Logo

মাদ্রাসা থেকে নিয়ে যাওয়ার তিন দিন পর নদীতে শিশুর মরদেহ

profile picture
উপজেলা প্রতিনিধি
ঘোড়াঘাট, দিনাজপুর
১৯ আগস্ট, ২০২৬, ১৪:৫৯
মাদ্রাসা থেকে নিয়ে যাওয়ার তিন দিন পর নদীতে শিশুর মরদেহ
ছবি: সংগৃহীত

মাদ্রাসায় ভর্তি করানোর কথা বলে ১০ বছরের শিশু তাসফিয়াকে সেখানে রেখে গিয়েছিলেন তাঁর সৎ বাবা শাফিউল। দুই দিন পর আবার মাদ্রাসায় গিয়ে শিশুটিকে সঙ্গে করে বেরিয়ে যান তিনি। ওই রাতেই শাফিউলের মোবাইল ফোন থেকে মাদ্রাসার পরিচালিকার সঙ্গে কথা বলে তাসফিয়া জানিয়েছিল, তাকে বিরামপুরে ভর্তি করানো হয়েছে। এর পরদিন রাতে করতোয়া নদী থেকে উদ্ধার করা হয় শিশুটির মরদেহ।

বিজ্ঞাপন

ঘটনার পর থেকে তাসফিয়ার মাদ্রাসা থেকে বের হওয়ার পরের সময় নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। প্রায় তিন দিনের ব্যবধানে শিশুটি কোথায় ছিল, কার সঙ্গে ছিল এবং কীভাবে তাঁর মরদেহ নদীতে গেল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট হয়নি।

গত শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ঘোড়াঘাট উপজেলার রানীগঞ্জ জুবাইদা বালিকা মাদ্রাসায় তাসফিয়াকে নিয়ে যান শাফিউল। মাদ্রাসার পরিচালিকা রমিছার কাছে নিজেকে শিশুটির সৎ বাবা হিসেবে পরিচয় দেন তিনি। তাসফিয়াকে মাদ্রাসায় ভর্তি করানোর কথা জানিয়ে তাঁর ও শিশুটির মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র পরে দেওয়ার কথা বলেন।

সেদিন রাতে তাসফিয়াকে মাদ্রাসায় রাখার অনুরোধ করেন শাফিউল। পরিচালিকা রমিছার ভাষ্য, তখন শিশুটি খুব কান্নাকাটি করছিল। তিনি তাকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। শাফিউলকে আগে থেকে চিনতেন না বলেও জানান তিনি।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

রমিছা বলেন, শাফিউল শিশুটিকে রেখে দ্রুত সেখান থেকে চলে যান। পরে তিনি বাইরে গিয়ে তাকে খোঁজ করলেও আর পাননি।

পরদিন শনিবার (১৫ আগস্ট) শাফিউল মাদ্রাসায় না আসায় পরিচালিকা তাসফিয়াকে নিয়ে তাঁর ভর্ণাপাড়ার বাড়িতে যান। সেখানে শিশুটির সৎ দাদিসহ কয়েকজন নারী ছিলেন। তাঁরা তাসফিয়াকে মাদ্রাসায় ভর্তি করানোর বিষয়ে আপত্তি নেই বলে জানান। তবে শাফিউল তখন বাড়িতে ছিলেন না।

বিজ্ঞাপন

সেখান থেকে তাসফিয়ার মায়ের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করেন মাদ্রাসার পরিচালিকা। একাধিকবার ফোন করেও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। পরে তাসফিয়াকে মাদ্রাসায় ফিরে আসতে বলা হলে সে নিজের কাপড়চোপড় নিয়ে পরিচালিকার সঙ্গে চলে আসে।

সেদিন সন্ধ্যার পর শাফিউল মাদ্রাসায় ফোন করেন। পরিচালিকা তাঁকে জানান, কাউকে কিছু না জানিয়ে এভাবে শিশুকে রেখে যাওয়া সম্ভব নয়। পরে শাফিউল মাদ্রাসায় এসে দাবি করেন, তিনি ইচ্ছা করেই তাসফিয়াকে সেখানে রেখে গিয়েছিলেন। কারণ, তিনি সামনে থাকলে শিশুটি তাঁর সঙ্গে বাড়িতে চলে যেতে চাইতে পারে।

পরিচালিকার দাবি, ওই সময় শাফিউল তাঁকে তাসফিয়ার মা কিংবা রংপুর থেকে কোনো আত্মীয় এলে শিশুটিকে তাঁদের সঙ্গে যেতে না দেওয়ার অনুরোধ করেন। কেউ তাসফিয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তাঁকে বিষয়টি জানানোর কথাও বলেন তিনি। শিশুটির প্রয়োজনীয় সবকিছু নিজেই দেখবেন বলেও জানান।

বিজ্ঞাপন

শাফিউল মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন, তাসফিয়ার মায়ের আগের বিয়ে রংপুরে হয়েছিল। সেখানকার আত্মীয়রা শিশুটিকে নিয়ে যেতে পারেন—এমন আশঙ্কা থেকেই তিনি বিষয়টি গোপন রাখতে চেয়েছিলেন বলে পরিচালিকার ভাষ্য।

এরপর রোববার (১৬ আগস্ট) দুপুরে শাফিউল আবার মাদ্রাসায় যান। তিনি তাসফিয়াকে ৫০ টাকা ও কিছু চকলেট দেন। পরে সন্ধ্যার দিকে আবার মাদ্রাসায় আসেন। ওই সময় পরিচালিকা গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে অবস্থান করায় অন্য এক শিক্ষিকা মাদ্রাসার দায়িত্বে ছিলেন।

মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, শাফিউল নিজের এবং তাসফিয়ার মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র মাদ্রাসায় রেখে ছবি তোলা ও শিশুটির জন্য একটি ট্রাঙ্ক কেনার কথা বলে তাসফিয়াকে সঙ্গে নিয়ে বের হন। মাদ্রাসার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজেও শিশুটিকে তাঁর সঙ্গে বের হতে দেখা গেছে বলে জানান পরিচালিকা।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু এরপর আর তাসফিয়াকে মাদ্রাসায় ফিরিয়ে দেননি শাফিউল।

রোববার রাত ৯টা ১৬ মিনিটে শাফিউলের মোবাইল নম্বর থেকে মাদ্রাসার পরিচালিকার ফোনে কল আসে। ওই সময় তাসফিয়া কথা বলে জানায়, তার বাবা তাকে বিরামপুরে ভর্তি করিয়ে দিয়েছেন।

পরিচালিকার দাবি, ফোনে কথা বলার সময় তাঁর মনে হয়েছিল, শিশুটির পাশে থাকা কেউ তাকে কী বলতে হবে তা বলে দিচ্ছিল। পরে আবার ফোন করা হলে তাসফিয়া জানায়, তার বাবা তাকে নতুন পোশাক কিনে দিয়েছেন। এরপর মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আর যোগাযোগ হয়নি।

বিজ্ঞাপন

পরদিন সোমবার (১৭ আগস্ট) রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঘোড়াঘাট উপজেলার ৩ নম্বর সিংড়া ইউনিয়নের ভর্ণাপাড়া টঙ্গী ঈদগাহ মাঠসংলগ্ন করতোয়া নদী থেকে লাল পোশাক পরা অবস্থায় শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে পরিচয় নিশ্চিত হয়ে জানা যায়, মরদেহটি তাসফিয়ার।

শিশুটির মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়ার পর মাদ্রাসার পরিচালিকা আগের ঘটনাগুলো ও সিসিটিভি ফুটেজ মিলিয়ে দেখেন। তাঁর দাবি, মাদ্রাসা থেকে তাসফিয়াকে সর্বশেষ শাফিউলই সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন।

এরপর শাফিউলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁর বক্তব্যে অসঙ্গতি পাওয়া যায় বলে দাবি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের। শাফিউল প্রথমে বলেন, তাসফিয়ার জন্য ট্রাঙ্ক ও পোশাক কিনে তাঁকে মাদ্রাসায় দিয়ে এসেছেন। কিন্তু সিসিটিভি ফুটেজে তাঁকে শিশুটিকে সঙ্গে নিয়ে বের হতে দেখা গেছে জানানো হলে তিনি দাবি করেন, তাসফিয়াকে একাই ভ্যানে করে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।

বিজ্ঞাপন

নিজে কেন শিশুটির সঙ্গে যাননি—এ প্রশ্নের জবাবে শাফিউল ইউনিয়ন পরিষদে তাঁর কাজ ছিল বলে জানান। সেখানে গিয়ে চেয়ারম্যানকে পাননি বলেও দাবি করেন তিনি।

বিরামপুরে ভর্তি করানোর কথা তাসফিয়াকে কেন বলতে বলা হয়েছিল—এ বিষয়ে শাফিউল বলেন, শিশুটির মা ও রংপুরের আত্মীয়রা যেন বিষয়টি জানতে না পারেন, সে কারণেই তাসফিয়াকে এমন কথা বলতে শেখানো হয়েছিল।

শাফিউল বর্তমানে ঢাকায় রয়েছেন বলেও জানান। তাসফিয়ার মৃত্যুর খবর কখন জানতে পেরেছেন জানতে চাইলে তিনি পরে জানতে পেরেছেন বলে দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য, শিশুটির মা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এবং তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে দুজন একসঙ্গে আসবেন।

বিজ্ঞাপন

তবে তাসফিয়ার মায়ের মোবাইল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

এদিকে তাসফিয়ার সৎ বাবার ভর্ণাপাড়ার বাড়িতে গিয়ে তাঁর মা ছালেমা বেগমের সঙ্গে কথা বলেছে স্থানীয় সূত্র। তিনি জানান, রোববার রাতে শাফিউল আনুমানিক রাত ১টার দিকে বাড়িতে ফেরেন। সাধারণত এত রাতে তাঁর ছেলে বাড়িতে ফেরেন না। ওই রাতে তাঁকে অস্বাভাবিক দেখাচ্ছিল এবং নেশাগ্রস্ত মনে হয়েছিল বলেও দাবি করেন ছালেমা বেগম।

তিনি বলেন, রাতে ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলে শাফিউল তাসফিয়াকে মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দিয়ে আসার কথা জানান। পরে সোমবার রাতে তাঁর স্বামী মোসলেম উদ্দিন নদীতে মাছ ধরতে গেলে শিশুর মরদেহ উদ্ধারের খবর পান। বাড়িতে ফিরে বিষয়টি জানালে তাঁরা শাফিউলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন।

বিজ্ঞাপন

ছালেমা বেগমের ভাষ্য অনুযায়ী, তাসফিয়ার মরদেহ নদীতে পাওয়ার বিষয়টি জানার পর শাফিউল তাঁকে মাদ্রাসার খোঁজ নিতে বলেন। পরে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁরা জানতে পারেন, তাসফিয়াকে শাফিউলই সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন।

নিজের ছেলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে ছালেমা বেগম বলেন, তিনি মা হয়েও তাসফিয়ার সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে বলে মনে করছেন এবং ঘটনায় জড়িত ব্যক্তির কঠোর শাস্তি চান।

ঘটনার পর শাফিউলের গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গেও কথা বলে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের কথা জানা গেছে। স্থানীয় কয়েকজন তাসফিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় তাঁকে সন্দেহ করছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইউপি সদস্যের দাবি, শাফিউলের বিরুদ্ধে অতীতেও একাধিক অপরাধের অভিযোগ ছিল এবং বিভিন্ন সময় পুলিশ তাঁকে ধরতে এলাকায় এসেছিল। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন নথিপত্র যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, ঘটনার রাতে নদীর আশপাশেও শাফিউলকে দেখা গিয়েছিল। নিরাপত্তার কারণে তাঁরা প্রকাশ্যে নাম বলতে চাননি। অনুসন্ধানের সময় রাত আনুমানিক ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে শাফিউলকে ডেকে নেওয়া হয়েছিল বলেও কয়েকজন জানিয়েছেন। তবে এসব তথ্যও তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

সিংড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুতর। তাঁর মতে, শিশুটির মৃত্যুর পেছনে কী ঘটেছিল তা বের করতে বিস্তারিত তদন্ত প্রয়োজন। প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন করে দায়ীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

ঘোড়াঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম জানান, শিশুটির পরিচয় শনাক্ত হওয়ার আগেই মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য দিনাজপুরের এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছিল। পরে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

ওসি আরও জানান, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর তদন্তের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তাসফিয়ার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে মাদ্রাসা থেকে বের হওয়ার পর তাঁর গতিবিধি, সৎ বাবার বক্তব্যের অসঙ্গতি এবং নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাগুলো তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই—১৪ আগস্ট সন্ধ্যায় মাদ্রাসায় রেখে যাওয়ার পর ১৬ আগস্ট সন্ধ্যায় সেখান থেকে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা এবং ১৭ আগস্ট রাতে নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের মধ্যবর্তী সময়ে তাসফিয়া কোথায় ছিল?

মাদ্রাসার সিসিটিভি ফুটেজে সর্বশেষ শাফিউলের সঙ্গে তাসফিয়াকে বের হতে দেখা গেছে। একই রাতে তাঁর মোবাইল থেকে মাদ্রাসায় ফোন করে শিশুটির সঙ্গে কথা বলানো হয়। এরপর আর তার জীবিত অবস্থার কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই মাদ্রাসা থেকে বের হওয়ার পরের সময়টিই এখন তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD