মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, স্বামীর কবরের পাশে কাটে মা ও দুই সন্তানের রাত

গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলায় স্বামীর মৃত্যুর পর শ্বশুরবাড়িতে ঠাঁই না পেয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন গৃহবধূ সোনিয়া বেগম (২৬)। সন্তানের অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে তিনি কখনো স্বামীর কবরের পাশে, আবার কখনো আশপাশের মানুষের বাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছেন। তার একমাত্র প্রত্যাশা—মৃত স্বামীর বাড়িতে সন্তানদের নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পাওয়া এবং তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হওয়া।
বিজ্ঞাপন
এই ঘটনাটি ইতোমধ্যে স্থানীয়দের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। অনেকেই মানবিক কারণে আর্থিক সহায়তা নিয়ে এগিয়ে এসেছেন। পাশাপাশি বিষয়টি প্রশাসনের নজরেও এসেছে এবং উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কালিয়াকৈর উপজেলার উত্তর লস্করচালা গ্রামের বাসিন্দা কফিল উদ্দিনের বড় ছেলে সুজন মাহমুদ দীর্ঘদিন ব্রেন টিউমারে ভুগে গত ২ এপ্রিল মারা যান। তার মৃত্যুর পর স্ত্রী সোনিয়া অভিযোগ করেন, পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাবেই তার স্বামীর মৃত্যু হয়েছে। এ অভিযোগকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। পরবর্তীতে সোনিয়া ও স্থানীয়রা সুজনের মৃত্যুর বিচার দাবি করেন। এক পর্যায়ে গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে সুজনের অংশের সম্পত্তি তার স্ত্রী ও সন্তানদের নামে লিখে দেওয়ার প্রস্তাব ওঠে। তবে এ প্রস্তাবে রাজি না হয়ে কফিল উদ্দিন বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যান।
বিজ্ঞাপন
পরবর্তীতে স্থানীয়দের সহায়তায় সুজনের দাফন সম্পন্ন হয়। কিন্তু বাবার অনুপস্থিতিতে ছেলের লাশ পড়ে থাকার ঘটনা এলাকায় ক্ষোভের সৃষ্টি করে। এ নিয়ে প্রতিবাদ হলে কফিল উদ্দিন কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন এবং পুত্রবধূ সোনিয়াকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। বাধ্য হয়ে সোনিয়া তার দুই সন্তানকে নিয়ে বাবার অন্য একটি ভিটায় মাঝুখান গ্রামে আশ্রয় নেন। কিন্তু সেখানে টিকে থাকা সম্ভব না হওয়ায়, অনাহার-অভাবের মধ্যে পড়ে তিনি আবার ফিরে এসে স্বামীর কবরের পাশেই আশ্রয় নেন।
কবরের পাশে বসে সোনিয়া জানান, আর্থিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তার স্বামী যথাযথ চিকিৎসা পাননি। স্বামীর মৃত্যুর পর তাকে ও সন্তানদের বাড়িতে থাকতে দেওয়া হয়নি। এমনকি স্বামীর মৃত্যুর দিনই শ্বশুর বাড়ি ছেড়ে চলে যান বলে অভিযোগ করেন তিনি। যারা তাকে সহায়তা করেছিলেন, তাদের বিরুদ্ধেও মামলা করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, দেবর সজিব তাকে হত্যার হুমকিও দিয়েছেন। তবুও সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি পিছু হটতে রাজি নন। তার একটাই দাবি—তার সন্তানরা যেন বাবার বাড়িতে নিজেদের অধিকার নিয়ে বড় হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
নিজের বাবার বাড়িতে না যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে সোনিয়া বলেন, তার একমাত্র ভাই স্বল্প আয়ে সংসার চালান। সেখানে গিয়ে বাড়তি বোঝা হতে চান না তিনি। তার বাবা অনেক আগেই মারা গেছেন, তাই সেই পরিবারে ফিরে যাওয়া তার জন্য কঠিন সিদ্ধান্ত।
সোনিয়ার ভাই রহিম বাদশা জানান, বোনের স্বামীর মৃত্যুর পর তারা চেষ্টা করেছেন তাকে শ্বশুরবাড়িতে রাখতে। স্থানীয় মাতাব্বর ও পুলিশের সহায়তাও নেওয়া হয়। কিন্তু কোনোভাবেই শ্বশুর রাজি হননি। পরে বোনকে নিজের বাড়িতে নেওয়ার প্রস্তাব দিলেও, নিজের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা ভেবে সোনিয়া সেখানে থাকতে চাননি। তিনি চান, স্বামীর সম্পত্তির ন্যায্য অংশ তার সন্তানদের নামে নিশ্চিত হোক।
এদিকে, সুজনের চাচাতো ভাই সাইফুল ও তার স্ত্রী শারমিন খাতুন দাবি করেন, অসুস্থ অবস্থায় সুজন পরিবারের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাননি। গ্রামের মানুষের সহায়তায় তার চিকিৎসা চলত। এমনকি খাদ্য সহায়তাও অনেক সময় তার বাবা-মা নিয়ে নিতেন বলে অভিযোগ করেন তারা। চিকিৎসার জন্য সাহায্য চাইলে সুজনের স্ত্রী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলেও তারা জানান। পরে জানা যায়, যে বাড়িতে সুজন থাকতেন সেটিও তার শ্বশুরের কেনা জমিতে নির্মিত। ফলে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় বাসিন্দা আলভি মাহমুদ বলেন, ছোট দুটি সন্তান নিয়ে এক নারী কবরের পাশে অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন—এ দৃশ্য হৃদয়বিদারক। অথচ তাদের থাকার মতো ঘর ফাঁকা রয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, যারা প্রতিবাদ করেছেন তাদের বিরুদ্ধেও মামলা করা হয়েছে। বর্তমানে সুজনের মা, ছোট ভাই ও তার স্ত্রী বাড়িতে থাকলেও, সুজনের বাবা অন্যত্র অবস্থান করছেন।
এ বিষয়ে জানতে সুজনের বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, কিছু অসাধু ব্যক্তি অর্থ আদায়ের উদ্দেশ্যে ঘটনাটি ভিন্নভাবে উপস্থাপন করছেন। তিনি দাবি করেন, সময়মতো নাতি-নাতনিদের তাদের প্রাপ্য সম্পত্তি বুঝিয়ে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য প্রচারের অভিযোগে মামলাও করেছেন বলে জানান।
অন্যদিকে, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বিষয়টি সমাধানে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। মধ্যপাড়া ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এহসানুল হক জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত মানবিক ও স্পর্শকাতর। তারা একাধিকবার চেষ্টা করেও সোনিয়াকে শ্বশুরবাড়িতে তুলতে পারেননি। পরে প্রশাসনের নির্দেশে তাকে স্বামীর চাচাতো ভাইয়ের বাড়িতে অস্থায়ীভাবে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি নিয়ে থানায় অভিযোগ হয়েছে এবং দুই পক্ষের সঙ্গে কথা বলে সমাধানের চেষ্টা চলছে। সমাধান না হলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এইচ এম ফখরুল হোসাইন জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে ওই নারী ও তার সন্তানদের নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধান এবং শিশুদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা হবে বলেও জানান তিনি।








