দুই মাসের পানিসংকটে বিপর্যস্ত মিরপুর, বাসা ছাড়ছেন ভাড়াটিয়ারা

রাজধানীর বৃহত্তর মিরপুরে দীর্ঘদিনের পানিসংকট এখন জনজীবনের অন্যতম বড় দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। টানা প্রায় দুই মাস ধরে অনিয়মিত ও অপর্যাপ্ত পানি সরবরাহের কারণে কাজীপাড়া, পূর্ব কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, মনিপুর, পীরেরবাগ, কাফরুল, পল্লবী, ৬০ ফিটসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার হাজারো পরিবার চরম ভোগান্তির মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেক ভাড়াটিয়া বাধ্য হয়ে অন্য এলাকায় বাসা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। একই সঙ্গে বাড়ির মালিকরাও ভাড়াটিয়া হারানোর আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
বিজ্ঞাপন
মেট্রোরেল চালুর পর সহজ যাতায়াতের সুবিধার কারণে মিরপুর রাজধানীর অন্যতম আকর্ষণীয় আবাসিক এলাকায় পরিণত হয়েছিল। চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী ও ছোট পরিবারগুলো বিশেষভাবে এই এলাকাকে বসবাসের জন্য বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক পানিসংকট সেই সুবিধাকে অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে।
খাবার পানি কিনেও মেটানো যাচ্ছে না প্রয়োজন
পূর্ব কাজীপাড়ার বাসিন্দা সাদিকুর রহমান জানান, গত দুই মাস ধরে নিয়মিতভাবে পানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। অনেক সময় সপ্তাহে কয়েকদিন পুরোপুরি পানি থাকে না। ফলে পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে বোতলজাত খাবার পানি কিনতে হচ্ছে। গোসল, কাপড় ধোয়া কিংবা অন্যান্য গৃহস্থালি কাজের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাচ্ছে না।
বিজ্ঞাপন
তার অভিযোগ, কখনো কখনো পানি এলেও সেটিতে দুর্গন্ধ থাকে, যা ব্যবহারের উপযোগিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করছে। মেট্রোরেলের সুবিধার কারণে যারা একসময় মিরপুরে বসবাসে আগ্রহী ছিলেন, এখন তাদের অনেকেই বিকল্প এলাকার কথা ভাবছেন।
ওয়াসার পানির গাড়িতেও বাড়তি খরচ
শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা ও বাড়ির মালিক নাছির উদ্দিন বলেন, লাইনে পানি না থাকায় অনেক পরিবার ওয়াসার ট্যাংকারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তবে সেখানেও সংকট রয়েছে। তার দাবি, সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ দিয়ে ট্যাংকারের পানি কিনতে হচ্ছে। ছোট একটি ট্যাংকারের জন্য কোথাও কোথাও ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ
পানির দাবিতে সম্প্রতি মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় কয়েক দফা বিক্ষোভ হয়েছে। গত মাসের শেষদিকে শেওড়াপাড়ার শতাধিক বাসিন্দা বালতি, বোতল ও জগ হাতে প্রধান সড়ক অবরোধ করেন। প্রায় ২০ মিনিট অবস্থানের পর দ্রুত পানি সরবরাহ স্বাভাবিক করার আশ্বাস পেয়ে তারা কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন।
বিজ্ঞাপন
পরে মিরপুর-১০ গোলচত্বর এলাকাতেও একই দাবিতে বিক্ষোভ হয়। এছাড়া সি-ব্লক এলাকার বাসিন্দারা নতুন পানির পাম্প স্থাপনের দাবিতে মানববন্ধন করেন। তবে এসব কর্মসূচির পরও সংকটের স্থায়ী সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
ভাড়াটিয়া হারাচ্ছেন বাড়ির মালিকরা
দীর্ঘস্থায়ী পানি সমস্যার কারণে শুধু সাধারণ মানুষ নয়, বাড়ির মালিকরাও ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
বিজ্ঞাপন
বেসরকারি চাকরিজীবী শহিদুল ইসলাম জানান, দীর্ঘদিনের ভোগান্তির কারণে তিনি ইতোমধ্যে রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় নতুন বাসা ঠিক করেছেন। আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে পরিবার নিয়ে মিরপুর ছাড়বেন।
কাজীপাড়ার বাড়ির মালিক হেদায়েতুল্লাহ বলেন, তার পাঁচতলা ভবনের একাধিক ভাড়াটিয়া ইতোমধ্যে আগামী আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের মধ্যে বাসা ছেড়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বাসায় অন্যান্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকলেও শুধু পানির সমস্যার কারণেই মানুষ অন্য এলাকায় চলে যেতে চাইছেন।
তার মতে, শুধু তার ভবন নয়, আশপাশের অনেক বাড়িতেই এখন ‘টু-লেট’ সাইনবোর্ড দেখা যাচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
সংকটের কারণ কী?
ঢাকা ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, সাভারের ভাকুর্তা পানি শোধনাগারে কারিগরি সমস্যার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় পানি সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
শোধনাগারটির দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১৫ কোটি লিটার হলেও বর্তমানে প্রায় ১০ কোটি ৫০ লাখ লিটার পানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। এছাড়া ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাওয়াও সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিজ্ঞাপন
ঢাকা ওয়াসা জানায়, রাজধানীতে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ কোটি লিটার পানির চাহিদা রয়েছে। এই চাহিদা পূরণে প্রায় ১ হাজার ৩৫০টি গভীর নলকূপ ব্যবহার করা হচ্ছে, যার মধ্যে প্রায় ১৮০টি মিরপুর এলাকায় অবস্থিত। তবুও ক্রমবর্ধমান চাহিদার তুলনায় সরবরাহ যথেষ্ট নয়।
জনসংখ্যা বেড়েছে, বাড়েনি অবকাঠামো
মেট্রোরেল চালুর পর মিরপুরে বহুতল ভবনের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। নতুন নতুন আবাসিক ভবন নির্মাণের ফলে জনসংখ্যা এবং পানির চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলেও সেই অনুপাতে নতুন পানির উৎস বা অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি।
বিজ্ঞাপন
এদিকে ভাকুর্তা শোধনাগারের ট্রান্সফর্মার ও জেনারেটরে ত্রুটির কারণে কিছুদিন আগে উৎপাদন আরও কমে যায়। একপর্যায়ে দৈনিক মাত্র সাত কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছিল। পরে তা বাড়িয়ে প্রায় ১০ কোটি লিটারে উন্নীত হলেও ঘাটতি পুরোপুরি কাটেনি।
ওয়াসার ব্যাখ্যা
ঢাকা ওয়াসার মডস জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী ইয়াদুল হক বলেন, মিরপুরে স্থায়ী পানি সংকট রয়েছে—এমন ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। তার মতে, ভাকুর্তা শোধনাগারের কারিগরি সমস্যার কারণে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, অনেক বাড়ির মালিক লাইনে পানি আসামাত্র একযোগে মোটর চালু করে পানি টেনে নেওয়ায় সড়কের শেষ প্রান্তের ভবনগুলোতে পর্যাপ্ত পানি পৌঁছাতে সমস্যা হচ্ছে। এছাড়া নতুন পানির পাম্প স্থাপনের প্রয়োজন থাকলেও উপযুক্ত জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না।
আরও পড়ুন
অন্যদিকে একটি পাম্পিং স্টেশনের কর্মী রুহুল আমিন জানান, আগে যেখানে প্রতি মিনিটে প্রায় ১ হাজার ৮০০ লিটার পানি উত্তোলন করা যেত, বর্তমানে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় তা প্রায় ১ হাজার ২০০ লিটারে নেমে এসেছে। ফলে সরবরাহ সক্ষমতাও কমে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, মিরপুরের পানিসংকট কেবল সাময়িক নয়; এটি দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাগত সীমাবদ্ধতার ফল।
তার ভাষ্য, দুই দশক আগে ঢাকায় তুলনামূলক অল্প গভীরতায় ভূগর্ভস্থ পানি পাওয়া গেলেও বর্তমানে অনেক গভীরে নেমে গেছে পানির স্তর। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে।
তিনি বলেন, মেট্রোরেল চালুর পর মিরপুরে বসবাসকারীর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুযায়ী পানি সরবরাহ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ হয়নি। ফলে বর্তমান সংকট ভবিষ্যতে আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন পানি উৎপাদন ও সরবরাহ অবকাঠামো গড়ে তোলা, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনার মাধ্যমে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য সৃষ্টি করা না গেলে মিরপুরের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পানিসংকট আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।








