Logo

নারায়ণগঞ্জের সাত খুন : ১২ বছর পরও ঝুলে আছে বিচার

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
নারায়ণগঞ্জ
২৭ এপ্রিল, ২০২৬, ১৩:৫৬
নারায়ণগঞ্জের সাত খুন : ১২ বছর পরও ঝুলে আছে বিচার
ছবি: সংগৃহীত

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল, দুপুরের ব্যস্ত সময়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে হঠাৎ করেই ঘটে যায় এক শিহরণজাগানো ঘটনা। সাদা পোশাকধারী একটি দল তল্লাশির নামে একটি প্রাইভেটকার থামিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যেই তুলে নিয়ে যায় গাড়িতে থাকা নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের তৎকালীন প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও তার সঙ্গীদের।

বিজ্ঞাপন

প্রায় একই সময়ে একই সড়ক থেকে তুলে নেওয়া হয় জ্যেষ্ঠ আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার গাড়িচালককে। এরপর তিন দিন ধরে তারা নিখোঁজ থাকেন, চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে উৎকণ্ঠা আর আতঙ্ক।

৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদীতে একে একে ভেসে ওঠে ছয়জনের মরদেহ। পরদিন উদ্ধার হয় আরেকজনের দেহ। সাতজনের এই নির্মম হত্যাকাণ্ড মুহূর্তেই দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন তোলে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। ঘটনার এক যুগ পেরিয়ে গেলেও এখনো বিচার কার্যক্রম শেষ হয়নি।

বিজ্ঞাপন

এই হত্যাকাণ্ডে নিহতরা হলেন— নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, সহযোগী তাজুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম লিটন, গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার এবং তার চালক ইব্রাহীম।

এই ঘটনার দীর্ঘ ছায়া সবচেয়ে গভীরভাবে পড়েছে নিহতদের পরিবারের ওপর। তাদের মধ্যেই একজন রোজা আক্তার জান্নাত। জন্মের আগেই হারান বাবাকে— জাহাঙ্গীর আলম ছিলেন এই সাতজনের একজন। বাবার মুখ কখনো দেখেনি রোজা; তার কাছে বাবা মানে শুধু একটি ছবি আর মায়ের অশ্রু।

রোজার মা শামসুন্নাহার আক্তার নুপুর জানান, মাদরাসায় অন্য শিশুরা যখন বাবার হাত ধরে আসে, তখন তার মেয়ে চুপ হয়ে যায়। বাড়িতে ফিরে বাবার কথা জিজ্ঞেস করে কাঁদে। সীমিত আয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে চুক্তিভিত্তিক চাকরি করে মেয়েকে মানুষ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

তার কণ্ঠে জমে থাকা ক্ষোভ স্পষ্ট— এত বছরেও স্বামীর হত্যার বিচার চোখে দেখলেন না। অপেক্ষা যেন শেষই হচ্ছে না।

নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা আক্তার বিউটির জীবনেও এই ঘটনা এনে দেয় গভীর শোক ও শূন্যতা। স্বামীর মৃত্যুর পর দীর্ঘ সময় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। পরে তিন সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিজেকে সামলে নেন।

তিনি জানান, ধীরে ধীরে সন্তানদের কথা ভেবে বেঁচে থাকার শক্তি খুঁজে পেয়েছেন। এখনো কঠিন সময় এলে সন্তানরাই তাকে সাহস জোগায়। মেয়ের একটি কথা তাকে বারবার শক্তি দেয়— “আমরাই তো আরেকটা নজরুল।”

বিজ্ঞাপন

নিহত তাজুল ইসলামের বাবা আবুল খায়েরের প্রত্যাশাও খুব সরল— জীবনের শেষ সময়ে হলেও তিনি ছেলের হত্যার বিচার দেখে যেতে চান। কিন্তু সেই আশা কতটা পূরণ হবে, তা নিয়ে তার মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

মামলার নথি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় জানা যায়, আদালত থেকে জামিন নিয়ে ফেরার পথে লিংক রোডের লামাপাড়া এলাকায় নজরুল ইসলামের গাড়ি থামিয়ে তাকে ও তার সঙ্গীদের তুলে নেওয়া হয়। তিন দিন পর তাদের মরদেহ উদ্ধার হয় নদী থেকে। তদন্তে উঠে আসে নির্মম নির্যাতনের চিত্র, যা জনমনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করে।

তদন্তে আরও জানা যায়, নজরুল ইসলামের সঙ্গে সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেনের দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। আধিপত্য বিস্তার ও রাজনৈতিক প্রভাবের দ্বন্দ্ব একপর্যায়ে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে রূপ নেয়।

বিজ্ঞাপন

২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত এ মামলায় ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তাদের মধ্যে ছিলেন নূর হোসেনসহ র‍্যাব-১১-এর কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তা। পরে ২০১৮ সালের আগস্টে হাইকোর্ট ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন এবং অন্যদের সাজা কমিয়ে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন।

তবে এরপর থেকে বিচার প্রক্রিয়ার গতি থমকে আছে। বর্তমানে মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ‘লিভ টু আপিল’ পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, আইনি প্রক্রিয়া অনুসারে মামলাটি এগোলেও এই পর্যায়ে এসে তা দীর্ঘ সময় ধরে নিষ্পত্তিহীন অবস্থায় রয়েছে। দ্রুত শুনানি সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে বলেও তিনি জানান।

১২ বছর পেরিয়ে গেলেও এই আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার শেষ হয়নি। স্বজনদের চোখে এখনো একটাই প্রত্যাশা— ন্যায়বিচার। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষত কিছুটা শুকালেও বিচারহীনতার বেদনা রয়ে গেছে আগের মতোই তীব্র।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD