ভরা মৌসুমে লোডশেডিং, মৌলভীবাজারে চা উৎপাদনে বড় ধস

চা উৎপাদনের ভরা মৌসুমে দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিংয়ে সংকটে পড়েছে মৌলভীবাজারের চা শিল্প। প্রতিদিন গড়ে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় জেলার বিভিন্ন চা-বাগানের কারখানায় উৎপাদন স্বাভাবিক সক্ষমতার তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
বিজ্ঞাপন
উৎপাদন প্রক্রিয়া সচল রাখতে বাধ্য হয়ে জেনারেটর ব্যবহার করছেন অনেক চা-বাগান কর্তৃপক্ষ। এতে বাড়ছে ডিজেলসহ জ্বালানি ব্যয়। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে চায়ের গুণগত মানও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে চলতি বছর দেশের ১০ কোটি ৪০ লাখ কেজি চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
চা শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ সংকট দীর্ঘায়িত হলে শুধু উৎপাদন ব্যাহত হবে না, চায়ের মান কমে রপ্তানি বাজারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ভরা মৌসুমে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখার জন্য যেখানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রয়োজন, সেখানে ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ায় কারখানার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
মৌলভীবাজার দেশের অন্যতম প্রধান চা উৎপাদনকারী জেলা। জেলার ৯৩টি চা-বাগান থেকে দেশের মোট উৎপাদিত চায়ের প্রায় ৬৪ শতাংশ আসে। বর্তমানে চা উৎপাদনের ভরা মৌসুম চলায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কাঁচা চা পাতা বাগান থেকে কারখানায় নেওয়া হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
চা পাতা সংগ্রহের পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা প্রক্রিয়াজাত করা না হলে পাতাগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বর্তমানে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
কারখানা সংশ্লিষ্টরা জানান, বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর উৎপাদন প্রক্রিয়া থেমে যায়। পরে বিদ্যুৎ এলেও উৎপাদন স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরতে সময় লাগে। এভাবে বারবার বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে উৎপাদনের গতি কমে যাওয়ার পাশাপাশি চায়ের মানেও প্রভাব পড়ছে।
বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকলেও কাঁচা চা পাতা ফেলে রাখার সুযোগ নেই। তাই অনেক বাগান কর্তৃপক্ষ জেনারেটরের মাধ্যমে কারখানার কার্যক্রম চালু রাখার চেষ্টা করছেন। এতে বিদ্যুৎ বিলের পাশাপাশি অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয় যুক্ত হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
একাধিক চা-বাগানের ফ্যাক্টরি-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর অনেক সময় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। ফলে কারখানার স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং সামগ্রিক ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
একজন কারখানা-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেন, অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে এবার চা শিল্প হুমকির মুখে পড়েছে। এভাবে বিদ্যুৎ বিভ্রাট অব্যাহত থাকলে শিল্পটির ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
মৌলভীবাজারের একটি চা-বাগানের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আলী বলেন, তাদের বাগানেও লোডশেডিং হচ্ছে, বিশেষ করে সন্ধ্যার পর বিদ্যুৎ সংকট বেশি দেখা যায়। চা উৎপাদনের জন্য ২৪ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় কাঁচা চা পাতা সময়মতো প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে পাতা নষ্ট ও পচে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে চা উৎপাদনে।
কমলগঞ্জের দেওরাছড়া চা-বাগানের ব্যবস্থাপক আব্দুল আল রুমেন বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও লোডশেডিং অব্যাহত থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ফিনলে টি কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তাহসীন আহমেদ চৌধুরী বলেন, কাঁচা চা পাতা থেকে চা তৈরির পুরো প্রক্রিয়াটি ধারাবাহিকভাবে সম্পন্ন করতে হয়। উৎপাদনের মাঝপথে বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলে চায়ের গুণগত মানের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ে।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, বর্তমানে দেশব্যাপী অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে চায়ের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে তারা মনে করছেন। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে উৎপাদন ও বাজার—দুই ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী সুজিত কুমার বিশ্বাস ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে মুঠোফোনে তিনি জানান, বর্তমানে এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১১০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ রয়েছে প্রায় ১০০ মেগাওয়াট।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহে কিছুটা বিঘ্ন ঘটছে। তবে খুব দ্রুতই সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বিদ্যুৎ সংকটে শুধু বাগান মালিক বা কারখানা কর্তৃপক্ষ নয়, চা শ্রমিকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। শ্রমিকদের অভিযোগ, দিনে ও রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলেও তাদের বিদ্যুৎ বিলের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় বা কমতি দেখা যাচ্ছে না।
চা শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, ভরা মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা না গেলে চলতি বছরের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, চায়ের মান কমে যাওয়া এবং বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান দুর্বল হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, চা-বাগানের উৎপাদনসংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ চা বোর্ডের কর্মকর্তারা সর্বাত্মক সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। বিদ্যুৎসহ উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যেকোনো সমস্যায় ভবিষ্যতেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
চা উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ এই সময়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা এবং চায়ের গুণগত মান ধরে রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন বাগান মালিক ও সংশ্লিষ্টরা। তাদের প্রত্যাশা, দ্রুত বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান করে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই কৃষিভিত্তিক শিল্পকে বড় ধরনের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা হবে।








