খোদাপ্রাপ্তির জন্য প্রয়োজন ইবাদত ও মহব্বত

হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘ইবাদত ও মহব্বত’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ খোদাপ্রাপ্তির জন্য প্রয়োজন ইবাদত ও মহব্বতঃ মানুষ 'আশ্রাফুল মাল্লুকাত' বা সৃষ্টির সেরা জীব। মানুষ আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধি। মানব সৃষ্টির পশ্চাতে দুইটি কারণ পরিলক্ষিত হয়। যথাঃ ইবাদত এবং প্রেম বা মহব্বত।
বিজ্ঞাপন
ইবাদত প্রসংগে আল্লাহতায়ালা বলেন,
وَ مَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
অর্থাৎ-"মানুষ ও জ্বীনকে আমার ইবাদত ভিন্ন অন্য কাজের জন্য সৃজন করি নাই।" (সূরা জারিয়াতঃ ৫৬) মানুষ আল্লাহর বিধানমতে চলিবে, আল্লাহর আনুগত্য করিবে এবং প্রভুর প্রভুত্বের হক আদায় করিবে-ইহা মানব সৃষ্টির অন্যতম কারণ।
বিজ্ঞাপন
প্রেম বা মহব্বত সম্পর্কে হাদীসে কুদসীতে দেখা যায় যে, আল্লাহপাক বলেন,
كُنْتُ كَنْزًا مَّخْفيًا فَأَحْبَبْتُ أَنْ أَعْرَفَ فَخَلَقْتُ الْخَلْقَ لِأَعْرَفَ
অর্থাৎ- "আমি ধন ভান্ডারের ন্যায় গুপ্ত ছিলাম। অতঃপর পরিচিত হইতে ভালবাসিলাম। তাই সৃষ্ট জগত সৃজন করিলাম।"
বিজ্ঞাপন
আল্লাহর পবিত্র জাতে প্রথমে পরিচয় বাসনা জাগ্রত হয়। ফলে প্রেমের উদ্ভব হয়। উদ্ভূত প্রেমের কারণে তিনি প্রথমে নিজ জাতি নূর দ্বারা জগতের শ্রেষ্ঠতম মানব রাসূলে পাক (সাঃ) এর নূর সৃষ্টি করেন। অতঃপর রাসূলে পাক (সাঃ) এর নূরে সৃষ্টি করেন অপরাপর সবকিছু। যে প্রেমের প্রভাবে আল্লাহতায়ালা সৃষ্টিকর্মে হাত দিলেন, সেই প্রেমের নূর লাভ করিয়া মানুষ খোদাতায়ালার পরিচয় জ্ঞান অর্জন করিবে-ইহাও মানব সৃষ্টির পশ্চাতে নিহিত অন্যতম এক কারণ।
আল্লাহতায়ালা প্রেমের তাড়নায় মানুষ সৃষ্টি করিয়া এই আদামাতে প্রেরণ করিয়াছেন। অতঃপর মানুষকে দিয়াছেন শরীয়তের বিধান বা ইবাদতের ফরমূলা। শরীয়তের বিধান অনুযায়ী নিজেকে পরিচালিত করা মানুষের জন্য যেমন ফরজ, তেমনি খোদাপ্রেম দেলে উৎপন্ন করাও ফরজ। আল্লাহপাক যেমন মানুষকে ইবাদতের নির্দেশ দিয়াছেন, তেমনি আল্লাহ-রাসূলের প্রেম বা ভালবাসা দেলে পয়দা করারও তাগিদ দিয়াছেন।
সৃষ্টির পশ্চাৎ কারণ ইবাদত ও মহব্বত; তেমনি এই আদামত হইতে খোদাপ্রাপ্তির সাধনারও দুইটি পথ নির্ধারিত। যথাঃ ইবাদত ও মহব্বত। কেবলমাত্র ইবাদতে খোদাতায়ালাকে পাওয়া সম্ভব নহে। মহব্বতশূন্য নীরস ইবাদতে উদ্দেশ্যের বিশুদ্ধতা (এখলাস) থাকে না। আর এখলাস বিহীন ইবাদতও আল্লাহতায়ালা কবুল করেন না। এতদ্ব্যতীত মহব্বত বা প্রেম শূন্য ইবাদতে শয়তান ও নাফসের দখল থাকে। যে ইবাদতে শয়তান ও নাফসের দখল থাকে, তাহা নাফসের জন্যই নিবেদিত থাকে; আল্লাহর উদ্দেশ্যে নহে। আর যে বন্দেগী নাফসের উদ্দেশ্যে করা হয়, তাহা আল্লাহ কবুল করিবেন কেন? তাই যতদিন নাফসের এমিনান' না হয়, যতদিন নাফসের পরিশোধন না হয় ততদিনের শুষ্ক ইবাদতে আবেদের ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশী থাকে। অসুস্থ্য রোগীকে সুস্থ্য না করিয়া উত্তম ও পুষ্টিকর খাবার দিলে তাহা তাহার স্বাস্থ্যের কোন উপকারে আসে না, অপকারই হয়। চিকিৎসা শাস্ত্রে একটি কথার প্রচলন আছেঃ যে পর্যন্ত রোগী রোগমুক্ত না হয়, সে পর্যন্ত কোন খাদ্যই তাহার জন্য উপকারী হয় না। তেমনি যাহাদের দেল অসুস্থ্য বা ব্যাধিগ্রস্থ, তাহাদের কোন ইবাদতই ফলপ্রদ হয় না, বরং অপকারই হয়। হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে-"অনেক কুরআন পাঠকারীকে কুরআন অভিশাপ দেয়। অনেক রোজাদারের রোজা হইতে ক্ষুৎপিপাসা ব্যতীত কোনই লাভ হয় না।"
বিজ্ঞাপন
ইবাদতকে গ্রহণযোগ্য বা কবুলিয়তের যোগ্য করিতে হইলে প্রয়োজন দেলের সুস্থতা, প্রয়োজন আল্লাহ ব্যতীত সব কিছুরই মহব্বত দেল হইতে মুছিয়া ফেলা; প্রয়োজন পিতা-পুত্র, ভাই-ভগ্নি, আত্মীয়-স্বজন, ধন-সম্পদ, ব্যবসা-বাণিজ্য, মান-সম্মান, কর্তৃত্ব ইত্যাদির যে মহব্বত বা প্রেম দেলের মধ্যে বিদ্যমান; তাহা বিদূরীত করা। ইত্যাকার বিষয়াদির মহব্বতই দুনিয়াপ্রেম। যে দেল দুনিয়াসক্ত, সে দেল ব্যাধিগ্রস্থ। যে দেল দুনিয়ার প্রভাবমুক্ত, সেই দেল সুস্থ। আর সুস্থ দেলেই খোদাপ্রেম পরিলক্ষিত হয়।
যতক্ষণ পর্যন্ত দেল দুনিয়ার প্রেমমুক্ত না হইবে, ততক্ষণ দেলে খোদার প্রেম পয়দা হইবে না। বিন্দু পরিমানও দুনিয়া প্রেম বা গায়ের আল্লাহর মহব্বত থাকিলে সেই দেলে খোদার প্রেমের ফয়েজ আসিবে না। প্রথম শর্ত দুনিয়ার প্রেমমুক্ত হওয়া। দুনিয়ার প্রভাবমুক্ত দেলই ব্যাধিমুক্ত। দুনিয়ার আবর্জনা মুক্ত দেলে খোদার প্রেমের ফয়েজ পাওয়া যায়। ফলে সুস্থ ও খোদার প্রেমে সিক্ত দেলে যে ইবাদত করা হয়-তাহা হুজুরী কালবী'তে সিদ্ধ হয়। সেই ইবাদতে এখলাস (উদ্দেশ্যের বিশুদ্ধতা) থাকে। ফলে তাহা খোদ খোদার জন্য নিবেদিত হয়। তাহা কবুল ও হয়।
এই কারণে আল্লাহতায়ালা ইবাদতের সংগে মহব্বতও দেলে পয়দা করার তাগিদ দিয়াছেন। ওলী-আল্লাহ সকলও ইবাদত ও মহব্বত -উভয়কেই একত্রে খোদাপ্রাপ্তির পথ হিসেবে উল্লেখ করিয়াছেন।
বিজ্ঞাপন
মহব্বত শূন্য ইবাদত যে অকার্যকর তাহা বুঝা গেল। এবার ইবাদত শূন্য মহব্বতও যে মূল্যহীন সে সম্পর্কে কিছু বলিতেছি। যাহারা খোদাপ্রেমের দাবী করে অথচ ইবাদত করে না, শরীয়তের বিধান পালন করে না; তাহাদের সে প্রেমের দাবী মিথ্যা। প্রেমিক প্রেমাস্পদের যে কোন নির্দেশ যখন তখন পালন করিবে-ইহাই প্রেমের স্বভাব। ইহাই প্রেমের ধর্ম। প্রেমাস্পদের হুকুম-তাহা যত কঠিনই হউক না কেন, প্রেমিক তাহা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আনন্দচিত্তেই পালন করে। প্রেমাস্পদের নির্দেশে প্রাণ দিতেও প্রেমিক কুণ্ঠাবোধ করে না। সেই স্থলে কেহ যদি প্রাণপ্রিয় শরীয়তের আদেশ-নির্দেশ পালন না করিয়া বলে যে, আমি খোদার প্রেমিক তবে তাহাকে মিথ্যাবাদী ছাড়া আর কিইবা বলা যায়। হযরত রাবেয়া বছরী (রঃ) তাই বলেন, "তুমি মুখে আল্লাহকে মহব্বত করার দাবী কর; অথচ কার্যতঃ তাঁহার নাফরমানীতে লিপ্ত থাক-ইহা নিঃসন্দেহে যুক্তিহীন ও অপাংক্তেয় দাবী। বস্তুতঃই যদি তোমার দাবী সত্য হইত, তাহা হইলে অবশ্যই তুমি তাঁহার অনুগত হইয়া চলিতে। কেননা, ইহা স্বতঃসিদ্ধ কথা যে, সত্যিকারের মোহেব মাহবুবের অনুগত হইয়া থাকে।"
যাহার দেলে একবার খোদার মহব্বত পয়দা হয়-সে খোদার ইবাদত না করিয়া থাকিতে পারে না। প্রেমের উত্তাপই তাহাকে ইবাদতে মগ্ন রাখে।
যখন ইবাদতের সাথে মহব্বত বা মহব্বতের সাথে ইবাদত একত্রিত হয়, তখনই একজন ছালেক বা মুরীদ খোদাপ্রাপ্তির পথে যাত্রা শুরু করিতে পারে। কলেমা "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ"-ইসলামের মূলমন্ত্র। কলেমার দুইটি অংশ আছে। প্রথম অংশটি আল্লাহর একত্ব সম্পর্কিত; দ্বিতীয়াংশটি আমাদের নবী (সাঃ) এর রেসালত সম্পর্কিত। কেহ যদি কেবল প্রথম অংশ বিশ্বাস করে, দ্বিতীয় অংশ বিশ্বাস না করে, তবে সে মুসলমান হইতে পারিবে না। ঠিক তেমনি কেহ যদি দ্বিতীয়াংশ স্বীকার করে কিন্তু প্রথম অংশে বিশ্বাস না আনে, তবে সেও মুসলমান দলভুক্ত নহে। মুসলমান হওয়ার জন্য কলেমার উভয় অংশের বিশ্বাস প্রয়োজন। অর্থাৎ আল্লাহর একত্বে যেমন বিশ্বাস স্থাপন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন নবীজীর রেসালতেও বিশ্বাস স্থাপন।
বিজ্ঞাপন
ঠিন তেমনি খোদাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রেও ইবাদত ও মহব্বত-এই দুইটি জিনিসই প্রয়োজন। কেবলমাত্র ইবাদতে আল্লাহকে পাওয়া সম্ভব নহে। আবার কেবলমাত্র মহব্বতেও তাহা সম্ভব নহে। ইবাদত ও মহব্বতের মিশ্রিত তপস্যাতেই খোদা পর্যন্ত পৌছানো সম্ভব।
মহব্বত বা প্রেমের স্বরূপ ও আল্লাহর দরবারে খোদাপ্রেমিকের মর্যাদা সম্পর্কীয় আলোচনাঃ
মহব্বত কি? মহব্বত বা প্রেম হৃদয়স্থিত এক আকর্ষণ বা শক্তি যাহা প্রেমাস্পদের স্মরণে প্রেমিককে সদা রত রাখে; যাহা মাহবুবের দর্শন ও সান্নিধ্যাকাংখায় মোহেবকে সদা ব্যস্ত ও চিন্তিত রাখে। হৃদয়ে উৎপন্ন প্রেম যখন পূর্ণতা পায়, তখন প্রেমিক বা মোহেব যে দিকেই তাকায় সে দিকেই আপন প্রেমাস্পদকেই দেখিতে পায়। প্রেমাস্পদের সত্ত্বায় প্রেমিক লীন হয়। দুনিয়াবী প্রেমেও এমন নজীর পরিলক্ষিত হয়। লায়লী ও মজনুর প্রেম কাহিনী কে না জানে? লায়লীকে মজনু ভালবাসিত। লায়লীর প্রেম অনলে মজনু সদা জ্বলিত। লায়লীর প্রেম অনলে পুড়িয়া মজনু নিজ সত্ত্বায় লায়লীকে ধারণ করিয়াছিল। তাই নিজেকে সে বিস্মৃত হইয়াছিল।
বিজ্ঞাপন
একদা লায়লীর প্রেমিক মজনুকে জিজ্ঞাসা করা হইলঃ "তোমার নাম কি?" সে বলিল, "আমার নাম লায়লী।" অপর এক ব্যক্তি মজনুকে বলিয়াছিল, "কিহে মজনু, লায়লী কি মারা গিয়াছে?" সে বলিয়াছিল, "লায়লী অবশ্যই মারা যায় নাই। সে আমার অন্তরে বিরাজমান। আমিই লায়লী।"
খোদাপ্রেমেও এমন অবস্থা হয়। প্রেমিকের সমস্ত সত্ত্বা খোদাপ্রেমে যখন পূর্ণ হয়, তখন সেই প্রেমিক যে দিকেই তাকায়, সে দিকেই প্রেমাস্পদ খোদাতায়ালার নূর দেখিতে পায়। সমুদয় বিশ্বব্রহ্মান্ডকে, এমনকি নিজেকেও সেই খোদাপ্রেমিক খোদাতায়ালার নূরে নিমজ্জিত দেখে। ফলে আবেগের আতিশয্যে নিজ সত্ত্বা বিস্মৃত খোদাপ্রেমিক প্রেমাস্পদের সত্ত্বাতেই কথা বলেন। যেমন হযরত মনসুর হাল্লাজ (রঃ) বলিয়াছেন, "আনাল হক" বা আমিই হক। মূলতঃ মনসুর তখন প্রেমাস্পদের সত্ত্বাতেই বিলীন ছিলেন। তাই 'আনাল হক' উক্তি মনসুরের আত্মিক অবস্থার দৃষ্টিকোণে অপরাধ ছিল না, যদিও শরীয়তের স্থূল দৃষ্টিতে ইহা ছিল কুফরী।
"আনাল হক' বলার অপরাধে মনসুর হাল্লাজকে বন্দী করা হয়। আঠার দিন তাহাকে বন্দী করিয়া রাখা হয়। শুলে চড়ানোর পূর্ব দিনে হযরত শিবলী (রঃ) মনসুর হাল্লাজ (রঃ) কে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, “হে মনসুর! বলুন, মহব্বত বা প্রেমের হকিকত কি?" তিনি বলিয়াছিলেন, "আজকে নয়, আগামীকল্য জিজ্ঞাসা করিবেন।" পরবর্তী দিন বন্দীশালা হইতে বাহির করিয়া মনসুরকে শুলে চড়ানোর জন্য যখন শুলমঞ্চের দিকে নেওয়া হইতেছিল, সে সময় হযরত শিবলী (রঃ) ছাহেবও সংগে ছিলেন। শিবলী (রঃ) কে দেখিয়া হযরত মনসুর হাল্লাজ (রঃ) উচ্চস্বরে বলিলেন, "হে শিবলী! শুনিয়া রাখুন, মহব্বতের হকিকত হইতেছে-সূচনাতে অগ্নিদগ্ধ হওয়া এবং পরিণামে প্রাণ বিসর্জন দেওয়া।"
বিজ্ঞাপন
বিবি যুলায়খা পয়গম্বর হযরত ইউসুফ (আঃ) কে ভালবাসিতেন। ইউসুফ (আঃ) এর প্রেমে তিনি উন্মত্ত হইয়া নিজের সমুদয় ধন-সম্পদ বিলাইয়া দিয়াছিলেন। কথিত আছে, তাহার সত্তরটি উটের বোঝা পরিমাণ স্বর্ণ রৌপ্যের অলংকার ছিল, যাহা সবই তিনি হযরত ইউসুফ (আঃ) এর প্রেমে উৎসর্গ করিয়াছিলেন। যে কেহ তাহার নিকট আসিয়া যদি শুধু এতটুকু বলিত যে, আমি তোমার ইউসুফকে দেখিয়াছি, তখনই তিনি সেই আগন্তককে একটি স্বর্ণের মালা উপহার দিতেন। এমনিভাবে তিনি তাহার সমুদয় অলংকার বিলাইয়া দেন। তিনি রিক্তহস্ত হন। কিতাবে দেখা যায়, তাহার এই অবস্থাকে কেন্দ্র করিয়া তখন লোকমুখে প্রবাদ প্রচলিত হয়-"ইউসুফের নামে সর্বস্ব।" ইউসুফের প্রেমে তিনি এতই মত্ত থাকিতেন যে, যে দিকেই তিনি দৃষ্টি ফেলিতেন, সে দিকেই ইউসুফ (আঃ) কে দেখিতেন; এমনকি আসমানের তারকারাজিতেও তিনি ইউসুফের নাম লেখা দেখিতেন।
পরবর্তীতে যুলায়খা ইসলামে দাখিল হন। ঈমানের নূরে নিজেকে আলোকিত করেন। ঈমান আনয়নের পর ইউসুফ (আঃ) এর সহিত তিনি বিবাহ বন্ধনেও আবদ্ধ হন। কিন্তু ততদিনে যুলায়খার দেলে খোদার প্রেমের নূর পয়দা হইয়াছে। যে ইউসুফের জন্য তিনি পাগল ছিলেন, খোদার প্রেম দেলে পয়দা হওয়ার পর সেই ইউসুফ (আঃ) এর সান্নিধ্যও তাহার ভাল লাগিত না। তিনি নির্জন ইবাদতে মগ্ন থাকিতেন, খোদার প্রেমের শরাব পানে বিভোর থাকিতেন। পয়গম্বর হযরত ইউসুফ (আঃ) যদি দিনের বেলায় তাহাকে নিকটে আহবান করিতেন, তবে রাতের কথা বলিয়া তিনি ইউসুফ (আঃ) হইতে দূরে থাকিতেন। আবার যখন রাত্রিতে আমন্ত্রণ করিতেন, তখন দিবসের কথা বলিয়া নিষ্কৃতি চাহিতেন। একদা হযরত ইউসুফকে (আঃ) উদ্দেশ্য করিয়া তিনি বলিয়া ফেলেন, "হে ইউসুফ! আল্লাহর পরিচয় লাভ করার পূর্বে আমি আপনাকে ভালবাসিতাম। কিন্তু আল্লাহপাক দয়া করিয়া তদীয় পরিচয় আমাকে দান করিয়াছেন, তাই খোদার প্রেম ও মহব্বত ছাড়া সকল গায়রুল্লাহর মহব্বত আমার অন্তর হইতে দূর হইয়াছে।" তখন হযরত ইউসুফ (আঃ) বলিলেন, "হে যুলায়খা! আল্লাহতায়ালা আমাকে হুকুম করিয়াছেন এবং বলিয়াছেন যে, তোমার গর্ভে দুইটি পুত্রসন্তান জন্ম নিবে এবং তাহাদেরকে নবুয়তী প্রদান করা হইবে। যুলায়খা তৎক্ষণাৎ বলিলেন, “যেহেতু আল্লাহতায়ালা আপনাকে হুকুম করিয়াছেন এবং এই জন্য আমাকে উপায় ও ওসীলা হিসেবে নির্ধারণ করিয়াছেন-তাই এই হুকুম আমার জন্য শিরোধার্য।" অতঃপর হযরত ইউসুফ (আঃ) এর সান্নিধ্যে তিনি আসিলেন।
খোদাপ্রেম মারেফাত বা খোদার পরিচয় জ্ঞানের মানদন্ড। আবার মারেফাত হইল খোদার দীদার বা প্রত্যক্ষ দর্শনের মানদন্ড। যে দেলে যতটুকু খোদাপ্রেম আছে, সে ততটুকু মারেফাতের অধিকারী। যে খোদার পূর্ণ মহব্বত অর্জনে সক্ষম হইয়াছে, তাহার মারেফাতও পূর্ণ।
বিজ্ঞাপন
মারেফাতের পূর্ণতার কারণে সে ব্যক্তি পরকালে খোদার দীদারও পূর্ণভাবে লাভ করিবে। হযরত ইমাম গাজ্জালী (রঃ) ছাহেব বলেন, "ইহলোকের মারেফাত হইল পরলোকে খোদার দীদারের বীজ। যে ব্যক্তি ইহলোকে আল্লাহর মারেফাত লাভ করিতে পারে নাই, পরলোকে সে আল্লাহর দীদার হইতে অনন্ত কালের জন্য বঞ্চিত থাকিবে। যে ব্যক্তি বীজই বপন করে নাই, সে ব্যক্তি কিরূপে শস্য লাভ করিবে? ইহকালে যাহার মারেফাত জ্ঞান যত তীক্ষ্ণ হইবে, পরলোকে তাহার প্রত্যজ্ঞ দর্শন বা দীদার লাভ তত উন্নত ও পূর্ণতর হইবে।"
উম্মতে মুহাম্মদীর মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী হইলেন হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) ছাহেব। তাহার শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে রাসূলে পাক (সাঃ)-এর একাধিক হাদীস পরিলক্ষিত হয়। রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন, "নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা জ্যোতিস্মান হইয়া আত্মপ্রকাশ করিবেন সমস্ত মানুষের জন্য সাধারণভাবে এবং হযরত আবুবকর সিদ্দিকের (রাঃ) জন্য বিশেষভাবে। "রাসূলে পাক (সাঃ) বলিয়াছেনঃ "আবুবকর নামাজ রোযা অধিক করার কারণে অন্যান্য ছাহাবীদের উপর ফজিলত বা শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেন নাই; বরং একটি বিশেষ কারণে তিনি ফযিলত লাভ করিয়াছেন-যাহা তাঁহার হৃদয়ের মধ্যে দৃঢ়বদ্ধ হইয়া গিয়াছে।" যে বিশেষ কারণের কথা হাদীসে বর্ণিত হইয়াছে-তাহা মূলতঃ খোদার মহব্বত ও মারেফাত। আল্লাহ ও রাসূলের প্রেম বা মহব্বত হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) ছাহেবের দেলে পূর্ণমাত্রায় ছিল। যে মহব্বতের বাহনে চড়িয়া তিনি মারেফাতের শেষের শেষ মাকাম পর্যন্ত পৌঁছাইয়াছিলেন। তাহার মারেফাত পূর্ণতা পাইয়াছিল। মহব্বত ও মারেফাতের পূর্ণতার কারণে পরকালে দীদারও তাহার পূর্ণভাবে হইবে। পরকালে প্রত্যেকে আপন আপন যোগ্যতানুযায়ী খোদাতায়ালার দীদার লাভ করিবে। যোগ্যতার মাপ কাঠি হইবে মারেফাত। খোদাতায়ালা পরকালে পূর্ণভাবেই আত্মপ্রকাশ করিবেন। সেখানে কেহবা তাহাকে পূর্ণভাবেই দেখিবেন, কেহবা অস্পষ্ট দেখিবেন, কেহবা দেখিতেই পাইবেন না। প্রত্যেকে নিজ মারেফাত জ্ঞানের পরিমান অনুসারেই খোদার দীদার লাভ করিবেন। যাহার মধ্যে মারেফাত নাই, বেহেশতে গেলেও সে খোদাতায়ালাকে দেখিতে পাইবে না। খোদার মারেফাত অন্যান্য সকলের চেয়ে হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) ছাহেবের অধিক থাকার কারণে পরকালে খোদার দীদারও তিনি বিশেষভাবে লাভ করিবেন। এতো গেল পরকালে খোদার দীদারের কথা। খোদা প্রেমিক তাহার প্রেমের বাহনে চড়িয়া দুনিয়াতে থাকিয়াই বাতেনী ভাবে উরুজ ও ছায়ের করিয়া খোদার সান্নিধ্য লাভ করেন, কৈফিয়তশূন্য ও বর্ণনাতীত দর্শন লাভ করেন। যে সাধক দুনিয়ার মহব্বত পরিত্যাগপূর্বক নিজ দেলে খোদার প্রেমের বিছানা পাতিতে পারেন, খোদাতায়ালা তাহার দেলে অবস্থান গ্রহণ করেন। তাহার অন্তরদৃষ্টিতে তখন আধ্যাত্মিক জগতের অভূতপূর্ব মনোমুগ্ধকর দৃশ্যাবলী ভাসিয়া উঠে। কিন্তু প্রেমিকের দৃষ্টি প্রেমাস্পদ ভিন্ন অন্য কোন দিকে থাকে না। আর তাই প্রেমাস্পদ খোদাতায়ালা তাহাকে নিজ সান্নিধ্য ও দর্শন দানে ধন্য করেন।
হযরত ইয়াহইয়া ইবনে মু'য়ায (রঃ) বলিয়াছেনঃ এক রজনীতে আমি হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) কে দেখিলাম, তিনি এশার নামাজের পর হইতে ফজর নামাজের পূর্ব পর্যন্ত হাটু জমিনে ফেলিয়া দুই পায়ের গোড়ালী উপরে রাখিয়া পায়ের অংগুলীর উপর বসিয়া দিশাহারা লোকের ন্যায় রাত্রি কাটাইয়া দিলেন। পরিশেষে সেজদা করিয়া উঠিলেন এবং দীর্ঘকাল পর্যন্ত নিস্তব্ধভাবে দাঁড়াইয়া রহিলেন। অতঃপর নিজের মুখমন্ডল আসমানের দিকে রাখিয়া মুনাজাত করিয়া বলিতে লাগিলেন, "হে খোদাতায়ালা! কিছু লোক তোমার অনুসন্ধান করিয়াছে, তুমি তাহাদিগকে এই রূপ বুযুর্গী দান করিয়াছ যে, তাহারা পানির উপর দিয়া হাঁটিতে ও বাতাসের উপর উড়িতে সক্ষম হইয়াছে। আমি এই সমস্ত কারামাত হইতে তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করিতেছি। তাহা হইতে তুমি আমায় রক্ষা কর, আমি তাহা চাই না। আর এক দল লোককে তুমি ভুতলস্থ বহু ধন-রত্ন দান করিয়াছ। আর এক দলকে তুমি এমন বুযুর্গী দান করিয়াছ যে, তাহারা এক রজনীতে বহু দীর্ঘ পথ অতিক্রম করিয়া যাইতে পারে। তাহারা এই সমস্ত কারামাত পাইয়া সন্তুষ্ট ও পরিতৃপ্ত হইয়াছে। আমি এই সমস্ত কারামাত চাই না। তুমি আমাকে ইহা হইতে রক্ষা কর।' অতঃপর তিনি পশ্চাৎদিকে মুখ ফিরাইয়া আমাকে দেখিতে পাইলেন এবং জিজ্ঞাসা করিলেন, 'হে ইয়াহইয়া! তুমি এখানে দাঁড়াইয়া আছ?' আমি বলিলাম, 'হাঁ, হে আমার ছরদার!" তিনি বলিলেন, 'কখন হইতে এখানে আছ?' আমি বলিলাম, 'অনেকক্ষণ ধরিয়া দাঁড়াইয়া আছি?' অতঃপর আমি বলিলাম, 'হযরত! আপনার এমন অবস্থার তাৎপর্য আমাকে বুঝাইয়া দিন।' তিনি বলিলেন, "যতটুকু তোমাকে বলার যোগ্য ততটুকু বলিতেছি, শোন। মহাপ্রভু আল্লাহতায়ালা আমাকে ঊর্ধ্ব জগত ও নিম্ন জগতের সর্বত্র ভ্রমণ করাইয়াছেন এবং আরশ ও সমস্ত আসমান ও বেহেশতসমূহে ঘুরাইয়া যাবতীয় কিছুই দেখাইলেন।
বিজ্ঞাপন
অবশেষে বলিলেন, বল! এখন তুমি কি চাও? এই সমুদয়ের যাহা কিছু তুমি পাইতে চাহিবে তাহাই তোমাকে প্রদান করিব। আমি নিবেদন করিলাম, আমি এ সমস্তের কিছুই চাই না। তখন আল্লাহতায়ালা বলিলেন, "সত্য সত্যই তুমি আমারই বান্দা।"
প্রকৃত খোদাপ্রেমিক আল্লাহ ছাড়া কিছুই বুঝেন না। ফলে আল্লাহপাক তদীয় আল ওদুদ (প্রেমময়) নামের নূরে তাহার ভিতর বাহির পরিপূর্ণ করিয়া দেন। আল্লাহপাকের খাছ হোব্ব-এশক-মহব্বতের ফয়েজ সেই খোদাপ্রেমিকের উপর অবিরাম পতিত হইতে থাকে। খোদাপ্রেমের নূরে দগ্ধ সাধককে খোদার সৃষ্ট সবকিছুই তাজিম করে। আগুনও তাহাকে খাতির করে। হযরত ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ্ (আঃ) ইহার জলন্ত প্রমাণ। নমরূদের প্রজ্জলিত অগ্নি ইব্রাহিম (আঃ) এর একটি পশমও পুড়াইতে পারে না।
"মুকাশাফাতুল কুলুব" নামক কিতাবে দেখা যায়ঃ জনৈক কৃপন ও মোনাফেক ব্যক্তির এক নেককার স্ত্রী ছিল। খোদার প্রেমে তার দেল পূর্ণ ছিল। প্রেম প্রভাবে সে নির্জনে অশ্রুপাত করিত। তাহার দানের হাত খুব বড় ছিল। দুয়ারে কোন ভিখারী আসিলে তাহাকে খালি হাতে যাইতে দিতেন না; কিছু না কিছু দান-খয়রাত অবশ্যই করিতেন। কিন্তু তাহার স্বামীতো ছিল বখিল, কৃপণ। স্ত্রীর এহেন দান-খয়রাত তাহার মোটেই বরদাস্ত হইত না। একদা স্বামী তাহার স্ত্রীকে রোষের সহিত বলিল, "তুমি যদি কোন মিছকিনকে আর দান-খয়রাত কর, তবে আমি তোমাকে তালাক দিব।" পরবর্তীতে কোন এক সময়ে একজন ভিখারী দ্বারে আসিয়া হাঁক ছাড়িয়া বলিল, "হে গৃহবাসী! আমাকে আল্লাহ ওয়াস্তে কিছু দান কর।" 'আল্লাহ' শব্দ শুনিয়া কোন আল্লাহপ্রেমিক কি স্থির থাকিতে পারে? সেই মহিলা তৎক্ষণাৎ তিনটি রুটি আনিয়া ফকিরকে দিলেন। রুটি লইয়া ভিখারী যাওয়ার সময় পথিমধ্যে দেখা হইল ঐ খোদাপ্রেমিক স্ত্রীর মোনাফেক ও কৃপণ স্বামীর সাথে। সে ফকিরকে জিজ্ঞাসা করিল, "তুমি রুটি কোথায় পাইলে?" ভিখারী লোকটিকে তাহার গৃহের কথা বলিলেন। ইহা শুনিয়া ঐ লোকটি অতিশয় রুষ্ট হইয়া গৃহে পৌছিয়াই স্ত্রীকে বলিল, "আমি কি তোমাকে বলি নাই যে, যদি তুমি পুনরায় দান-খয়রাত কর তবে তোমাকে তালাক দিব?" স্ত্রী বলিল, 'আমি আল্লাহর নামে দান-খয়রাত করিয়াছি।" ইহা শুনিয়া ক্রুদ্ধ স্বামী একটি গর্ত তৈরী করিল। গর্তে অগ্নি প্রজ্জলিত করিয়া স্ত্রীকে বলিল, 'তুই আল্লাহর নামে যেমন দান-খয়রাত করিয়াছিস, তেমনি আল্লাহর নামে এই অগ্নিকুন্ডের মধ্যে ঝাঁপ দে।" এই নির্দেশে খোদার প্রেমদগ্ধ স্ত্রীর মধ্যে কোন ভয় বা শংকা সৃষ্টি হইল না। তিনি দ্রুত গহনা ও অলংকারে সজ্জিতা হইয়া আগুনে ঝাঁপ দিতে প্রস্তুত হইলেন। মুনাফেক স্বামী স্ত্রীকে মূল্যবান গহনা-অলংকার খুলিয়া ফেলার নির্দেশ দিলে উত্তরে তিনি বলিলেন, "বন্ধু বন্ধুর জন্য সাজ-সজ্জা গ্রহণ করিয়া থাকে। এখন আমি আমার বন্ধুর সাক্ষাত লাভে ধন্য হইতে চলিয়াছি।" এই কথা বলিয়াই সে অগ্নি কুন্ডে ঝাঁপাইয়া পড়িলেন। মুনাফেক স্বামীতো ইহা দেখিয়া হতভম্ব।
লোক-জানাজানি হইতে পারে, এই ভয়ে সে তাড়াতাড়ি গর্তের মুখ ঢাকিয়া চলিয়া গেল। তিন দিন পর ফিরিয়া আসিয়া গর্তটি খুলিয়া দেখিল-তাহার স্ত্রী দিব্যি যেমন ছিল তেমনি সহি-সালামতে জীবিত আছে। এই দৃশ্য দেখিয়া সে বিস্ময়ে অভিভূত হইয়া পড়িল; এমন সময় অদৃশ্য হইতে একটি আওয়াজ ভাসিয়া আসিল, 'তুমি কি এই কথা বিশ্বাস কর না যে, অগ্নি আমার প্রিয়জনকে কখনও স্পর্শ করে না?'
প্রেমের কারণে খোদাপ্রেমিকের মর্যাদা কত অধিক হয় যে, অগ্নিও তাহাকে স্পর্শ করে না। খোদাপ্রেমিক যখন নির্জনে প্রেমের প্রভাবে, শুধু প্রেমেরই কারণে অঝরে কাঁদিয়া বুক ভাসায়, তখন আকাশের ফেরেশতাদের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। বেহেশতের লোভে নয়, দোযখের ভয়ে নয়, কেবলমাত্র প্রেমের প্রভাবে প্রেমিক বান্দা এমন করিয়া কাঁদিতে পারে, এমন অনুভূতিতো ফেরেশতাদের মধ্যে নাই। ফেরেশতাদেরকে ইবাদতের গুণ বা যোগ্যতা দেওয়া হইয়াছে, প্রেমের স্বাদ গ্রহণের কোন গুণ তাহাদেরকে দেওয়া হয় নাই; তাই প্রেমিক বান্দার ক্রন্দন দৃশ্য দেখিয়া তাহারা বিস্ময়ে অভিভূত হন। খোদাতায়ালাও ফেরেশতাদের মধ্যে সেই প্রেমিক বান্দাকে লইয়া গর্ব করেন। বলেন, 'দেখ হে ফেরেশতা সকল! আমার বান্দা দুনিয়া চায় না। বেহেশত চায় না। ১৮০০০ আলমও তাহাকে দিলে তাহাও সে গ্রহণ করে না। সে চায় শুধু আমাকে। আমারই সান্নিধ্যাকাংখায় অঝরে কাঁদে। তাই আমি তাহাকে ভালবাসি।'
হযরত সাররী সব্জী (রঃ) ছাহেব বলিয়াছেনঃ আগামীকাল কিয়ামতের মাঠে প্রত্যেক মানুষকে তাহার যুগের নবীর সহযোগে ডাকা হইবে।
যথাঃ হে অমুক! মুসা নবীর উম্মত, হে অমুক! ঈসা নবীর উম্মত, হে অমুক! মুহাম্মদ (সাঃ) এর উম্মত, ইত্যাদি। কিন্তু খোদাপ্রেমিকদের এমন সম্বোধনে আহবান করা হইবে না। তাঁহাদিগকে ডাকা হইবে-ইয়া আউলিয়া আল্লাহ! হে খোদা প্রেমিকগণ! তোমরা আল্লাহতায়ালার দরবারে আস! এরূপ স্নেহের আহবানে তাঁহাদের হৃদয় নিতান্ত প্রীত ও আনন্দিত হইবে।
খোদাপ্রেমিকদেরকে খোদাতায়ালা কিরূপ পুরস্কারে ভূষিত করেন-তাহা উপলব্ধির জন্য নিম্নের ঘটনাটি প্রণিধানযোগ্য। একদা হযরত যুনুন মিছরী (রঃ) ছাহেব মক্কা মোয়াজ্জামায় মসজিদে হারামের একটি স্তম্ভের নীচে একজন যুবককে দেখিলেন-নেহায়েত পীড়িত ও বিবস্ত্র অবস্থায় পড়িয়া আছে; তাহার বেদনা ভারাক্রান্ত অন্তর হইতে আহ্ আহ্ শব্দ বাহির হইতেছে। হযরত যুনুন (রঃ) ছাহেব বলিলেন, 'এমন অবস্থা দেখিয়া আমি তাহাকে ছালাম দিয়া তাহার পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলাম।' সে বলিল, 'আমি একজন মুসাফির আশেক। প্রেম পীড়িত হইয়া পথে পড়িয়া আছি।' তাহার উত্তর শুনিয়া আমি বিষয়টি উপলব্ধি করিয়া বলিলাম, 'আমিও তোমার মতই একজন।' ইহা শুনিয়া প্রেমদগ্ধ সাধক কাঁদিল। আমিও তাহার সাথে কাঁদিলাম। অতঃপর সে জিজ্ঞাসা করিল, 'তুমিও কি কাঁদিতেছ?' আমি বলিলাম, 'তোমার মত আমিও যে একজন মুসাফির প্রেমিক।' ইহা শুনিয়া সে আরও অধিক পরিমানে কাঁদিতে লাগিল এবং এই অবস্থাতেই হঠাৎ সজোরে চিৎকার দিয়া শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করিল, আশেক মাশুকের সান্নিধ্যে চলিয়া গেল। অতঃপর আমি কাপড় দিয়া তাহার শরীর আচ্ছাদিত করিয়া কাফন খরিদ করার জন্য বাজারে গমন করিলাম। বাজার হইতে কাফন আনিয়া দেখি যে, সে নাই। তখন আমি আশ্চর্যান্বিত হইয়া বলিলাম, সুবহানাল্লাহ! সে কোথায় গেল? এমন সময় আমার প্রতি এলহাম হইল-'হে যুনুন! সে এমন এক পথিক-যাহাকে শয়তান আক্রমণ করিতে চাহিয়াছে কিন্তু পারে নাই; তোমার সম্পদের কিয়দাংশ তাহাকে স্পর্শ করিতে চাহিয়াছে, তাহাও হয় নাই, রেদওয়ান ফেরেশতা তাহাকে জান্নাতে আহবান করিয়াছে; তাহাও সে প্রত্যাখ্যান করিয়াছে। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, 'এখন সে কোথায় আছে?' উত্তর আসিল,
فِي مَقْعَدِ صِدْقٍ عِنْدَ مَلِيْكَ مُقْتَدِرٍ -
অর্থাৎ-" যোগ্য আসনে, সর্বাধিপতি সম্রাটের সান্নিধ্যে।" (সূরা ক্বামারঃ ৫৫)
যে প্রেমের মূল্য এত বেশী, যে প্রেমের নূরে দগ্ধ সাধকের মর্যাদা আল্লাহতায়ালার দরবারে এত অধিক, সেই প্রেম অর্জনও অত্যন্ত কঠিন। প্রেম বা মহব্বতের পথ আরাম-আয়েশের নহে। সেই পথে শুধু কন্টক আর কন্টক। হাজার দুঃসাধ্য পরীক্ষা দিতে হয় এই পথে। এক ব্যক্তি রাসূলে পাক (সাঃ) এর সমীপে নিবেদন করিলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আপনাকে ভালবাসি।' তিনি বলিলেন, 'অভাব ও দরিদ্রতা কর্তৃক নিষ্পেষিত হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাক।' সেই ব্যক্তি আবার বলিলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আল্লাহতায়ালাকে ভালবাসি।' তখন হুযুর (সাঃ) বলিলেন, 'বিপদ-আপদ ও দুঃখ-কষ্ট সহ্য করার জন্য প্রস্তুত হও।'
তবে যে সকল সাধক প্রেম সমরে অবতীর্ণ হয়, তাহাদের উপর যত বিপদই আসুক না কেন, যত মুছিবতই আপতিত হউক না কেন, কোন কিছুতেই তাহারা পিছু হটেন না; প্রেমের মাল্য ছিনাইয়া আনিয়া তবেই যুদ্ধে ক্ষান্ত হন।
ফেরাউনের স্ত্রী বিবি আছিয়া (রাঃ) এর দেল খোদার এঙ্কের ফয়েযে ভরপুর ছিল; যদিও ফেরাউন নিজেই খোদা দাবী করিয়াছিল। বিবি আছিয়া (রাঃ)-এর ঈমান আনয়নের কথা দীর্ঘদিন যাবৎ ফেরাউনের নিকট গোপন ছিল। কিন্তু যখন প্রকাশ পাইল, ফেরাউন আছিয়ার উপর অত্যাচারের স্টীম রোলার চালনা শুরু করিল। বিচিত্র পদ্ধতিতে তাহাকে অত্যাচার করা হইত। অত্যাচারকালে ফেরাউন বলিত, 'হে আছিয়া! তুমি তোমার দ্বীনকে পরিত্যাগ কর।' কিন্তু বিবি আছিয়া বহু পূর্বেই ঈমানের বীজ নিজ দেলে রোপন করিয়াছেন। খোদার প্রেম নূরের সিঞ্চনে সে বীজ অংকুরিত হইয়া আজ বিশাল মহীরূহে পরিণত হইয়াছে। কাহার সাধ্য যে, সেই ঈমানবৃক্ষকে উড়াইয়া ফেলে? ফেরাউনের শত অত্যাচারেও বিবি আছিয়া (রাঃ) ঈমান পরিত্যাগ করিলেন না। ফেরাউনও নাছোড়বান্দা। সে অত্যাচারের মাত্রা আরও বাড়াইয়া দিল। একদা বিবি আছিয়ার (রাঃ) হাতে পায়ে পেরেক পুঁতিয়া অতঃপর ঈমান পরিত্যাগের জন্য তাহাকে নির্দেশ দেওয়া হইল। আছিয়া (রাঃ) এর উপর ফেরাউনের অত্যাচার যেমন চলিতেছিল, তেমনি আল্লাহতায়ালার এঙ্কের ফয়েযও তাহার উপর অবিরাম আসিতেছিল। তিনি পাষন্ড ফেরাউনকে বলিলেন, 'হে ফেরাউন! তুমি আমার শরীরের অংগ-প্রত্যংগের উপর ক্ষমতা প্রয়োগ করিতে পার; কিন্তু অন্তঃকরণতো আল্লাহর হাতে; সেখানে তুমি কোনরূপ অধিকার বা ক্ষমতা প্রয়োগ করিতে পারিবে না। জানিয়া রাখ, তুমি যদি আমার প্রতিটি অংগ-প্রত্যংগ কাটিয়া টুকরা টুকরা কর, তাহাতে আমার ঈমানে কোন প্রকার হ্রাস হওয়াতো দূরের কথা; বরং তাহা আরও বৃদ্ধি পাইবে।' এই সময় হযরত মুসা (আঃ) হযরত আছিয়া (রাঃ)-এর পার্শ্ব দিয়া পথ অতিক্রম করিতেছিলেন। তখন হযরত আছিয়া (রাঃ) তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেনঃ 'হে মুসা! আপনি বলুন, খোদা আমার প্রতি সন্তুষ্ট আছেন কি না?' হযরত মুসা (আঃ) বলিলেন, 'হে আছিয়া! আসমানের ফেরেশতাকুল আপনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করিতেছে এবং আল্লাহতায়ালা তাহাদের সম্মুখে আপনার বিষয়ে গৌরব করিতেছেন, আপনার যাহা মনোবাসনা আছে, আল্লাহর কাছে আপনি এখন তাহা প্রার্থনা করিতে পারেন, আল্লাহতায়ালা আপনার দু'আ কবুল করিবেন।' তখন আছিয়া দু'আ করিলেন। কুরআন পাকের ভাষায়ঃ
رَبِّ ابْنِ لِي عِنْدَكَ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ وَنَجِّنِي مِنْ فِرْعَوْنَ وَعَمَلِهِ وَ نَجِّنِي مِنَ الْقَوْمِ الظَّلِمِينَ
অর্থাৎ-"হে আমার পালন কর্তা! আপনার সন্নিকটে জান্নাতে আমার জন্যে একটি গৃহ নির্মাণ করুন, আমাকে ফেরাউন ও তাহার দুষ্কর্ম হইতে উদ্ধার করুন এবং আমাকে জালেম সম্প্রদায় হইতে মুক্তি দিন।" (সূরা তাহরীমঃ ১১)
এতক্ষণ প্রেম, প্রেম বা মহব্বতের স্বরূপ এবং আল্লাহর দরবারে খোদাপ্রেমিকদের মর্যাদা সম্পর্কে আলোকপাত করা হইল। খোদাতায়ালার প্রেম বা মহব্বতের গুরুত্ব সম্পর্কে নিশ্চয় তোমরা কিছু উপলব্ধি করিতে পারিয়াছ। তোমরা যাহারা খোদাতায়ালাকে চাও, সর্বাগ্রে দুনিয়ার মহব্বত দেল হইতে ঝাড়িয়া ফেল। অতঃপর তথায় প্রেমের বিছানা পাত। তবে খোদার মহব্বত তোমাদের দেলে পয়দা হইবে। আশেক কবি বলেন,
'যার তার কাছে আসে না সে,
বুক ভরা চায় ভালবাসা
বুক ভরা চায় ভালবাসা,
আর প্রাণ ভরা চায় প্রেমের নেশা।
যার তার কাছে আসে না সে,
বুক ভরা চায় ভালবাসা।"
তোমরা আল্লাহর প্রেম অর্জনে সফল হও। আল্লাহপাক তোমাদিগকে দয়া করুন। আমীন!







