কে এই ডেভিড ইমন, কেন তার নাম ঘিরে এত আতঙ্ক?

চট্টগ্রামের অপরাধজগতে এখন সবচেয়ে আলোচিত নাম মোবারক হোসেন ইমন, যিনি ‘ডেভিড ইমন’ নামে পরিচিত। হাতে দামি ঘড়ি, আভিজাত্যপূর্ণ জীবনযাপন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাখের বেশি অনুসারী—বাহ্যিকভাবে তাকে দেখে অনেকেরই চলচ্চিত্রের নায়কের কথা মনে হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
তবে এই চাকচিক্যের আড়ালেই রয়েছে ভয়ংকর অপরাধ সাম্রাজ্যের অভিযোগ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে চট্টগ্রামে চাঁদাবাজি, সশস্ত্র হামলা ও হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন ঘটনায় তার নাম উঠে এসেছে।
সম্প্রতি নগরের চকবাজার থানার চন্দনপুরা-বাকলিয়া সংযোগ সড়কে অবস্থিত ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘ডিজিটাল ডট নেট’-এ প্রকাশ্য দিবালোকে সশস্ত্র হামলা ও ৩৫ লাখ টাকা লুটের ঘটনায় আবারও আলোচনায় আসেন ডেভিড ইমন।
ডিডিএনের মালিক আদিল বিন মামুন জানান, সম্প্রতি বিদেশি একটি নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করে ডেভিড ইমন পরিচয় দিয়ে তার কাছে এককালীন ২ কোটি টাকা এবং প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। ফোনে হুমকি দিয়ে ইমন বলেছিলেন, ‘ব্যবসা করতে হলে এককালীন ২ কোটি টাকা দেবেন।
বিজ্ঞাপন
না হলে এখন থেকে আমার ছেলেরা ব্যবসা করবে। আমার ডিটেইলস পুলিশ কমিশনারকে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন।’
চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর ঠিক দুই দিনের মাথায়, গত ১৩ জুলাই সোমবার দুপুরে ২০ থেকে ৩০ জন সশস্ত্র যুবক মুখে মাস্ক পরে ডিডিএন কার্যালয়ে তাণ্ডব চালায় এবং বেতনের জন্য রাখা ৩৫ লাখ টাকা লুট করে নেয়। সিসিটিভি ফুটেজে ছড়িয়ে পড়া এই হামলার পর এলাকাভিত্তিক ইন্টারনেট সেবাদাতাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
শুধু এই ঘটনাই নয়, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডে ২০ লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় ব্যবসায়ী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনের নির্মাণাধীন ১০ তলা ভবনেও হামলা, ভাঙচুর ও ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগ রয়েছে। পরে ওই ব্যবসায়ীর কাছে আরও ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। এর পর থেকেই ভবনটির নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
কে এই ডেভিড ইমন?
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মোবারক হোসেন ইমনের বাড়ি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকায়। তার বাবা মো. মুসা একজন কৃষক। লেখাপড়ায় বেশি দূর এগোতে না পারা ইমন অল্প বয়সেই কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে অপরাধ জগতে তার তেমন পরিচিতি ছিল না। তবে বিদেশে অবস্থানকারী শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর ধারাবাহিক কয়েকটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগে দ্রুত তার প্রভাব বাড়তে থাকে। বর্তমানে সাজ্জাদ বাহিনীর অর্ধশতাধিক সদস্যের একটি সশস্ত্র চক্র পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ, পতেঙ্গা এবং রাউজান ও হাটহাজারী উপজেলায় এই চক্রের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। আগে দেশে সাজ্জাদের বাহিনীর নেতৃত্ব দিতেন ‘ছোট সাজ্জাদ’ ওরফে সাজ্জাদ হোসেন। তিনি বর্তমানে কারাগারে থাকায় ইমন ও মোহাম্মদ রায়হান এলাকা ভাগ করে পুরো চক্রটি নিয়ন্ত্রণ করছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ডেভিড ইমন দুই বছরের ব্যবধানে অন্তত সাতটি হত্যা মামলার আসামি হয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট আনিস ও মোহাম্মদ হাসান নামে দুইজনকে ব্রাশফায়ারে হত্যা। এছাড়া ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকার আলোচিত জোড়া খুন (যার সমন্বয় ও মোটরসাইকেল ভাড়ার দায়িত্বে ছিলেন ইমন) এবং একই বছরের ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ‘ঢাকাইয়া আকবর’ হত্যা। এছাড়া নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে প্রতিপক্ষ সারোয়ার হোসেন বাবলার হত্যাকাণ্ডেও তার নাম এসেছে।
বিজ্ঞাপন
পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে, ইমন অত্যন্ত অস্ত্র পরিচালনায় দক্ষ এবং তার কাছে অন্তত ১৫ থেকে ২০টি আগ্নেয়াস্ত্রের অ্যাক্সেস রয়েছে।
ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে গত এক মাসেই প্রায় দেড় কোটি টাকার বেশি চাঁদা আদায় করেছে ইমন বাহিনী। অক্সিজেন, মুরাদপুর, জিইসির মোড় ও পাঁচলাইশ এলাকার ব্যবসায়ীরা আতঙ্কের মুখে নীরবে চাঁদা দিতে বাধ্য হচ্ছেন। ডিডিএনে হামলার খবর পেয়েই ‘নেট প্লাস’ নামে অপর একটি প্রতিষ্ঠানের মালিককেও ফোন করে হুমকি দেয় ডেভিড ইমন।
এ ঘটনার পর চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে হামলার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সংগঠনের চট্টগ্রাম বিভাগীয় নেতারা।
বিজ্ঞাপন
উল্লেখ্য, মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) দিবাগত রাত ৩টার দিকে যশোরের ধুমধুমপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে চেকপোস্ট স্থাপন করে পরিচালিত অভিযানে তাকে আটক করা হয়। যশোর ও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের যৌথ অভিযানের পর ডেভিড ইমনকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।








