কর্মকর্তা সংকটে অচল মদন উপজেলা, ভোগান্তিতে হাওরবাসী

নেত্রকোনার বৃহৎ ও হাওরবেষ্টিত উপজেলা মদনে কর্মকর্তা সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষের এই উপজেলার প্রশাসনিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ চলছে ভারপ্রাপ্ত ও অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দিয়ে।
বিজ্ঞাপন
নিয়মিত কর্মকর্তা না থাকায় বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। ফলে প্রয়োজনীয় সেবা পেতে এসে দিনের পর দিন ঘুরতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
উপজেলা পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, পরিষদের আওতাধীন ১৭টি দপ্তরের মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত কর্মকর্তা নেই। উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে প্রায় এক বছর, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরে তিন বছর এবং মৎস্য অফিসে প্রায় এক বছর ধরে নিয়মিত কর্মকর্তা নেই। এ ছাড়া সমাজসেবা অফিসসহ আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরও অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
নিয়মিত কর্মকর্তা না থাকায় এসব দপ্তরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পার্শ্ববর্তী উপজেলার কর্মকর্তাদের ওপর। তবে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা এসব কর্মকর্তা মাসে মাত্র দুই থেকে চার দিন মদনে অফিস করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ফলে নিয়মিত দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং জনগণকে দ্রুত সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিজ্ঞাপন
শুধু বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা সংকটই নয়, উপজেলা প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়েও রয়েছে অতিরিক্ত দায়িত্বের চাপ। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাদির হোসেন শামীমকে উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌরসভার প্রশাসকের অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছে।
একইভাবে মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শফিকুল বারী মদনের পাশাপাশি আরও দুটি উপজেলার দায়িত্ব পালন করছেন। উপজেলা প্রকৌশলী আরিফ উল্লাহ এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা হুমায়ুন কবিরও মদনের পাশাপাশি অন্য উপজেলার দায়িত্বে রয়েছেন।
এ ছাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, সমবায় কর্মকর্তা ও সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তারাও একটি করে ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসকের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে কর্মকর্তাদের ওপর দায়িত্বের চাপ বাড়ছে এবং এর প্রভাব পড়ছে স্বাভাবিক দাপ্তরিক কার্যক্রমে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
কর্মকর্তা সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ। কাগজপত্রে স্বাক্ষর, বিভিন্ন প্রকল্পের বিল অনুমোদন, ভাতা-সংক্রান্ত আবেদন, দাপ্তরিক অনুমোদনসহ নানা কাজ দীর্ঘদিন আটকে থাকছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
হাওরাঞ্চলের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে মানুষকে সরকারি সেবা নিতে উপজেলা সদরে আসতে হয়। একবার এসে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা না পাওয়ায় অনেককে আবারও আসতে হচ্ছে। এতে সময় ও অর্থ দুটোই নষ্ট হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
বিশেষ করে বয়স্ক, নারী, প্রতিবন্ধী এবং দরিদ্র মানুষ সরকারি ভাতা ও অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সেবা নিতে গিয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, নিজেদের দপ্তরের নিয়মিত কাজ সামলাতেই তাঁদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। এর মধ্যে একাধিক দপ্তর বা উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
তাঁদের ভাষ্য, অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নিয়মিতভাবে মদনে অবস্থান করতে না পারায় অনেক কাজ জমে থাকে। পরে নির্দিষ্ট দিনে অফিসে এলে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক ফাইল ও আবেদন নিষ্পত্তির চাপ তৈরি হয়। এতে কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সেবা নিতে আসা উভয় পক্ষই সমস্যায় পড়ছেন।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ বলছেন, মদন একটি গুরুত্বপূর্ণ হাওরবেষ্টিত উপজেলা। এখানকার মানুষের বড় একটি অংশ কৃষি ও হাওরনির্ভর জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের সরকারি সেবা পাওয়ার সুযোগ সহজ করতে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে নিয়মিত কর্মকর্তা থাকা জরুরি।
তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকা পদগুলো দ্রুত পূরণ করা না হলে জনভোগান্তি আরও বাড়বে। একই সঙ্গে এক কর্মকর্তার ওপর একাধিক দায়িত্বের চাপ কমিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পূর্ণাঙ্গ জনবল নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাদির হোসেন শামীম বলেন, শূন্য পদগুলোতে দ্রুত জনবল নিয়োগের জন্য জেলা প্রশাসককে জানানো হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, খুব শিগগিরই সমস্যার সমাধান হবে।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, হাওরবাসীর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত কর্মকর্তা সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। নিয়মিত কর্মকর্তা নিয়োগের মাধ্যমে সরকারি দপ্তরগুলোর কার্যক্রম স্বাভাবিক হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তিও অনেকাংশে কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।








