মুজিববর্ষের দুইশ কোটি টাকা কায়কোবাদের পকেটে

গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. কায়কোবাদ আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। অভিযোগ উঠেছে, মুজিববর্ষ উদযাপনের প্রায় চারশ কোটি টাকার প্রকল্প থেকে দুইশ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন।
বিজ্ঞাপন
ভুয়া প্রাক্কলন, সিন্ডিকেট এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়া ব্যবহার করে কালো টাকার মালিক বনে গেছেন তিনি। নিজেকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দিতে তিনি এখন ১০ কোটি টাকার ঘুষ ‘বাজেট’ নিয়ে মাঠে নেমেছেন। এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার অতীতের নানা অনিয়মের তথ্য থাকা সত্ত্বেও তাকে পদোন্নতির দৌড়ে রাখায় প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান নিয়ে।
কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ: কায়কোবাদের দুর্নীতির পদ্ধতি সরাসরি টাকা লেনদেন নয় তিনি বেছে নিয়েছেন প্রকল্প ভিত্তিক ‘প্রাক্কলন’ দুর্নীতি। প্রকৃত কাজ না করেও বড় প্রকল্পের ভুয়া ফাইল বানিয়ে ইএম ডিভিশন-৭ সহ বিভিন্ন ডিভিশনে দায়িত্ব পালনকালে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প জাতীয় সংসদ ভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, গণভবন ইত্যাদি তদারকি করেছেন। এসব প্রকল্পে ঠিকাদার ও অফিসারদের সঙ্গে যোগসাজশে একাধিকবার সরকারি অর্থের অপচয় ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছে অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ সূত্র।
কায়েকবাদের সম্পদের উৎস: কায়েকবাদের দুর্নীতির পদ্ধতি খুবই প্রথাগত। বড় প্রকল্পের ভুয়া প্রাক্কলন তৈরি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। বিশেষ করে ইএম ডিভিশন-৭ এর দায়িত্বে থাকা অবস্থায় প্রকৃত কাজ না করে ভুয়া ফাইলের মাধ্যমে অর্থ বের করেছেন। তিনি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের জাতীয় সংসদ ভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, গণভবনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভবনের প্রকল্প পরিচালনায় যুক্ত ছিলেন। এ সময় কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সূত্র বলছে, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের প্রধান আশরাফুল আলমের হয়ে কোটি কোটি টাকার টেন্ডার আদায়ে সক্রিয় ছিলেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
গণপূর্ত ভবন সূত্র বলছে, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কায়েকবাদ, নির্বাহী প্রকৌশলী শফিউল হান্নান এবং উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী কল্যাণ কুন্ডু ছাড়া কেউ কাজ পেত না। তারা বাতিল হওয়া কাজগুলো বিভিন্ন ঠিকাদারিতে দিয়ে কমিশন আদায় করতেন।
মিরপুর সরকারি আবাসন প্রকল্প দুর্নীতি: কায়েকবাদের দুর্নীতির সবচেয়ে বড় উদাহরণ মিরপুর সরকারি আবাসিক ভবনের টেন্ডার থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া। তখনকার নির্বাহী প্রকৌশলী আমান উল্লাহ সরকারের সঙ্গে তার যোগসাজশে এ অনিয়ম হয়। স্থানীয় ঠিকাদার ও কর্মীরা জানায়, প্রকল্পের মানও ছিল নিম্নমানের, কিন্তু অর্থের লেনদেনের মাধ্যমে কায়েকবাদ এবং তার সহযোগীরা বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব: বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে। তবে গণপূর্তের কায়েকবাদর মত দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিলে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিজ্ঞাপন
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম কায়েকবাদর পদোন্নতি বিষয়ক ফাইল নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত। উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদদের চাপের মুখে তিনি কী সিদ্ধান্ত নেবেন, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক শঙ্কা রয়েছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কায়েকবাদ অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পেতে কমপক্ষে ১০ কোটি টাকা বাজেট নিয়ে মন্ত্রণালয়, দুদক ও গোয়েন্দা সংস্থায় চাপ সৃষ্টি করছেন। এজন্য তিনি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত উপদেষ্টার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মানবাধিকার কর্মীকে নিয়োগের ব্যবস্থা করছেন, যিনি উচ্চপদস্থদের সঙ্গে যোগাযোগের কাজ করবেন। তিনি ইতোমধ্যে প্রশাসনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের গলানোর জন্য সক্রিয় প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। এই দুর্নীতির চক্র ভেঙে ফেলা না গেলে সরকারের দুর্নীতি বিরোধী অভিযানের সফলতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
গণপূর্তের এক কর্মকর্তা বলেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরে দুর্নীতি ও অনিয়মের গভীরতা সহজে প্রমানিত হবে না। এর জন্য প্রয়োজন কঠোর তদন্ত, অবিলম্বে দুর্নীতি দমন কমিশন ও সরকারের উচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।
বিজ্ঞাপন
গণপূর্ত অধিদপ্তরের এক গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের অপর এক কর্মকর্তা বলেন, সরকারের উচিত, অবিলম্বে কায়েকবাদসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তদন্ত চালানো। পদোন্নতির প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা। দুর্নীতির জড়িত উচ্চপদস্থদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি। গণপূর্ত অধিদপ্তরের দুর্নীতির সংস্কৃতি পরিবর্তনে উদ্যোগ নেয়া। তিনি বলেন, মো. কায়েকবাদর দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, অবৈধ লেনদেন ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাজের স্বচ্ছতা ও সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। বর্তমানে তিনি অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি লাভের জন্য ১০ কোটি টাকার মিশন নিয়ে তৎপরতা চালাচ্ছেন, যা সরকারের দুর্নীতি বিরোধী অবস্থানের জন্য বড় এক কালো দাগ হয়ে থাকবে। সরকার এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থরা যদি এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেন, তবে জনগণের বিশ্বাস ক্ষুণ্ন হবে এবং দুর্নীতিমুক্ত একটি প্রশাসন প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন সার্থক হবে না।
এ ব্যাপারে গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. কায়কোবাদ সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি ফোন রিসিপ করেননি। এমন ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা ব্যর্থ, সাড়া মেলেনি।
এ বিষয় দুর্নীতি গবেষক ও বিশ্লেষক ড. সেলিনা হাসান বলেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরের এই ধরনের দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি ঘটায় না, বরং দেশের উন্নয়ন প্রকল্পের প্রতি জনমনের আস্থা কমিয়ে দেয়। দুর্নীতির এই চক্র ভেঙে না ফেলা গেলে জাতীয় উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। সরকারের উচিত, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা।
বিজ্ঞাপন
এ বিষয় প্রশাসন ও নীতি বিশেষজ্ঞ প্রফেসর মোহাম্মদ জামিল বলেন, দুর্নীতির মূল কারণ হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে প্রশাসনিক সংস্কৃতি পরিবর্তন না করলে দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব হবে না। দুর্নীতি দমন কমিশন ও অন্যান্য তদন্ত সংস্থাগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে।
এ বিষয় মানবাধিকার কর্মী ও প্রশাসনিক সংস্কারক আনিসুর রহমান বলেন, দুর্নীতি শুধু একটি সরকারি দপ্তরের সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় সমস্যা। এর মোকাবিলায় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে এবং প্রশাসনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া অত্যাবশ্যক।
এ বিষয় টিআইবি নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ভুয়া ভাউচার করে টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা দেওয়া জরুরি। এ বিষয় দুদকে তদন্ত করে পদক্ষেপ নিতে হবে। না হলে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা পার পেয়ে যাবে।
বিজ্ঞাপন








