কম দৌড়েই বিশ্বকাপে ইতিহাস গড়ছেন লিওনেল মেসি

ফুটবলে সাফল্য অর্জনের জন্য সবসময় সবচেয়ে বেশি দৌড়াতে হয়—এমন ধারণাকে যেন নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছেন লিওনেল মেসি। ৩৯ বছর বয়সী আর্জেন্টাইন অধিনায়ক এবার বিশ্বকাপে সবচেয়ে কম দৌড়ানো ফুটবলারদের একজন হওয়া সত্ত্বেও গোলদাতার তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছেন। তার এই পারফরম্যান্স আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে, ফুটবল কেবল শারীরিক শক্তির নয়, বরং বুদ্ধিমত্তা, সময়জ্ঞান ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার খেলাও।
বিজ্ঞাপন
ফুটবল কিংবদন্তি ইয়োহান ক্রুইফ একবার বলেছিলেন, ফুটবলে অযথা দৌড়ানোর চেয়ে সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় থাকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বহু বছর আগে দেওয়া সেই দর্শনের বাস্তব প্রতিফলন যেন দেখা যাচ্ছে বর্তমান বিশ্বকাপে মেসির খেলায়।
ফুটবল পরিসংখ্যানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অপটা-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে অন্তত ৯০ মিনিট খেলা ৬১৮ জন আউটফিল্ড খেলোয়াড়ের মধ্যে সবচেয়ে কম দূরত্ব অতিক্রম করেছেন মেসি। প্রতি ম্যাচে তার গড় দৌড়ের পরিমাণ মাত্র ৮ দশমিক ১ কিলোমিটার।
বিজ্ঞাপন
তবে এই পরিসংখ্যানের বিপরীতে রয়েছে আরও বিস্ময়কর একটি তথ্য। গ্রুপ পর্ব শেষে ছয়টি গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকার শীর্ষে রয়েছেন আর্জেন্টাইন তারকা। অর্থাৎ মাঠে কম দৌড়ালেও ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে তিনিই সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রেখে চলেছেন।
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে মেসির খেলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল অসাধারণ গতি, দ্রুত ড্রিবলিং এবং একের পর এক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার খেলার ধরনেও এসেছে বড় পরিবর্তন। এখন তিনি ম্যাচের বড় একটি সময় প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ পর্যবেক্ষণ করেন, ফাঁকা জায়গা খুঁজে বের করেন এবং সুযোগ তৈরি হওয়ার অপেক্ষায় থাকেন।
এই ধৈর্যশীল ও পরিকল্পিত ফুটবলই তাকে কম শক্তি ব্যয় করে ম্যাচে সর্বোচ্চ প্রভাব বিস্তার করতে সাহায্য করছে। একটি নিখুঁত পাস, একটি সঠিক অবস্থান গ্রহণ কিংবা একটি দুর্দান্ত শটে মুহূর্তের মধ্যেই ম্যাচের চিত্র পাল্টে দিতে পারছেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সময়ে মেসির সবচেয়ে বড় শক্তি আর গতি নয়; বরং খেলার গতি বোঝার ক্ষমতা, নিখুঁত পজিশনিং, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং প্রতিপক্ষের দুর্বল মুহূর্ত শনাক্ত করার অসাধারণ দক্ষতা। এ কারণেই কম দৌড়েও তিনি প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে থাকছেন।
আর্জেন্টিনা দলের কৌশলও মেসির বর্তমান খেলার ধরনকে কেন্দ্র করেই সাজানো হয়েছে। কোচ লিওনেল স্কালোনি এমন একটি দল গড়ে তুলেছেন, যেখানে রক্ষণাত্মক দায়িত্বের বড় অংশ সতীর্থরা সামলে নেন। ফলে মেসিকে অপ্রয়োজনীয় দৌড়ঝাঁপ করতে হয় না এবং তিনি পুরো মনোযোগ দিতে পারেন আক্রমণভাগে।
বিজ্ঞাপন
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপেও একই কৌশল দেখা গিয়েছিল। বিশেষ করে রদ্রিগো ডি পলকে অনেক সময় মেসির নিরাপত্তা ও সহায়ক ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপেও সেই পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। বল প্রতিপক্ষের দখলে থাকলে মেসিকে তুলনামূলকভাবে কম রক্ষণাত্মক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে, যা তার শক্তি সঞ্চয় এবং আক্রমণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সহায়তা করছে।
স্কালোনির এই পরিকল্পনা এবং সতীর্থদের সমন্বিত প্রচেষ্টার ফলেই ৩৯ বছর বয়সেও মেসি বিশ্বমঞ্চে নিজের সেরাটা তুলে ধরছেন। সবচেয়ে কম দৌড়িয়েও গোলদাতার তালিকার শীর্ষে থাকা প্রমাণ করে, আধুনিক ফুটবলে শুধু পরিশ্রম নয়, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তই একজন খেলোয়াড়কে আলাদা করে তোলে।
বর্তমান বিশ্বকাপে মেসির পারফরম্যান্স আবারও দেখিয়ে দিচ্ছে, অভিজ্ঞতা, ফুটবলবোধ এবং কৌশলগত দক্ষতা অনেক সময় গতির ঘাটতিকেও ছাপিয়ে যেতে পারে। তাই বয়সের ভার সত্ত্বেও তিনি এখনও আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় ভরসা এবং বিশ্বকাপ শিরোপা ধরে রাখার লড়াইয়ে অন্যতম প্রধান অস্ত্র।








