বিতর্কিত মুছিবুল হাসান রিপু আবারও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বহুল আলোচিত কর্মকর্তা মো. মুছিবুল হাসান রিপুকে ঘিরে আবারও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের টানা তিন শিক্ষামন্ত্রীর দপ্তরে দায়িত্ব পালন করা এই কর্মকর্তা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মন্ত্রীর দপ্তর থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেও, প্রায় দুই বছর পর আবারও শিক্ষামন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও) হিসেবে দায়িত্বে ফিরেছেন।
বিজ্ঞাপন
তার এই প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে শিক্ষা প্রশাসনে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। এটি কি কেবল একটি নিয়মিত প্রশাসনিক পদায়ন, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও শক্তিশালী কোনো প্রভাবশালী মহলের সমর্থন? শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে এখন এ নিয়েই চলছে আলোচনা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শিক্ষামন্ত্রীর দপ্তর থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় মুছিবুল হাসানকে। কিন্তু ২০২৬ সালের ১৩ এপ্রিল তিনি আবারও শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলনের দপ্তরে ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও) হিসেবে যোগ দেন। এই পদায়ন নিয়েই তৈরি হয়েছে বিতর্ক।
কারণ, তৎকালীন মন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল ১৬ এপ্রিল পদত্যাগ করেন। অর্থাৎ তার পদত্যাগের মাত্র তিন দিন আগেই মুছিবুল হাসানকে মন্ত্রীর দপ্তরে ফিরিয়ে আনা হয়। এ ঘটনাকে ঘিরে প্রশাসনের ভেতরে প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি কেবল কাকতালীয়, নাকি পূর্বপরিকল্পিত কোনো সিদ্ধান্তের অংশ?
বিজ্ঞাপন
শিক্ষামন্ত্রীর সাবেক সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির অভিযোগের পর দায়িত্ব হারান। পরবর্তীতে তাকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক হিসেবে পদায়নের আদেশ দেওয়া হলেও তা বাতিল হয়ে যায়। ফলে তার পুনর্বাসনের উদ্যোগও সফল হয়নি।
এ অবস্থায় শিক্ষা প্রশাসনের একটি অংশের প্রশ্ন—দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের ঘোষিত 'জিরো টলারেন্স' নীতির সঙ্গে এসব পদায়ন কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?
শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন সূত্রের দাবি, সাবেক পিএস ও সাবেক এপিএসের যোগাযোগের মাধ্যমেই আওয়ামী লীগ আমলে তিন শিক্ষামন্ত্রীর দপ্তরে দায়িত্ব পালনকারী এবং কথিত '১২ সিন্ডিকেট'-এর অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত মুছিবুল হাসানকে আবারও মন্ত্রীর দপ্তরে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। যদিও এই অভিযোগের পক্ষে কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন এখন পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি।
বিজ্ঞাপন
সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দায়িত্ব পালন করা একাধিক কর্মকর্তার পুনরায় পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নিয়োগ, বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে আবারও একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে অনিয়ম, তদবির ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও সামনে আসছে।
সরকারি চাকরিতে ২০০৮ সালে ১৩তম গ্রেডে স্টেনো কাম টাইপিস্ট হিসেবে যোগ দেন মো. মুছিবুল হাসান রিপু। ২০০৯ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই তার প্রভাব বাড়তে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
২০১২ সালে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রীর একান্ত সচিবের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর শিক্ষা প্রশাসনে তার অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়। প্রায় সাত বছর একই দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এই সময়ে শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে বিস্তৃত একটি যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন তিনি। শিক্ষা প্রশাসনের একাধিক সূত্রের দাবি, পদোন্নতি, বদলি, টেন্ডার পাইয়ে দেওয়া, শিক্ষা বোর্ড, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নানা প্রশাসনিক বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরেই তদবির-বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
২০১৯ সালে নতুন শিক্ষামন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর তাকে অন্যত্র বদলি করা হলেও মাত্র সাত দিনের মধ্যে আবার আগের দায়িত্বে ফিরে আসেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা বোর্ড ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগও ওঠে তার বিরুদ্ধে।
বিজ্ঞাপন
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো আদালতের দণ্ড বা সরকারি তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। শুধু একজন নয়, আওয়ামী লীগ সরকারের টানা তিন শিক্ষামন্ত্রীর সময়ই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন মুছিবুল হাসান।
২০২৪ সালে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তাকে সরিয়ে দেওয়া হলেও ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে আবারও মন্ত্রীর দপ্তরে ফিরে আসেন তিনি। এ প্রত্যাবর্তনকে অনেকেই শিক্ষা প্রশাসনে পুরোনো প্রভাব বলয়ের পুনরুত্থানের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয় নয়, নিজ জেলা পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলাতেও তাকে ঘিরে নানা অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, তার প্রভাবেই তার ভাই প্রায় এক দশক ধরে এগারগ্রাম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় বাসিন্দারা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে মুছিবুল হাসান ও তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত এবং আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
বিজ্ঞাপন
মুছিবুল হাসানের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের পক্ষে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন তিনি। নির্বাচনী প্রচারণা, ব্যয় ব্যবস্থাপনা, সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
এছাড়া তার পিতার নামে প্রতিষ্ঠিত 'মাস্টার শাহাদাৎ হোসেন পাঠাগার'-এর ব্যানারে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণা চালানো হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, ওই পাঠাগারের কার্যালয় দীর্ঘদিন স্থানীয় আওয়ামী লীগের কার্যক্রম পরিচালনার কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে।
এছাড়া বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণে ভূমিকা রাখার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন মুছিবুল হাসান। তার ঘনিষ্ঠদের দাবি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এসব অভিযোগ ছড়ানো হচ্ছে এবং এগুলোর বেশিরভাগই ভিত্তিহীন।
বিজ্ঞাপন
শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্টদের একটি অংশের দাবি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা বোর্ড ও বিভিন্ন অধিদপ্তরে যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অস্বাভাবিক প্রভাব থেকে থাকে, তবে তা নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত।
তাদের মতে, শিক্ষা প্রশাসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে অভিযোগগুলোর সত্যতা উদঘাটন জরুরি। সমালোচকদের প্রশ্ন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কি আবারও পুরোনো প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠছে? নাকি সবকিছুই কেবল প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের অংশ? এ প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। তবে শিক্ষা প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ক্রমেই বাড়ছে।








