Logo

পাহাড়ে মিলনের উৎসব, একদিনেই গাঁথা সম্প্রীতির অটুট বন্ধন

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ১৬:৩৭
পাহাড়ে মিলনের উৎসব, একদিনেই গাঁথা সম্প্রীতির অটুট বন্ধন
ছবি: সংগৃহীত

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে বসবাসরত বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের কাছে নববর্ষ মানেই শুধু উৎসব নয়, বরং একতা, ভালোবাসা ও সম্প্রীতির প্রতীক। জাতিগত বিভেদ, হিংসা-বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে সবাইকে এক সুতোয় গাঁথে যে আয়োজন, তার নাম ‘বৈসাবি’। শত বছরের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জীবনযাপনের নানা রঙে রাঙানো এই উৎসব পাহাড়ি জনপদের মানুষের মধ্যে মিলন ও উন্নয়নের স্বপ্ন জাগায়।

বিজ্ঞাপন

রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান—এই তিন পার্বত্য জেলায় বসবাসরত ১১টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে অন্তত আটটি সম্প্রদায়ের প্রধান সামাজিক উৎসব এখন ‘বৈসাবি’ নামে পরিচিত। ত্রিপুরাদের ‘বৈসু’, মারমাদের ‘সাংগ্রাই’, চাকমাদের ‘বিজু’সহ বিভিন্ন উৎসবের নামের আদ্যক্ষর মিলিয়েই গড়ে উঠেছে ‘বৈসাবি’ শব্দটি। যদিও এ নামের উৎপত্তি নিয়ে মতভেদ রয়েছে, তবু এটি এখন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত পরিচয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বৈসাবি উৎসব পেয়েছে নতুন মাত্রা। একসময় যেখানে ছিল শুধুই নিজস্ব আচার-অনুষ্ঠান, সেখানে এখন যুক্ত হয়েছে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, নদীতে ফুল ভাসানো, মৈত্রী পানিবর্ষণ, ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বিশেষ করে ১৯৯০-এর দশক থেকে এই সম্মিলিত উৎসবের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে।

বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রত্যেক জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি ও ধর্মীয় রীতিনীতির আলোকে বর্ষবরণ করার দীর্ঘ ঐতিহ্য থাকলেও একত্রে উদযাপনের ধারণা থেকেই ‘বৈসাবি’ শব্দটির প্রচলন ঘটে। এটি এখন পাহাড়ের সবচেয়ে বড় সামাজিক আয়োজন হিসেবে স্বীকৃত।

ত্রিপুরা, মারমা ও চাকমা—এই তিন বৃহৎ জাতিগোষ্ঠীর উৎসবের ধরন আলাদা হলেও মূল ভাবনা এক।

ত্রিপুরাদের ‘বৈসু’ বা ‘বৈসুক’ তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম দিনে ঘরবাড়ি পরিষ্কার করে ফুল দিয়ে সাজানো হয়, দ্বিতীয় দিনে ঐতিহ্যবাহী খাবার রান্না ও অতিথি আপ্যায়ন, আর তৃতীয় দিনে আনন্দ-উৎসব ও প্রার্থনার মধ্য দিয়ে নতুন বছরকে বরণ করা হয়।

বিজ্ঞাপন

মারমাদের ‘সাংগ্রাই’ উৎসবেও একইভাবে তিন দিনের আয়োজন থাকে। ঘরবাড়ি পরিষ্কার, ফুল দিয়ে সাজানো, ধর্মীয় আচার পালন এবং শেষ দিনে অতিথি আপ্যায়নের মাধ্যমে উৎসব সম্পন্ন হয়। এ সময় অনেকেই ধর্মীয় নিয়ম মেনে জীবনযাপন করেন।

অন্যদিকে চাকমাদের ‘বিজু’ উৎসবেও তিন দিনের বিশেষ আয়োজন থাকে। ফুল ভাসানোর মাধ্যমে শুরু, পরে ঐতিহ্যবাহী ‘পাজন’ রান্না ও অতিথি আপ্যায়ন, আর শেষ দিনে আনন্দ-উল্লাসে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয়।

গবেষকদের মতে, শত শত বছর ধরে পার্বত্য অঞ্চলের প্রতিটি জনগোষ্ঠী নিজস্ব কৃষ্টি-সংস্কৃতির আলোকে নববর্ষ উদযাপন করে আসছে। তবে বৈসাবি সেই বিচ্ছিন্ন উদযাপনগুলোকে একত্র করেছে, তৈরি করেছে সম্মিলিত পরিচয়।

বিজ্ঞাপন

অনেকে মনে করেন, স্বাধীনতার পর পার্বত্য অঞ্চলে প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে ওঠার পর থেকেই সম্মিলিতভাবে নববর্ষ উদযাপনের ধারণা জোরদার হয়। আবার কেউ কেউ বলছেন, সাংস্কৃতিক ঐক্যের প্রয়োজন থেকেই এ নামের প্রচলন।

চৈত্র মাসের শেষ দুই দিন এবং বৈশাখের প্রথম দিনকে কেন্দ্র করে মূলত তিন দিনের এ উৎসব পালিত হলেও বর্তমানে এর ব্যাপ্তি বেড়ে প্রায় দুই সপ্তাহজুড়ে বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজন করা হচ্ছে।

উৎসবে থাকে র‌্যালি, নাচ-গান, ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা, প্রতিযোগিতা, ধর্মীয় প্রার্থনা এবং সামাজিক মিলনমেলা। নদী-খাল-বিলে ফুল ভাসানো, জলকেলি, দড়ি টানাটানি, কুস্তি, লোকজ খেলা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এ উৎসবকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।

বিজ্ঞাপন

শুধু পাহাড়ি জনগোষ্ঠী নয়, বাঙালি ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষও এখন বৈসাবির আনন্দে অংশ নিতে পাহাড়ে ভিড় করেন। বিদেশি পর্যটকদের উপস্থিতিও এ উৎসবকে দিয়েছে আন্তর্জাতিক মাত্রা।

চলতি বছর খাগড়াছড়িতে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে বৈসাবি উৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়েছে। এতে জেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

বিজ্ঞাপন

উৎসবকে কেন্দ্র করে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। তিন স্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনী কাজ করছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বৈসাবি শুধু একটি উৎসব নয়—এটি পাহাড়ের মানুষের মিলন, ভালোবাসা ও সহাবস্থানের প্রতীক। বছরে একদিন হলেও এই আয়োজন সব বিভেদ ভুলিয়ে সবাইকে একত্র করে, গড়ে তোলে সম্প্রীতির এক অনন্য বন্ধন।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD