সফল এক গর্বিত পিতার নাম শাহজাহান আলী, অত:পর স্মৃতি রোমন্থন

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। প্রত্যেক মানুষকে আল্লাহ পাক বানিয়েছেন সুন্দর করে আর এই সুন্দর মানুষের মধ্যে স্বভাবগত ভিন্নতা বিদ্যমান। স্বভাবগত ভিন্নতার উপর ভিত্তি করে মানুষকে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায় যেমন- ক) জ্ঞানী, মহাজ্ঞানী খ) বোকা গ) উৎকৃষ্ট ও গ) নিকৃষ্ট ।
বিজ্ঞাপন
কোটি কোটি মানুষের মধ্যে জ্ঞানী ও মহাজ্ঞানী বিদ্যমান। জ্ঞানী অনেকেই তবে মহাজ্ঞানী আসেন যুগে যুগে সীমিত আকারে। কেউ আবিস্কারে মহাজ্ঞানী, কেউ ধর্মীয় জগতের মহাজ্ঞানী, কেউ শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা প্রভৃতি বিষয়ে মহাজ্ঞানী।
জ্ঞানী আর মহাজ্ঞানীদের মাঝে সাদাসিধা,কর্মক্ষম,সৎ মানুষগুলোই বোকা। সমাজ গঠনে, সমাজ বিনির্মাণে বোকাদের অবদান অনস্বীকার্য্য। জ্ঞানী আর বোকাদের মাঝে যারা মানব কল্যাণে অবদান রাখে, সমাজ উন্নয়নে ভূমিকা রাখে, সদা সর্বদা ভাল কাজ করে, দেশ জাতি গঠন সহ শিক্ষা দীক্ষা প্রভৃতি ভাল কাজে নিজেদেরকে নিয়োজিত রাখে এবং নিবেদিত তারাই উৎকৃষ্ট। জ্ঞানী , মহাজ্ঞানী, এবং উৎকৃষ্ট মানুষের ভিড়ে যে সকল মানুষ খুনি, চোর, ডাকাত, ধর্ষক, ভেজালদাতা, কলহ প্রিয়, ভূমি দস্যু. রাষ্ট্রদ্রোহী, ষড়যন্ত্রকারী, হিংসুক, প্রতারক, নিন্দুক, দখলবাজ প্রভৃতি শ্রেণির মানুষ গুলোই নিকৃষ্ট। বর্তমান একবিংশ শতাব্দিতে নিকৃষ্ট মানুষের সংখ্যা গাণিতিক হারে বেড়েই চলেছে। প্রিয় পাঠক জ্ঞানী, মহাজ্ঞানী না হলেও উৎকৃষ্ট একজন মানুষের গল্প শোনাবো। যিনি একজন গর্বিত পিতা, সফল অভিভাবক এবং ছিলেন কৃতিময় ব্যবসায়ী।
চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা থানার অন্তর্গত হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন এক জনপদের নাম কুড়ালগাছি। সবুজ বন জঙ্গলে ঘেরা গ্রামে একশ্রেণির শ্রমজীবী মানুষ গাছ কাটার কাজে নিয়োজিত ছিল। তারা গাছ কাটতো কুড়াল দিয়ে এবং যারা গাছ কাটতো তাদেরকে আঞ্চলিক ভাষায় বলা হতো গাছি। সেখান থেকে নামকরণ হয়ে যায় কুড়ালগাছি। চমৎকার যাতায়াত ব্যবস্থা এবং স্বর্গীয় পরিবেশে ভৈরব নদীর কিনার ঘেষে গড়ে ওঠে কুড়ালগাছি গ্রাম। কালক্রমে কুড়ালগাছি গ্রাম পরিণত হয় বর্ধিষ্ণু গ্রামে।
বিজ্ঞাপন
কুড়ালগাছি গ্রামের পাদদেশে বিশালাকৃতির বিল অবস্থিত। যেখানে প্রকৃতিগতভাবে উৎপাদিত হতো নানা জাতের মাছ। তার মধ্যে গলদা চিংড়ি ছিল বিখ্যাত। কৃষ্ণনগরের জমিদার অভয়ানন্দের ছেলে জগদানন্দ ছিলেন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানী। বৃটিশ সরকার ১৯২৫ সালে জগদানন্দকে রায় সাহেব উপাধি দিলে তিনি পরিচিতি পান রায় সাহেব হিসেবে। কুড়ালগাছির বিলটি পছন্দ হয়ে গেলে বৃটিশ সরকারের কাছ থেকে বিলটি লিজ নেন রায় সাহেব। সেই থেকে বিলটির নাম হয়ে যায় ‘রায় সাহেব বিল’।
গ্রামীণ মানুষরা রায় সাহেবের বিল না বলে বিকৃত করে বলতো রায়সার বিল। রায় সাহেব এই বিল থেকে মাছ সংগ্রহ করে জাহাজে মাছ নিয়ে আসতেন ঢাকার তাঁতিবাজার এলাকায়। রায় সাহেব অত্র এলাকায় একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করেন। কালের বিবর্তনে এখন সেই বাজার না থাকলেও নামকরণ হয়ে গেছে রায় সাহেবের বাজার হিসেবে। কিন্তু জনতা বলে রাইসা বাজার মোড়। রায় সাহেব বাবুর বিলের মাছ অত্র এলাকা, ওপার বাংলার কৃষ্ণনগর, কোলকাতা, মেদিনিপুর ও ঢাকার এমন লোক নেই যে খায়নি। তবে সেই ঐতিহ্য এখন আর নেই। কালের বিবর্তনে বিল হয়েছে সংকুচিত। নেই
সেই মাছের আবাদ।
বিজ্ঞাপন
কুড়ালগাছিতে জন্মেছে অনেক নামিদামি গুণী ব্যক্তি। তার মধ্যে কামিনী রায় ছিলেন বিদ্যান, শিক্ষিত, গুণী , সমাজ সেবিকা। তিনি ১৯২৩ খৃষ্টাব্দে এই গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন কুড়ালগাছি প্রাইমারি স্কুল ও কুড়ালগাছি হাই স্কুল। কুড়ালগাছির শিক্ষিত যামিনি মজুমদার ছিলেন স্বদেশি আন্দোলনের অগ্রজ নেতা। অত্র গ্রামের আব্দুল গফুর ছিলেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক। কালের বিবর্তনে ১৯৪৭ খৃষ্টাব্দে অবিভক্ত ভারতবর্ষ ভাগ হলে দুটি পৃথক রাষ্ট্রের জন্ম হয়।
একটি ভারত এবং অপরটি পাকিস্তান। পাকিস্তানের দুটি অংশ পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান। তৎকালীন নদীয়া জেলার অন্তর্গত ছিল দামুড়হুদা থানা। চুয়াডাঙ্গা মহকুমার অধীন দামুড়হুদা থানার অন্তর্গত ছিল স্বনামধন্য গ্রাম কুড়ালগাছি। দেশ ভাগের পর বিনিময় সূত্রে কৃষ্ণনগর মহকুমার করিমপুর-২ ব্লকের নারায়ণপুর - সিমুরালি গ্রাম থেকে জেহের আলী মণ্ডল স্ত্রী পরশ নেছা সহ পাঁচজন ছেলে মেয়ে যথাক্রমে জামাত আলী মণ্ডল (বড় ছেলে), এলাহি বক্স মণ্ডল (মেজ ছেলে ), নূর ইসলাম মণ্ডল(সেজ ছেলে) ,আছিয়া খাতুন (বড় মেয়ে) রিজিয়া খাতুন (মেজ মেয়ে) কে নিয়ে চলে আসেন কুড়ালগাছি গ্রামে।
জেহের আলী মণ্ডল ছিলেন একজন আদর্শ চাষি। বিনিময় সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তিই ছিল তাঁর জিবিকা নির্বাহের একমাত্র অবলম্বন। পূর্ব পাকিস্তানে আসার পর ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর ওরসে জন্ম নেয় ছোট ছেলে শাহজাহান আলী। শাহজাহান আলী ছিলেন প্রচণ্ড মেধাবী এবং শান্ত স্বভাবের বন্ধু প্রিয় মিশুক ছেলে। তাঁর একমাত্র প্রিয় বন্ধু ছিলেন হারুণ অর রশিদ মোল্লা। অভিন্ন হৃদয়ের দুই বন্ধু একসাথে মেট্রিক পাশ করেন ১৯৭৫ সালে।
বিজ্ঞাপন
দুই বন্ধু মিলে ১৯৮০ সালে শুরু করেন চুয়াডঙ্গার বিখ্যাত সোনালী আঁশ পাটের ব্যবসা। পাটের ব্যবসার পাশাপাশি রবি শস্যের ব্যবসাও চালু করেন। পাট ব্যবসায় সফলতা এলে দর্শনার মনোরঞ্জন বাবুর সাথে যৌথভাবে পাটের ব্যবসা শুরু করেন। ব্যবসা যখন তুঙ্গে ঠিক তখনই পাটের গুদামে আগুন লেগে লক্ষ লক্ষ টাকার পাট পুড়ে যায়। দীর্ঘ ১৬ বছর পাটের ব্যবসা করেছেন সুনামের সাথে। এরপর তিনি থেমে থাকেননি, দমে যাননি। শুরু করেন পূর্ণদ্দোমে আখের গুড়ের উৎপাদন। প্রতিষ্ঠা করেন গুড় উৎপাদনের কারখানা।
যেখানে নিয়োজিত ছিলেন শতাধিক কর্মচারি, শ্রমিক। এখানেই শেষ নয় কর্ম প্রিয় শাহজাহান আলী গুড় উৎপাদনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠা করেন ফসলি জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য ৪টি ব্লকে ৪টি গভীর গভীর নলকূপ। সেই গভীর নলকূপের পানিতে সেচ হতো শত শত বিঘা জমিতে। তাতে ধন্য হতো গ্রামের চাষিরা। যা ছিল খুবই নান্দনিক ও প্রশংসিত। গ্রামের মানুষের কষ্ট লাঘবের জন্য এবং সময় অর্থ দুইই সাশ্রয়ের লক্ষে দূরদর্শী এই মহৎ মানুষ শাহজাহান আলী নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন রাইস মিল।
গ্রামের চাষি গৃহস্থরা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী গ্রামের অনেকে মানুষ আসতেন গরুর গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে মেশিনে ধান ভাঙাতে। গ্রামীন মায়েদেও ঢেঁকি চর্চাকে বাদ দিয়ে অল্প সময়ে বেশি ধান ভাঙানোর জন্যই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন রাইস মিল। যা ছিল সময়োপযোগী পদক্ষেপ। রাইস মিল প্রতিষ্ঠার কারণে এলাকায় শাহজাহান আলীর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। প্রচণ্ড পরোপকারী মনোভাবাপন্ন, দয়াবান ও দানশীল ব্যক্তি হিসেবে খ্যাতি ছিল দামুড়হুদা থানা জুড়ে। ব্যবসার কারণে ব্যপক পরিচিতি লাভ করা শাহজাহান আলী ছিলেন একজন মহৎ দানবীর ও শতভাগ সামাজিক মানুষ। এই গুণী মানুষটির গুণের কথা বলে শেষ করা যাবে না।
বিজ্ঞাপন
দৃঢ়চেতা শাহজাহান আলী বিপদগ্রস্থ মানুষের পাশে দাঁড়াতেন আশীর্বাদ হয়ে, হাত বাড়িয়ে দিতেন সাহায্যের। দুহাত খুলে দান করতেন অবলীলায়। তৎকালীন সময়ে গ্রামীণ রাস্তা ঘাট কাঁচা ও কর্দমাক্ত থাকার কারণে গ্রামের লোকদের সদয় কিনতে যেতে হতো দূরবর্তী কোন দোকানে বা হাটে। নিজ গ্রামের মানুষের কষ্ট লাঘবে শাহজাহান আলী গুড়ের কারখানার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠা করেন নিজ গ্রামে মুদি দোকান। মুদি দোকানের জন্য গ্রামের মানুষ ছিল উচ্ছসিত এবং উৎফুল্ল। কারণ হাত বাড়ালেই পাওয়া যেত মুদি মাল।
প্রয়াত শাহজাহান আলী ব্যবসায় ছিলেন নাম্বার ওয়ান তেমনি পিতা হিসেবে ছিলেন সফল, সৌভাগ্যবান এবং গর্বিত পিতা। তিনি শুধু নিজ গ্রাম বা নিজ জেলারই নন সমগ্র দেশের একজন গর্বিত পিতা। দুই পুত্র সন্তানের জনক এই গর্বিত পিতার বড় ছেলে তারিকুল ইসলাম বর্তমানে পুলিশ ইন্সপেক্টর। ছোট ছেলে শফিকুল ইসলাম একটি জনপ্রিয় ও বহুল প্রচারিত দৈনিক পত্রিকা ‘দৈনিক জনবাণী’র প্রকাশক সম্পাদক। ২০০৪ সালে মহৎ এই ব্যক্তি পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন। দীর্ঘ চার বছর রোগাক্রান্ত থাকার পর ২০০৮ সালের ৭ই জুন শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। আমরা গর্বিত পিতা মরহুম শাহজাহান আলীর আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।








