Logo

ঢাকার পাশে ভূমিকম্পের উৎপত্তি, কতটা বাড়ছে দুর্যোগের আশঙ্কা?

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১১ জুলাই, ২০২৬, ১৯:১১
ঢাকার পাশে ভূমিকম্পের উৎপত্তি, কতটা বাড়ছে দুর্যোগের আশঙ্কা?
ছবি: সংগৃহীত

সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় একাধিক ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল শনাক্ত হওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্পের মাত্রা তুলনামূলক কম হলেও উৎপত্তিস্থল রাজধানীর এত কাছে হওয়া ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা বহন করছে।

বিজ্ঞাপন

তারা বলছেন, ঢাকার ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে শক্তিশালী কোনো ভূমিকম্প আঘাত হানলে দেশের সবচেয়ে বড় মানবিক ও অবকাঠামোগত বিপর্যয় ঘটতে পারে।

সম্প্রতি ২২ জুন রিখটার স্কেলে ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যার উৎপত্তিস্থল ছিল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে—ঢাকার ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরে। এর কয়েক সপ্তাহ আগে ২৬ মে ময়মনসিংহের ভালুকাকে কেন্দ্র করে আরেকটি মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যার উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে প্রায় ৬১ কিলোমিটার দূরে। এরও আগে গত বছরের ২১ নভেম্বর ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর মাধবদী, যা রাজধানী থেকে মাত্র ১৩ কিলোমিটার দূরে।

ক্রমাগত ঢাকার আশপাশে ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল শনাক্ত হওয়ায় ভূতত্ত্ববিদ, নগর পরিকল্পনাবিদ ও দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টিকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। এখনই প্রস্তুতি, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে বড় ধরনের দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ভয়াবহ হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

বাড়ছে ভূমিকম্পের সংখ্যা

সাম্প্রতিক বছরগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ভূমিকম্পের সংখ্যা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২১ সালে ২৭টি, ২০২২ সালে ১৯টি, ২০২৩ সালে ৩৫টি এবং ২০২৪ সালে ৫৪টি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়। চলতি বছরও অল্প সময়ের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে, যার কয়েকটির উৎপত্তিস্থল ছিল রাজধানীর খুব কাছাকাছি।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্পের সংখ্যা বৃদ্ধি মানেই বড় ভূমিকম্প আসন্ন—এমন নয়। তবে টেকটোনিক প্লেটে দীর্ঘদিন ধরে শক্তি জমা হওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে ছোট ছোট কম্পনকে গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

কী বলছেন ভূতত্ত্ববিদরা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতারের মতে, বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন ফল্ট লাইনে দীর্ঘদিন ধরে ভূ-অভ্যন্তরীণ শক্তি জমা হচ্ছে।

তার ভাষ্য, বাংলাদেশের জন্য দুটি বড় ভূমিকম্প উৎস রয়েছে। একটি হলো ডাউকি ফল্ট, যা শেরপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট ও জৈন্তাপুর অঞ্চলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। অন্যটি সিলেট থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত প্লেট সীমান্ত, যেখানে ভূত্বকের চাপ ক্রমাগত বাড়ছে।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, এসব এলাকায় ছোট ছোট ভূমিকম্প মূলত জমে থাকা শক্তির বহিঃপ্রকাশ। তবে বড় অংশের শক্তি যদি একসঙ্গে মুক্তি পায়, তাহলে ৮ মাত্রারও বেশি শক্তিশালী ভূমিকম্প ঘটার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তার মতে, বাংলাদেশের সাবডাকশন জোনে ৮ দশমিক ২ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প ঘটানোর মতো শক্তি জমা রয়েছে। এর মাত্র ৬০ শতাংশ শক্তিও যদি একবারে নির্গত হয়, তাহলে প্রায় ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে।

কেন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ঢাকা

বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু উৎপত্তিস্থল নয়, নগর পরিকল্পনার দুর্বলতাও ঢাকাকে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ শহরে পরিণত করেছে।

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, রাজধানীর বিপুলসংখ্যক ভবন নির্মাণে জাতীয় বিল্ডিং কোড যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে নকশা অনুমোদন পেলেও কাঠামোগত নিরাপত্তা যথাযথভাবে যাচাই হয়নি।

তার মতে, বিগত দুই দশকে জলাভূমি ও নিচু এলাকা ভরাট করে যেসব আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা গড়ে উঠেছে, সেগুলো ভূমিকম্পের সময় আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ এসব এলাকায় মাটির 'লিকুইফ্যাকশন' এবং কম্পনের 'অ্যামপ্লিফিকেশন' হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

বিজ্ঞাপন

তিনি পূর্বাচল, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, জলসিঁড়ি প্রকল্প এবং মিরপুরের সম্প্রসারিত অংশকে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

ড. আদিল মুহাম্মদ খানের মতে, ঢাকার কাছাকাছি অগভীর কেন্দ্রে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে তা ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। সে ক্ষেত্রে শুধু আবাসিক ভবন নয়, হাসপাতাল, স্কুল, ফায়ার সার্ভিস ও অন্যান্য জরুরি সেবার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ঝুঁকিতে ভবনের বড় অংশ

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারীর মতে, দেশে ভূমিকম্পের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ভবনগুলোর নিরাপত্তাহীনতা।

তার ভাষ্য, দেশে আনুমানিক ৩০ থেকে ৪৫ শতাংশ ভবন কোনো না কোনোভাবে ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও অনেক সময় বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হয় না। আবার পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোরও প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন ও সংস্কার করা হচ্ছে না।

তিনি বলেন, ঢাকা শহরের প্রতিটি ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা ধাপে ধাপে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নতুন ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

তার মতে, বড় ধরনের ভূমিকম্পে মানুষের মৃত্যুর প্রধান কারণ ভবন ধসে পড়া। তাই ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এখনই জরুরি।

সচেতনতা ও মহড়ার ওপর জোর

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব যথাযথ প্রস্তুতির মাধ্যমে।

বিজ্ঞাপন

তাদের মতে— নিয়মিত ভূমিকম্প মহড়া আয়োজন করতে হবে; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস ও আবাসিক এলাকায় সচেতনতা বাড়াতে হবে; প্রতিটি ওয়ার্ডে নিরাপদ খোলা স্থান নিশ্চিত করতে হবে; মানুষকে জানতে হবে ভূমিকম্পের সময় কী করতে হবে এবং কী করা যাবে না এবং স্মার্টফোনভিত্তিক দুর্যোগ প্রস্তুতি বিষয়ক অ্যাপ ও প্রশিক্ষণ চালু করা যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আতঙ্ক নয়; সঠিক প্রস্তুতিই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরক্ষা।

সরকারের প্রস্তুতি

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর জানিয়েছে, ভূমিকম্পসহ নগর দুর্যোগ মোকাবিলায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। রাজধানীতে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুতের কার্যক্রম চলছে।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে ৪৩ হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবকের তথ্যভান্ডার তৈরি করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এই সংখ্যা এক লাখে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

আরও পড়ুন

এ ছাড়া ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় মোট ৪৪৫টি নিরাপদ আশ্রয়স্থল চিহ্নিত করা হয়েছে। দুর্যোগের সময় এসব স্থান অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে।

দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উদ্ধার সরঞ্জামের তালিকাও প্রস্তুত করা হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিস, সশস্ত্র বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর চার হাজারের বেশি উদ্ধার সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, দেশের প্রতিটি বিভাগেই ভূমিকম্প মোকাবিলায় বিশেষায়িত উদ্ধার দল রয়েছে। ঢাকার জন্য আলাদা বিশেষ টিম নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও মহড়া পরিচালনা করছে। তবে পুরান ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় উদ্ধার অভিযান সবসময়ই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিকল্প নেই

বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল উদ্ধার সরঞ্জাম বা মহড়া যথেষ্ট নয়। ভবিষ্যতের বড় বিপর্যয় এড়াতে এখনই নগর পরিকল্পনা, বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্তকরণ, উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

তাদের মতে, ঢাকার আশপাশে সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলোর উৎপত্তিস্থল ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। তাই এখনই কার্যকর প্রস্তুতি না নিলে বড় মাত্রার ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে রাজধানীকে ভয়াবহ মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD