Logo

ঝুঁকিপূর্ণ ট্রলারে মেঘনা পাড়ি দিচ্ছেন মনপুরাবাসী

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
ভোলা
২৯ জুন, ২০২৬, ১৯:২৬
ঝুঁকিপূর্ণ ট্রলারে মেঘনা পাড়ি দিচ্ছেন মনপুরাবাসী
ছবি: সংগৃহীত

ভোলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা মনপুরার মানুষের নিরাপদ নৌযাতায়াত এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। প্রায় ছয় মাস ধরে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) একমাত্র সি-ট্রাক বন্ধ থাকায় প্রতিদিন শত শত যাত্রী বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মালবাহী ট্রলারে করে উত্তাল মেঘনা নদী পার হচ্ছেন। এতে যাত্রীদের জীবনহানির আশঙ্কা বাড়লেও কার্যকর তদারকির অভাবে অবৈধ নৌযান চলাচল অব্যাহত রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয়দের অভিযোগ, সমুদ্র চলাচলের উপযোগী সনদ (সি-সার্ভে) ছাড়া যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল নিষিদ্ধ থাকলেও সেই নিয়ম কার্যত মানা হচ্ছে না। প্রশাসন ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবে প্রতিদিনই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষ পারাপার করতে বাধ্য হচ্ছেন।

সম্প্রতি তজুমদ্দিন ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, মনপুরা থেকে আসা একটি কাঠের মালবাহী ট্রলারে শতাধিক যাত্রী বহন করা হচ্ছে। যাত্রী পরিবহনের প্রয়োজনীয় অনুমতি কিংবা ফিটনেস সনদ না থাকলেও নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ সবাই গাদাগাদি করে ট্রলারের ভেতরে বসে নদী পার হচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

একই দিন বিকেলে মনপুরাগামী ট্রলারেও একই চিত্র দেখা যায়। বসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই, নেই কোনো লাইফ জ্যাকেট বা অন্যান্য নিরাপত্তা সরঞ্জাম। মানুষের পাশাপাশি একই স্থানে গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি এবং বিভিন্ন ভারী মালামাল বহন করা হচ্ছিল। প্রচণ্ড গরম ও বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও যাত্রীরা বাধ্য হয়ে এই ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণ করছেন।

মনপুরা উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির আমিমুল এহসান জসিম জানান, স্ত্রীকে নিয়ে ট্রলারে উঠলেও বসার জায়গা পাননি। দীর্ঘ ছয় মাস ধরে এভাবেই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তার ভাষ্য, এমন ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা যেন মৃত্যুকে সামনে রেখে চলার মতো। একাধিকবার আইনশৃঙ্খলা সভায় বিষয়টি তুলে ধরা হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তিনি দ্রুত একটি আধুনিক সি-ট্রাক বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানান।

হাজিরহাট সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক তপন চন্দ্র হাওলাদার পরিবার নিয়ে মনপুরায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে ঘাটে এলেও ট্রলারের অবস্থা ও উত্তাল নদী দেখে শেষ পর্যন্ত যাত্রা বাতিল করেন। তিনি বলেন, মনপুরার মানুষ প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করছেন।

বিজ্ঞাপন

উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা আলী আকবর জানান, মাঝনদীতে আকস্মিক ঝড় শুরু হলে ট্রলারের ভেতরে নারী ও শিশুদের আতঙ্কে কান্নার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। নিরাপদ বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে আইন অমান্য করে এসব ট্রলারে যাতায়াত করছেন।

ঘাট সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তজুমদ্দিন-মনপুরা নৌপথে নিরাপদ যাত্রী পরিবহনের জন্য বিআইডব্লিউটিসির ‘এসটি ইলিশা’ নামের সি-ট্রাকটি গত বছরের নভেম্বর থেকে অচল রয়েছে। অন্যদিকে প্রতিবছর ১৫ মার্চ থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত মেঘনার ১১০ কিলোমিটার এলাকাকে ‘ডেঞ্জার জোন’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এ সময় সি-সার্ভে সনদ ছাড়া যাত্রী পরিবহন আইনত নিষিদ্ধ হলেও মনপুরা-তজুমদ্দিনসহ ভোলার অন্তত ১০টি রুটে নিয়ম ভেঙে অবৈধ নৌযান চলাচল করছে। পাশাপাশি যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়াও আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বিআইডব্লিউটিসির উপ-বাণিজ্য ব্যবস্থাপক (যাত্রী) খন্দকার মুহাম্মদ তানভী হোসেন জানান, যান্ত্রিক ত্রুটি এবং ইজারা-সংক্রান্ত কিছু জটিলতার কারণে সি-ট্রাকটি দীর্ঘদিন চালু করা সম্ভব হয়নি। তবে এসব সমস্যা সমাধান হয়েছে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই মনপুরা রুটে পুনরায় সি-ট্রাক চলাচল শুরু হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

এদিকে সম্প্রতি ভোলা সফরকালে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, দ্বীপাঞ্চলের মানুষের নিরাপদ ও স্বাভাবিক যাতায়াত নিশ্চিত করতে সরকারি কিংবা বেসরকারি উদ্যোগে দ্রুত মানসম্মত জাহাজ চালুর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে স্থানীয়দের দাবি, কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটার আগেই নিরাপদ নৌযান চালু এবং অবৈধ ট্রলার চলাচল বন্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD