হঠাৎ বাংলাদেশে কীভাবে বাড়ছে বিরল কমলাবতী সাপ?

বিশ্বের অন্যতম বিরল সাপ হিসেবে পরিচিত কোরাল রেড কুকরি বা স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘কমলাবতী’ সাপের উপস্থিতি বাংলাদেশে আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কয়েক বছর আগেও দেশের প্রাণীবৈচিত্র্যের তালিকায় এই প্রজাতির কোনো নথিভুক্ত তথ্য ছিল না।
বিজ্ঞাপন
কিন্তু ২০২১ সালে প্রথমবারের মতো উত্তরাঞ্চলে এর সন্ধান পাওয়ার পর থেকে একের পর এক নতুন তথ্য সামনে আসছে। বিশেষ করে পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও অঞ্চলে এই সাপের পুনঃপুন দেখা মিলছে, যা গবেষকদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।
প্রাণিবিজ্ঞানীদের মতে, কোরাল রেড কুকরি (বৈজ্ঞানিক নাম Oligodon kheriensis) অত্যন্ত বিরল একটি প্রজাতি। ১৯৩৬ সালে ভারতের উত্তরপ্রদেশে প্রথম এই সাপের সন্ধান পাওয়া যায়। দীর্ঘ সময় ধরে এটি কেবল ভারতের উত্তরাঞ্চল ও নেপালের হিমালয়ঘেঁষা এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল বলে ধারণা করা হতো। পরে বাংলাদেশে এই সাপের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ায় দেশটি এই প্রজাতির তৃতীয় আবাসস্থল হিসেবে গবেষণায় স্থান পায়।
প্রথম দিকে বিশ্বজুড়ে এই সাপের দেখা পাওয়ার সংখ্যা ছিল মাত্র ২২ থেকে ২৩টির মতো। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশেই এর উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
ওয়াইল্ডলাইফ অ্যান্ড স্নেক রেসকিউ টিম ইন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা এবং সাপ উদ্ধারকারী মো. শহীদুল ইসলাম জানান, ২০২১ সালে প্রথম কমলাবতী সাপ উদ্ধারের পর থেকে এখন পর্যন্ত তিনি একাই ৬৬টি সাপের সন্ধান পেয়েছেন। এর মধ্যে পূর্ণবয়স্ক সাপের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি বাচ্চাও রয়েছে। এছাড়া একই এলাকায় অন্য উদ্ধারকারীরাও কয়েকটি সাপ পেয়েছেন, যদিও সেগুলোর তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হয়নি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমদিকে পঞ্চগড়ে সাপটির দেখা মিললেও পরে ঠাকুরগাঁওয়েও এটি পাওয়া গেছে। অধিকাংশ উদ্ধার অভিযান হয়েছে পঞ্চগড়ের বোদা ও আটোয়ারী উপজেলায়।
সম্প্রতি পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার চৌরঙ্গী বাজার এলাকার একটি কৃষিজমিতে মাছ ধরার জন্য পাতা রিং জালে দুটি কমলাবতী সাপ ধরা পড়ে। উদ্ধারকারীরা জানান, এর একটি ছিল এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে পাওয়া সবচেয়ে বড় কমলাবতী সাপ, যার দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে তিন ফুট। স্থানীয় বাসিন্দারা আগে কখনও এমন উজ্জ্বল কমলা রঙের সাপ দেখেননি। অপরিচিত হওয়ায় তারা সাপটি না মেরে উদ্ধারকারীদের খবর দেন।
বিজ্ঞাপন
এর আগে এই প্রজাতির সাপ সাধারণত বাঁশঝাড়, মাটির নিচ কিংবা নির্মাণকাজের সময় দেখা যেত। এবার প্রথমবারের মতো কৃষিজমি ও পানির কাছাকাছি এলাকায় এর উপস্থিতি লক্ষ্য করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, খাদ্যের সন্ধানেই হয়তো সাপটি সেখানে চলে এসেছে।
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে পঞ্চগড়ের আটোয়ারীতে একটি মা সাপের সঙ্গে আটটি সদ্য জন্মানো বাচ্চাও উদ্ধার করা হয়েছিল। সেই তথ্যের ভিত্তিতে উদ্ধারকারীদের ধারণা, এই প্রজাতির সাপ একবারে আট থেকে ১২টি পর্যন্ত ডিম দিতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়নি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এবং ভেনম রিসার্চ সেন্টারের গবেষক অধ্যাপক মো. আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী বলেন, কমলাবতী সাপের জীববিজ্ঞান, প্রজনন, খাদ্যাভ্যাস কিংবা জীবনচক্র সম্পর্কে তথ্য অত্যন্ত সীমিত। ফলে বাংলাদেশে এর সংখ্যা বাড়ার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
বিজ্ঞাপন
তবে তিনি মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা, মানুষের কারণে বনভূমি ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন প্রাণীর মতো সাপও নতুন এলাকায় স্থানান্তরিত হতে পারে। উপযুক্ত পরিবেশ ও নিরাপদ আবাসের সন্ধানে তারা নতুন এলাকায় বসতি গড়ে তোলে।
গবেষকদের মতে, উত্তরবঙ্গের ভৌগোলিক অবস্থানও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও হিমালয় অঞ্চলের তুলনামূলক কাছাকাছি এবং উঁচু ভূমি হওয়ায় এই প্রজাতির সাপের বিচরণ ও বিস্তারের জন্য অঞ্চলটি অনুকূল হতে পারে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিশেষজ্ঞরা জানান, কমলাবতী সাপ বিষধর নয়। এটি সাধারণত নরম মাটির নিচে বাস করে এবং অত্যন্ত লাজুক স্বভাবের। মানুষ দেখলে আক্রমণ না করে আত্মগোপনের চেষ্টা করে। উজ্জ্বল কমলা-লাল রঙের জন্য গবেষকদের কাছেই এর ‘কমলাবতী’ নামটি জনপ্রিয় হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশে ২০২১ সালে প্রথমবার এই সাপের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকীতে এ নিয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। সেই সময়ই এটি দেশের ১০৩তম সাপের প্রজাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়।
গবেষকদের মতে, বর্তমানে পাওয়া তথ্য এই বিরল প্রজাতির বিস্তার সম্পর্কে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কেন বাংলাদেশে এর উপস্থিতি দ্রুত বাড়ছে, এটি স্থায়ীভাবে আবাস গড়ছে কি না এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না—এসব বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন।
এদিকে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন)-এর বৈশ্বিক রেড লিস্টে এখনো এই প্রজাতির সংরক্ষণ অবস্থান নির্ধারিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট গবেষকদের আশা, চলমান গবেষণা ও নতুন তথ্যের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে কোরাল রেড কুকরি বা কমলাবতী সাপের সংরক্ষণ অবস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। ততদিন পর্যন্ত এই বিরল প্রজাতির সাপের প্রতিটি নতুন সন্ধান বাংলাদেশের প্রাণীবৈচিত্র্য গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে বিবেচিত হবে।
বিজ্ঞাপন
তথ্য সূত্র: বিবিসি বাংলা








