Logo

শ্রীপুরে মৃত্যুর পরও মিলল না দাফনের জায়গা

profile picture
উপজেলা প্রতিনিধি
শ্রীপুর, গাজীপুর
১২ আগস্ট, ২০২৬, ১২:২৪
শ্রীপুরে মৃত্যুর পরও মিলল না দাফনের জায়গা
ছবি: সংগৃহীত

গাজীপুরের শ্রীপুরে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে মৃত্যুর পরও দাফনের জায়গা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে একটি মান্দাই পরিবার। বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যাওয়ার পর শ্রী মেনোকা (৬০) নামে এক নারীর মরদেহ ঘরের বারান্দায় রেখে রাতভর অপেক্ষা করতে হয়েছে স্বজনদের।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় মাতব্বর, জনপ্রতিনিধি ও পুলিশের উপস্থিতিতে দফায় দফায় বৈঠক হলেও বিরোধের কোনো সমাধান হয়নি। পরে বাধ্য হয়ে বসতবাড়ির উঠানেই মেনোকার মরদেহ দাফনের প্রস্তুতি নেন স্বজনেরা।

ঘটনাটি ঘটেছে শ্রীপুর উপজেলার মাওনা ইউনিয়নের আক্তাপাড়া গ্রামে। নিহত মেনোকা ওই গ্রামের গোপালের স্ত্রী।

স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার দুপুরের দিকে বার্ধক্যজনিত কারণে মেনোকার মৃত্যু হয়। এরপর স্বজনেরা বাড়ির পাশে তাঁকে দাফনের প্রস্তুতি নেন। কিন্তু কবর খননের উদ্যোগ নিলে জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের কারণে বাধার মুখে পড়েন তাঁরা। ফলে দাফন না করেই মরদেহ বাড়ির বারান্দায় রাখতে হয়।

বিজ্ঞাপন

পরিবারের দাবি, গোপাল কয়েক দশক আগে আক্তাপাড়া গ্রামে এক শতাংশ জমি কিনে সেখানে ঘর নির্মাণ করে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে বসবাস শুরু করেন। প্রায় এক বছর আগে প্রতিবেশী ছফর উদ্দিনের কাছ থেকে আরও এক শতাংশ জমি কেনা হয়। তবে মিউটেশন বা খারিজ-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে জমিটি রেজিস্ট্রি করা সম্ভব হয়নি। পরিবারের দাবি, জমির মূল্য পরিশোধ করে জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল।

পরিবারের অভিযোগ, বর্তমানে ছফর উদ্দিন ওই জমি বিক্রির বিষয়টি অস্বীকার করছেন। এমনকি সেখানে মেনোকার মরদেহ দাফনের জন্য কবর খনন করতে গেলেও তিনি বাধা দেন।

বুধবার রাত ১১টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির বারান্দায় রাখা রয়েছে মেনোকার মরদেহ। স্বজনেরা মরদেহের পাশে বসে আছেন। দাফনের ব্যবস্থা না হওয়ায় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা দেখা যায়। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও জনপ্রতিনিধিরা দুপুরের পর থেকে একাধিকবার বৈঠক করলেও কোনো সমাধানে পৌঁছাতে পারেননি।

বিজ্ঞাপন

মেনোকার ভাই নিধারণ বলেন, এক শতাংশ জমি কেনা হয়েছিল এই আশায় যে পরিবারের কেউ মারা গেলে ঘরের পাশেই দাফন করা যাবে। কিন্তু এখন সেই জায়গাতেও মাকে দাফন করতে দেওয়া হচ্ছে না। কবর খনন করতে গেলে ছফর উদ্দিন ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা লাঠিসোঁটা নিয়ে বাধা দেন। স্থানীয় সাবেক চেয়ারম্যানসহ অনেকেই বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করলেও কোনো ফল হয়নি।

মেনোকার ছেলে সুনিল বলেন, মায়ের মৃত্যুর পরও তাঁরা শান্তিতে দাফন করতে পারছেন না। মেম্বার, চেয়ারম্যান ও পুলিশের কাছে যাওয়ার পাশাপাশি কয়েক দফা সালিস হলেও কবর খননের অনুমতি পাওয়া যায়নি। বাধ্য হয়ে রাত জেগে মরদেহ পাহারা দিতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বাড়ির উঠানেই কবর খননের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

তবে পরিবারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ছফর উদ্দিন। তিনি বলেন, আমি তাঁর কাছে কোনো জমি বিক্রি করিনি এবং কোনো টাকা নিইনি। আমার জমিতে তাঁকে দাফন করতে দেব না।

মাওনা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল হক বলেন, বিষয়টি সমাধানের জন্য ছফর উদ্দিনকে একাধিকবার বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে কয়েক দফা বৈঠকও হয়েছে। কিন্তু তাঁর অবস্থানের কারণে সমাধান করা সম্ভব হয়নি।

শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শাহীনুর আলম বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। পুলিশ বিষয়টি সমাধানের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে। তবে জমি-সংক্রান্ত বিরোধ হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান সম্ভব হয়নি। ভুক্তভোগী পরিবারকে আদালতের আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এদিকে, জমি নিয়ে বিরোধের কারণে একজন মৃত নারীর দাফন নিয়েও এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিষয়টির দ্রুত আইনগত সমাধানের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

এ বিষয়ে জানতে শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাহিদ ভূঁইয়ার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের প্রকৃত সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র ও আইনগত বিষয় যাচাই করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে মৃত্যুর পর একজন মানুষের দাফন নিয়েও এমন অনিশ্চয়তার ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD