আড়াই শতাব্দীর ঐতিহ্য বুকে ধারণ করে চলছে কুন্ডুবাড়ির মেলা

মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলায় দীপাবলি ও কালীপূজা উপলক্ষে প্রায় ২৪৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে ঐতিহ্যবাহী কুন্ডুবাড়ির মেলা। সময়ের পরিবর্তন, আধুনিকতার প্রভাব কিংবা সামাজিক রূপান্তর—সবকিছুর মধ্যেও এই মেলা তার নিজস্ব লোকজ বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহ্য অটুট রেখে টিকে আছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। বাংলার সংস্কৃতি, সামাজিক বন্ধন ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে আজও এটি পরিচিত।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয়দের মতে, ১৭৮৩ সালের দিকে ভুরঘাটা এলাকার দীননাথ কুন্ডু ও মহেশ কুন্ডু দীপাবলি ও কালীপূজাকে কেন্দ্র করে এই মেলার সূচনা করেন। কুন্ডু পরিবারের নাম অনুসারেই এটি পরবর্তীতে কুন্ডুবাড়ির মেলা নামে পরিচিতি লাভ করে। সেই সময় দীপাবলির পরদিন আশপাশের কালী প্রতিমাগুলো একত্র করা হতো এবং সেরা প্রতিমার জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থাও ছিল। পাশাপাশি পুতুলনাচ, কবিগান, জারিগান, পালাগান ও নৌকাবাইচের মতো লোকজ বিনোদন ছিল মেলার অন্যতম আকর্ষণ।
সময়ের সঙ্গে অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে গেলেও এখনও টিকে আছে নাগরদোলার মতো কিছু বিনোদনমূলক আয়োজন। বর্তমানে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি এটি একটি বৃহৎ লোকজ মেলায় পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রতিমা প্রদর্শন ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মিলনমেলা ঘটে।
বিজ্ঞাপন
কালকিনি পৌরসভার গোপালপুর এলাকার কুন্ডুবাড়ি মন্দির ঘিরে আয়োজিত এই মেলা প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত হয়। ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের গোপালপুর থেকে ভুরঘাটা পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে শত শত অস্থায়ী দোকান বসে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ব্যবসায়ীরা এখানে কাঠ, বাঁশ, বেত ও মাটির তৈরি নানা পণ্য নিয়ে হাজির হন। বিশেষ করে কাঠের আসবাবপত্রের জন্য এই মেলার আলাদা খ্যাতি রয়েছে। খাট, আলমারি, চেয়ার-টেবিলসহ বিভিন্ন গৃহস্থালি সামগ্রী এখানে ব্যাপকভাবে বিক্রি হয়।
মেলা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত কুন্ডু পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে মন্দিরের উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে ভূমিকা রেখে আসছেন। পরিবারের একাধিক সদস্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মেলা আয়োজন ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করছেন।
আয়োজকদের ভাষ্যমতে, কালীপূজার পরদিন থেকেই মূল মেলার কার্যক্রম শুরু হলেও কয়েকদিন আগে থেকেই ব্যবসায়ীরা প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। পূজার সময় থেকেই ক্রেতা-বিক্রেতার আনাগোনা বাড়তে থাকে। মেলা চলাকালীন পুরো এলাকা রূপ নেয় জনসমুদ্রে, যেখানে দূরদূরান্ত থেকে হাজারো মানুষ ভিড় করেন।
বিজ্ঞাপন
এখানে শুধু কেনাবেচাই নয়, বরং এটি হয়ে ওঠে একটি সামাজিক মিলনমেলা। পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরতে আসা মানুষদের ভিড়ে মুখর থাকে পুরো এলাকা। শিশু-কিশোরদের জন্য থাকে নাগরদোলা, খেলাধুলা ও বিনোদনের নানা আয়োজন। পাশাপাশি হস্তশিল্প, মাটির পণ্য, বাঁশ-বেতের সামগ্রী ও গ্রামীণ খাবারের পসরা মেলাটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও কুন্ডুবাড়ির মেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গ্রামীণ কারিগর ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য এটি একটি বড় বাজার, যেখানে তারা সরাসরি ক্রেতাদের কাছে পণ্য বিক্রি করতে পারেন। অনেকের কাছেই এই মেলা বছরের অন্যতম আয়ের উৎস হিসেবে বিবেচিত।
স্থানীয়দের মতে, দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম বড় লোকজ মেলা হিসেবে পরিচিত এই আয়োজনকে ঘিরে প্রতি বছরই হাজারো মানুষের সমাগম ঘটে। দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষদের কাছে এটি কেবল কেনাকাটার স্থান নয়, বরং এক আবেগের নাম।
বিজ্ঞাপন
একজন দীর্ঘদিনের ব্যবসায়ী জানান, ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন ডিজাইনের কাঠের আসবাবপত্র এখানে আনা হয়। প্রতিযোগিতামূলক দামে বিক্রির কারণে প্রতিদিনই বিপুল সংখ্যক ক্রেতা সমাগম ঘটে।
তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে মেলার সময়কাল ও আয়োজনে কিছু পরিবর্তন এসেছে। আগে পাঁচ-ছয় দিনব্যাপী চললেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রশাসনিক অনুমতির ভিত্তিতে এর সময়সীমা কমে এসেছে। এরপরও ঐতিহ্যগত গুরুত্ব ও জনপ্রিয়তায় কোনো ঘাটতি পড়েনি।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয়রা মনে করেন, কুন্ডুবাড়ির এই মেলা শুধু ধর্মীয় বা বাণিজ্যিক আয়োজন নয়, বরং এটি সামাজিক ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের প্রতীক। প্রতিবছরই এটি মানুষের মধ্যে উৎসবের আমেজ তৈরি করে, পুরোনো সম্পর্কের পুনর্মিলন ঘটায় এবং নতুন স্মৃতির জন্ম দেয়।
কুন্ডুবাড়ি মন্দিরের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি জানান, এই মেলা তাদের পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য বহন করছে এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের অংশগ্রহণে এটি একটি বিশাল সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। তারা চান, এই ঐতিহ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যেও অটুটভাবে টিকে থাকুক।







