শিকলবন্দী ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের মোবাইল ক্লিনিক

প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় অসুস্থ গরু-ছাগলকে জরুরি চিকিৎসা দিতে ২৪৬ কোটি টাকায় ক্রয় করা মোবাইল ভেটেরিনারি ক্লিনিক বা এমভিসি (ভ্রাম্যমাণ প্রাণিচিকিৎসা ক্লিনিক) এখন শিকলবন্দী। বিশ্বব্যাংকের অর্থ্যায়নে গাড়ি ক্রয় করে প্রকল্প অফিস। তবে শুরু থেকেই অভিযোগ রয়েছে অসুস্থ প্রাণীর চিকিৎসার জন্য গ্রামের পথে খুব একটা না ছুটলেও কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত কাজেই বা ভোগবিলাসীতায় এসব গাড়ির ব্যবহার বেশি হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প চলতি বছরের ৩০ জুন শেষ হয়েছে আর এ কারণেই গাড়ি গুলোর যথাযথ ব্যবহার না হয়ে শিকলবন্দী অবস্থায় পড়ে আছে। প্রকল্পের আওতায় গাড়ি ব্যবহারের জন্য গাড়ি চালক ও তেলসহ রক্ষণাবেক্ষণ খরচ সরবরাহ করা হতো। কিন্তু প্রকল্পের সাথে সাথে আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগকৃত গাড়ি চালকদের চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ায় মাঠ পর্যায়ে প্রাণী চিকিৎসায় পড়েছে ভাঁটা। তবে গত ১ জুলাই প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ক্রয়কৃত ৪৭৪টি মোবাইল ভেটেরিনারি ক্লিনিক (এমভিসি) টিওএন্ডই ভুক্ত করেছে সরকার।
মোবাইল ভেটেরিনারি ক্লিনিক বা এমভিসি (ভ্রাম্যমাণ প্রাণিচিকিৎসা ক্লিনিক) নামে পরিচিত এসব গাড়ি কেনা হয়েছে প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায়। কয়েক ধাপে দেশের ৪৭৪টি উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে গাড়ি দেওয়া হয়। প্রতিটি গাড়ি কিনতে গড়ে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫২ লাখ টাকা। গাড়ি ক্রয়ে এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা যাতে গাড়ি নিয়ে ঘুরে ঘুরে খামারিদের বাড়িতে বা খামারে গিয়ে অসুস্থ গরু-ছাগলকে চিকিৎসাসেবা দিতে পারেন। কিন্তু বর্তমানে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় সে কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছে এ সব বিষয়ে প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. মোস্তফা কামাল দৈনিক জনবাণী কে বলেন, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় গাড়িগুলো প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরকে বুঝিয়ে দিয়েছি। কর্তৃপক্ষ জনবল নিয়োগ দিলে গাড়িগুলো আবার সচল হবে ও প্রাণি সেবায় ভূমিকা রাখবে।
প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের মেয়াদ কয়েক দফায় বৃদ্ধি হলে গত ৩০ জুন শেষ হয় কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৩ মাস আগে গত ৩১ মার্চ মোবাইল ভেটেরিনারি ক্লিনিক বা এমভিসি চালকদের চাকরির মেয়াদ শেষ হয়। কিন্তু আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগকৃত গাড়ি চালকদের চাকরি শেষ হলেও মোবাইল ভেটেরিনারি ক্লিনিকের জন্য তেল ও রক্ষণাবেক্ষণ বরাদ্দ ছিল প্রকল্পটিতে। এখন প্রশ্ন উঠেছে গাড়ি চালক না থাকলেও এ বরাদ্দ কিভাবে ব্যবহার বা উত্তোলন হল? এসব প্রসঙ্গ নিয়ে সারাদেশের একের অধিক উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে দৈনিক জনবাণী।
বিজ্ঞাপন
কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার
ডা. বীরেন্দ্র নাথ রায় দৈনিক জনবাণী কে বলেন, প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প শেষ হওয়ায় তেল ও রক্ষণাবেক্ষণ বরাদ্দ না থাকায় মোবাইল ভেটেরিনারি ক্লিনিক ব্যবহার হচ্ছে না।
মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার
বিজ্ঞাপন
ডা. মো. দেলোয়ার হোসাইন দৈনিক জনবাণী কে বলেন, গাড়ি চালক না থাকায় মোবাইল ভেটেরিনারি ক্লিনিকটি বন্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। কর্তৃপক্ষ গাড়ি চালক দিলে গাড়িটি আবার সচল হবে।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলা ভেটেরিনারি সার্জন
ডা. শ্যামল কুমার চৌধুরী দৈনিক জনবাণী কে বলেন, গাড়িটি উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে রয়েছে, চালকসহ প্রয়োজনীয় তেল ও রক্ষণাবেক্ষণ বরাদ্দের অভাবে ব্যবহার হচ্ছে না।
বিজ্ঞাপন
লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা
ডা. মোছা. মৌসুমী আক্তার দৈনিক জনবাণী কে বলেন, গাড়িটি অচল হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে নিজ অর্থ্যায়নে সচল রেখেছি।
ফেনীর সোনাগাজী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. লেবু লাল দত্ত দৈনিক জনবাণী কে বলেন, প্রকল্প বন্ধ হওয়ায় দৈনিক মজুরি ভিত্তি ড্রাইভার নিয়োগ দিয়ে প্রান্তিক পর্যায়ে খামারিদের সেবা দিচ্ছি।
বিজ্ঞাপন
জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আতিকুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তাকে পাওয়া যায়নি তবে এ প্রসঙ্গে উপসহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (সম্প্রসারণ) মো: মন্জুরুল ইসলাম দৈনিক জনবাণী কে বলেন, প্রকল্প শেষ হওয়ায় গাড়িটি বন্ধ হয়ে পড়ে আছে মাঝেমধ্যে ইউএলও স্যার গাড়িটি চালান।
বাগেরহাটের রামপাল উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সুমন সরকার দৈনিক জনবাণী কে বলেন, এলডিডিপি প্রকল্প বন্ধ হওয়ায় জনবল ও বরাদ্দ না-থাকায় গাড়িটি বন্ধ হয়ে পড়ে আছে।
ভোলার চরফ্যাশন উপজেলায় প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. রাজন আলী দৈনিক জনবাণী কে বলেন, গাড়িটি নষ্ট হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য মাঝে মধ্যে স্টার্ট দিয়ে রাখি। বর্তমানে গাড়িটি ব্যবহার করতে পারছি না।
বিজ্ঞাপন
এ খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়নে ও প্রাণী সেবা প্রান্তিক খামারিদের দৌড় গোড়াই পৌঁছে দিতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ে মোবাইল
ভেটেরিনারি ক্লিনিক (এমভিসি) ক্রয় করে প্রকল্পটি কিন্তু বর্তমানে কার্য্যত এ সেবা কার্যক্রম শিকলবন্দী হয়ে পড়েছে। তবে এ প্রসঙ্গে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. শাহজামান খানের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তাকে পাওয়া যায়নি।
এদিকে দেশজুড়ে প্রাণিসম্পদ খাতে সেবা প্রদানকারী জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ও বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরিচালকগণ এবং দায়িত্বশীল কর্মকর্তাগণের গাড়ি না থাকায় মাঠপ্রশাসনের কর্মকাণ্ডে বিরুপ প্রভাব পড়ছে। কোন কোন জেলা অফিসগুলোতে ক্ষেত্র বিশেষ বহু পুরানো গাড়ি এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের একের অধিক পরিচালকদের গাড়ি না থাকায় প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে স্থবিরতা তৈরি হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
প্রাণিজাত পণ্যরে উৎপাদন বৃদ্ধি, মার্কেট লিংকেজ ও ভেলু চেইন সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ও মাঝারী খামারীদের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুকি ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ প্রাণিজ খাদ্য উৎপাদন এবং বেসরকারী উদ্যোক্তাগণের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে নির্ধারিত এলাকায় প্রাণিসম্পদ খাতে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি শুরু হয়ে দুই দফায় মেয়াদ বৃদ্ধি পেয়েছে চলতি বছরের ৩০ জুন শেষ হয়েছে। প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক ঋণ হিসেবে দিচ্ছে ৩ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা। বাকি ৪০০ কোটি টাকা দিয়েছে সরকার।
এ প্রসঙ্গে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: দেলোয়ার হোসেনের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি দৈনিক জনবাণী কে জানান, দেশের বাহিরে আছি পরে কথা বলবো।








