Logo

যে কারণে ছয় দিন পানির নিচে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১২ জুলাই, ২০২৬, ১৮:২৫
যে কারণে ছয় দিন পানির নিচে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ
ছবি: সংগৃহীত

টানা ভারী বর্ষণের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং বাস্তবায়ন না হওয়া উন্নয়ন পরিকল্পনার কারণে চট্টগ্রাম–কক্সবাজার রেলপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ টানা ছয় দিন পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে। এর ফলে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারগামী ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে হাজারো যাত্রীকে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু অতিবৃষ্টিই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী নয়। প্রায় আট বছর আগে শতকোটি টাকার পুনর্বাসন প্রকল্পে নিচু রেললাইন উঁচু না করা, প্রায় তিন দশক আগে প্রণীত ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়া, জলাধার ও খাল উন্নয়ন না করা এবং আশপাশের দুর্বল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সম্মিলিত প্রভাবেই রেলপথ দীর্ঘ সময় পানির নিচে আটকে রয়েছে।

মৌসুমি বায়ুর সক্রিয় প্রভাবে ৪ জুলাই থেকে চট্টগ্রামে ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত মঙ্গলবার দুপুরে নগরের সুন্নিয়া মাদ্রাসা থেকে শমসেরপাড়া পর্যন্ত প্রায় দেড় থেকে দুই ফুট পানি জমে রেললাইন তলিয়ে যায়। এরপর থেকেই কক্সবাজারমুখী ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

রেলওয়ে সূত্র জানায়, শনিবার পর্যন্ত সুন্নিয়া মাদ্রাসা এলাকার পানি নেমে গেলেও শমসেরপাড়ার প্রায় ২০০ মিটার রেললাইনে এখনো প্রায় ৯ ইঞ্চি পানি জমে ছিল। রেলওয়ের নিয়ম অনুযায়ী, পানির গভীরতা ৬ ইঞ্চির নিচে না নামা পর্যন্ত ওই পথে ট্রেন চালানো নিরাপদ নয়। এ কারণেই ট্রেন চলাচল পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়নি।

বিজ্ঞাপন

চট্টগ্রাম–কক্সবাজার রুটে প্রতিদিন চট্টগ্রাম থেকে দুটি এবং ঢাকা থেকে দুটি ট্রেন চলাচল করে। এসব ট্রেনে দৈনিক প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন। দীর্ঘদিন ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় পর্যটক, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী এবং নিয়মিত যাত্রীদের ভোগান্তি কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।

রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে এত দীর্ঘ সময় এই রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকার নজির নেই। এর আগে ২০২৪ সালের আগস্টে ফেনী অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যার সময় চার দিন ঢাকা–চট্টগ্রাম রেল যোগাযোগ বন্ধ ছিল। এছাড়া ২০২৩ সালে নির্মাণাধীন দোহাজারী–কক্সবাজার রেলপথের একটি অংশও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

রেলওয়ে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, নালা-নর্দমা নিয়মিত পরিষ্কার না করা, জলাশয় ও বিল ভরাট হয়ে যাওয়া, খালের প্রতিরোধ দেয়াল উঁচু করা, নতুন খাল না খনন এবং অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণের জন্য জলাধার নির্মাণ না হওয়ায় এবার বৃষ্টির পানি দ্রুত সরে যেতে পারেনি।

বিজ্ঞাপন

সরেজমিনে দেখা গেছে, সুন্নিয়া মাদ্রাসা এলাকার একটি নালা পরিষ্কার থাকলেও অন্যটি আগাছা ও ঝোপঝাড়ে প্রায় বন্ধ হয়ে রয়েছে। নাজিরপাড়া পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে একই চিত্র দেখা যায়। সিটি করপোরেশনের কর্মীরা নালা পরিষ্কারের কাজ করলেও তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

শমসেরপাড়া এলাকায় রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ট্রলির মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পরিদর্শন করতে দেখা গেছে। রেললাইনের একপাশে মাটির স্তূপ এবং অন্যপাশে জমে থাকা পানি পরিস্থিতির জটিলতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

রেলওয়ের বিভাগীয় প্রকৌশলী-১ আবু রাফি মোহাম্মদ ইমতিয়াজ হোছাইন জানিয়েছেন, এভাবে দীর্ঘ সময় রেললাইনে পানি আটকে থাকার ঘটনা আগে দেখা যায়নি। তাঁর ভাষ্য, এলাকাটি স্বাভাবিকভাবেই নিচু এবং একসময় আশপাশে থাকা বিল ও জলাশয়ের অনেকগুলো এখন ভরাট হয়ে গেছে। পাশাপাশি কোথাও কোথাও পর্যাপ্ত নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় পানি বের হওয়ার সুযোগ কমে গেছে। আপাতত ট্রেন চালু করতে ডুবে থাকা অংশ ৬ থেকে ১২ ইঞ্চি পর্যন্ত উঁচু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অতীতে কখনো এত দীর্ঘ সময় রেললাইনে পানি আটকে থাকতে দেখা যায়নি। নাজিরপাড়ার বাসিন্দা মো. নুরুল আবসার জানান, এবারের বৃষ্টিতে তাঁর বাড়িতে কোমরসমান পানি উঠেছিল এবং রেললাইনও পুরোপুরি তলিয়ে যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যার মূল কারণ বহু আগের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত ষোলশহর–দোহাজারী রেলপথের পুনর্বাসনে ২০১১ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে প্রায় ১৯৭ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। এর মধ্যে ষোলশহর–দোহাজারী অংশে ব্যয় হয় প্রায় ১১০ কোটি টাকা। তবে ওই প্রকল্পে নিচু অংশ উঁচু করা হয়নি।

পরবর্তীতে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) প্রকল্পের কাজের মান নিয়েও প্রশ্ন তোলে। তাদের মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়, প্রয়োজনীয় পরিমাণ ব্যালাস্ট ব্যবহার করা হয়নি, কিছু স্লিপারের মানও সন্তোষজনক ছিল না এবং প্রকল্পের উদ্দেশ্য পুরোপুরি অর্জিত হয়নি।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

রেলওয়ের কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, পূর্বের প্রকল্পে মূলত রেললাইন সংস্কারের কাজ হয়েছে, কিন্তু উচ্চতা বাড়ানোর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল না। বর্তমানে নতুন ডুয়েলগেজ প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত রেললাইন উন্নীত করা হবে এবং নিচু অংশগুলো প্রায় পাঁচ ফুট পর্যন্ত উঁচু করা হবে। প্রায় ১০ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকার এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে ভারী বর্ষণের সময়ও ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, ১৯৯৫ সালে প্রণীত চট্টগ্রাম নগরের ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনায় শমসেরপাড়া এলাকায় রেললাইনের সমান্তরালে নতুন খাল খনন এবং প্রায় ২০ হেক্টর এলাকায় অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি ধারণের জন্য জলাধার নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু প্রায় ৩০ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, নতুন খাল এবং জলাধার নির্মাণ করা হলে অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশন করা সম্ভব হতো। এতে শমসেরপাড়া রেললাইন এবং আশপাশের এলাকায় কয়েক দিন ধরে পানি আটকে থাকার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা অনেকটাই কমে যেত।

বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়ছে। তাই শুধু অস্থায়ী সংস্কার নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় রেললাইন উঁচু করা, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, নতুন খাল ও জলাধার নির্মাণ এবং নিয়মিত নালা-নর্দমা পরিষ্কার রাখার মতো পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের পরিস্থিতি বারবার সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD