পদোন্নতি তালিকা ঘিরে বিতর্ক, প্রশ্নে মুখে প্রশাসনের স্বচ্ছতা

সরকারের প্রথম বৃহৎ প্রশাসনিক পদোন্নতিকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষমতা গ্রহণের প্রায় পাঁচ মাস পর ১৭৯ জন উপসচিবকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হলেও সেই তালিকায় অবসরপ্রাপ্ত, সাময়িক বরখাস্ত এবং অতীতে বিভিন্ন কারণে বিতর্কে থাকা কয়েকজন কর্মকর্তার নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় প্রশাসনের পদোন্নতি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, যাচাই-বাছাই এবং জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আমলাদের মতে, প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের পদোন্নতির ক্ষেত্রে এমন ধরনের ত্রুটি অত্যন্ত অস্বাভাবিক। তাদের ভাষায়, বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক ভুল নয়; বরং এটি সরকারের ভাবমূর্তির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই কীভাবে এসব নাম চূড়ান্ত তালিকায় এসেছে, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই প্রশাসনে প্রথম বড় আকারের পদোন্নতি। গত ৯ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ১৭৯ জন উপসচিবকে যুগ্ম সচিব পদে উন্নীত করে। পদোন্নতিতে প্রধানত ২৫তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও দীর্ঘদিন পদোন্নতিবঞ্চিত আরও কয়েকটি ব্যাচের কর্মকর্তাও তালিকায় স্থান পান।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তবে প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পরপরই বিভিন্ন অসঙ্গতি সামনে আসতে শুরু করে। প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে কয়েকজন কর্মকর্তার নাম।
বিজ্ঞাপন
সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের উপসচিব মো. মাইনুল হক ভুঁইয়ার নাম। তিনি গত ৩০ জুন অবসরে গেলেও ৯ জুলাই প্রকাশিত পদোন্নতির তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। অবসরের পরও একজন কর্মকর্তার পদোন্নতির তালিকায় স্থান পাওয়ার ঘটনায় প্রশাসনের বিভিন্ন মহলে বিস্ময় দেখা দিয়েছে।
একইভাবে তালিকায় রয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৫-এর সাবেক আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা ছাদেকুর রহমানের নাম। রাজধানীতে কোরবানির বর্জ্য অপসারণে অবহেলার অভিযোগ ওঠার পর তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয় এবং পরবর্তীতে অসদাচরণের অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত করে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়। সেই তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই তিনি যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে।
এছাড়া বগুড়ার সাবেক জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলামের পদোন্নতিও আলোচনায় এসেছে। অতীতে তার প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়ে বিভিন্ন সময় সমালোচনা হলেও তিনি পদোন্নতির তালিকায় স্থান পেয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
আরেকটি আলোচিত নাম দুলাল চন্দ্র সূত্রধর। কিশোরগঞ্জে ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের অর্থ আত্মসাতের বহুল আলোচিত মামলায় তার নাম উঠে এসেছিল। যদিও ওই মামলার বিষয়ে এখনো আদালতের চূড়ান্ত রায় হয়নি এবং প্রশাসনিকভাবেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। তারপরও তার পদোন্নতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
প্রশাসনে উপসচিব থেকে সচিব পর্যায় পর্যন্ত পদোন্নতির ক্ষেত্রে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন এই বোর্ড সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন, কর্মদক্ষতা, জ্যেষ্ঠতা, বিভাগীয় মামলা, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, অবসর-সংক্রান্ত তথ্যসহ বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করে সুপারিশ করে। পরে সরকারের অনুমোদনের ভিত্তিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে।
এতগুলো ধাপ অতিক্রম করার পরও কীভাবে অবসরপ্রাপ্ত কিংবা বিতর্কিত কর্মকর্তাদের নাম তালিকায় যুক্ত হলো— এ প্রশ্ন এখন প্রশাসনের ভেতরেও আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিজ্ঞাপন
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদারের মতে, যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। এখানে অবসরপ্রাপ্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আওতায় থাকা কর্মকর্তার নাম চলে আসা স্বাভাবিক ভুল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তিনি অতীত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেন, নব্বইয়ের দশকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনকালে শত শত কর্মকর্তার পদোন্নতির কাজ সম্পন্ন হলেও এমন ধরনের ভুলের ঘটনা ঘটেনি। তার মতে, বর্তমানে দায়িত্বশীলতার ঘাটতি এবং যথাযথ যাচাই-বাছাই না হওয়ার কারণেই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
তার ভাষ্য, সরকারের উচ্চপর্যায়ের পক্ষে প্রতিটি কর্মকর্তার ব্যক্তিগত তথ্য আলাদাভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়। তবে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় যারা তথ্য যাচাই ও তালিকা প্রস্তুতের দায়িত্বে ছিলেন, তাদের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। কারণ জনগণ শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তকে সরকারের সিদ্ধান্ত হিসেবেই দেখবে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে কর্মকর্তাদের সব ধরনের তথ্য ডিজিটাল ডাটাবেজে সংরক্ষিত থাকে। ফলে অবসর, বিভাগীয় মামলা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপেক্ষিত হওয়ার বিষয়টি সহজ প্রশাসনিক ভুল হিসেবে ব্যাখ্যা করা কঠিন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি শুধু একটি পদোন্নতির তালিকার সীমাবদ্ধতা নয়; বরং প্রশাসনিক তথ্য ব্যবস্থাপনা, যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া এবং প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার বিষয়ও সামনে নিয়ে এসেছে। তাই কীভাবে এসব অসঙ্গতি ঘটেছে, তা তদন্ত করে দায়ীদের চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যতে এমন ভুল এড়াতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এদিকে পদোন্নতির তালিকা নিয়ে ওঠা বিভিন্ন প্রশ্নের বিষয়ে জানতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিজ্ঞাপন
বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের পদোন্নতি শুধু কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং জনআস্থার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে এ ধরনের বিতর্ক দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে নিষ্পত্তি করা হলে প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।








