Logo

পীরের আশীষে শরীয়ত ও সুন্নতের শেষ স্তরে পৌঁছাইতে পারিবে

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
৩ নভেম্বর, ২০২৬, ২২:২১
পীরের আশীষে শরীয়ত ও সুন্নতের শেষ স্তরে পৌঁছাইতে পারিবে
ছবি: জনবাণী।

হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘ইবাদত ও মহব্বত’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ ইবাদতের পরিচয়, খাঁটি ইবাদতের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য, যোগ্য আবেদ, মোহেব ও মাহবুবের বিভিন্ন হাল এবং ইবাদত ও মহব্বতের শেষের শেষ মাকামে পৌঁছানোর উপায় সম্পর্কে আলোচনাঃ

বিজ্ঞাপন

ইবাদত কি? ইবাদত আরবী শব্দ। ইহার মূলে আছে আবদুন শব্দ-যাহার অর্থ গোলাম, দাস বা বান্দা। কাজেই ইবাদতের আভিধানিক অর্থ দাঁড়ায়-গোলামী করা, দাসত্ব, আনুগত্য বা বন্দেগী করা। ইসলামী পরিভাষায় মহব্বতের সাথে, বিশুদ্ধচিত্তে, একাগ্র মনে মহান প্রতিপালক আল্লাহতায়ালার যাবতীয় আদেশ যথাযথ পালন করা এবং নিষিদ্ধ বা হারাম কাজ হইতে বিরত থাকাই ইবাদত। অর্থাৎ ইবাদত হইলঃ আল্লাহর আদেশ-নিষেধের সাজে নিজের জাহের ও বাতেনকে সজ্জিত করা।

পূর্বেই বলা হইয়াছে, খোদাপ্রাপ্তির দুইটি পথ-ইবাদত ও মহব্বত। আল্লাহপাক আমাদেরকে ইবাদতের জন্য বা দাসত্বের জন্যই সৃষ্টি করিয়াছেন। পাক কালামে বহু জায়গায় ইবাদতের নির্দেশ দিয়াছেন। ইরশাদ হইতেছে-

يَأَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمْ

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ-"হে মানবমন্ডলী! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ইবাদত কর।" (সূরা বাকারাঃ ২১) আল্লাহপাক আরও বলিতেছেন,

الا الله الدِّينُ الخَالِص.

অর্থাৎ- "মনে রাখিও, কেবলমাত্র বিশুদ্ধ ধর্মকর্মই আল্লাহতায়ালার জন্য।" (সূরা জুমারঃ ৩)

বিজ্ঞাপন

এখানে দুইটি আয়াত পাকের উল্লেখ করা হইল। প্রথমটিতে শুধু ইবাদতের (দাসত্বের) কথা বলা হইয়াছে। দ্বিতীয়টিতে বিশুদ্ধ বা খালেছ ইবাদতের কথা বলা হইয়াছে। বিশুদ্ধ বা খালেছ ইবাদত (দাসত্ব) কি? তাহা সর্বাগ্রে জানা প্রয়োজন। যে ইবাদত কেবলমাত্র খোদাতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য, খোদাতায়ালার রেজামন্দী লাভের জন্য নিবেদিত হয়; যেখানে শয়তানের প্রভাব থাকে না, নাফসের দখল থাকে না, অর্থাৎ যে দাসত্বে বা ইবাদতে আত্মতুষ্টি, লোক দেখানো মনোভাব, অহমিকা, সুনাম-সুখ্যাতি অর্জনের বাসনা, ব্যক্তিগত ইচ্ছার পরিপূরণ ইত্যাদি থাকে না, সেই ইবাদতই বিশুদ্ধ, সেই ইবাদতই হয় কবুলযোগ্য; কারণ তাহা সমর্পিত হয় আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে।

প্রত্যেকটি জিনিস বা বিষয়ের দুইটি অবস্থা আছে। একটি ছুরাত; অপরটি হকিকত। যেমন মানুষের ছুরাত আছে, আবার হকিকতও আছে। কাবার ছুরাত আছে, হকিকতও আছে। শরীয়তের ছুরাত আছে; আবার ইহার হকিকতও আছে। ঠিক তেমনি ইবাদত বা দাসত্বের দুইটি অবস্থা। যথাঃ ছুরাত ও হকিকত। বান্দার প্রতি যে দাসত্বের নির্দেশ আসিয়াছে, মানুষকে যে বন্দেগীর জন্য সৃষ্টি করা হইয়াছে তাহা হাকীকী ইবাদত; ছুরাতে ইবাদত নহে। কারণ হকীকী গুণ বর্জিত ছুরাতে ইবাদত নিবেদিত হয় নাফসের জন্য। নাফসই এখানে আবেদের মাবুদ হয়।

ইবাদতের মধ্যে কতকগুলি অত্যাবশ্যকীয়। যেমনঃ নামাজ, যাকাত, রোজা ও হজ্জ। এগুলো বান্দার জন্য বাধ্যতামূলক। এতদ্ব্যতীত একজন ঈমানদারের সমুদয় কর্মকান্ডই ইবাদতের মধ্যে পরিগণিত হয় যদি তাহার উদ্দেশ্য বা নিয়ত বিশুদ্ধ হয় তথা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভই একমাত্র উদ্দেশ্য হয়।

বিজ্ঞাপন

উদ্দেশ্য যদি আল্লাহ ভিন্ন অন্য কিছু হয় যাহা পূর্বে উল্লেখ করা হইল; যেমন রিয়া, আত্মতুষ্টি, কামনা-বাসনা ইত্যাদি তবে বান্দার সমুদয় কর্মকান্ডই দুনিয়াবী কাজের অন্তর্ভুক্ত হইবে। ফরজ ইবাদতও আর সেই ইবাদত থাকিবে না-যে ইবাদত বা দাসত্বের কথা আল্লাহ বলিয়াছেন।

ইবাদতের যে কোন একটি লইয়া চিন্তা করিলে উপরের তথ্য উপলব্ধি করা সহজ হইবে। ধরা যাক, নামাজ। নামাজ একটি ইবাদত। বরং ইহা সমস্ত ইবাদতের মূল। নামাজই শ্রেষ্ঠতম ইবাদত। ইবাদতের শাব্দিক অর্থ দাসত্ব করা, আনুগত্য করা। নামাজের মাধ্যমেই দাসত্ব ও আনুগত্যের পূর্ণ বিকাশ হয়। তাই রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন, "নামাজ হইল বিনয় ও আনুগত্যের মূর্ত প্রতীক।"

নামাজের মাধ্যমে খোদাতায়ালার সর্বাধিক নৈকট্য হাছিল হয়, খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান সিদ্ধ হয়, মেরাজ বা খোদার দীদার বা দর্শন মিলে। যে দাসত্বের জন্য মানুষ সৃষ্ট, সেই দাসত্বের পূর্ণ প্রতিফলন হয় নামাজের মাধ্যমে। অবশ্য ইহা নামাজের হকিকত; ছুরাত নহে।

বিজ্ঞাপন

নামাজি নামাজে দাঁড়ানোর সময়ে হলফ করিয়া বলে, "আমি মোশরেকদের অন্তর্ভুক্ত নহি।" কিন্তু যখনই নামাজ শুরু করে, তখনই তাহার মন ছুটাছুটি শুরু করে, দেলে অস্থিরতা শুরু হয়, দুনিয়াবী হাজার চিন্তা মনে ভীড় করে, কত বাল্য বন্ধুর স্মৃতি, মামলা মকদ্দমার কথা হৃদয়ে আসিয়া জমা হয়। যে খোদাতায়ালাকে সেজদা করার জন্য দাঁড়ানো হইল, তাহার কথাই আর স্মরণ থাকে না। ফলে মন ও মুখ এক থাকে না-যাহা নিঃসন্দেহে মোনাফেকী। কারণ মুখে বলা হয় "ইয়‍্যাকা না'বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তাইন"-অর্থাৎ আমরা তোমারই ইবাদত করি ও তোমারই সাহায্যপ্রার্থী, অথচ মনে থাকে গরু, ভেড়া, স্ত্রী, পুত্র, ব্যবসা বাণিজ্যের চিন্তা। কি ঘৃণ্য কথা! এস্থলেই মনে প্রশ্ন জাগে, এমন হয় কেন? মানুষতো নামাজে আল্লাহকে সেজদা করার জন্যই দাঁড়ায় কিন্তু এমনটি হয় কেন?

আসলে মানুষের শত্রু হইল নাফস ও শয়তান। এই শয়তান অতীব কৌশলে মানুষের হৃদয়ে ইবদাতরত অবস্থায় নানাবিধ চিন্তা প্রবেশ করায় এবং মানুষের মনকে আল্লাহর দিক হইতে নিজেদের দিকে ঘুরাইয়া রাখে; মানুষকে আল্লাহর দাসত্বের পরিবর্তে নিজেদের দাসত্বে আবদ্ধ রাখে। মানুষ বুঝিতেই পারে না যে, সে কি করিতে কি করিয়া ফেলে। আল্লাহকে সেজদা করিতে দাঁড়ায়, অথচ সেজদা করে খাহেশাতে নাফসকে। বান্দার আগোচরেই তাহার প্রভুত্বের আসন দখন করে নাফস। ইহারই ইশারা পাওয়া যায় কালামুল্লাহ শরীফে। আল্লাহ পাক বলেন,

أَفَرَعَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوُهُ وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَى

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ- "আপনি কি সেই ব্যক্তির অবস্থা দেখিয়াছেন, যে নিজ খাহেশাতে নাফসকে বা প্রবত্তিকে আপন মাবুদ সাব্যস্থ করিয়াছে? আর আল্লাহ তাহাকে জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও পথভ্রষ্ট করিয়া দিয়াছেন। (সূরা জাসিয়াহঃ ২৩)

কিন্তু এমন ইবাদতের জন্যতো মানুষকে আদেশ দেওয়া হয় নাই। আদেশ দেওয়া হইয়াছে বিশুদ্ধ ইবাদতের। আল্লাহপাক বলেন,

وَ مَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّيْنَ

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ- "আল্লাহতায়ালার প্রতি বিশুদ্ধচিত্তে একনিষ্ঠভাবে ইবাদত করুক-ইহা ভিন্ন তাহাদিগকে আর কোন আদেশ করা হয় নাই।" (সূরা বাইয়্যেনাহঃ ৫)

বিশুদ্ধ ইবাদত করিতে হইলে নাফসের দাসত্বের শৃংখলমুক্ত হওয়া প্রয়োজন; প্রয়োজন যাবতীয় শিরক হইতে নিজেকে মুক্ত করা। চার প্রকার শিরক আছে। নাফসে আম্মারা বা দায়েরায়ে এমকানে দুই ধরনের শিরক এবং বেলায়েতে ছোগরাতেও আছে দুই ধরনের শিরক। নাফসে আম্মারার প্লাটফর্মের শেরেকদ্বয়ের একটি হইল প্রকাশ্য; যেমন মূর্তিপূজা, অগ্নিপূজা ইত্যাদি এবং অপরটি হইল গুপ্ত শিরক যেমন নামাজে আজেবাজে কল্পনা করা।

বেলায়েতে ছোগরা স্তরে দুই ধরনের শিরক আছে।

বিজ্ঞাপন

প্রথমতঃ ঐ স্তরে উপনীত সাধকের উপর ছয় দিক বা দশ দিক হইতে আল্লাহপাকের নূরের কারেন্ট সদা প্রবাহিত থাকে। নূরের প্রবাহ ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়। ফলে সাধকের সাধারণ বুঝাবুঝির জ্ঞান লোপ পায়। সে নিজেকে এবং সমস্ত সৃষ্টজগতকে নূরে নিমজ্জিত দেখে। এক পর্যায়ে নূর হইতে আর সৃষ্টিকে পৃথক করিতে পারে না; এমনকি নিজের পৃথক অস্তিত্বও আর স্বীয় উপলব্ধিতে থাকে না। ফলে তাহার দৃষ্টিতে সৃষ্টি ও স্রষ্টা এক মনে হয়-যাহা ওয়াহদাতুল অজুদ' এর অবস্থা। এই যে সৃষ্টিকে স্রষ্টার অনুরূপ মনে করা-যাহা এক ধরনের শিরক।

দ্বিতীয়তঃ বেলায়েতে ছোগরার শেষ পর্যায়ে কিছু কিছু সাধক কর্তৃক আর এক ধরনের সূক্ষ্ম শিরক সংঘটিত হয়। বেলায়েতে ছোগরার শেষ প্রান্তে আকরাবিয়াতের নিম্নে আল্লাহতায়ালার অজুদ বর্তমান। অজুদ কি? আল্লাহতায়ালার জাত ছাড়াও মূল মারেফাত দফতরে বহু কামালাত আছে-সেই সমস্ত কামালাতের প্রতিবিম্ব আছে আকরাবিয়াতের নিম্নে। এই প্রতিবিম্বই অজুদ। অনেক সাধক এই অজুদকে জাত মনে করেন। ইহাও এক ধরনের সূক্ষ্ম শিরক।

এতদ্ব্যতীত আরও এক প্রকারের বিপদ সাধকের সম্মুখে থাকিয়া যায়। তাহা হইল দেহস্থিত আগুনের দুষ্ট স্বভাব। আগুন জড় উপাদান বিধায় ইহার কিছু জড়দোষ আছে। আগুন অন্যের চেয়ে নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করে। 'আনা খায়রুম' অর্থাৎ আমি শ্রেষ্ঠ-এর অনুভূতি আগুন হইতেই উৎপন্ন হয়। উক্তরূপ দোষ হইতেও পবিত্র হওয়া প্রয়োজন। নতুবা ইবাদতের হাকীকী পর্যায়ে উপনীত হওয়া সম্ভব নয়।

বিজ্ঞাপন

যে ইবাদতের জন্য আমরা সৃষ্ট সেই ইবাদত যথাযথ করিতে হইলে উল্লিখিত চার প্রকারের শিরক হইতে যেমন নিজেকে মুক্ত করিতে হইবে, তেমনি দেহের পবিত্রতাও অর্জন করিতে হইবে। তবেই খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান সিদ্ধ হইবে, খোদার দীদার নছিব হইবে; নতুবা নয়। আল্লাহপাক তাই বলেন,

فَمَنْ كَانَ يَرْجُوا لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلاً صَالِحًا وَ لَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا -

অর্থাৎ-“যে ব্যক্তি তাহার পালন কর্তার সহিত সাক্ষাতের এবং তদীয় দীদারের আশা রাখে, তাহার উচিত সে যেন নেক কাজ করে এবং তাহার পালন কর্তার ইবাদতে বা দাসত্বে কাহাকেও শরীক না করে।" (সূরা কাহাফঃ ১১০)

বিজ্ঞাপন

খোদাঅন্বেষী যখন মারেফাতের কেন্দ্র কামালাতে নবুয়তের মাকামে উপনীত হয়, তখন সে সর্ববিধ শেরেকী হইতে নিজেকে হেফাযতে রাখিতে পারে, দেহের পবিত্রতাও অর্জন করিতে পারে।

ইবাদতের হাকীকী পর্যায়ে চারটি মাকাম আছে। যথাঃ হকিকতে কুরআন, হকিকতে কাবা, হকিকতে সালাত এবং মাবুদিয়াতে সেরফা। ইহাদেরকে একত্রে "হকিকতে এলাহিয়া" বলা হয়। এই সকল মাকাম কামালাতের মাকামসমূহের ঊর্ধ্বে মহব্বতে ছানীর বিস্তৃত ক্ষেত্রে অবস্থিত যাহা ওজুদ মাওহুব লাহুর মাধ্যমে ছায়ের করিতে হয়। মাকাম সমূহের বিবরণ নসিহত সমূহের ৭ম খন্ড "আত্নদর্শনের পথে মাকাম-মঞ্জিল" নামক পুস্তকে দেওয়া হইয়াছে। প্রাসংগিক বিধায় এখানে দু একটি কথা বলিতেছি মাত্র।

হকিকতে কুরআনের দায়েরায় উপনীত সাধক কুরআন শরীফের পূর্ণ জ্ঞান অর্জনে সক্ষম হন। পাক কালামে তিন ধরনের অবস্থা বর্তমান।

★ আয়াতে বাইয়েনাত' বা আয়াতে মুহকামাতুন

★ আয়াতে মোতাশাবেহাত'। এবং

★ হরফে মোকাত্তায়াত।

পাক কালামে কিছু আয়াত আছে যে গুলির অর্থ স্পষ্ট, সাধারণ আলেমদের বোধগম্য। সেই সকল সহজবোধ্য আয়াতই 'আয়াতে বাইয়েনাত' নামে পরিচিত। পাক কালামে আরও বেশ কিছু আয়াত আছে যাহার অর্থ অস্পষ্ট, দুর্বোধ্য। উদাহরণ স্বরূপ দুই/একটি আয়াতপাক এখানে তুলিয়া ধরিতেছি। যেমন,

★ "আল্লাহ আসমান জমীনের নূর”। (সূরা নূরঃ ৩৫)

★ তিনি (আল্লাহ) তোমাদের সংগে আছেন যেখানে তোমরা থাক।" (সূরা হাদিদঃ আয়াত-৪)

★ "আমি মানুষের কন্ঠশিরা হইতেও অধিকতর নিকটবর্তী।" (সূরা ক্বাফঃ আয়াত-১৫)

★ "আমি তো তোমাদের মধ্যেই, তোমরা দেখ না কেন?” (সূরা জারিয়াতঃ আয়াত-২০)

উক্তরূপ বহু আয়াত পাক কালামে আছে যাহার অর্থ নিতান্তই দুর্বোধ্য। এই সকল আয়াতকে আয়াতে মোতাশাবেহাত বলে।

ইহা ছাড়াও কুরআন শরীফের বিভিন্ন সূরার প্রথমে কিছু কিছু হরফ আছে যেমনঃ আলিফ, লাম, মিম ইত্যাদি। সেই সকল হরফকে হরফে মোকাত্তায়াত বলে।

জাহেরা আলেম ওলামাদের নিকট আয়াতে মোতাশাবেহাত ও হরফে মোকাত্তায়াতের অর্থ বোধগম্য নহে। এলমে হুছুলী দ্বারা কুরআন শরীফের উক্ত দুই অধ্যায়ের জ্ঞান অর্জন সম্ভব নহে। যে সমস্ত সাধক হকিকতে কুরআনের মাকামে ছায়ের করিতে সক্ষম-তাহারাই পাক কুরআনের তিনটি অবস্থার জ্ঞানে জ্ঞানী, শুধু তাহাই নহে-হকিকতে কুরআনের মাকামে উন্নীত সাধক কুরআন তেলাওয়াত কালে বাতেনী চোখে স্পষ্ট দেখিতে পায় যে কুরআন শরীফের প্রত্যেক হরফ বা বাক্য থেকে খোদাতায়ালার সিফাতী নূর সাধকের উপর পড়িতেছে। সাধকের সমুদয় সত্ত্বা সেই নূরে ভাসিতেছে।

হকিকতে কুরআনের উপরে আছে হকিকতে কাবার মাকাম। পূর্বেই বলা হইয়াছে-প্রত্যেকটি জিনিসের দুইটি অবস্থা। কাবারও দুইটি অবস্থা আছে। যথাঃ কাবার ছুরাত ও হকিকত। মক্কা শরীফের যে কাবা-তাহা কাবার ছুরাত। কাবার হকিকত হইল জাতের ইতেবার বা সেরেফ নূরের পর্দা। কাবার হকিকতে যে সাধক পৌঁছাইতে পারেন তিনি দেখিতে পান যে সৃষ্টির প্রতি রেণু, প্রতি কণা হকিকতে কাবার দিকে সেজদা করিতেছে। সৃষ্টির হকিকত আছে হকিকতে মুহাম্মদীতে। ছুরাতে কাবা যেমন ছুরাতে মুহাম্মদীর সেজদার দিক; তেমনি হকিকতে কাবা হকিকতে মুহাম্মদীর সেজদার দিক। সমুদয় সৃষ্টির হকিকত হকিকতে মুহাম্মদীতে নিহিত বিধায়-কাবার হকিকত সমুদয় সৃষ্টির হকিকতেরও সেজদার দিক।

হকিকতে কাবার উপরে আছে হকিকতে সালাত। হকিকতে সালাতের মাকামে যে সাধক উপনীত হইতে পারেন, তাহার মধ্যেই দাসত্বের পূর্ণ বিকাশ হয়। এখানেই বিনীতভাব হৃদয়ে পূর্ণভাবে জন্মে। আল্লাহপাকের জাতি নূর সাধকের উপর এমনভাবে পতিত হয় যাহার উপমা নাই। এমন আনন্দ অনুভূতি জন্মে যাহার তুলনা নাই। সাধকের মনে হয়ঃ হকিকতে সালাত যেন নূরের তৈরী বিশাল এক গম্বুজ-যাহা অপর দুই হকিকত-হকিকতে কুরআন ও হকিকতে কাবাকে বেষ্টন করিয়া আছে এবং তিন হকিকত হইতে অবিরাম নূরের স্রোত তাহার সত্ত্বায় পড়িতেছে, তাহার সত্ত্বা জাতি নূরে পূর্ণ হইতেছে, মাথার চান্দি হইতে পায়ের তলা পর্যন্ত সমস্ত শরীরই নূরের এক পিন্ডে পরিণত হইতেছে। এমতাবস্থায় সাধক নূরের গম্বুজে থাকিয়া, নূরের সত্ত্বায়, বিগলিত প্রাণে, সমর্পিত আত্মায়, চরম একাগ্রতা ও একনিষ্ঠতায় খোদাতায়ালাকে সেজদা করে। এখানেই সাধকের সিদ্ধ হয় খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান। ইহার ঊর্ধ্বেই আছে মাবুদিয়াতে সেরফার মাকাম- যেখান হইতে ওজুদ মাওহুব লাহুর কুওতে নজরিয়ার মাধ্যমে জাতের অবর্ণনীয় দর্শন মিলে, দীদার নছিব হয়। হকিকতে কুরআন, হকিকতে কাবা, হকিকতে সালাতের মাকামে দাসত্বের বা ইবাদতের যথার্থতা সাধকের নছিব হয়, দাসত্বের বৈশিষ্ট্যসমূহ হাছিল হয়।

দাসত্বের বৈশিষ্ঠ্য কি কি? দাসত্বের বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ। যথাঃ-

★ নিজেকে নিকৃষ্ঠ দর্শন করা। সকলের চেয়ে নিজেকে ছোট মনে করা। এমন কি পথের চামড়া ছোলা কুকুরের চেয়েও নিজেকে ছোট মনে করা।

★ নিজের যাবতীয় ইবাদত ত্রুটিপূর্ণ মনে করা; কবুলিয়তের অযোগ্য মনে করা।

★ নেকীর আমলনামা শূন্য বলিয়া ধারণা করা।

★ নেকী লেখক ফেরেশতা বেকার বসিয়া আছে ধারণা করা। এবং

★ ইবাদতের অক্ষমতা প্রকাশ করা।

পূর্বের নসিহতে বলা হইয়াছে যে, ইবাদতের উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যসমূহ হকিকতে আহমদীর মাকামেও সিদ্ধ হয়। হকিকতে আহমদীর নিম্নে আছে হকিকতে মুহাম্মদীর দায়েরা। হকিকতে মুহাম্মদীতে প্রেমিকত্ব ও প্রেমাস্পদত্ব-উভয়ই থাকে। কিন্তু হকিকতে আহমদীতে তাহা থাকে না। “খোদাকে ভালবাসি"-এমন কথা হকিকতে আহমদীর মাকামস্থিত সাধক বলিতে পারেন না। তাহার মধ্যে পয়দা হয় ইবাদতের বৈশিষ্ট্য বা স্বভাব। তথা নিজেকে নিকৃষ্ট দর্শনের জ্ঞান এবং নিজের সমুদয় আমল কদর্যে পূর্ণ বলিয়া মনে হয়। এই অনুভূতি আল্লাহপাকের এক বিশেষ দান।

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব উল্লিখিত কারণেই হকিকতে আহমদীর মাকামকে হকিকতে এলাহিয়ার মাকামসমূহের সমপর্যায়ের বলিয়া তদীয় কিতাবে উল্লেখ করিয়াছেন। হকিকতে আহমদী হকিকতে মুহাম্মদীর উপরে। হকিকতে আহমদী; হকিকতে কুরআন, হকিকতে কাবা ও হকিকতে সালাতের সমমর্যাদার হওয়ায়-এই সমস্ত মাকাম হকিকতে মুহাম্মদীর উপরে। উল্লিখিত আলোচনা হইতে মহব্বতের সাথে ইবাদতের সম্পর্ক এবং মহব্বতের চেয়ে ইবাদতের শ্রেষ্ঠত্বেরও ইশারা মিলে। মূলতঃ ইবাদত ও মহব্বত-উভয় কারণেই মানুষ সৃষ্ট, উভয় পথই জাতের সান্নিধ্য প্রাপ্তির মাধ্যম। তবুও দাসত্বের (ইবাদতের) মাকামই যেন নৈকট্যের সর্বশেষ মাকাম।

পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, হকিকতে এলাহিয়ার দায়েরা সমূহ (যেখানে দাসত্বের গুণাগুণ হাসিল হয়) মহব্বতে ছানীর অধ্যায়ে অবস্থিত। কিন্তু মহব্বতে জাতি ছাড়া মহব্বতে ছানীতে পৌঁছানো যায় না। আবার মহব্বতে জাতি অর্জনের জন্যে প্রয়োজন শরীয়ত ও সুন্নতের অন্ততঃ চতুর্থ স্তরের জ্ঞান ও গুণ। যেখানে পৌঁছানোর জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে শরীয়তের যাবতীয় খুটিনাটি আমলও (ইবাদত) আদায় করা প্রয়োজন।

কাজেই বুঝা গেল, ইবাদত ব্যতীত মহব্বতে জাতি পয়দা হয় না। আবার মহব্বতে জাতি ছাড়া ইবাদতের শেষ মাকামে (মাকামে আন্দিয়াতে) পৌঁছানো যায় না। বৈদ্যুতিক বাল্ব জ্বালানোর জন্য বা টেলিভিশন চালানোর জন্য প্রয়োজন বিদ্যুতের। তেমনি খোদাপ্রাপ্তির জন্য প্রয়োজন চেষ্টা-সাধনার। বিদ্যুতে যেমন থাকিতে হয় পজিটিভ ও নেগেটিভ; তেমনি খোদাপ্রাপ্তির তপস্যাতেও থাকিতে হয় ইবাদত ও মহব্বত। পজিটিভ ও নেগেটিভ কারেন্টের সাহায্যে চালিত টেলিভিশনের পর্দায় যেমন ভাসিয়া উঠে মনোমুগ্ধকর দৃশ্যাবলী; তেমনি ইবাদত ও মহব্বতের যৌথ তপস্যার মাধ্যমে শেষের শেষ মাকামে তথা মাবুদিয়াতে সেরফা ও হোব্বে সেরফায় উপনীত সাধকের স্বীয় সত্ত্বায় ভাসিয়া উঠে মারেফাত রাজের অপূর্ব সিনারী। এমনকি নিজ সত্ত্বাতেই সাধক খুঁজিয়া পায় আপন মাবুদ পরওয়ারদিগারকে। আল্লাহপাক বলেন, "অফি আন ফুছেকুম আফালা তুছেরুন"- অর্থাৎ-আমিতো তোমাদের মধ্যেই আছি, তোমরা দেখ না কেন? এই আয়াতের মর্মার্থ সেই সাধক নিজের মধ্যেই খুঁজিয়া পায়। হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশ্বন্দ (রঃ) ছাহেব বলেন, "ওলী আল্লাহগণ ফানা ও বাকা প্রাপ্তির পর যাহা কিছু দর্শন করেন তাহা নিজের মধ্যেই করেন এবং যাহা পরিচয় পাইয়া থাকেন তাহাও নিজের মধ্যে। (মকতুব নং-৩০, প্রথম খন্ড; মকতুবাত শরীফ)

ইবাদত ও মহব্বতের পথে সর্বোচ্চ মাকামে উপনীত সাধকের দাসত্বের নমুনা সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা সিদ্দীকীন মর্তবার কোন এক ওলীকে এলহামযোগে জানাইয়াছিলেন যে, "আমার একদল বান্দা আছে যাহারা আমাকে চায়, আমিও তাহাদেরকে চাই; তাহারা আমার জন্য প্রেমবিহবল, আমিও তাহাদের জন্য প্রেমবিহবল; তাহারা আমাকে স্মরণ করে, আমিও তাহাদেরকে স্মরণ করি; তাহাদের চক্ষু আমাকে খোঁজে, আমার চক্ষু তাহাদেরকে খোঁজে, তুমি যদি তাহাদের পথ ধর, তাহা হইলে তুমিও আমার ভালবাসা পাইবে: আর যদি তাহাদের পথ এডাইয়া চল, তাহা হইলে আমার রোষানলে পতিত হইবে। উক্ত ওলী বলিলেন, 'হে আমার রব্ব! তাহাদের আলামত কি? আল্লাহপাক বলিলেন, তাহারা দিনের বেলায় ছায়াঘেরা স্থান খুঁজিয়া ফেরে, যেইভাবে কোন দয়ালু রাখাল তদীয় ছাগপালের দিকে দৃষ্টি রাখে; অধীর আগ্রহে সূর্যাস্তের অপেক্ষায় থাকে, যেভাবে পাখীরা সূর্যাস্তের সাথে সাথে আপন আপন বাসায় গমনের জন্য ব্যাকুল হইয়া ছুটে; যখন রাত নামে, চারিদিক অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়, সকলে আপন আপন জায়গায় আরামের বিছানা পাতে এবং প্রিয়-প্রিয়তমারা নির্জনতায় মিলিত হয়, তাহারা তখন আপন আপন পদযুগলের উপর দন্ডায়মান হয়, আমার সম্মুখে চেহারা ও মস্তক বিছাইয়া দেয়, আমাকে আমার "কালাম” পাঠ করিয়া শুনায়, আমার প্রদত্ত নেয়ামতের কথা প্রেমের ভংগিতে স্বীকার করে। তাহাদের মধ্যে এক নিদারুণ হালতের সৃষ্টি হয়; কাহারো অশ্রু ঝরে, কেউবা চিৎকার করিয়া কাঁদে, কাহারো বুক চিরিয়া 'আহ আহ' ধ্বনিত হইতে থাকে, কাহারো মুখ হইতে অভিমানমিশ্রিত অভিযোগ উত্থাপিত হয়। কেউবা দাঁড়ানো, কেউবা উপবিষ্ট, কেউবা রুকুতে, কেউবা সেজদায়। আমি উপলব্ধি করি যে আমার পাগলেরা আমার জন্য কত কষ্ট করিতেছে। আমার মহব্বতে কত কি ফরিয়াদ ও বেদনা প্রকাশ করিতেছে। 'ওদেরকে' আমি সর্ব প্রথম তিনটি পুরস্কার দান করিঃ

★ আমার নূরের একটি অংশ তাহাদের অন্তরে ঢালিয়া দেই; ফলে তাহারা সেই নূরের তারে আমার খোঁজ-খবর পায়, যেভাবে আমিও তাহাদের খোঁজ-খবর পাই।

★ সাত আসমান, সাত জমীন এবং তন্মধ্যস্থিত সবকিছুকেই যদি 'ওদের' মীযানে তুলিয়া দেওয়া হয়, 'ওদের' সম্মুখে ঐ সবকিছুই আমার কাছে অত্যন্ত তুচ্ছ লাগে। এবং

★ সর্বদা আমি তাহাদের প্রতি দৃষ্টিমান থাকি।

ইবাদত ও মহব্বতের অর্থাৎ দাসত্ব ও প্রেমের শেষের শেষ মাকামে পৌছানের উপায় কি? সেই জন্য প্রয়োজন রাসূল (সাঃ) এর আনুগত্য। রাসূল (সাঃ) এর আনুগত্য ও দাসত্ব হকিকতে আল্লাহর আনুগত্য ও দাসত্ব। এই ব্যাপারে কাহারো কোন সন্দেহ নাই। কালামুল্লাহ শরীফেও আল্লাহপাক বলেন,

إِنَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللَّهُ

অর্থাৎ-"যাহারা তোমার কাছে আনুগত্যের শপথ নেয়, তাহারা মূলতঃ আল্লাহর আনুগত্যের শপথ নেয়।" (সূরা ফাতহিঃ ১০)

পূর্বের নসিহতে রাসূলে পাক (সাঃ) এর অনুসরণ ও আনুগত্যের সাতটি স্তরের বিশ্লেষণ মূলক আলোচনা করা হইয়াছে। সেই বিশ্লেষণ হইতে বুঝা যায় যে, প্রথম স্তর ব্যতীত বাকী স্তরসমূহের যোগ্যতা অর্জন করার জন্য প্রয়োজন কামেল পীরের আনুগত্য ও তাবেদারী। পাক কালামেও ইহার ইশারা মিলে। এরশাদ হইতেছে,

ياَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُو اللَّهَ وَأَطِيعُو الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ.

অর্থাৎ-“ হে মুসলমানগণ! আল্লাহর তাবেদারী বা দাসত্ব কর, রাসূলের তাবেদারী কর এবং তোমাদের মধ্যে যাহারা উলিল-আমর (আদেশদাতা) তাহাদের তাবেদারী কর। (সূরা নেসাঃ ৫৯)

"উলিল আমর"-এর অর্থ ব্যাপক। বাদশাহ হইতে শুরু করিয়া যে কোন দলের দলপতি পর্যন্ত এই শব্দের আওতায় পড়ে। এতদ্ব্যতীত মোজতাহেদ আলেম, ওলামায়ে রাসেখ বা কামেল ওলী সকলও উক্ত 'উলিল-আমর' শব্দ দ্বারা নির্দেশিত হইতে পারে। তবে উক্ত আয়াতের 'উলিল-আমর'-এর অর্থে দেশের কোন বাদশাহ নয়, কোন রাজনৈতিক বা সামাজিক সংগঠনের দলপতি নয় বরং কামেল ওলীগণই অধিক প্রযোজ্য কারণ আল্লাহর তাবেদারী ও রাসূল (সাঃ) এর তাবেদারীর সংগে কামেল ওলীর তাবেদারীই অধিক নিকটবর্তী। কামেল পীর রাসূলের চরিত্রে চরিত্রবান। কামেল ওলী আল্লাহর চরিত্রে চরিত্রবান। কামেল ওলীর তাবেদারীতেই শরীয়ত ও সুন্নতের শেষের শেষ স্তরে পৌছানো যায়। উক্ত আয়াতে কামেল ওলীর তাবেদারীর প্রতিই নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে।

তাবেদারী বা গোলামী কেমন হওয়া উচিৎ সে সম্পর্কে নিম্নের ঘটনাটি উল্লেখযোগ্য। হযরত ইব্রাহিম আদহাম (রঃ) ছাহেব বলেন, একদা আমি একটি গোলাম খরিদ করিয়া আনিয়া তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, তোমার নাম কি? সে উত্তরে বলিল, আপনি আমাকে যে নামে ডাকেন, তাহাই আমার নাম হইবে। আমি পুনরায় প্রশ্ন করিলাম, তুমি কি খাও? সে বলিল, আপনি যাহা খাইতে দিবেন, তাহাই খাইব। আমি আবার জানিতে চাহিলাম, তুমি কেমন কাপড় পর? সে বলিল, আপনি যাহা পরাইবেন, তাহাই পরিব। আমি পুনরায় প্রশ্ন করিলাম, তুমি কি কাজ কর? সে এবারও বলিল, আপনি যাহা করিতে নির্দেশ দিবেন, তাহাই করিব। আবার জিজ্ঞাসা করিলাম? তোমার মন কি চায়? সে বলিল, কামনা-বাসনার সংগে গোলামের কি সম্পর্ক? হযরত ইব্রাহিম আদহাম (রঃ) ছাহেব বলেন যে, গোলামের উক্তরূপ উত্তর শুনিয়া আমি আমার নাফসকে বলিলাম, ওরে নিঃস্ব! তুই সারা জীবনে এক দিনের জন্যেও আল্লাহতায়ালার এইরূপ গোলামী করিতে পারিলি না। এমন দাসত্ব আমাকে গোলামের নিকট হইতেই শিক্ষা করা উচিৎ। অতঃপর তিনি রোদন করিতে করিতে বেহুশ হইয়া পড়িলেন।

উল্লিখিত ঘটনা হইতে দাসের দাসত্বের যথার্থ নমুনা খুঁজিয়া পাওয়া যায়। মূলতঃ দাসের বা গোলামের কোন ইচ্ছা অনিচ্ছা, কামনা-বাসনা থাকিতে নাই। এমন দাসত্বের গুণ অর্জনের জন্য প্রাথমিক ভাবে প্রয়োজন কামেল পীরের আনুগত্য; প্রয়োজন কামেলের সন্নিধানে এমনভাবে থাকা যেমন ধৌতকারীর হাতে মুর্দা থাকে। কামেল পীরের ইচ্ছায় নিজের ইচ্ছা, নিজের কামনা-বাসনা বিলীন করিতে হয়। ফলে কামেলের যথার্থ আনুগত্যের যোগ্যতা মুরীদের মধ্যে পয়দা হয়, যে আনুগত্য তাহাকে ফানা-ফিশ-শায়খের মাকামে উপনীত করে। ফানা-ফিশ-শেখের উপরে আছে ফানা-ফির-রাসূলের মোকাম। যেখানে পৌঁছাইলে মুরীদ রাসূলে পাক (সাঃ) এর খাঁটি আনুগত্য ও তাবেদারী করিতে সক্ষম হয়। ইহার উপরে আছে ফানাফিল্লাহ ও বাকাবিল্লাহর মাকাম-যেখানে পৌঁছাইলে খোদাতায়ালার দাসত্ব করার তথা ইবাদতের প্রকৃত গুণ দাসের মধ্যে পয়দা হয়।

হে জাকেরান সকল! তোমরা যদি খোদাতায়ালাকে চাও, যদি মারেফাতের শেষ মাকাম-মাকামে আবদিয়াতে পৌঁছাইতে চাও, যদি মাবুদিয়াতে সেরফা ও হোব্বে সেরফায় পৌঁছাইয়া সৌন্দর্যময় জাতের কৈফিয়তশূন্য দর্শন লাভে নিজেকে সার্থক করিতে চাও এবং অনাবিল শান্তির অধিকারী হইতে চাও, তবে আপন পীরের আনুগত্য কর, স্বীয় পীরের ইচ্ছায় নিজের ইচ্ছা লীন কর, পীরের সমীপে মুর্দা হও, তবে পীরের আশীষে শরীয়ত ও সুন্নতের শেষ স্তরে পৌঁছাইতে পারিবে। যাবতীয় শিরক থেকে নিজেকে পাক করিয়া খোদাতায়ালার যথার্থ দাসত্ব করার যোগ্যতা ও গুণ অর্জন করিতে পারিবে। আল্লাহপাক তোমাদিগকে দয়া করুন। আমীন।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD