Logo

মার্শাল আর্টের আড়ালে ‘উগ্রপন্থা’, বোমা তৈরির চেষ্টা

profile picture
বিশেষ প্রতিবেদক
১০ জুলাই, ২০২৬, ১৮:৩৪
মার্শাল আর্টের আড়ালে ‘উগ্রপন্থা’, বোমা তৈরির চেষ্টা
ছবি: সংগৃহীত

মার্শাল আর্ট শেখানোর আড়ালে দেশের বিভিন্ন এলাকায় তরুণদের উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধ করার অভিযোগে পরিচালিত একটি নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম (এফসিএস)-এর প্রধান প্রশিক্ষক শাহ আমানত সাবিরসহ ছয়জনকে সম্প্রতি গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।

বিজ্ঞাপন

ফাতাহ কমব্যাটের দাবি, তারা ‘বিশ্বের প্রথম মিউজিকমুক্ত ও শরিয়াভিত্তিক মার্শাল আর্ট’ সংগঠন। আর এই ‘খাঁটি তাওহীদবাদী’ সাজার আড়ালেই চলছিলো ডাকাতি আর উগ্রপন্থার চর্চা।

ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে এফসিএস-এর আদ্যোপান্ত।

এছাড়াও শাহ আমানত সাবিরের মোবাইল থেকে উদ্ধার হওয়া ২ মিনিট ২৩ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের।

বিজ্ঞাপন

ভিডিওতে দেখা যায়, গভীর রাতে নির্জন রাস্তায় সাবির ও তার সহযোগীরা একের পর এক বোমা বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে আর নেপথ্যে বাজছে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) প্রকাশ করা একটি রণসংগীত। বিস্ফোরণের পর সাবির ক্যামেরার দিকে ধারালো দা উঁচিয়ে ‘‘হে কুফফাররা’’ বলে হুমকি দেয় এবং ইউনূস নামে কাউকে প্রস্তুতির নির্দেশ দেয়। এছাড়া ভিডিওর অন্য অংশে সাবির ও তার সহযোগীদের কোরআনের আয়াত তিলাওয়াত করতে দেখা যায়।

এর আগে, একটি ইজিবাইক ছিনতাইয়ের সূত্র ধরে তদন্তে বেরিয়ে আসে নব্য ‘উগ্রপন্থি’ সংগঠন ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’ (এফসিএস) এর কর্মকান্ড মার্শাল আর্ট প্রতিযোগিতার নামে তহবিল সংগ্রহ করা এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা নিজেই অভিযুক্ত হয়েছেন ছিনতাইয়ের অভিযোগে। সম্প্রতি পাঁচ সহযোগীসহ ঢাকায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেমের প্রধান শাহ আমানত সাবির। বুধবার আদালত সাবির ও তার সহযোগী হোসাইন তানিমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দ্বিতীয় দফায় তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর দিয়েছেন। বাকি চারজনকে পাঠিয়েছেন কারাগারে। আগামী ১২ই জুলাইয়ের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলাম। সিটিটিসি ছাড়াও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসছে ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেমের কর্মকাণ্ড।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিশেষ একটি গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় পরিচালিত অভিযানে আটক ব্যক্তিদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসের প্রাথমিক ফরেনসিক বিশ্লেষণে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, এসব তথ্য নেটওয়ার্কটির কার্যক্রম সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

বিজ্ঞাপন

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, গত দুই মাসে শাহ আমানত সাবিরের নেতৃত্বে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে একাধিকবার ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) পরীক্ষামূলকভাবে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। তদন্তকারীদের দাবি, এসব পরীক্ষার ভিডিও বিদেশে পাঠানো হয়েছিল। এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদে সাবির এ ধরনের তথ্য দিয়েছেন বলেও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এছাড়া তদন্তে যশোর এলাকায় ধর্মীয় ব্যাখ্যার অপব্যবহার করে অমুসলিম নাগরিকদের পরিচালিত স্বর্ণের দোকানে ডাকাতির পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উঠে এসেছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি। বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।

তদন্তকারীদের মতে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সম্ভাব্য নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতিরও কিছু আলামত মিলেছে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করার কাজ চলছে। তাদের কাছ থেকে নেটওয়ার্কের অন্যান্য সদস্য, অর্থায়নের উৎস, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এবং সম্ভাব্য পরিকল্পনা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে তদন্তকারী সংস্থা।

বিজ্ঞাপন

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে উদ্ধার হওয়া ডিজিটাল তথ্য, ভিডিও এবং অন্যান্য আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষা চলছে। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রয়োজন হলে নতুন মামলাও দায়ের করা হতে পারে।

যেভাবে শুরু ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম

ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম সংগঠনটির তথ্যমতে, তাদের যাত্রা শুরু হয় চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে। এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান প্রশিক্ষক শাহ আমানত সা‌বির। নিজ জেলা খুলনা থেকে তিনি প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু করেন। অনলাইনে ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেমের একটি ওয়েবসাইট রয়েছে যেখানে ঠিকানা হিসেবে খুলনার ময়লাপোতা এলাকার ফরাজীপাড়ার লেনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমেও বেশ সক্রিয় ছিল সংগঠনটি।

বিজ্ঞাপন

নিজেদের পরিচয় দিতে গিয়ে সংগঠনটি বলছে, তারা ‘বিশ্বের প্রথম শিরকমুক্ত, কুফরমুক্ত, মিউজিকমুক্ত এবং পরিপূর্ণ শরিয়াহভিত্তিক ইসলামী মার্শাল আর্ট’ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। তাদের লক্ষ্য কেবল একজন দক্ষ প্রশিক্ষণার্থী তৈরি করা নয়; বরং এমন আত্মবিশ্বাসী, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও দায়িত্বশীল মুসলিম গড়ে তোলা, যিনি প্রয়োজনে শরিয়াহর নির্দেশনা মেনে নিজের, পরিবারের এবং নিরপরাধ মানুষের আত্মরক্ষা করতে সক্ষম,’ ফেসবুকে পেজের পোস্টে এমনটাই উল্লেখ করেছে ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম।

তহবিল সংগ্রহে ছিনতাই

গত বছরের ১৬ই সেপ্টেম্বর রাত ১১টার দিকে যশোরের কোতয়ালী থানার নওয়াপাড়া ইউয়িনের মধুগ্রাম এলাকা থেকে কমল বিশ্বাস নামে এক ইজিবাইক চালকের নগদ ১০ হাজার ৩০০ টাকা এবং পৌনে ৩ লাখ টাকা দামের ইজিবাইক ছিনিয়ে নেন সাবির ও তার সঙ্গীরা। সেসময় সাবিরের পরিচয় জানতেন না কমল। ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে রাশেদ নামে একজনকে সন্দেহ করেছিলেন তিনি। তবে রাশেদের ভাই ফয়সাল হুমকি দেওয়ায় থানা-পুলিশের কাছে যাওয়ার সাহস করেননি। পরে ওই বছরেরই ১০ই নভেম্বর এ বিষয়ে যশোরের কোতয়ালী থানায় জিডি করেন। ৫ই জুলাই সাবির ও তার সঙ্গীরা ঢাকায় গ্রেপ্তার হলে পত্রিকায় প্রকাশিত ছবি দেখে সাবিরকে চিনতে পারেন তিনি কমল। ৭ জুলাই কমল বিশ্বাস যশোরের কোতয়ালী থানায় এ বিষয়ে একটি মামলাও করেছেন। ঢাকা মহানগর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সাবির ও তার সঙ্গীরা নগদ টাকা ও ইজিবাইক ছিনিয়ে নেওয়ার কথাও স্বীকার করেছেন।

বিজ্ঞাপন

সাবিরের বিরুদ্ধে আরও এক মামলা

পুলিশের সাথে ‘মারমুখি’ আচরণের অভিযোগে ২০২৫ সালের ৯ই মার্চ খুলনার সোনাডাঙ্গা থানার শিববাড়ির মোড় এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন সাবির। এ সময় সাব্বির আহমেদ সাকিব নামে এফসিএস’র এক কর্মীও গ্রেফতার হন। সোনাডাঙ্গা থানায় দায়ের হওয়া ওই মামলায় পরদিন (১০ই মার্চ) সাবির ও সাকিবকে আদালতে হাজির করা হলে তাদের কারাগারে পাঠানোর হয়। পরে জামিনে বেরিয়ে যান তারা।

কে এই শাহ আমানত সাবির

বিজ্ঞাপন

২০১৮ থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ন্যাশনাল স্কুল অফ বুত্থান মার্শাল আর্টস এর খুলনা শাখা পরিচালনার সাথে যুক্ত ছিলেন সাবির। এটি বাংলাদেশ বুত্থান অ্যাসোসিয়েশনের অনুমোদিত সংগঠন। প্রশিক্ষণের নিয়ম-নীতি নিয়ে মতবিরোধ হওয়ায় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে পদত্যাগ করেন সাবির। সাবিরের গ্রামের বাড়ি খুলনার ডুমুরিয়া থানার চেচুড়ী গ্রামে। খুলনা সদরে গল্লামারি দারোগা রোডে এক ব্যক্তির বাসায় ভাড়া থাকতেন। এছাড়া ঢাকার বাড্ডার আরও একটি ঠিকানা ব্যবহার করেন সাবির।

সাবিরের সহযোগী এনসিপি নেতা

পাঁচই জুলাই সাবিরের সাথে গ্রেপ্তার হওয়া পাঁচ সহযোগীর একজন ছিলেন আতাউল্লাহ শাহ। যিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) গাজীপুর মহানগর কমিটির যুগ্ম সদস্যসচিব হিসাবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তবে গ্রেপ্তারের পর তাকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে তার দল। মঙ্গলবার এনসিপি'র দপ্তর সেলের সদস্য সাদিয়া ফারজানা দিনা স্বাক্ষরিত নোটিশে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ঢাকায় গ্রেফতার যেভাবে

খুলনা থেকে শুরু করলেও গত ছয় মাসে সংগঠনটির কার্যক্রম যশোর এবং ঢাকাতেও ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে যশোরের সদর এবং অভয়নগর উপজেলায় তাদের তিনটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে বলে ফেসবুকে পেজে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও পুলিশ বলছে, খুলনার বাইরে তারা বিভিন্ন নির্জন খোলা জায়গায় প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। সেই ধারাবাহিকতায় চলতি সপ্তাহের শুরুতে ঢাকায় রমনা পার্কে এ ধরনের একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আয়োজনের চেষ্টা করে সংগঠনটি। কিন্তু শেষপর্যন্ত সেটাতে সফল না হয়ে পরে যাত্রাবাড়ীর কোনাপাড়া এলাকার একটি মাঠে প্রশিক্ষণের স্থান নির্ধারণ করে ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম। গত ৫ জুলাই ভোরে প্রশিক্ষণ শুরু সময় সেখান থেকে প্রশিক্ষকসহ ছয়জন তরুণকে গ্রেফতার করে পুলিশ। যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ জানায়, ‘আমাদের কাছে তথ্য ছিল যে, তারা ওইদিন ভোরে বালুর মাঠে প্রশিক্ষণ শুরু করছে। খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে পৌঁছালে তারা পালানোর চেষ্টা করলেও আমরা ধরে ফেলি।

স্থানীয় উপকরণে বোমা তৈরির চেষ্টা

বিজ্ঞাপন

স্থানীয়ভাবে উপকরণ সংগ্রহ করে তারা বোমা তৈরির চেষ্টা করছিল বলেও দাবি করেছে পুলিশ। পুলিশ সূত্র বলছে, ‘বোমা তৈরির পর পরীক্ষামূলকভাবে সেটি বিস্ফোরণ করা হচ্ছে-এমন একটা ভিডিও আমরা পেয়েছি।’ জিজ্ঞাসাবাদে ‘পটকার বারুদ’ দিয়ে হাত বোমা এবং পেট্রোল দিয়ে ‘পেট্রোল বোমা’ বানানোর চেষ্টার কথা তারা স্বীকার করেছে বলেও পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। তবে বিদেশি উগ্রপন্থি কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে এফসিএসের যোগাযোগ ছিল কিনা, বা তাদের হয়ে সদস্য সংগ্রহ করছিল কিনা, সেটি এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি কর্মকর্তারা।

এদিকে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ক্রীড়া বা আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণের আড়ালে উগ্রবাদী মতাদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। তবে তারা একই সঙ্গে জোর দিয়ে বলেছেন, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয় এবং সব অভিযোগ যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় যাচাই হওয়া প্রয়োজন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নেটওয়ার্কটির কার্যক্রম, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক সংযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে নতুন তথ্য প্রকাশ করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD