কালবৈশাখীতে লন্ডভন্ড ঠাকুরগাঁও, ঘরবাড়ি-ফসলের ব্যাপক ক্ষতি

টানা দুই দিনের কালবৈশাখী ঝড়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ঠাকুরগাঁও জেলা। শনিবার (২৫ এপ্রিল) সকাল থেকে রবিবার দুপুর পর্যন্ত দমকা হাওয়া, বজ্রপাত ও ভারী বৃষ্টিপাতে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হওয়া থেকে শুরু করে গাছ উপড়ে পড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে, একইসঙ্গে কৃষকের সোনালি স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে মুহূর্তেই এবং ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। হঠাৎ এই দুর্যোগে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
বিজ্ঞাপন
শনিবার (২৫ এপ্রিল) সকালে হঠাৎই আকাশের পরিস্থিতি বদলে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই দমকা হাওয়া, তীব্র বজ্রপাত ও বৃষ্টি শুরু হলে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী চলা ঝড়ে অনেক স্থানে ঘরের টিন উড়ে যায়, গাছ উপড়ে সড়কে পড়ে যান চলাচল ব্যাহত হয়। ঝড় থেমে গেলেও স্বস্তি ফেরেনি, কারণ রাতভর দফায় দফায় বজ্রসহ বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে সদর উপজেলা ও বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে। অনেক পরিবারের বসতঘর আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও ঘরের টিনের চাল উড়ে গেছে, আবার কোথাও দেয়াল ধসে পড়েছে।
বিজ্ঞাপন
এদিকে সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে কৃষিখাতে। ভুট্টা, ধানসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসল ঝড়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। বছরের পর বছর পরিশ্রমে গড়া ফসল চোখের সামনে নষ্ট হতে দেখে অনেক কৃষক হতবাক ও হতাশ হয়ে পড়েছেন। অন্যদিকে ঝড়ের তীব্রতায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, ফলে রাতভর অন্ধকারে কাটাতে হয় হাজারো মানুষকে। মোবাইল নেটওয়ার্কেও বিঘ্ন ঘটে, জরুরি যোগাযোগেও সৃষ্টি হয় সমস্যা।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রাতের দিকে হঠাৎ করেই আকাশ কালো হয়ে আসে। বাতাস এত জোরে বইছিল যে, ঘরের টিন কাঁপতে থাকে, মনে হচ্ছিল যে কোনো সময় উড়ে যাবে। অনেকের ঘরের চাল উড়ে গেছে, গাছ পড়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। সকালে উঠে দেখি মাঠের ফসল সব মাটিতে পড়ে আছে। এমন ঝড় অনেকদিন দেখিনি।
সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়নের আনোয়ার, ঢোলারহাট ইউনিয়নের জিলানী, বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার মাজেদুল হক ও রানীশংকৈল উপজেলার নাজমূল হোসেন জানান, শনিবার রাতের দিকেই হঠাৎ আবহাওয়া খারাপ হয়ে যায় এবং কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রচণ্ড ঝড় শুরু হয়। বাতাসের তীব্রতায় ঘরের টিন কাঁপতে কাঁপতে খুলে যাওয়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়। পরিবার নিয়ে সবাই আতঙ্কে ঘরের ভেতর অবস্থান করেন এবং বাইরে বের হওয়ার সাহস পাননি। বজ্রপাতের বিকট শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠছিল। ঝড় থামার পরও দফায় দফায় বৃষ্টি ও বজ্রপাত চলতে থাকে, পুরো রাতটাই আতঙ্কের মধ্যে কেটেছে বলে জানান তারা।
বিজ্ঞাপন
তারা আরও বলেন, সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কৃষিজমিতে। ভুট্টা ও ধানসহ অনেক ফসল মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। পরিশ্রম করে যে ফসল ফলানো হয়েছিল, তা চোখের সামনে নষ্ট হতে দেখে তারা হতাশ হয়ে পড়েছেন। কীভাবে এই ক্ষতি পুষিয়ে উঠবেন তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকরা। এমন আকস্মিক ঝড় আগে থেকে বুঝতে না পারায় কোনো প্রস্তুতিও নেওয়া সম্ভব হয়নি বলে জানান তারা। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো সরকারের সহায়তা ছাড়া ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না বলেও মন্তব্য করেন স্থানীয়রা।
ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক আলমগীর কবীর বলেন, শনিবারের আকস্মিক ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে কিছু এলাকায় ফসলের ক্ষতি হয়েছে, তবে রবিবার সকালের প্রবল ঝড়ে ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়েছে। মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে এবং প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে দ্রুত প্রতিবেদন তৈরি করা হবে বলে জানান তিনি।
বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক জানান, কালবৈশাখী ঝড়ে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে মাঠে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে যেসব পরিবারের ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। দ্রুত তালিকা প্রস্তুত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হবে। পাশাপাশি যেসব এলাকায় গাছ পড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে, সেগুলো স্বাভাবিক করতে কাজ চলছে বলেও তিনি জানান।








