Logo

মা ও তিন বোন হারিয়ে নিঃস্ব সিফাতের আহাজারি

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
লক্ষ্মীপুর
২৫ জুন, ২০২৬, ২১:৫৭
মা ও তিন বোন হারিয়ে নিঃস্ব সিফাতের আহাজারি
ছবি: সংগৃহীত

লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে এক হৃদয়বিদারক ঘটনায় মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে একটি পরিবার। কয়েক বছর আগে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে বাবাকে হারানোর পর মা শাহিনুর বেগমের সংগ্রামের সংসারই ছিল একমাত্র ভরসা। কিন্তু বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে সেই সংসারের চার সদস্য—মা ও তিন বোনকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় একমাত্র ছেলে সিফাত হোসেন হয়ে পড়েছেন সম্পূর্ণ নিঃস্ব।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সকালে অন্য দিনের মতোই কর্মস্থলে চলে যান সিফাত। তিনি রায়পুর বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। বাসা থেকে অল্প দূরত্বেই তার কর্মস্থল। কাজের মধ্যে থাকা অবস্থায় বেলা ১১টার দিকে তিনি খবর পান, তার মা ও তিন বোনের ওপর ভয়াবহ হামলা হয়েছে।

খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে শোক ও হতাশায় ভেঙে পড়েন সিফাত। স্বজনদের হারানোর বেদনায় তার কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে আশপাশের পরিবেশ। স্থানীয়দের ধারণ করা ভিডিওতেও তার হৃদয়বিদারক আহাজারির দৃশ্য ধরা পড়ে। পরে তাকে সেখান থেকে সরিয়ে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয় এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে সামলে রাখার চেষ্টা করেন স্বজন ও স্থানীয়রা।

বিজ্ঞাপন

নিহতরা হলেন শাহিনুর বেগম (৩৮), তার বড় মেয়ে সায়মা আক্তার (২১), মেজো মেয়ে ইকরা আক্তার (১৭) এবং ছোট মেয়ে শিফা আক্তার (৯)। একসঙ্গে চারজনকে হারিয়ে এখন কার্যত একা হয়ে পড়েছেন সিফাত।

পুলিশ ও স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান পরিবারের কর্তা কামাল হোসেন। স্বামীর মৃত্যুর পর শাহিনুর বেগম তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে সংগ্রাম করে সংসার চালিয়ে আসছিলেন। আর্থিক সংকটের মধ্যেও সন্তানদের লেখাপড়া চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।

পরিবারের বড় মেয়ে সায়মা ছিলেন মেধাবী শিক্ষার্থী। তিনি আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর মেডিকেল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তার সহপাঠীদের ভাষ্য, পড়াশোনায় তিনি বরাবরই ভালো ছিলেন এবং উচ্চশিক্ষা গ্রহণের স্বপ্ন দেখতেন।

বিজ্ঞাপন

মেজো মেয়ে ইকরা স্থানীয় একটি কলেজে দ্বাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ছিলেন। আর ছোট্ট শিফা পড়ত একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। অন্যদিকে, পরিবারের একমাত্র ছেলে সিফাতও পড়াশোনার পাশাপাশি সংসারের হাল ধরতে চাকরি করতেন। তিনি রায়পুর সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী।

সাইফুল ইসলাম মুরাদ জানান, বাবার মৃত্যুর পর পরিবারটি অনেক কষ্টে দিন কাটিয়েছে। প্রায় এক বছর ধরে সিফাত তার প্রতিষ্ঠানে কাজ করছিলেন। পরিবারের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার চেষ্টা করছিল এই তরুণ। কিন্তু এখন মা ও তিন বোনকে হারিয়ে সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তদন্ত শুরু করেছে। রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহীন মিয়া জানান, একই পরিবারের চার সদস্য নিহত হয়েছেন। তাদের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। স্বজনদের খবর দেওয়া হয়েছে এবং তারা এসে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন।

পুলিশ আরও জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে রতন মজুমদার নামে এক যুবককে স্থানীয়রা আটক করে গণপিটুনি দেয়। পরে তারও মৃত্যু হয়। ঘটনার প্রকৃত কারণ ও বিস্তারিত জানতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

এক সকালে সব হারিয়ে ফেলা সিফাতের জীবনে নেমে এসেছে গভীর অন্ধকার। পরিবারের শেষ সদস্য হিসেবে এখন তার সামনে অপেক্ষা করছে অনিশ্চয়তা আর বেদনাভারাক্রান্ত এক নতুন বাস্তবতা।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD