৩ কিলোমিটার সড়কের অভাবে ৩০ কিলোমিটার ঘুরে যাতায়াত

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ও ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের তিস্তা নদীর পশ্চিম তীরে বসবাসকারী মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ যেন শেষ হওয়ার নয়। মাত্র তিন কিলোমিটার সড়কের অভাবে ইউনিয়ন পরিষদ কিংবা উপজেলা পরিষদে যেতে তাদের প্রায় ৩০ কিলোমিটার পথ ঘুরে যাতায়াত করতে হয়।
বিজ্ঞাপন
এভাবে ৫৬ বছর ধরে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন চরাঞ্চলের ছয়টি গ্রামের প্রায় তিন হাজার পরিবার। এসব এলাকায় বসবাস করেন আনুমানিক ১৪ থেকে ১৫ হাজার মানুষ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, তিস্তা নদীর বুকে গড়ে ওঠা চর বিদ্যানন্দ, চর তৈয়বখাঁ, চর মনম্বর, চর চতুরা, চর গতিয়াসাম ও চর খিতাবখাঁ—এই ছয়টি চরে রয়েছে ২০টিরও বেশি পাড়া। নদীর ভাঙন-গড়নের সঙ্গে বারবার বদলে যাওয়া এই জনপদ এখনো উন্নয়নের মূলধারা থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন।
বর্ষা মৌসুমে তিস্তার পানি বেড়ে গেলে চরবাসীর যাতায়াতের একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে নৌকা। তবে নৌপথেও সবসময় স্বাভাবিক যোগাযোগ সম্ভব হয় না। পানি কমে গেলে নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। কোথাও কোথাও নৌকা চললেও বালুচরে আটকে পড়তে হয়। ফলে স্বাভাবিক সময়ে মাত্র আধা ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে অনেক সময় তিন ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে যায়।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয়দের অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন এলাকায় উন্নয়নের ছোঁয়া লাগলেও তাদের জীবনযাত্রায় সেই পরিবর্তন আসেনি। খিতাবখাঁ এলাকার বাসিন্দা মাঈদুল ইসলাম বলেন, ‘দেশে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল হয়েছে, গ্রামের কাঁচা রাস্তা পাকা হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৬ বছর পরও আমরা একটি ভালো সড়ক, নৌ-অ্যাম্বুলেন্স, সেতু কিংবা উন্নত হাসপাতাল পাইনি।’
চর বিদ্যানন্দের বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘একটি সাধারণ কাগজে চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর নিতে গেলেও আমাদের দুই জেলার ভেতর দিয়ে প্রায় ৩০ কিলোমিটার ঘুরে যেতে হয়। চেয়ারম্যানকে না পেলে পুরো দিনটাই নষ্ট হয়ে যায়।’
চরাঞ্চলের প্রধান সমস্যা যোগাযোগব্যবস্থা। ছোট-বড় মিলিয়ে ১০ থেকে ১২টি কাঁচা রাস্তা থাকলেও বর্ষা মৌসুমে অধিকাংশই পানিতে তলিয়ে যায়। উঁচু ও পাকা সড়ক না থাকায় বছরের প্রায় পুরো সময়ই স্থানীয়দের দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
বিজ্ঞাপন
শিক্ষাক্ষেত্রেও পিছিয়ে রয়েছে চরাঞ্চলের মানুষ। এখানে প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে মাত্র দুটি। নদীভাঙনের কারণে এসব বিদ্যালয়ও বারবার হুমকির মুখে পড়ে। কোনো কোনো সময় নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পর পুনর্নির্মাণ করে চালু করা হলেও আবারও ভাঙনের আশঙ্কা থেকে যায়। চরাঞ্চলে নেই কোনো মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ফলে অনেক শিক্ষার্থী প্রাথমিকের পর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না। বাড়ছে বাল্যবিয়ের ঝুঁকিও।
বর্ষাকালে শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। অভিভাবক মৌল মিয়া ও জাফর আলী জানান, পানি পার হয়ে বিদ্যালয়ে যেতে শিশুদের অনেক সময় দুই সেট কাপড় সঙ্গে নিতে হয়। এক কাপড়ে পানি পার হয়ে পরে শুকনো কাপড় পরে তারা বিদ্যালয়ে যায়।
স্বাস্থ্যসেবার চিত্রও নাজুক। প্রায় আট হাজার মানুষের জন্য রয়েছে মাত্র একটি কমিউনিটি ক্লিনিক—চর বিদ্যানন্দ কমিউনিটি ক্লিনিক। সেটিও চরাঞ্চলের বিপরীত পাশে অবস্থিত। সেখানে একজন মাত্র স্বাস্থ্যকর্মী দায়িত্ব পালন করছেন।
বিজ্ঞাপন
স্বাস্থ্যকর্মী রুফাইদা ইয়াসমিন বীমা বলেন, ‘আমি একাই এখানে দায়িত্ব পালন করছি। প্রতিদিন প্রায় ৪০ জন রোগী আসে। কিন্তু পর্যাপ্ত ওষুধ ও জনবল না থাকায় চিকিৎসাসেবা দিতে খুবই সমস্যা হচ্ছে।’
জরুরি প্রয়োজনে অ্যাম্বুলেন্স কিংবা ফায়ার সার্ভিসও সহজে চরাঞ্চলে পৌঁছাতে পারে না। নেই নৌ-অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা। ফলে গুরুতর অসুস্থ রোগীদেরও অনেক সময় স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিতে হয় কিংবা কবিরাজের শরণাপন্ন হতে হয়।
তবে চরাঞ্চলের মাটি কৃষির জন্য বেশ উর্বর। এখানে বাদাম, আলু, ভুট্টা, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদিত হয়। কিন্তু উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা না থাকায় উৎপাদিত ফসল সহজে বাজারজাত করতে পারেন না কৃষকেরা। এতে তারা ন্যায্যমূল্য থেকেও বঞ্চিত হন।
বিজ্ঞাপন
কৃষক নুরুল হক মুন্সি বলেন, ‘আমাদের ত্রাণ বা রিলিফ দরকার নেই। রাস্তা থাকলে আমরা নিজেরাই ফসল বিক্রি করে ভালোভাবে বাঁচতে পারতাম।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্বাচনের সময় জনপ্রতিনিধি ও প্রার্থীদের নানা প্রতিশ্রুতি শোনা গেলেও নির্বাচন শেষ হলে তাদের আর দেখা মেলে না। চর বিদ্যানন্দের আমজাদ হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এলাকায় রাস্তা-ঘাট কিছুই নেই। চলাফেরা করতে পারি না। ইউনিয়ন পরিষদে যেতে প্রায় ৩০ কিলোমিটার ঘুরতে হয়।’
হায়দার আলী বলেন, ‘নির্বাচনের আগে নেতারা এলাকায় আসেন। ভোট শেষ হলে আর তাদের দেখা যায় না।’
বিজ্ঞাপন
এ বিষয়ে বিদ্যানন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. তাইজুল ইসলাম বলেন, ‘চরবাসীরা সরাসরি ইউনিয়ন পরিষদে আসতে পারেন না। অনেক কষ্ট করে তাদের আসতে হয় এবং যাতায়াতে প্রায় ৩০০ টাকা খরচ হয়। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে তাদের যাতায়াতব্যবস্থা অনেক সহজ হবে।’
তিস্তার বুকে গড়ে ওঠা এই জনপদের মানুষের প্রত্যাশা একটাই—একটি টেকসই সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা। স্থানীয়দের মতে, মাত্র তিন কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হলে বদলে যেতে পারে হাজারো মানুষের জীবনযাত্রা। যোগাযোগব্যবস্থার এই দীর্ঘদিনের সংকট দূর করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন চরাঞ্চলের বাসিন্দারা।
দেশজুড়ে যখন উন্নয়নের নানা গল্প, তখনও তিস্তার চরাঞ্চলের মানুষ অপেক্ষায় রয়েছেন একটি সড়কের জন্য, একটি সহজ ও স্বাভাবিক জীবনের জন্য।








