর্ধ্বের মাকাম সমূহ হইতে। তাজাল্লীয়াতে জাতী নূরের সাহায্যে নিম্নলিখিত পাঁচটি গুণ ছালেকের লাভ হয়।
★ একিন (বিশ্বাস)
★ এখলাস (ইবাদতের বিশুদ্ধতা)
★ তছলিম (আপনাকে ন্যস্ত করা)
★ রেজা (খোদাতায়ালা যখন যে অবস্থায় রাখেন তাহাতেই রাজী থাকা) ও
★ তাকমিলোল একিন (পূর্ণাংগ বিশ্বাস)।
তাজাল্লীয়াতে সিফাতি নূরের সাথে ছালেকের পরিচয় ঘটে আকরাবিয়াত হইতে বেলায়েতে উলিয়া পর্যন্ত সব কয়টি দায়েরাতে। তাজাল্লীয়াতে সিফাতি নূরে ছালেকের নিম্নলিখিত পাঁচটি গুণ অর্জিত হয়।
★ ছবর (ধৈর্য বা সহিষ্ণুতা)
★ শোকর (কৃতজ্ঞতা প্রকাশ)
★ তাওয়াক্কুল (নির্ভর)
★ খওফ (ভয়)
★ রেযা (ভরসা)
তাজাল্লীয়াতে আফয়ালের নূরের সাথে ছালেকের পরিচয় হয় আকরাবিয়াতের নীচে বেলায়েতে ছোগরায়। এই তাজাল্লায় ছালেকের পাঁচটি গুণাবলী লাভ হয়। যথাঃ-
★ তওবা (পাপে নিবৃত্ত)
★ যোহদ (বাসনা ত্যাগ)
★ তাকওয়া (খোদাভীতি বা পরহেজগারী)
★ রেয়াযত (কঠোর ব্রত)
★ ফকর (দরিদ্রতা অবলম্বন)
কাজেই শরীয়তের বাতেনী অংশের জ্ঞান অর্জনের পথে ছালেক উপরে বর্ণিত সৎগুণাবলীসমূহ অর্জন করে, যাহা ছালেককে খোদাতায়ালার চরিত্রে চরিত্রবান করিয়া বিশুদ্ধ ও পরিশুদ্ধভাবে ইবাদত করিতে সাহায্য করে; খোদাতায়ালার প্রেম, পিরিতি, ভালবাসা অর্জনে এবং খোদাতায়ালার সান্নিধ্য ও রেজামন্দি লাভে মদদ জোগায়। পীরে কামেলের খেদমত ব্যতীত উল্লিখিত গুণাবলী অর্জনের দ্বিতীয় কোন পথ নাই। আর এই কারণেই পীরের দরবারে দীর্ঘ সময় খেদমত করিতে হয়। ওলীয়ে কামেল সকল আপন আপন পীরের দরবারে কেউবা ১২ বছর, কেউবা ২৪ বছর, কেউবা ৩৬ বছর খেদমত করিয়াছেন শুধু মাত্র উল্লিখিত গুণাবলী অর্জন করিয়া, শরীয়তের পরিপূর্ণ জ্ঞানে সুসজ্জিত হইয়া, খোদাতায়ালার সান্নিধ্য অর্জন ও পরিচয় লাভের উদ্দেশ্যে। এ প্রসংগে একটি ঘটনা উল্লেখ করিতেছি।
হযরত ইউসুফ ইবনে হুসাইন রাজী (রঃ) যৌবনে স্বপ্নে একজন পয়গম্বর কর্তৃক আদৃষ্ট হইয়া খোদাপ্রাপ্তি তত্ত্বজ্ঞান তথা পূর্ণাংগ শরীয়তের জ্ঞান শিক্ষার জন্য হযরত যুনুন মিছরী (রঃ) ছাহেবের খেদমতে হাজির হন। তদীয় হাতে বায়াত হন। তৎপর খেদমত করিতে থাকেন। এক মাস, দুই মাস করিতে করিতে এক বৎসর চলিয়া গেল। একটি বৎসরের মধ্যে হযরত যুনুন মিছরী (রঃ) আগন্তক হযরত ইউসুফ-এর সাথে কোন কথাই বলিলেন না। এক বৎসর পরে তিনি হযরত ইউসুফকে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, "হে যুবক! তোমার বাড়ী কোথায়? কেন তুমি খেদমত করিতেছ?” উত্তরে হযরত ইউসুফ বলিলেন, "আমার বাড়ী অমুক স্থানে, আমি হুজুরের সাক্ষাত লাভের জন্য আসিয়াছি।" ইহা শুনিবামাত্র হযরত যুনুন মিছরী (রঃ) ছাহেব তদীয় চেহারা মোবারক অন্য দিকে ঘুরাইয়া লইলেন। হযরত ইউসুফ চিন্তা করিতে লাগিলেন, "একটি বৎসের মধ্যে মনের কথা ব্যক্ত করিবার জন্য বহুবারই সময় ও সুযোগ খুঁজিয়াছি, কিন্তু তাহা পাই নাই। একটি বৎসর শেষে যদিওবা পীর ছাহেব একটি সুযোগ দিলেন কিন্তু উদ্দেশ্য বলিবার আগেই তিনি মুখ ফিরাইয়া লইলেন।" কোন্ বেয়াদবীর কারণে হযরত যুনুন মিছরী (রঃ) মুখ ফিরাইয়া লইলেন, তাহা ইউসুফ চিন্তা করিয়া পাইলেন না। পুনরায় তিনি সময় ও সুযোগের অপেক্ষায় থাকিলেন। দিন যায়, মাস যায় কিন্তু তদীয় পীর ছাহেব তাহাকে একবারও কথা বলিবার কোন সুযোগ দেন না। এইভাবে আরও এক বৎসর অতিবাহিত হইল। অতঃপর একদিন হঠাৎ তদীয় পীর হযরত যুনুন মিছরী (রঃ) ছাহেব তাহাকে তাহার খেদমতের উদ্দেশ্য জানিতে চাহিলেন। এখনি মোক্ষম সময় মনে করিয়া হযরত ইউসুফ বলিয়া ফেলিলেন, "আমি খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান অর্জন করিতে আসিয়াছি।" ইহা শুনিয়া হযরত যুন্নুন মিছরী (রঃ) নীরব রহিলেন, কোন জবাব দিলেন না। এই নীরবতার মধ্যে আরও এক বছর কাটিয়া গেল। এক এক করিয়া তিন বছর কাটিয়া গেল। তিনি খেদমত করেন নিজের ইচ্ছায়। তদীয় পীর ছাহেব তাহাকে কোন কাজের আদেশও দেন না। মনে মনে ভাবেন আর কাঁদেন। ব্যবসা-বাণিজ্য, মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সবই পরিত্যাগ করিয়া খোদাপ্রাপ্তির আশায় একনিষ্ঠ খেদমত করিয়া যাইতেছেন। অথচ তদীয় পীর কেবলা মিষ্টিমুখে একটি কথাও তাহার সাথে বলেন না। ইহার কোন রহস্যই হযরত ইউসুফ (রঃ) বুঝিতে পারিলেন না। এর কয়েক দিন পর হযরত যুনুন মিছরী (রঃ) হযরত ইউসুফকে নিকটে ডাকিয়া ছোট্ট একটি কাজ দিলেন। তিনি মুখ বন্ধ একটি কাঠের কৌটা হযরত ইউসুফের হাতে দিয়া বলিলেন, "যাও, নীল নদের অপর প্রান্তে অমুক স্থানে আমার এক বন্ধু থাকে। তাহার হাতে কৌটাটি দিয়া আস এবং তিনি যাহা বলেন, তাহা স্মরণ রাখিও। পথিমধ্যে কৌটাটি খুলিও না।" হযরত ইউসুফ (রঃ) যারপরনাই খুশী হইলেন। দীর্ঘ তিন বৎসর পরে তদীয় পীর তাহাকে একটি কাজের নির্দেশ দিলেন। তিনি আনন্দে আত্মহারা। পীরের দেওয়া কৌটাটি লইয়া তিনি নির্দেশিত স্থানের দিকে যাত্রা করিলেন। পথিমধ্যে এক বিশাল রাস্তা পড়িল। অথচ কোন লোকজনের সাড়াশব্দ নাই। এদিকে তাহার হাতে পীরের দেওয়া মুখবন্ধ কৌটাটিও কেমন যেন নড়াচড়া করে। তিনি কিছুটা ভয়-ভীতির মধ্যে হাতের কৌটাটির নড়াচড়ার রহস্য বুঝিবার জন্য মুখটি খুলিলেন। আর সংগে সংগে কৌটার মধ্যে হইতে একটি ছোট্ট ইঁদুর বাহির হইয়া লাফাইয়া পড়িয়া পালাইয়া গেল। হযরত ইউসুফ (রঃ) কিংকর্তব্যবিমূঢ়। তিনি হতবুদ্ধি হইয়া ভাবিতে লাগিলেন, এখন তিনি কি করিবেন। নির্দেশিত ব্যক্তির নিকটই যাইবেন? না কি আপন পীরের নিকট ফেরত যাইয়া তদীয় বেয়াদবীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিবেন। ভাবিয়া চিন্তিয়া ইঁদুর বিহীন খালি কৌটাটি লইয়াই নির্দেশিত ব্যক্তির নিকট যাইয়া হাজির হইলেন। সেই ব্যক্তি স্মিতমুখে হযরত ইউসুফ (রঃ) কে জিজ্ঞাসা করিলেন, "তুমি নাকি হযরত যুনুন মিছরীর (রঃ) নিকট খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান শিখিতে আসিয়াছ?" ইউসুফ (রঃ) বলিলেন, "জী, হুজুর।" তৎপর সেই ব্যক্তি বলিলেন, হযরত যুনুন মিছরী (রঃ) ছাহেব তোমাকে মুখবন্ধী একটি কৌটার মধ্যে একটি ইঁদুর দিয়াছিলেন, তোমার ছবর (ধৈর্য) পরীক্ষা করিবার জন্য। কিন্তু তুমি সে পরীক্ষায় ফেল করিলে। তুমি একটি ইঁদুরকে সামলাইয়া রাখিতে পাড়িলে না। বল দেখি, খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান কেমন করিয়া তুমি তোমার কালবে সামলাইয়া রাখিবে।" হযরত ইউসুফ লজ্জিত হইয়া অগত্যা হযরত যুন্নুন মিছরীর (রঃ) নিকট ফিরিয়া ক্ষমা প্রার্থনা করিলেন। হযরত যুনুন মিছরী (রঃ) তাহাকে বলিলেন, “দেখ ইউসুফ! তুমি যে খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান শিখিতে আসিয়াছ, আমি তাহা জানি। আমি উপর্যুপরি সাতবার মহান খোদাতায়ালার নিকট তোমাকে আল্লাহপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান শিক্ষা দানের হুকুম চাহিয়াছি, আল্লাহপাক হুকুম দেন নাই। কারণ এখনও নাকি তোমার ভিতর খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান ধারণের উপযোগিতা সৃষ্টি হয় নাই তথা ছবর, তাওয়াক্কুল, যোহদ ইত্যাদি সৎ গুণাবলীর পয়দা হয় নাই। অতঃপর তোমাকে একটি ইঁদুর দ্বারা পরীক্ষা করিবার নির্দেশ পাইলাম। পরীক্ষায় দেখিলাম, তাহাই সত্য। এখনও তুমি ধৈর্য বা ছবর গুণের অধিকারী হইতে পার নাই।" অতঃপর হযরত যুনুন মিছরী (রঃ) ছাহেব তাহাকে কিছু উপদেশ প্রদান পূর্বক বিদায় দিয়া পুনরায় খেদমতে আসিতে বলিলেন। পরবর্তীতে হযরত ইউসুফ দীর্ঘকাল খেদমত করিয়া আল্লাহপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান হাছিল করিয়াছিলেন।
কাজেই বুঝা যায়, খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান অর্জনের জন্য তওবা, যোহদ, তাকওয়া, রেয়াযত, ফকর, শোকর, ছরব, তাওয়াক্কুল, খওফ, রেজা, একিন, এখলাস, তছলিম, তাকমিলোল একিন ইত্যাদি উত্তম গুণাবলীর সাজে নিজেকে সজ্জিত করা একান্ত আবশ্যক। আর উল্লিখিত গুণাবলীসমূহ রাসূলে পাক (সাঃ) এর পরিপূর্ণ অনুসরণ বা জাহেরী সুন্নত ও বাতেনী সুন্নত প্রতিপালনের মাধ্যমে অর্জন করিতে হয়। কিন্তু বাতেনী সুন্নত বা বাতেনী শরীয়তের জ্ঞান আত্মাপরম্পরায় পীরে কামেলের কালবে। তাই পীরে কামেলের খেদমতে রাসূলে করীম (সাঃ) এর পরিপূর্ণ অনুসরণের ক্ষমতা ছালেকের হয়; যে অনুসরণ তাহাকে খোদাতায়ালার একান্ত সান্নিধ্যে, একান্ত নৈকট্যে পৌঁছাইয়া খোদাতায়ালার গুণে গুণান্বিত করে, খোদাতায়ালার জ্ঞানে জ্ঞানী করে। পরিপূর্ণ জ্ঞানের ধারক ও বাহক হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর আবির্ভাবের এই পবিত্র রবিউল আউয়াল মাস এই শিক্ষায় তোমাদেরকে দেয় যে, তোমরা পীরে কামেলের প্রাণপণ খেদমত করিয়া রাসূলে করীম (সাঃ) এর পরিপূর্ণ অনুসরণের তথা জাহেরী ও বাতেনী শরীয়তের জ্ঞান আহরণ করিয়া খোদাতায়ালার চরিত্রে চরিত্রবান হও, খোদাতায়ালার প্রেম, পিরিতি, মহব্বত অর্জন কর এবং পরিপূর্ণ ইবাদতের মাধ্যমে
তাঁহার একান্ত সান্নিধ্যে পৌছাইয়া জাতপাকের পরিচয় লাভ কর। ইহাই মানব জীবনের উদ্দেশ্য। ইহাতেই মানব জীবনের সার্থকতা। আর সকলই বৃথা।







