১৩ বছরে ৯৯ ভরি সোনা আত্মসাৎ, কর্মচারীসহ ছয়জন গ্রেপ্তার

চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশে একটি জুয়েলারি দোকান থেকে দীর্ঘ ১৩ বছরে বিপুল পরিমাণ সোনা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে এক কর্মচারীর বিরুদ্ধে। দোকানের মালিক আসার খবর পেয়ে ওয়াশরুমে যাওয়ার কথা বলে পালিয়ে যান ওই কর্মচারী। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে আত্মসাৎ করা ৫৫টি সোনার চুড়ি উদ্ধার করেছে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
শুক্রবার (২১ আগস্ট) বিকেলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) পক্ষ থেকে দেওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে সহকারী পুলিশ কমিশনার (গণসংযোগ) আমিনুর রশিদ ঘটনাটির বিস্তারিত তুলে ধরেন।
পুলিশ জানায়, পাঁচলাইশ থানার প্রবর্তক মোড়ের মিমি সুপার মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় ‘নিউ কনক বাহার জুয়েলার্স’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক বিপ্লব বসাক, বয়স ৫৩ বছর। সেখানে রোমেন দে নামে ৩৬ বছর বয়সী এক ব্যক্তি দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে সেলসম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
গত ১৪ আগস্ট দুপুরে দোকানের কর্মীরা নিয়মিতভাবে সোনার অলংকারের মজুত হিসাব ও পণ্য মিলিয়ে দেখছিলেন। এ সময় মজুতে বড় ধরনের অসঙ্গতি ধরা পড়ে। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে দোকান মালিককে জানানো হয়।
বিজ্ঞাপন
খবর পেয়ে বিপ্লব বসাক বাসা থেকে দোকানের উদ্দেশে রওনা দেন। কিন্তু মালিক আসছেন জানতে পেরে রোমেন দে কৌশলে দোকান থেকে বের হয়ে যান। পুলিশ জানিয়েছে, তিনি ওয়াশরুমে যাওয়ার কথা বলে দোকান থেকে বেরিয়ে পালিয়ে যান।
পরে বিস্তারিতভাবে মজুত যাচাই করে দেখা যায়, রোমেন দে’র দায়িত্বে থাকা সাতটি বক্স থেকে ৫৩টি সোনার চুড়ি নেই। ওই চুড়িগুলোর মোট ওজন ছিল প্রায় ৯২৭ দশমিক ৫০০ গ্রাম। পুলিশ ও মামলার তথ্য অনুযায়ী, এসব সোনার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি ৮৮ লাখ ২৯ হাজার ৯০০ টাকা।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
অভিযোগ রয়েছে, সোনার চুড়িগুলো সরিয়ে নেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বক্সগুলোতে ইমিটেশনের চুড়ি রেখে দেওয়া হয়েছিল। এতে দীর্ঘ সময় ধরে মজুতের ঘাটতি গোপন রাখার চেষ্টা করা হয় বলে ধারণা করছে পুলিশ।
ঘটনার পর ১৫ আগস্ট পাঁচলাইশ মডেল থানায় মামলা করেন জুয়েলারি দোকানের মালিক বিপ্লব বসাক। মামলাটি তদন্তে নেমে পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তার পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ শুরু করে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শওকত ইমামের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল অভিযান চালিয়ে ১৮ আগস্ট রাত প্রায় ২টার দিকে সীতাকুণ্ড থানার ফৌজদারহাট মহাসড়ক এলাকা থেকে রোমেন দেকে গ্রেপ্তার করে।
বিজ্ঞাপন
পরে আদালতের অনুমতি নিয়ে তাকে তিন দিনের পুলিশ রিমান্ডে নেওয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদে রোমেন দে পুলিশকে জানান, আত্মসাৎ করা সোনার চুড়িগুলো বিভিন্ন জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান ও বন্ধকি ব্যবসায়ীর কাছে রাখা হয়েছে।
তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, ৫৩টি চুড়ির মধ্যে ৪৬টি বাকলিয়ার মিয়াখান নগর রোডের ‘মর্ডাণ ইরানী জুয়েলার্স’-এর মালিক শ্যামল সিংহের কাছে বন্ধক রাখা হয়েছিল।
পরে ১৯ আগস্ট রাতে বোয়ালখালী থানার কানুনগোপাড়া এলাকা থেকে শ্যামল সিংহকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই দিন মিয়াখান নগরের ‘মর্ডাণ ইরানী জুয়েলার্স’ থেকে সাতটি সোনার চুড়ি উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার করা এসব চুড়ির ওজন ১৪২ দশমিক ৪০ গ্রাম।
বিজ্ঞাপন
পরদিন ২০ আগস্ট শ্যামল সিংহকে আদালতে হাজির করা হলে পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ডে নেয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান, তার কাছে থাকা বাকি ৩৯টি সোনার চুড়িও বিভিন্ন জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান ও বন্ধকি ব্যবসায়ীর কাছে রাখা হয়েছে।
পুলিশ এরপর শ্যামল সিংহের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নগরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে। কোতোয়ালি থানার আওতাধীন এলাকায় ‘মর্ডাণ রিনা জুয়েলার্স’ থেকে তিনটি এবং ‘সাহা জুয়েলার্স’ থেকে ১৬টি সোনার চুড়ি উদ্ধার করা হয়।
এ ছাড়া বিভিন্ন বন্ধকি ব্যবসায়ীর কাছ থেকেও উদ্ধার করা হয়েছে আরও ২০টি চুড়ি। এর মধ্যে লিটন মহাজনের কাছ থেকে একটি, সাগর কারিগরের কাছ থেকে পাঁচটি, পার্থ মহাজনের কাছ থেকে ১১টি এবং রুবেল মহাজনের কাছ থেকে তিনটি চুড়ি উদ্ধার করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে রোমেন দে’র দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাকলিয়ার ‘মর্ডাণ রিয়া জুয়েলার্স’ থেকে তিনটি এবং ‘শাহ আমানত জুয়েলার্স’ থেকে তিনটি চুড়ি উদ্ধার করা হয়। এছাড়া চকবাজারের ‘ফেন্সী জুয়েলার্স’ থেকে দুটি এবং ‘তাজমহল জুয়েলার্স’ থেকে একটি সোনার চুড়ি উদ্ধার করেছে পুলিশ।
সিএমপি জানিয়েছে, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযানে মোট ৫৫টি সোনার চুড়ি উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া এসব চুড়ির মোট ওজন ৯৯ ভরি ৪ আনা ৫ রত্তি।
দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে কীভাবে এত বিপুল পরিমাণ সোনা আত্মসাৎ করা হয়েছে এবং এই ঘটনায় আরও কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। উদ্ধার হওয়া স্বর্ণালংকারের প্রকৃত মালিকানা ও আত্মসাতের পুরো প্রক্রিয়াও তদন্তের আওতায় রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।








