এক কিডনি নিয়েই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের ক্রিকেটার

বাংলাদেশের ক্রিকেটে দীর্ঘদিন খেলেছেন সাবেক অফ স্পিনার ফাহিম মুনতাসির। বয়সভিত্তিক ক্রিকেট থেকে ঘরোয়া প্রতিযোগিতা, প্রথম শ্রেণি, ‘এ’ দল হয়ে জাতীয় দল—সব পর্যায়েই ছিল তার বিচরণ। কিন্তু ক্যারিয়ারের বড় একটি সময় তিনি যে জন্মগতভাবে একটি কিডনি নিয়ে বেঁচে ছিলেন, সেটিই জানতেন না। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের শেষ ম্যাচ খেলার প্রায় ২১ বছর পর ২০২৩ সালে বিষয়টি জানতে পারেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
ক্রিকেটে ‘সুমিত’ নামে পরিচিত ফাহিম মুনতাসির ১৯৯৮ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের সদস্য ছিলেন। পরের বছর তিনি যুব দলের নেতৃত্বও পান। ১৯৯৮ সালের মার্চে বিসিবি একাদশের হয়ে ভারতের বিপক্ষে লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে অভিষেক হয় তার। এরপর ওয়েস্ট ইন্ডিজ ‘এ’ দলের বিপক্ষে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক করেন।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফাহিমের অভিষেক হয় ২০০১ সালের নভেম্বরে চট্টগ্রামে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে। ওই সিরিজে দুটি ওয়ানডে খেলার পর ২০০২ সালের সেপ্টেম্বরে শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেন নিজের তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডে।

টেস্ট ক্রিকেটেও দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন ফাহিম। ২০০২ সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় পাকিস্তানের বিপক্ষে তার টেস্ট অভিষেক হয়। সব মিলিয়ে জাতীয় দলের হয়ে তিনি তিনটি টেস্ট ও তিনটি ওয়ানডে খেলেছেন।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
২১ বছর পর জানা গেল এক কিডনির কথা
বিজ্ঞাপন
২০২৩ সালে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে ভারতের দিল্লিতে যান ফাহিম। পেটের আলট্রাসনোগ্রাম করার সময় চিকিৎসকের সন্দেহ হয়, তার বাঁ পাশে কিডনি নেই।

সেই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে ফাহিম বলেন, ‘আলট্রাসনো করার সময় ডাক্তার আমাকে জিজ্ঞেস করছিলেন, আমার কখনো কোনো অস্ত্রোপচার হয়েছে কি না। আমি বললাম, হয়নি। উনি তখন সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, আমার কিডনি সম্ভবত জন্মগতভাবেই একটি, ডান দিকে। বাঁ দিকেরটা নেই। পরে রিপোর্টেও তাই আসে।’
চিকিৎসকেরা তাকে জানান, জন্মগতভাবে একটি কিডনি নিয়ে সুস্থ জীবনযাপন করা সম্ভব হলেও থাকা কিডনিটির বিষয়ে নিয়মিত নজর রাখা জরুরি। পরে দেশে ফিরে চিকিৎসা চালিয়ে যান ফাহিম। এরই মধ্যে তার একমাত্র কিডনির কার্যকারিতায়ও সমস্যা দেখা দেয় এবং রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা বাড়তে থাকে।
বিজ্ঞাপন
এক কিডনি নিয়ে খেলাধুলা প্রসঙ্গে চিকিৎসকদের মত
মানুষের শরীরে সাধারণত দুটি কিডনি থাকে। তবে জন্মগতভাবে কারও একটি কিডনি না থাকার ঘটনাও চিকিৎসাবিজ্ঞানে পরিচিত। এমন অবস্থায় খেলাধুলা করা একেবারে অসম্ভব—এমন নিয়ম নেই। তবে কিডনি শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হওয়ায় আঘাত বা অন্য কোনো জটিলতার ঝুঁকি বিবেচনায় খেলাধুলার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ।

বিসিবির প্রধান চিকিৎসক ডা. দেবাশীষ চৌধুরী বলেন, ‘একটি কিডনি থাকলে খেলা যাবে না, এমন কোনো কথা নেই। তবে যেহেতু কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হলে লাইফ থ্রেট আসতে পারে, এসব ক্ষেত্রে সাধারণত খেলাধুলা থেকে দূরে থাকতেই বলা হয়।’
বিজ্ঞাপন
ফাহিমের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও ব্যতিক্রমী হয়ে ওঠে, কারণ নিজের শারীরিক অবস্থার কথা না জেনেই তিনি দীর্ঘ সময় ক্রিকেট খেলেছেন এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও অংশ নিয়েছেন।
সতীর্থরাও জানতেন না
ফাহিমের সঙ্গে খেলোয়াড়ি জীবনে থাকা সতীর্থদের কাছেও তার এই শারীরিক অবস্থার কোনো ধারণা ছিল না। জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার বলেন, ‘খেলোয়াড়ি জীবনে আমরা কখনো বুঝতে পারিনি, ওর একটা কিডনি নেই! আমরা বুঝব কী, সুমিত নিজেই তো জানত না! ও অত্যন্ত ফিট খেলোয়াড় ছিল, খুব ভালো অফ স্পিনার ছিল।’
বিজ্ঞাপন
সাবেক জাতীয় দলের ওপেনার হান্নান সরকারও ফাহিমের ফিটনেসের প্রশংসা করে বলেন, ‘আমার মনে পড়ে না সুমিত ভাই কখনো ফিটনেসের কারণে বা কোনো ইনজুরির কারণে দল থেকে বাদ পড়েছেন। উনি স্পিনার ছিলেন, কিন্তু প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে কোনো সমস্যা ছাড়াই অনেক লম্বা স্পেলে বোলিং করতেন। কখনো মনে হয়নি তাঁর কোনো সমস্যা আছে।’

নিজের শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে ফাহিমও খেলোয়াড়ি জীবনে কোনো অস্বাভাবিকতা টের পাননি। তার ভাষায়, ‘ডাক্তার বলেছেন, যাদের একটি কিডনি থাকে, প্রকৃতিপ্রদত্তভাবেই সেটি তখন বেশি কার্যক্ষম হয়। আমার বেলায়ও হয়তো তাই হয়েছে।’
এখন কিডনি জটিলতায় চিকিৎসাধীন
বিজ্ঞাপন
ফাহিমের শারীরিক পরিস্থিতি বর্তমানে আগের মতো নেই। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে কিডনি সমস্যায় বেশি ভুগছেন তিনি। ৩০ জানুয়ারি থেকে তার ডায়ালাইসিস শুরু হয় এবং বর্তমানে সপ্তাহে দুই দিন ডায়ালাইসিস নিতে হচ্ছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
চিকিৎসকেরা তাকে কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দিয়েছেন। ভারত বা পাকিস্তানে এ চিকিৎসায় আনুমানিক ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এবং ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াবের পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগিতার আশ্বাস পাওয়ার কথাও জানিয়েছেন ফাহিম।
দীর্ঘ ক্রিকেটজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খেলোয়াড়দের জন্যও একটি পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। ফাহিম বলেন, ‘খেলোয়াড়দের জন্য পেনশনের মতো ব্যবস্থা থাকা উচিত, যেন পরে অন্তত নিজের চিকিৎসা করাতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে না হয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ক্রিকেটারদের কথা ভেবেই কথাটা বললাম।’








