আউটসোর্সিং নিয়োগে ডিপিডিসি’র এমডি’র পকেটে ১০ কোটি টাকা

নিয়োগ বিধিমালা ও সুপ্রিম কোর্টের সুস্পষ্ট নির্দেশনা উপেক্ষা করে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডে (ডিপিডিসি) রাজস্ব খাতে নিয়োগের নামে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মকর্তা নিয়োগের পাঁয়তারা চলছে এমন গুরুতর অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বি এম মিজানুল হাসানের বিরুদ্ধে।
বিজ্ঞাপন
এ ঘটনায় প্রকৌশলীরা দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন। দুদকের অভিযোগ ও ডিপিডিসির অভ্যন্তরীণ নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সংস্থাটির পরিচালনা পর্ষদের ৩৬০তম সভায় “আপাতত ব্যবস্থা” দেখিয়ে ৪০ জন জুন ডিপ্লোমা প্রকৌশলীকে ঠিকাদারের মাধ্যমে আউটসোর্সিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অথচ এসব পদ মূলত নিয়মিত ও রাজস্ব খাতভুক্ত কর্মকর্তা পদ যেখানে আউটসোর্সিংয়ের কোনো বৈধ সুযোগ নেই।
সচিব, সংস্থাপন মন্ত্রণালয় বনাম মোঃ আব্দুল হান্নান (৫৫ ডিএলআর (এডি) ২০০৩) মামলার রায়ে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ স্পষ্টভাবে বলেছেন “নিয়মিত বা রাজস্ব পদে অফ-দ্য-জব, অস্থায়ী বা অ্যাডহক ভিত্তিতে নিয়োগ আইনসম্মত নয়। এ ধরনের নিয়োগ সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদ ও নিয়োগ বিধিমালার পরিপন্থী এবং অবৈধ।” আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিপিডিসির বর্তমান সিদ্ধান্ত সরাসরি এই রায়ের অনুপাত সিদ্ধান্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। নিয়মিত পদ পূরণ করতে হলে অবশ্যই অনুমোদিত অর্গানোগ্রাম, নিয়োগ বিধি ও স্বচ্ছ প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
সরকার প্রণীত আউটসোর্সিং নীতিমালা ২০২৫ অনুযায়ী, গ্রেড-১৬ থেকে গ্রেড-২০ পর্যন্ত অফিসার ও ম্যানেজারিয়াল পদে আউটসোর্সিং করা যাবে না। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ও বিশেষায়িত সেবা সংশ্লিষ্ট কাজে আউটসোর্সিং নিষিদ্ধ।
বিজ্ঞাপন
ডিপিডিসির উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদ একটি কারিগরি, দায়িত্বশীল ও রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো-সংবেদনশীল পদ হওয়া সত্ত্বেও আউটসোর্সিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়াকে নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
ডিপিডিসি ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতির অভিযোগ, আউটসোর্সিংয়ের আড়ালে একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদার গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সমিতির হিসাব অনুযায়ী মাসিক বেতন ও নানা সুবিধা দিয়ে কয়েক বছরের চুক্তি সিধান্ত নেওয়া হয়। এই নিয়োগে ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুল হাসানের সঙ্গে ৪০ জন প্রকৌশলী নিয়োগ প্রত্যাশিদের জনপ্রতি ২৫ লাখ টাকা করে মোট ১০ কোটি টাকা চুক্তি বন্ধ হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই নিয়োগে ঘুষ লেনদেন ও অস্বচ্ছ খাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “স্থায়ী পদে নিয়োগ দিলে যেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকে, সেখানে আউটসোর্সিং মানেই নিয়োগের দোকান খোলা।”
বিজ্ঞাপন
ডিপিডিসির গ্রিড ও কার্যক্রম সম্প্রসারণের প্রেক্ষিতে ২০২৩ সালেই বিদ্যমান অর্গানোগ্রাম-২০১৩ পুনর্গঠনের জন্য কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটি ইতোমধ্যে বাস্তবসম্মত নতুন সেট-আপের সুপারিশও দিয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নতুন সেট-আপ অনুমোদনের পথে না গিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে আউটসোর্সিং বেছে নেওয়া হয়েছে, যাতে নিয়মিত নিয়োগ এড়িয়ে যাওয়া যায়।
এই সিদ্ধান্তে ডিপিডিসির ভেতরে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতির নেতারা বলছেন, এতে নিয়মিত কর্মকর্তারা বঞ্চিত হচ্ছেন, পদোন্নতি ও ক্যারিয়ার গ্রোথ থমকে যাচ্ছে, প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি দক্ষতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ছে, প্রশ্ন উঠছে জবাবদিহি নিয়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, নিয়মিত পদে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগের এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা ও প্রশাসনিক সংকট তৈরি করতে পারে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারির দাবি রাখে। সরকারি নীতিমালা ও বিদ্যুৎ খাতের স্বার্থ উপেক্ষা করে এই সিদ্ধান্ত কার স্বার্থে? বিষয়টি তদন্ত করে দেখার জন্য বিদ্যুৎ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিজ্ঞাপন
এ বিষয়ে ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বি এম মিজানুল হাসান বলেন, আমি ঘুষ খেয়েছি ভালো করেছি। আপনি জনসংযোগ বিভাগে যোগাযোগ করেন। এই বিষয় আর কিছু বলতে পারবো না।
এ বিষয় ডিপিডিসি’র ডিজিএম(জনসংযোগ) মো. শামীমুল হক বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিষয় আমার কিছু জানা নেই।
বিজ্ঞাপন
এ ব্যাপারে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এ ধরনের ঘটনা শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়; এটি প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও শাসনব্যবস্থার গভীর সংকটের প্রতিফলন। স্বাধীন ও প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত করতে হবে। তাহলে দুর্নীতিবাজ বের করা সম্ভব।








