এজাজের সামনে ২৫ বছর পর আশার আলো

দক্ষিণে সুন্দরবনের পাদদেশ আর উত্তরে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিঁড়ি পর্যন্ত বিস্তৃত খুলনা-১ সংসদীয় আসন। খুলনা জেলার দাকোপ উপজেলা ও খুলনা মহানগর-সংলগ্ন বটিয়াঘাটা উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনটি বরাবরই আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে এবারের নির্বাচনে দলটির কোনো প্রার্থী না থাকায় পাল্টে গেছে রাজনৈতিক সমীকরণ।
বিজ্ঞাপন
আওয়ামী লীগবিহীন এই মাঠে সুযোগ হিসেবে দেখছেন ১০টি রাজনৈতিক দলের ১২ জন প্রার্থী। তবে ভোটের আলোচনায় এগিয়ে আছেন বিএনপির আমীর এজাজ খান, জামায়াতের কৃষ্ণ নন্দী এবং সিপিবির কিশোর কুমার রায়।
ভোটার সংখ্যা ও এলাকার বৈশিষ্ট্য: খুলনা-১ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৭ হাজার ১০৩ জন। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক নারী ভোটার। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী দাকোপ উপজেলায় ৫৪ শতাংশ মানুষ হিন্দু ধর্মাবলম্বী, বটিয়াঘাটায় এই হার ২৭ শতাংশ।
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ছাড়া বাকি সব সংসদ নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরাই বিজয়ী হয়েছেন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির প্রার্থীরা।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন: কুষ্টিয়া কারাগারে হাজতির রহস্যজনক মৃত্যু
নিরুত্তাপ মাঠে এজাজের আশাবাদ: এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ভোট নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তেমন উত্তেজনা বা আগ্রহ নেই। এই নিরুত্তাপ পরিবেশকে বিএনপি প্রার্থী আমীর এজাজ খানের সামনে ‘আশার আলো’ হিসেবে দেখছেন তার সমর্থকরা।
২০০১ সাল থেকে টানা এই আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন আমীর এজাজ খান। প্রতিবার পরাজিত হলেও ভোটের ব্যবধান কমিয়েছেন তিনি। আওয়ামী লীগ প্রার্থী না থাকায় এবার তাকেই সবচেয়ে ‘ফেভারিট’ প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করছেন স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা।
বিজ্ঞাপন
আমীর এজাজ খান বলেন, “অতীতে পরাজিত হলেও আমি মাঠ ছাড়িনি। বিপদে-আপদে সব সময় মানুষের পাশে ছিলাম। মানুষের জন্য কাজ করে গেছি, এখনও করছি। এবার মানুষ তার প্রতিদান দেবে। আমি বিজয়ী হবো।”
কৃষ্ণ নন্দী: জামায়াতের ব্যতিক্রমী মুখ খুলনা-১ আসনে জামায়াতের সাংগঠনিক অবস্থান ঐতিহাসিকভাবে দুর্বল। ১৯৯৬ সালের পর দলটি আর কোনো প্রার্থী দেয়নি। সে বছর জামায়াত প্রার্থী শেখ মো. আবু ইউসুফ পেয়েছিলেন মাত্র ২ হাজার ৩০৮ ভোট।
এবার শুরুতে তাকেই প্রার্থী করা হলেও গত ৩ ডিসেম্বর প্রার্থী বদল করে জামায়াত ডুমুরিয়া উপজেলা হিন্দু কমিটির সভাপতি কৃষ্ণ নন্দীকে মনোনয়ন দেয়। প্রচারণা শুরু করার পর থেকেই তিনি বেশ সাড়া ফেলেছেন।
বিজ্ঞাপন
ডুমুরিয়ার চুকনগরের বাসিন্দা কৃষ্ণ নন্দী অল্প সময়ের মধ্যেই দাকোপ ও বটিয়াঘাটায় আলোচনায় এসেছেন। তার সাদাসিধে ও রসাত্মক কথাবার্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে তরুণ ভোটারদের কাছে তাকে পরিচিত করে তুলেছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের একজন ব্যক্তি জামায়াতের প্রার্থী হওয়ায় বিষয়টি বাড়তি নজর কাড়লেও দলের ভেতরে কিছুটা অসন্তোষও তৈরি হয়েছে।
কৃষ্ণ নন্দী বলেন, “আমি প্রার্থী হয়ে জামায়াত সম্পর্কে হিন্দুদের ভুল ধারণা ভেঙেছি। মানুষ পরিবর্তন চায়। আমি নির্বাচিত হলে এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর কোনো আঘাত আসতে দেব না।”
বিজ্ঞাপন
আলোচনায় সিপিবির কিশোর কুমার সিপিবির প্রার্থী কিশোর কুমার রায়ও ভোটের মাঠে আলোচনায় রয়েছেন। তিনি এর আগে দাকোপ উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ জুন অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে ২৪ হাজার ৫৭১ ভোট পেয়ে যুবলীগ নেতা জাহিদুর রহমানকে পরাজিত করেন।
কিশোর কুমার রায় বলেন, “এলাকার মানুষ সুখে-দুঃখে সব সময় আমাকে পাশে পেয়েছে। আগের নির্বাচনে তারা আমাকে ভোট দিয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তারা আমাকে বিজয়ী করবে বলে বিশ্বাস করি।”
অন্য প্রার্থীরা: এ আসনের অন্যান্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন—বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের সুনীল শুভ রায়, জাতীয় পার্টির মো. জাহাঙ্গীর হোসেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আবু সাঈদ, জেএসডির প্রসেনজিৎ দত্ত, বাংলাদেশ মাইনরিটি জাতীয় পার্টির প্রবীর গোপাল রায়, গণ অধিকার পরিষদের জি এম রোকনুজ্জামান, বাংলাদেশ সম অধিকার পরিষদের সুব্রত মণ্ডল এবং দুই স্বতন্ত্র প্রার্থী গোবিন্দ হালদার ও চালনা পৌরসভার সাবেক মেয়র অচিন্ত্য কুমার মণ্ডল। তবে তাদের নিয়ে তেমন আলোচনা নেই।
বিজ্ঞাপন
প্রশাসনের প্রস্তুতি: রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক আ স ম জামশেদ খোন্দকার জানান, নির্বাচনী এলাকার পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রয়েছে। ভোটের দিন সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বিজিবির পাশাপাশি উপকূলীয় কয়েকটি ইউনিয়নে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবে।
স্থানীয় ভোটারদের মতে, খুলনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোট পড়ে এই আসনে। সহিংসতার রেকর্ডও তুলনামূলক কম। তবে কে জিতবে—তা ১২ ফেব্রুয়ারির রাতের আগে বলা কঠিন।








