সীমান্তে ভেসে আসছে কান্নার আওয়াজ, পতাকা বৈঠকেও মেলেনি সমাধান

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ি সীমান্তে ২৮ জন ব্যক্তিকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের উদ্যোগে ওই ব্যক্তিদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর অভিযোগ উঠলেও বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি তা প্রতিহত করেছে। ফলে নারী ও শিশুসহ ২৮ জন মানুষ দুই দেশের সীমান্তের মধ্যবর্তী শূন্য রেখায় আটকা পড়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
বিজ্ঞাপন
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বিকেলে নওগাঁ ব্যাটালিয়নের (১৬ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আরিফুজ্জামান বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সমাধান হয়নি।
বিজিবি সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার ভোররাত প্রায় ৩টার দিকে বাঙ্গাবাড়ি সীমান্তের ২০৩/৬-আর পিলার সংলগ্ন এলাকায় ভারতের ১২ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের আশরাফপুর ক্যাম্পের সদস্যরা ২৮ জনকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করে। ওই দলে ১২ জন পুরুষ, ১০ জন নারী এবং ৬ জন শিশু রয়েছে বলে জানা গেছে।
বিজ্ঞাপন
খবর পেয়ে বাঙ্গাবাড়ি বিওপির একটি টহল দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। বিজিবি সদস্যরা তাদের বাংলাদেশ ভূখণ্ডে প্রবেশে বাধা দিলে তারা সীমান্তের শূন্য রেখায় অবস্থান নিতে বাধ্য হয়।
পরে দুপুরে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিজিবি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, যথাযথ যাচাই-বাছাই ও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছাড়া কোনো ধরনের পুশ-ইন গ্রহণ করা হবে না। যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বাংলাদেশি নাগরিক হন, তাহলে দুই দেশের কর্তৃপক্ষের মধ্যে নিয়মতান্ত্রিক আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। তবে রাতের আঁধারে সীমান্ত অতিক্রম করিয়ে কাউকে পাঠানোর চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানানো হয়।
অন্যদিকে বিএসএফের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া ওই ব্যক্তিদের পুনরায় ভারতের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। ফলে কোনো সমঝোতা ছাড়াই বৈঠক শেষ হয় এবং ২৮ জনের অবস্থান অপরিবর্তিত থাকে।
বিজ্ঞাপন
বিজিবি জানিয়েছে, তাদের অনুরোধে পরে বিএসএফ ওই ব্যক্তিদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে সীমান্তের খোলা স্থানে অবস্থান করায় তারা চরম দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছেন।
বিকেলের দিকে এলাকায় ভারী বৃষ্টি শুরু হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করা নারী, পুরুষ ও শিশুরা বৃষ্টিতে ভিজে পড়েন। স্থানীয়দের দাবি, শূন্য রেখা থেকে শিশু ও নারীদের কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছিল, যা পুরো পরিস্থিতিকে আরও মানবিক সংকটে পরিণত করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাত থেকেই ওই ব্যক্তিরা সীমান্ত এলাকায় আটকে রয়েছেন। তারা জানান, গরম, অনিশ্চয়তা ও খাদ্যসংকটের মধ্যে তাদের সময় কাটছে। স্থানীয়দের অনেকেই ঘটনাটিকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে দ্রুত সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় বাসিন্দা হাফিজুর রহমান বলেন, সীমান্তের মধ্যবর্তী এলাকায় আটকে থাকা মানুষগুলো অত্যন্ত কষ্টকর পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। বৃষ্টিতে ভিজে এবং পর্যাপ্ত আশ্রয় ছাড়াই তাদের দিন কাটছে। বিষয়টির দ্রুত সমাধান প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
আরেক বাসিন্দা শামিম বলেন, সীমান্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে স্থানীয় লোকজন সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। তারা চান, দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান করুক।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নাসিরুল ইসলাম জানান, গভীর রাত থেকে ওই ২৮ জন ব্যক্তি শূন্য রেখায় অবস্থান করছেন। দীর্ঘ সময় ধরে তারা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আরিফুজ্জামান বলেছেন, যাচাই-বাছাই ছাড়া কাউকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। সীমান্তে অবস্থানরত ব্যক্তিদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিজিবি তাদের অবস্থানে অনড় থাকবে। একই সঙ্গে সীমান্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বিজিবি সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
সীমান্তের এই অচলাবস্থা কবে কাটবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে নতুন করে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। এরই মধ্যে মানবিক সংকটে পড়া ২৮ জনের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে সীমান্ত এলাকায়।








