Logo

চাল আমদানির খবরে ধানের দামে ধ্বস, ঋণ শোধে হিমশিম কৃষক

profile picture
উপজেলা প্রতিনিধি
বগুড়া
২৯ নভেম্বর, ২০২৫, ১২:১৯
13Shares
চাল আমদানির খবরে ধানের দামে ধ্বস, ঋণ শোধে হিমশিম কৃষক
ছবি: প্রতিনিধি

রোপা–আমন মৌসুমে ধান কাটা-মাড়াই শুরু হলেও বাজারে ধানের দামের ধ্বস নামায় বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। মাঠে বাম্পার ফলন হলেও লাভের বদলে লোকসান গুনতে হচ্ছে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার কৃষকদের। তার ওপর ভরা মৌসুমে ভারত থেকে শুল্কমুক্ত সুবিধায় ১ লাখ মেট্রিক টন চাল আমদানির খবর বাজারে ছড়িয়ে পড়ায় ধানের দাম আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। দাম কম থাকলেও ঋণ পরিশোধে তাড়াহুড়ো করেই তারা নতুন ধান বাজারে তুলতে বাধ্য হচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্র বলছে, শেরপুরে এ বছর রোপা-আমন ধানের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২২ হাজার ৩২৫ মেট্রিক টন। অর্জন হয়েছে ২২ হাজার ৪৬০ মেট্রিক টন। চাষ হয়েছে ব্রি–৩৪, ৪৯, ৫১, ৫২, ৭৫, ১০৩ এবং কাটারি, স্বর্ণা ও রনজিৎ জাতের ধান । এ পর্যন্ত ৬৫% ধান কাটা হয়েছে।

উপজেলার বিভিন্ন হাট ঘুরে দেখা গেছে নতুন ধান উঠতে থাকায় সরবরাহ হঠাৎ বেড়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, অতিরিক্ত যোগানের চাপেই ধানের দাম কমে গেছে। তবে চাল আমদানির খবরের প্রভাব আছে বলে জানান অনেকে। হাটে ব্রি–৫১ ধান বিক্রি হচ্ছে ১,১৫০ থেকে ১,২২০ টাকা দরে, স্বর্ণা–৫ বিক্রি হচ্ছে ১,১২০ থেকে ১,২৫০, ব্রি–৪৯ বিক্রি হচ্ছে ১,২৫০ থেকে ১,৩২০ টাকা দরে। নতুন কাটারি বিক্রি হচ্ছে ১,৫৫০–১,৭০০ টাকায়। এর ফলে এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতিমন ধানের দাম ১০০–১২০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। অপরদিকে পুরাতন কাটারি ১৭৫০ থেকে ১৮১০ থেকে ১৮২০ টাকা দরে বেচা কেনা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

কৃষকদের অভিযোগ, সরকারের নির্ধারিত দর, প্রতি কেজি ৩৪ টাকা (প্রতিমন ১,৩৬০ টাকা), বাজারে কোনো প্রভাবই ফেলছে না। চাষিরা বলছেন, এবার ঝড়-বৃষ্টি তে ক্ষতি ও সার, বীজ, বালাইনাশক, শ্রমিকসহ সব খরচ বেড়ে যাওয়ায় এবার ধানের গড় উৎপাদন ব্যয় বিঘাপ্রতি ১১–১২ হাজার টাকা। কিন্তু দাম না থাকায় সেই খরচই তুলতে পারছেন না তারা। চাষিদের অভিযোগ-ব্যবসায়ীরা নিজের মতো করে দাম নিয়ন্ত্রণ করছেন।

এদিকে ভোরা মৌসুমে শুল্কমুক্ত সুবিধায় ভারত থেকে ১ লাখ মেঃ টন চাল আমদানির খবর বাজারে ছড়িয়ে পরায় ধানের দাম নিম্নমুখী। ধানের পাইকাররা ধানের দাম কম বলছেন বলে জানান শেরপুরের তালতলায় হাটে ধান বেচতে আসা কৃষক অহিদুল, শামিম, আব্দুল হাকিমসহ অনেকে। এই ভোরা মৌসুমে আমদানি করায় বাজারে চালের দাম ৫ টাকা কমলেও কৃষক ধান উৎপাদনে নিরুতসায়ী হবে বলে জানান অনেক কৃষক।

ভবানীপুুর ইউনিয়নের কৃষক ফিরোজ আহমেদ জানান, বিঘায় ১৪ মন ফলন হলেও লাভ নেই। দাম না থাকলে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবো। খামারকান্দির আবু সাইদ বলেন, এবার ঝড়–বৃষ্টিতে ধানের ক্ষতি হয়েছে। বিঘায় ২০ মনের জায়গায় ১৩ মন পেয়েছি। ৫–৬ হাজার টাকা লোকসান হবেই।

বিজ্ঞাপন

এবার হঠাৎ ঝর, বৃষ্টি ও বাতেসের কারনে তাদের ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে জানান, খানপুর ইউনিয়নের রুহুল আমিন, খামারকান্দি ইউপির আবু সাইদ ও আরমান হোসেন, তারা জানান, এক বিঘায় ধান উৎপাদনে তাদের খরচ ১১-১২ হাজার টাকা। সবকিছুরই দাম বেশি। তারপর মোবাইলের যুগে ভারত থেকে চাল আমদানির খবর ছরিয়ে পরায় দাম কমার উপরই আছে, এবার ধানে লোকসান হবে।

আরেক কৃষক মিজানুর রহমান জানান, এক সপ্তাহ আগেও স্বর্ণা-৫ বিক্রি করেছি ১২০০ টাকায়। আজ একই ধান ১১০০ টাকায় দিতে হচ্ছে। মৌসুমের শুরুতে ব্যবসায়ীরা দাম আরও কমিয়ে রাখেন। অনেকেই কিস্তির ওপর ঋণ ও ধার নিয়ে চাষ করে। ফলে ঋণ পরিশোধে চাপের কারনে তারা আগাম ধান বিক্রি করতে বাধ্য হন।

বিজ্ঞাপন

বাজারে চাল কিনতে আসা আব্দুল হালিম বলেন, সুবল লতা বস্তা বিক্রি হচ্ছে, ৪৮০০ টাকা আর কেজি ৫৩ টাকা, কাটারি বস্তা ৬৩০০ টাকা ও কেজি ৬৫ টাকা।

উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আব্দুল হান্নান শেখ বলেন, এ মৌসুমে সরকারিভাবে শেরপুর উপজেলায় ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৪০ মেট্রিক টন এবং চাল ৮ হাজার ৮৮ মেট্রিক টন। সরকার প্রতি কেজি চাল ৫০ টাকা এবং ধান ৩৪ টাকা দরে সংগ্রহ করছে। তিনি জানান, ধান–চাল সংগ্রহ অভিযান বছরে দুই মৌসুমে পরিচালিত হয় এবং ধানের মূল্য পরিধারণ কমিটির মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে কৃষকের আবেদন গ্রহণ করে তালিকা চূড়ান্ত করা হয়, পরে তাদের কাছ থেকেই সরাসরি ধান কেনা হয়। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে ‘আগে আসলে আগে ভিত্তিতে’ কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করা হয়। বাজারে ধানের দাম কমে যাওয়ায় সরকারি সংগ্রহ কর্মসূচি কৃষকদের কিছুটা স্বস্তি দেবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা জুলফিকার হায়দার বলেন, এ বছর রোপা–আমনের উৎপাদন খুবই ভালো হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে রোগবালাইয়ের আক্রমণ তুলনামূলকভাবে কম দেখা গেছে। ঝড় বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত পরামর্শ ও সহায়তা প্রদান করা হওয়ায় উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজারদর কিছুটা কমলেও সামগ্রিকভাবে উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে কৃষক উপকৃত হবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

বিজ্ঞাপন

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা জানান, ধান উৎপাদনে মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের সব ধরনের সহযোগিতা করছে কৃষি বিভাগ। তিনি বলেন, মাটির জৈব পদার্থ বৃদ্ধির জন্য মৃত্তিকা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরামর্শ অনুযায়ী কৃষকদের মাটি পরীক্ষা করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এতে মাটির গুণগত মান বাড়বে এবং বগুড়ায় উৎপাদিত ধানের মান আরও বিশ্বমানের পর্যায়ে উন্নত হবে।

জেবি/আরএক্স
Logo

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ

মোঃ শফিকুল ইসলাম ( শফিক )

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ৫৭, ময়মনসিংহ লেন, ২০ লিংক রোড, বাংলামটর, ঢাকা-১০০০।

ফোনঃ 02-44615293

ই-মেইলঃ dailyjanobaninews@gmail.com; dailyjanobaniad@gmail.com

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৫

Developed by: AB Infotech LTD