৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ১২ বছরের মাদরাসাছাত্রী

নেত্রকোণার মদন উপজেলায় এক মাদরাসাশিক্ষকের বিরুদ্ধে ১২ বছর বয়সী এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ওই ছাত্রী বর্তমানে প্রায় ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা বলে জানা গেছে এবং তার শারীরিক অবস্থাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখছেন চিকিৎসকেরা। ভুক্তভোগীর পরিবার অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে।
বিজ্ঞাপন
অভিযুক্ত শিক্ষকের নাম আমান উল্লাহ সাগর। তিনি উপজেলার কাইটাইল ইউনিয়নের পাঁচহার বড়বাড়ি গ্রামের মৃত শামসুদ্দিন মিয়ার ছেলে এবং স্থানীয় হযরত ফাতেমাতুজ জোহুরা মহিলা কওমি মাদরাসার পরিচালক ও শিক্ষক। গত বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) সন্ধ্যায় মদন থানায় ভুক্তভোগী শিশুটির মা তার বিরুদ্ধে মামলা করেন।
মামলার এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আমান উল্লাহ সাগর ২০২২ সালে পাঁচহার গ্রামে ওই মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। একই প্রতিষ্ঠানে তার স্ত্রী প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্বে আছেন। ভুক্তভোগী শিশুটি এলাকার এক বিধবা নারীর একমাত্র সন্তান। জীবিকার প্রয়োজনে শিশুটির মা সিলেটে গৃহপরিচারিকার কাজ করেন। ফলে শিশুটি নানির কাছে থেকে ওই মাদরাসায় পড়াশোনা করত।
বিজ্ঞাপন
অভিযোগে বলা হয়, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে মাদরাসার শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর শিশুটিকে ধর্ষণ করেন এবং বিষয়টি কাউকে জানালে প্রাণনাশের হুমকি দেন। চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল তিনি ছুটিতে যান এবং এরপর আর মাদরাসায় ফিরে আসেননি বলে জানান আরেক শিক্ষক। একই সময়ে অসুস্থতার কারণে শিশুটিও গত প্রায় পাঁচ মাস মাদরাসায় যায়নি।
পরবর্তীতে শিশুটির শারীরিক পরিবর্তন দেখা দিলে তার মা সিলেট থেকে এসে বিষয়টি জানতে পারেন। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে শিশুটি ঘটনার কথা জানায় বলে দাবি পরিবারের। এরপর তাকে নিয়ে মদন উপজেলা হাসপাতাল রোডে অবস্থিত স্বদেশ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. সায়মা আক্তারের কাছে নেওয়া হয়।
এর পর ডা. সায়মা আক্তারের সঙ্গে গণমাধ্যম কর্মীরা যোগাযোগ করলে তিনি জানান, শিশুটি তার মায়ের সঙ্গে ক্লিনিকে এসে পেট ভারী লাগা এবং ভেতরে কিছু নড়াচড়া করার অনুভূতির কথা জানায়। প্রাথমিক পরীক্ষায় দেখা যায়, শিশুটি রক্তশূন্যতায় ভুগছে। তার শরীরে রক্ত নেই বললেই চলে।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও জানান, শিশুটির গর্ভে থাকা সন্তানের বয়স প্রায় ২৭ সপ্তাহের বেশি (প্রায় ৭ থেকে সাড়ে ৭ মাস)। শিশুটির বয়স প্রায় ১১ বছর, উচ্চতা সাড়ে চার ফুটের কম এবং ওজন মাত্র ২৯ কেজি। গর্ভস্থ শিশুর মাথার মাপ (বাইপ্যারাইটাল ডায়ামিটার) প্রায় ৭৪ মিলিমিটার, যা তার সরু পেলভিসের তুলনায় অনেক বড়। এতে স্বাভাবিক প্রসব মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এছাড়া বাচ্চাটির রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা মাত্র ৮.২, যা মারাত্মক রক্তস্বল্পতার লক্ষণ। সে অপুষ্টি এবং কৃমির সমস্যায়ও ভুগছে। সরু পেলভিসের ভেতর দিয়ে বড় মাথার বাচ্চা প্রসব করা স্বাভাবিকভাবে সম্ভব নয়, যা মা ও বাচ্চা উভয়ের জন্যই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
চিকিৎসকের মতে, এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক ডেলিভারি প্রায় অসম্ভব। শুধুমাত্র ‘ক্র্যানিওটমি’ (বাচ্চার মাথা কেটে বের করা) পদ্ধতির মাধ্যমে স্বাভাবিক ডেলিভারি করা যেতে পারে, যা একটি অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া। ১১ বছরের এই ছোট বাচ্চার শরীরে সিজারিয়ান সেকশনের জন্য প্রয়োজনীয় অ্যানেস্থেসিয়া বা ওষুধের ডোজ নির্ধারণ করা চিকিৎসকদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
বিজ্ঞাপন
ডা. সায়মা আক্তার বলেন, শিশুটি বর্তমানে প্রচণ্ড ভয়ের মধ্যে রয়েছে। যখন সে প্রথম চেম্বারে আসে, তখন কথা বলার সাহস পাচ্ছিল না। অনেকক্ষণ নিজের সমস্যার কথা বুঝিয়ে বলতে পারেনি। শিশুটি এবং তার পুরো পরিবার এই ঘটনায় ট্রমাটাইজড হয়ে পড়েছে। শিশুটি এখনও পুরোপুরি বুঝতে পারছে না যে তার সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছে বা ভবিষ্যতে তার জন্য কী অপেক্ষা করছে।
তিনি আরও বলেন, ১১ বছর বয়সী এই শিশুটির আসলে একজন শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তাকে গাইনোকোলজিস্টের কাছে আসতে হয়েছে এমন একটি সমস্যা নিয়ে। মেয়েরা জন্মের সময় থেকেই ডিম্বাশয়ে ডিম্বাণু নিয়ে জন্মায়। সাধারণত ১১-১২ বছর বয়সে এই ডিম্বাণুগুলো পূর্ণতা পায় এবং প্রথম মাসিকের মাধ্যমে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। শিশুটি তার জীবনের প্রথম মাসিক হওয়ার অভিজ্ঞতা পাওয়ার আগেই গর্ভবতী হয়ে পড়েছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির কারণে শিশুটি এবং তার পরিবার বর্তমানে ভয়াবহ বিপদে পড়েছে।
বিজ্ঞাপন
এদিকে মাদরাসার প্রতিষ্ঠাকালীন উদ্যোক্তা ও শিক্ষক মো. ছোটন বলেন, এই বিষয়ে বলতে গেলে এখন পর্যন্ত ভুক্তভোগীর পরিবার কিছু জানায়নি। আর পাঁচ মাস আগে ওই মেয়ে চলে গেছে, তখনো আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না। তারা দুই পরিবার প্রতিবেশী। অভিযুক্ত আমান উল্লাহ সাগর তো ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পর থেকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে না। তিনি স্ত্রী সন্তানসহ পলাতক রয়েছেন। এমনকি গ্রামের কোনো মানুষের সঙ্গে বা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করছে না।
এ বিষয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ধরনের একটি মামলা থানায় দায়ের করা হয়েছে। আমি একটি মামলা সংক্রান্ত কাজে প্রত্যন্ত এলাকায় আছি, এ বিষয়ে আপনাদের পরে বিস্তারিত জানাতে পারব।
ওসি আরও বলেন, আমি এখানে নতুন যোগদান করায় এখনো বিস্তারিত কিছু বলতে পারছি না। তবে আইন তার নিজস্ব প্রক্রিয়া মেনে এগিয়ে যাবে।
বিজ্ঞাপন








