সাজেক পর্যটনকেন্দ্র বন্ধে ১০ দিনে ৫ কোটি টাকা ক্ষতির আশঙ্কা

নিরাপত্তাজনিত কারণে রাঙামাটির জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেক ভ্যালি সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করায় বড় ধরনের আর্থিক সংকটের আশঙ্কায় পড়েছেন পর্যটন ব্যবসায়ীরা। দুর্গাপূজার ছুটি ও শীতের পর্যটন মৌসুম সামনে রেখে আগাম বুকিংয়ের মাধ্যমে বাড়তি আয়ের প্রত্যাশা থাকলেও হঠাৎ নিষেধাজ্ঞায় সেই পরিকল্পনা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
বিজ্ঞাপন
ব্যবসায়ীদের হিসাবে, নিষেধাজ্ঞা ১০ দিন স্থায়ী হলে রিসোর্ট ও পর্যটক পরিবহন খাতেই সম্ভাব্য আয়হানি হতে পারে ৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। রেস্তোরাঁ, দোকানপাট ও অন্যান্য ব্যবসার ক্ষতি যোগ হলে অঙ্কটি পাঁচ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাজেকের পর্যটন ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৩৫টি রিসোর্ট ও শতাধিক রেস্তোরাঁ রয়েছে। পর্যটকদের যাতায়াতের জন্য প্রতিদিন গড়ে ২০০টি গাড়ি চলাচল করে। প্রতিটি গাড়ির গড় ভাড়া প্রায় ১৩ হাজার টাকা। সেই হিসাবে পরিবহন খাতে প্রতিদিন প্রায় ২৬ লাখ টাকার লেনদেন হয়। টানা ১০ দিন পর্যটক পরিবহন বন্ধ থাকলে এ খাতে সম্ভাব্য আয়হানি দাঁড়াবে ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
সাজেক গাড়ির লাইনম্যান ইয়াছিন আরাফাত বলেন, ‘সাধারণত শুক্র ও শনিবার ছাড়া অন্যান্য দিনে প্রতিদিন ৬০-৭০টি গাড়ি সাজেকে প্রবেশ করে। শনিবার রাতেও ৫৮টি গাড়িতে প্রায় ৫০০ পর্যটক এসেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেক বন্ধ ঘোষণায় গাড়িচালক ও ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। পর্যটন ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এমন পরিস্থিতি কেউ প্রত্যাশা করেননি।’
আবাসন খাতেও বড় অঙ্কের আয়হানির আশঙ্কা
বিজ্ঞাপন
পরিবহন খাতের পাশাপাশি সাজেকের রিসোর্ট ও কটেজ ব্যবসায়ও বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট মালিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৩৫টি রিসোর্টে মোট ৬৭৫টি কক্ষ রয়েছে। এসব কক্ষের ভাড়া থেকে প্রতিদিন ন্যূনতম ২২ লাখ ৫০ হাজার টাকা আয়ের হিসাব করেছেন তারা। সে হিসাবে ১০ দিনে সম্ভাব্য আয়হানি হতে পারে ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
পর্যটক না থাকায় কক্ষভাড়া থেকে আয় বন্ধ হলেও কর্মীদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল, জেনারেটরের জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বহন করতে হবে রিসোর্ট মালিকদের। পাশাপাশি আগাম বুকিং বাতিল হওয়ায় পর্যটকদের অগ্রিম অর্থ ফেরত দেওয়ার চাপও তৈরি হয়েছে।
অবকাশ রিসোর্টের ব্যবস্থাপক নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘১৬ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত সাজেকের বেশিরভাগ রিসোর্ট ও কটেজ আগেই বুকিং করা হয়েছিল। বিশেষ করে দুর্গাপূজার ছুটিকে কেন্দ্র করে ১৯ অক্টোবর থেকে শতভাগ বুকিং ছিল। কিন্তু হঠাৎ বন্ধের সিদ্ধান্তে এখন অগ্রিম বুকিং বাতিল করে টাকা ফেরত দিতে হচ্ছে। পর্যটন মৌসুমের শুরুতেই এই ক্ষতির ধাক্কা সামলে ওঠা অনেক ব্যবসায়ীর পক্ষে কঠিন হবে।’
বিজ্ঞাপন
ব্যবসায়ীদের মতে, সাজেকে পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ থাকার প্রভাব শুধু আবাসন ও পরিবহন খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পর্যটকদের খাবার সরবরাহকারী রেস্তোরাঁ, স্থানীয় দোকান, হস্তশিল্প বিক্রেতা, কৃষিপণ্য সরবরাহকারী এবং বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়বেন।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
পর্যটকদের আনাগোনা কমে গেলে স্থানীয় বাজারে পণ্য বিক্রি কমে যায়। একই সঙ্গে সংকুচিত হয় পরিবহনসেবা ও খাবারের চাহিদা। এতে পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত দৈনিক মজুরির শ্রমিক, গাড়িচালক, রেস্তোরাঁকর্মী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের আয় বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। দীর্ঘদিন নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিচালনা এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ নিয়েও অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে সাময়িক বন্ধ ঘোষণা
সম্প্রতি সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের ডাকা সড়ক অবরোধের কারণে সাজেকগামী সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে পর্যটকদের যাতায়াতে বিঘ্ন ঘটে এবং অনেকে আটকা পড়েন। সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় রাঙামাটি জেলা প্রশাসন জরুরি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে পর্যটনকেন্দ্রটি সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে। পাশাপাশি সেখানে অবস্থানরত পর্যটকদের মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বিকেল ৫টার মধ্যে নিরাপদে এলাকা ছেড়ে নিজ নিজ গন্তব্যে ফেরার নির্দেশ দেওয়া হয়।
বিজ্ঞাপন
সাজেক রিসোর্ট মালিক সমিতির সভাপতি সুপর্ণ দেব বর্মণ বলেন, জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী মঙ্গলবার বিকেলের মধ্যে সব পর্যটক সাজেক ত্যাগ করেছেন। তবে অনির্দিষ্টকালের নিষেধাজ্ঞায় সাজেকের পুরো ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্রুত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য তারা প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছেন।
ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতির ক্ষতি কমানোর বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে নিরাপদ পরিবেশে দ্রুত পর্যটন কার্যক্রম চালুর দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে বুকিং বাতিল, অগ্রিম অর্থ ফেরত, কর্মীদের বেতন ও নিয়মিত পরিচালন ব্যয়ের কারণে সৃষ্ট আর্থিক চাপ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা।








