টানা বৃষ্টি আরও কতদিন, কী বলছে আবহাওয়া অধিদপ্তর?

মৌসুমি বায়ুর সক্রিয় প্রভাবে কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অব্যাহত বৃষ্টিপাত চলছে। কোথাও মাঝারি, কোথাও আবার অতি ভারী বর্ষণে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা, আকস্মিক বন্যা এবং পাহাড়ধসের মতো দুর্যোগ। বিশেষ করে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য জেলাগুলোতে পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়তে থাকায় নতুন করে বন্যা পরিস্থিতির আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
বিজ্ঞাপন
টানা বর্ষণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বান্দরবানের বিভিন্ন এলাকায় গত তিন দিনে একাধিক পাহাড়ধসের ঘটনায় অন্তত ২৩ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে নদীর পানি উপচে পড়ে এবং জলাবদ্ধতার কারণে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে। অনেক নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই টানা বৃষ্টি আর কতদিন চলবে এবং বন্যা পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা কতটা?
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৃহস্পতিবারও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগের অনেক স্থানে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের অধিকাংশ এলাকাতেও হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টির সঙ্গে কোথাও কোথাও ভারী বর্ষণ হতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বাংলাদেশের ওপর মৌসুমি বায়ু এখনও সক্রিয় রয়েছে এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে এটি প্রবল অবস্থায় বিরাজ করছে। এ কারণে আগামী অন্তত দুই দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। তবে পাঁচ দিনের বর্ধিত পূর্বাভাসে বৃষ্টির প্রবণতা ধীরে ধীরে কমে আসার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার বৃষ্টিপাতের হিসাবেও দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত চট্টগ্রামের আমবাগান স্টেশনে সর্বোচ্চ ৩২৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া কুতুবদিয়ায় ৩০০ মিলিমিটার, চট্টগ্রাম শহরে ২৪৯ মিলিমিটার, বান্দরবানে ২৩৫ মিলিমিটার, গোপালগঞ্জে ১৪২ মিলিমিটার, রাঙামাটিতে ১৩০ মিলিমিটার, কক্সবাজারে ১২৫ মিলিমিটার এবং তেঁতুলিয়ায় ১২২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে উজানের ভারতীয় রাজ্যগুলোতেও ভারী বর্ষণ অব্যাহত রয়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, ভারতের ত্রিপুরা, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গে আগামী ২৪ ঘণ্টায় আরও ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এর প্রভাবে বাংলাদেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদ-নদীগুলোর পানি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, দেশের ভেতরে গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়েছে চট্টগ্রামে। আর উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জিতে ২২৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা সীমান্তবর্তী নদীগুলোর পানির প্রবাহ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বর্তমানে দেশের অন্তত ছয়টি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পার্বত্য জেলা বান্দরবানের সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। সাঙ্গু নদীর পানি বান্দরবান পয়েন্টে বিপৎসীমার ১৪২ সেন্টিমিটার এবং দোহাজারী পয়েন্টে ১৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একইভাবে মাতামুহুরী নদীর পানি লামা পয়েন্টে ১৫৪ সেন্টিমিটার এবং কক্সবাজারের চিরিঙ্গা পয়েন্টে ৪৯ সেন্টিমিটার ওপরে রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের কয়েকটি নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। কুশিয়ারা নদীর পানি সুনামগঞ্জের মারকুলি পয়েন্টে বিপৎসীমার ১১ সেন্টিমিটার ওপরে রয়েছে। এছাড়া মনু নদী, ধলাই নদী ও খোয়াই নদীর বিভিন্ন পয়েন্টেও পানি বিপৎসীমা ছাড়িয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট জেলার নদীতীরবর্তী নিচু এলাকায় ইতোমধ্যে পানি প্রবেশ করেছে এবং আগামী ২৪ ঘণ্টায় পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সর্দার উদয় রায়হান জানিয়েছেন, ভারতের আসাম, ত্রিপুরাসহ উজানের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় বাংলাদেশের নদীগুলোতেও পানির প্রবাহ বাড়তে পারে। তিনি বলেন, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের তিস্তা অববাহিকার নদীগুলোর পানি দ্রুত বাড়ছে এবং আগামী ২৪ ঘণ্টায় সেখানে সাময়িক বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বর্তমানে তিস্তা নদীর পানি নীলফামারীর ডালিয়া, লালমনিরহাটের কাউনিয়া ও গাইবান্ধার তারাপুর পয়েন্টে বিপৎসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে। একই সঙ্গে কুশিয়ারা নদী সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের শেরপুর পয়েন্টে এবং সোমেশ্বরী নদী নেত্রকোনার কলমাকান্দা ও সুনামগঞ্জের লরেরগড় পয়েন্টে সতর্কসীমার কাছাকাছি প্রবাহিত হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
এদিকে অব্যাহত ভারী বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রাখা হয়েছে।
আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, বৃষ্টিপ্রবণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে সতর্ক থাকতে হবে এবং পাহাড়ঘেঁষা ও নিচু এলাকায় অবস্থানকারীদের প্রয়োজন হলে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার প্রস্তুতি রাখতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।







