পাইকগাছায় ১৭৩ জাতের ফল ও সবজি চাষে স্বাবলম্বী তরুণ উদ্যোক্তা বিধান

খুলনার পাইকগাছায় ১৭৩ জাতের ফল ও সবজি চাষ করে সবুজ বিপ্লবে সাবলম্বী হয়েছেন তরুণ উদ্যোক্তা বিধান মন্ডল। আগাছাপূর্ণ ও পতিত জমিতে যেখানে ছিল বিষাক্ত সাপ পোকামাকড় আর ইঁদুরের অভয়ারণ্য।
বিজ্ঞাপন
দীর্ঘদিন যাবত অবহেলায় পড়ে থাকা খালের দুই পাড় আজ যেন এক অপূর্ব সবুজ প্রান্তরে রুপ নিয়েছে। সবুজ শস্যের বেষ্টনিতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন কৃষক, আর সেই দৃশ্য দেখে অভিভূত আশ পাশের এলাকাবাসী উপজেলার দেলুটির ২২ নং পোল্ডারের ডিহিবুড়া খালের দুপাড়ে যে দৃশ্যপট গড়ে উঠেছে তা এক কথায় সবুজ বিপ্লব।
এই বিপ্লবের কারিগর তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা বিধান মণ্ডল। মাছ চাষের পাশাপাশি তিনি খালের দুপাড়ে পতিত জমি চাষের আওতায় এনে গড়ে তুলেছেন এক ভিন্ন রকম কৃষি উদ্যোগ। তার হাত ধরেই আজ সেই খাল পাড়ের জমি থেকে উঠছে দেশি-বিদেশি নানা জাতের ফল-সবজি। যা বাজারজাত হয়ে পৌঁছাবে কোটি টাকার ঘরে। উপজেলার কালিনগর সেনেরবেড়ে অবস্থিত প্রায় ১৫ একর আয়তনের ডিহিবুড়া খাল। সরকারি উদ্যোগে খনন করা হয়েছিল পানি সরবরাহ ও কৃষিকাজের জন্য।
পরবর্তীতে উপজেলা প্রশাসন টেন্ডারের মাধ্যমে খালটি ৩ বছরের জন্য সোনারবাংলা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির কাছে ইজারা দেন। তিনি খালের ১৫ একরের মধ্যে জনসাধারণের জন্য ১৩ একর উন্মুক্ত রাখেন। আর বাকি ২ একরে গলদা চিংড়ি ও রুই জাতীয় মাছ চাষ শুরু করেন। শুধু তাই নয়, খালের দুপাড়ের প্রায় ৩৩ একর জমি চাষের আওতায় এনে উৎপাদনে যুক্ত করেন বিভিন্ন ফল ও সবজি। খালের দুপাশ জুড়ে মাচায় ঝুলছে দেশি-বিদেশি ১১ জাতের অফসিজন তরমুজ, ১১ জাতের সাম্মাম, ৬ জাতের বাঙ্গিসহ মোট ১৭৩ জাতের ফল ও সবজি। সবজি খেতের ভেতর দিয়ে হাঁটলে চোখে পড়ে লাউ, করলা, বরবটি, চুই, মিষ্টি কুমড়াসহ নানা রঙের সবজির সমাহার।
বিজ্ঞাপন
বর্তমানে প্রতিদিন ৪০ জন নারী-পুরুষ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হচ্ছে এই খালপাড়ে। ফলে শুধু কৃষিই নয়, সৃষ্টি হয়েছে গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন কর্মচাঞ্চল্য। কৃষক বিধান মণ্ডলের হিসেবে ৩০ হাজার তরমুজ গাছে প্রতিটি গাছে গড়ে ২-৩ টি করে ফল ধরছে। এতে উৎপাদন হবে অন্তত ৬০-৬৫ হাজার তরমুজ। প্রতিটির ওজন আড়াই কেজি থেকে সাড়ে ৮ কেজি পর্যন্ত। বাজারদর কেজিপ্রতি ৪০ টাকা হলে তরমুজ বিক্রি হবে প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ লাখ টাকা। ২৪ হাজার সাম্মাম গাছে প্রতিটি গাছে ৩-৪টি করে ফল ধরছে। প্রতিটি সাম্মামের ওজন ৫০০ গ্রাম থেকে দেড় কেজি পর্যন্ত। বাজারে কেজিপ্রতি ৬০ টাকা হলে সাম্মাম বিক্রি হবে প্রায় ১৫ লাখ টাকা। ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রজাতির করলা, লাউ, বরবটি ইত্যাদি সাপ্তাহিক ২০০ কেজি হারে বাজারজাত শুরু হয়েছে।
সব মিলিয়ে তার খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬০ লাখ টাকা, আর প্রত্যাশিত আয় হবে প্রায় কোটি টাকারও বেশি। স্থানীয় জমির মালিক কাত্তিক চন্দ্র সরদার বলেন, বিধান মণ্ডল খালের দুপাড়ে আমাদের পরিত্যক্ত জমি পরিস্কার করে কাজে লাগিয়ে শুধু ফসল ফলাননি, আমাদেরও নতুন স্বপ্ন দেখিয়েছেন। এখন আমরা কৃষিকাজে আগ্রহী হয়ে উঠছি।
বিজ্ঞাপন
শ্রীকান্ত হালদার জানান, আমার বাড়ি পাশের গ্রামে হলেও বিধান বাবুর অভূতপূর্ব ফল ও ফসল উৎপাদন দেখতে এসেছি। আমার মত প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এ কৃষি প্রজেক্ট দেখতে আসছে। আগামীতে আমরাও আধুনিক কৃষির সাথে সম্পৃক্ত হবো।
উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুমিত দেবনাথ জানান, বিধান বাবুর অধুনিক কৃষি প্রজেক্টের সকল ধরনের সমস্যা ও সম্ভাবনার পাশে উপজেলা কৃষি অফিস সব সময় কাজ করছে।
বিজ্ঞাপন
বিধান মণ্ডল জানান, তিনি ইউটিউব চ্যানেল ও কৃষি গ্রুপের মাধ্যমে উন্নতমানের বীজ সংগ্রহ করেছেন। সার প্রয়োগে জৈবসার ব্যবহার করেছেন এবং রোগবালাই দমনে ব্যবহার করেছেন বহুজাতিক সিনজেনটা কোম্পানির বালাইনাশক।
তিনি আরও বলেন, আমি চেষ্টা করেছি আধুনিক প্রযুক্তি আর স্থানীয় মানুষের সহায়তায় কিছু করার। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২০ দিনের মধ্যে বাজারজাত শেষ হবে। আশা করছি ভালো দাম পাওয়া যাবে। দুশ্চিন্তা রয়ে গেছে তবে এই সফলতার মাঝেও বিধান মণ্ডলের একটাই দুশ্চিন্তা ঝুঁকিপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা। ফসল বাজারজাত করতে ভাঙা রাস্তা আর দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে আমাকে অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি এই সমস্যা সমাধান করে, তবে আমাদের মতো কৃষকদের স্বপ্ন আরও বড় আকারে বাস্তবায়িত হবে। যাহাতে আগামীতে আরও কৃষি উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে আমার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। সকলের সহযোগিতা কামনা করছি।
বিজ্ঞাপন
উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ একরামুল হোসেন জানান, দ্বীপ বেষ্টিত দেলুটী ইউনিয়নের কালীনগর এলাকায় বিধান মন্ডল পতিত জমিতে আধুনিক কৃষি প্রজেক্ট তৈরি করেছেন। সেখানে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জাতের ফল ফসল উৎপাদন করে সাড়া ফেলেছেন। উপজেলা কৃষি অফিস শুরু থেকে পরামর্শ দিয়ে পাশে থেকে কাজ করছে।








