পরিচালক আতাহারের পকেটে নিয়োগ বাণিজ্যের কোটি টাকা

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের নিয়োগ কার্যক্রমকে ঘিরে অনিয়ম ও কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ সামনে এসেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, নিয়োগ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগে অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. শহীদ আতাহার হোসেনের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কথা উল্লেখ করা হয়।
বিজ্ঞাপন
অভিযোগকারীরা বলছে, পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) পদধারী কর্মকর্তা নিয়োগ কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করায় সেই প্রশাসনিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে নিয়োগ-সংশ্লিষ্ট একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়। তাদের দাবি, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কর্মরত কয়েকজন ফায়ারফাইটার ও ড্রাইভারকে এই নেটওয়ার্কে সম্পৃক্ত করা হয়েছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, চাকরির আশ্বাস দিয়ে প্রার্থীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগও রয়েছে।
এদিকে সিরাজগঞ্জের পাওয়া প্লান্ট ফায়ার স্টেশনের ড্রাইভার শিহাব উদ্দিনের মৃত্যুর পর বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, নিয়োগসংক্রান্ত আর্থিক লেনদেনের ঘটনায় তিনি দীর্ঘদিন মানসিক চাপে ছিলেন। তবে তার মৃত্যুর সঙ্গে এসব অভিযোগের সম্পর্ক রয়েছে বলে আলম নামে এক ভুক্তভুগী স্বীকার করেন। এই ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে শিহাব উদ্দিনের মৃত্যুর ঘটনাসহ নিয়োগ-সংক্রান্ত সব অভিযোগ নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
অভিযোগে বলা হয়, নিয়োগ সিন্ডিকেটের সদস্য হিসেবে যুক্ত ছিলেন সিরাজগঞ্জের পাওয়া প্লান্ট ফায়ার স্টেশনের ড্রাইভার শিহাব উদ্দিন। জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল ফায়ার স্টেশনের ড্রাইভার মাহমুদুল হাসানের মাধ্যমে পরিচালক শহীদ আতাহার হোসেন ড্রাইভার শিহাব উদ্দিনের কাছ থেকে ৮৫ লাখ টাকা নেন বলে অভিযোগ উল্লেখ করা হয়। কিন্তু বিধিবাম নিয়োগ বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে শিহাবের কাছ থেকে ঘুষের অর্থ গ্রহণ করলেও সে মোতাবেক কোনো কাজই করেনি শহীদ আতাহার হোসেন। আর এই কারণে গত শনিবার দুপুরে মানসিক চাপে গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করেন শিহাব উদ্দিন।
বিজ্ঞাপন
এ ঘটনায় ড্রাইভার শিহাব উদ্দিনের স্ত্রী লাবনী আক্তার দৈনিক জনবাণীকে বলেন, ড্রাইভার মাহমুদুল হাসানের মাধ্যমে পরিচালক শহীদ আতাহার হোসেন স্যারকে ৮৫ লাখ টাকা দেওয়া হয়। ফায়ারফাইটার নিয়োগ না দিতে পেরে মানসিক চাপে তিনি আত্মহত্যা করেছেন। আজ আমি সংসার নিয়ে অনেক দুশ্চিন্তায় রয়েছি।
তিনি অনুরোধ করেন বলেন এই বক্তব্য লিখবেন না। তাহলে আমার স্বামীর পেনশন নিয়ে ঝামেলা হতে পারে। সব টাকা পরিচালক স্যার খেয়েছে এখন আপনারা লেখা-লেখি করলে পেনশন আটকিয়ে দিবে।
জানা যায়, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) শহীদ আতাহার হোসেন ইতিপূর্বে ফায়ার সার্ভিসের প্রকল্প পরিচালক ছিলেন। পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) হিসেবে পদায়ন হলেও প্রথমে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালকের হস্তক্ষেপে তিনি দায়িত্ব বুঝে নিতে পারেননি। পরে তিনি মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে পরিচালকের (প্রশাসন ও অর্থ) চেয়ারে বসেছেন। আর সেই টাকা উঠাতেই তিনি এখন বেপরোয়া। খুলে বসেছেন ঘুষের দোকান। আর সেই দোকানে এখন চলছে রমরমা অবৈধ নিয়োগ বাণিজ্যে। আর এ কারণে ফায়ার সার্ভিসের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন শহীদ আতাহার হোসেন।
বিজ্ঞাপন
প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়ও তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল বলে দাবি করেছেন একাধিক কর্মকর্তা। যদিও এসব অভিযোগ কালো টাকার জোরে আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত করেনি কর্তৃপক্ষ।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ব্যাহত করার উদ্দেশ্যে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন আতাহার হোসেন। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষায় প্রভাবিত করার অভিযোগ উঠেছে। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন জেলার প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তার সিন্ডিকেটের সদস্যরা। ঘুষের টাকা ফেরত না দিতে পেরে শিহাব উদ্দিনের মত অনেক ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঘুষের টাকা লেনদেনের বিষয় অকপটে স্বীকার করে জয়পুরহাট জেলার ক্ষেতলাল ফায়ার স্টেশনের ড্রাইভার মাহমুদুল হাসান বলেন , বড় স্যার টাকা নিয়েছে এটা সত্যি, তবে বলা ঠিক হবে না। শিহাবের জীবন শেষ, আমি চাকরি হারাবো।
বিজ্ঞাপন
এ ব্যাপারে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক আতাহার হোসেনের মুঠোফোনে কল দিলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এমনকি তার দপ্তরে দুই দিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করলেও তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে চাননি। এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামালের মুঠোফোনে কল দিলে তিনি রিসিভ করেননি। এমনকি খুদেবার্তা পাঠিয়েও উত্তর মেলেনি।








