চায়না রিং জালের দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী বাঁশের কুটির শিল্প

একসময় গ্রামবাংলার নদী-খাল-বিলজুড়ে মাছ ধরার অপরিহার্য উপকরণ ছিল বেত ও বাঁশের তৈরি আন্তা, চাঁইসহ নানা ধরনের ফাঁদ। যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা সেই ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্প এখন বিলুপ্তির পথে। আধুনিক ও ক্ষতিকর ‘চায়না রিং জাল’-এর দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে বংশপরম্পরায় টিকে থাকা এই শিল্প।
বিজ্ঞাপন
এমন আক্ষেপের কথাই জানালেন কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামের কুটির শিল্প কারিগর বিমল সরকার (৪৮)। তিনি প্রয়াত হুরণ সরকারের ছেলে। এক ছেলে ও দুই মেয়ের জনক বিমল সরকারের সঙ্গে বুধবার বাতাকান্দি বাজারের সাপ্তাহিক হাটে কথা হলে উঠে আসে এই শিল্পের বর্তমান দুর্দশার চিত্র।
তিনি জানান, প্রায় ২২ বছর ধরে বাঁশের তৈরি মাছ ধরার আন্তা ও চাঁই তৈরির কাজ করছেন তিনি। তবে এ পেশার ইতিহাস আরও পুরোনো। তাঁর দাদা প্রয়াত মাহিন্দ সরকার, পরে বাবা হুরণ সরকার এবং বর্তমানে তিনি নিজে—তিন প্রজন্ম ধরে ধরে রেখেছেন এই ঐতিহ্যবাহী পেশা।
বিজ্ঞাপন
বিমল সরকার বলেন, ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে বিভিন্ন সাপ্তাহিক হাটে গিয়ে কাজ শিখেছি। প্রতি রবিবার বাঞ্ছারামপুর, সোমবার ঘাড়মোড়া, মঙ্গলবার রামচন্দ্রপুর এবং বুধবার বাতাকান্দি বাজারে দোকান বসাতাম। তখন আমাদের তৈরি চাঁই ও আন্তা বিক্রি হতো ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকার মতো। সেই আয়ের ওপরই নির্ভর ছিল পুরো সংসার।
তিনি বলেন, বাজারে চায়না রিং জাল আসার পর থেকেই তাঁদের পণ্যের চাহিদা দ্রুত কমে গেছে। এখন হাটে দোকান বসিয়েও ৪ থেকে ৫ হাজার টাকার বেশি বিক্রি হয় না। অনেক সময় সেই টাকায় যাতায়াত খরচও ওঠে না।
বিমল সরকারের ভাষায়, বাপ-দাদার শেখানো এই শিল্প আজ চোখের সামনে হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা কারিগররা ভালো নেই, সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, চায়না রিং জাল শুধু কুটির শিল্প ধ্বংস করছে না, মাছের প্রজননেও মারাত্মক ক্ষতি করছে। এ জালে মাছের রেণু-পোনা, ডিম ও ছোট মাছ নির্বিচারে ধরা পড়ায় নদী-খাল-বিলে দেশীয় মাছের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে।
আরও পড়ুন: গাইবান্ধায় কুকুরের কামড়ে ৫ জনের মৃত্যু
সরকারের প্রতি আবেদন জানিয়ে তিনি বলেন, ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্প বাঁচাতে এবং দেশীয় মাছের প্রজনন রক্ষায় দ্রুত চায়না রিং জাল নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। তা না হলে একদিন মাছে-ভাতে বাঙালির ঐতিহ্যও হারিয়ে যাবে।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয়দের মতে, গ্রামীণ জনপদের বহু পুরোনো এই কুটির শিল্প টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ ঋণ সুবিধা এবং ক্ষতিকর জালের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ।








