Logo

পেটের দায়ে ঢাকামুখী দুই বোন, জনবাণীর সংবাদে ফিরল প্রিয় স্কুলে

profile picture
উপজেলা প্রতিনিধি
নগরকান্দা, ফরিদপুর
২৪ আগস্ট, ২০২৬, ১৪:৩৭
পেটের দায়ে ঢাকামুখী দুই বোন, জনবাণীর সংবাদে ফিরল প্রিয় স্কুলে
ছবি প্রতিনিধি।

পেটের দায়ে মায়ের হাত ধরে ঢাকার পথে পাড়ি জমিয়েছিল ফরিদপুরের বড় কাজুলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী—পঞ্চম শ্রেণির কেয়া ও তৃতীয় শ্রেণির তার ছোট বোন আয়শা। দারিদ্র্যের কারণে দুই বোনের স্কুলছুটির বেদনাময় ঘটনা নিয়ে জাতীয় দৈনিক জনবাণী-তে সংবাদ প্রকাশের পর অবশেষে আবারও বিদ্যালয়ে ফিরেছে তারা। এতে স্বস্তি ফিরেছে শিক্ষক, সহপাঠী ও এলাকাবাসীর মধ্যে।

বিজ্ঞাপন

দারিদ্র্যের কারণে দুই বোনের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর প্রকাশের পর বিষয়টি প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের নজরে আসে। পরে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় উদ্যোগের ফলে কেয়া-আয়শা আবারও ফিরে আসে তাদের প্রিয় বিদ্যালয়ে।

রবিবার (২৩ আগস্ট) বিদ্যালয়ে ফিরে দুই বোনকে দেখে আনন্দিত হয়ে ওঠেন শিক্ষক ও সহপাঠীরা। দীর্ঘদিন পর পরিচিত শ্রেণিকক্ষে তাদের উপস্থিতিতে ফিরে আসে আগের সেই প্রাণচাঞ্চল্য। যে বিদ্যালয়টিকে অনেকটা নীরবেই ছেড়ে গিয়েছিল তারা, সেই বিদ্যালয়েই আবার শুরু হলো তাদের পড়াশোনার পথচলা।

বড় কাজুলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মিজান মুকুল বলেন, “কেয়া ও আয়শা খুবই ভালো ছাত্রী। তাদের স্কুল ছেড়ে চলে যাওয়ার বিষয়টি আমাদের জন্য খুবই কষ্টের ছিল। তারা আবার বিদ্যালয়ে ফিরেছে—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় আনন্দ। আমরা চাই, কোনো সংকট যেন তাদের পড়াশোনার পথে আর বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।”

বিজ্ঞাপন

বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা কামরুন্নাহার ও মুসলিমা জাহান বলেন, কেয়া ও আয়শার ফিরে আসায় আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। তাদের মতো মেধাবী ও সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীরা যেন দারিদ্র্যের কারণে পড়াশোনা থেকে ঝরে না পড়ে, সেদিকে পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজের সবাইকে গুরুত্ব দিতে হবে। দুই বোনের পড়াশোনা অব্যাহত রাখতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও খোঁজখবর রাখার কথাও জানান তারা।

কেয়া ও আয়শার ফিরে আসার বিষয়টি নিয়ে উপজেলা প্রশাসন ও প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারাও খোঁজখবর নেন। নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা আফরিনের দায়িত্বকালে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. চুন্নু ফকির এবং সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা অসীম কুমার দাসও বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. চুন্নু ফকির বলেন, দারিদ্র্যের কারণে কোনো শিশুর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়া কাম্য নয়। কেয়া ও আয়শা আবার বিদ্যালয়ে ফিরেছে, এটি আনন্দের বিষয়। তাদের পড়াশোনা যাতে অব্যাহত থাকে, সে বিষয়ে আমরা নজর রাখব।

বিজ্ঞাপন

কেয়ার সঙ্গে প্রধান শিক্ষক মো. মিজান মুকুলের রয়েছে বিশেষ এক স্মৃতি। বিদ্যালয়ের বালিকা ফুটবল দলের উপজেলা পর্যায়ের সেমিফাইনাল খেলায় শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিতে তিনি কক্সবাজার থেকে কানের দুল ও ব্রেসলেট এনে তাদের মধ্যে বিতরণ করেছিলেন। সেই উপহারের একটি কানের দুল হারিয়ে ফেলেছিল কেয়া। মাত্র ১০ টাকা দামের সেই দুল হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছিল সে। কারণ দুলটি তার কাছে ছিল প্রিয় শিক্ষকের ভালোবাসার স্মৃতি। সেই স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কেয়া আবারও বিদ্যালয়ে ফিরেছে—এতে শিক্ষকরা বিশেষভাবে আনন্দিত।

বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানান, পরিবারের দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট ও খাবারের অনিশ্চয়তার কারণে কেয়া ও আয়শার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। সন্তানদের খাবারের নিশ্চয়তা দিতে তাদের মা ঢাকায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ফলে শিক্ষা ও শৈশব থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পথে ছিল দুই বোন।

জাতীয় দৈনিক জনবাণীতে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। প্রশাসন, শিক্ষা বিভাগ ও সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগে তাদের শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখতে নেওয়া হয় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। শেষ পর্যন্ত বিদ্যালয়ে ফিরে এসেছে দুই বোন। এতে শুধু একটি পরিবার নয়, একটি বিদ্যালয়ও যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয়রা বলছেন, কেয়া-আয়শার মতো আরও অনেক শিশু দারিদ্র্যের কারণে শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তাদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে পরিবারকে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন।

শিক্ষকদের প্রত্যাশা, এবার আর কোনো অর্থনৈতিক সংকট যেন দুই বোনের পড়াশোনার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। কেয়ার সেই ১০ টাকার কানের দুলের স্মৃতির মতোই তার বিদ্যালয়জীবনের গল্পটিও যেন সুন্দরভাবে এগিয়ে যায়—এটাই এখন শিক্ষক ও সহপাঠীদের প্রত্যাশা।

কেয়া ও আয়শার ফিরে আসার ঘটনা দেখিয়ে দিল, একটি শিশুর শিক্ষাজীবন রক্ষায় সংবাদমাধ্যম, প্রশাসন, শিক্ষক ও সমাজ একসঙ্গে এগিয়ে এলে ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব। জাতীয় দৈনিক জনবাণীতে প্রকাশিত সংবাদটি দুই শিশুর শিক্ষাজীবন নিয়ে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। দু’মুঠো খাবারের জন্য যেন আর কোনো শিশুকে স্কুল ছাড়তে না হয়—কেয়া-আয়শার ফিরে আসা সেই প্রত্যাশাকেই আরও জোরালো করেছে।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD